রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ও সংসদীয় সরকারের প্রকৃতি

রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ও সংসদীয় সরকারের প্রকৃতি (Presidential and Parliamentary Government)

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

1. সংসদীয় গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায় ?
উত্তর: সংসদীয় গণতন্ত্র বলতে বোঝায় এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে নির্বাচিত একটি আইনসভার নিকট দায়ীত্বশীল মন্ত্রীসভা আছে।

2. রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ কীভাবে পদচ্যুত হয় ?
উত্তর: রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ পদচ্যুত হন মহাবিচার পদ্ধতি দ্বারা।

3. ভারতের মন্ত্রীপরিষদ কী ধরনের শাসক ?
উত্তর: ভারতের মন্ত্রীপরিষদ প্রকৃত শাসক।

4. ইংল্যান্ডের রাজা বা রানি কীরূপ শাসক প্রধান ?
উত্তর: ইংল্যান্ডের রাজা বা রানি নিয়মতান্ত্রিক শাসক প্রধান।

5. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কীরূপ সরকার আছে ?
উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার আছে।

6. ইংরেজি Republic কথাটি কোন শব্দ ভাণ্ডার থেকে উদ্ভূত হয়েছে ?
উত্তর: ইংরেজি Republic কথাটি ল্যাটিন শব্দ ভাণ্ডার থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

7. রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান কোন পদ্ধতিতে পদচ্যুত হন ?
উত্তর: রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান সাধারণত পদচ্যুত হন ‘ইমপিচমেন্ট পদ্ধতি’ দ্বারা।

8. ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতি কোন শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ?
উত্তর: ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতি রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

9. রাজস্ব বন্টনে আয়ের বেশির ভাগ অংশ কার হাতে থাকে ?
উত্তর: রাজস্ব বণ্টনে আয়ের বেশির ভাগ অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে।

10. কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র প্রবণতার চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন ?
উত্তর: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কে. সি. হোয়ার যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র-প্রবণতার চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন।

11. ইংল্যান্ডের শাসনব্যবস্থা কী ধরনের ?
উত্তর: ইংল্যান্ডের শাসনব্যবস্থা এককেন্দ্রিক।

12. অ্যারিস্টটলের মতে সরকার কয় প্রকার ?
উত্তর: অ্যারিস্টটলের মতে সরকার দুই প্রকার।

13. সোভিয়েত ইউনিয়নে কী ধরনের শাসন কর্তৃপক্ষ দেখা যায় ?
উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়নে বহু শাসন কর্তৃপক্ষ দেখতে পাওয়া যায়।

14. ভারতে কীরূপ সরকার আছে?
উত্তর: ভারতে সংসদীয় সরকার আছে।

15. ভারতের রাষ্ট্রপতিকে কী ধরনের শাসক বলা যেতে পারে?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতিকে নিয়মতান্ত্রিক শাসক বলা যেতে পারে।

16. সংসদীয় সরকারের মন্ত্রীসভা কার নিকট দায়িত্বশীল?
উত্তর: সংসদীয় সরকারের মন্ত্রীসভা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার নিকট দায়িত্বশীল।

17. লিখিত সংবিধানে সাধারণত কোন বিভাগের প্রাধান্য থাকে ?
উত্তর: লিখিত সংবিধানে সাধারণত বিচার বিভাগের প্রাধান্য থাকে।

18. রাষ্ট্রপতি পরিচালিত শাসনব্যবসথায় রাষ্ট্রপ্রধান কার নিকট দায়িত্বশীল থাকেন ?
উত্তর: রাষ্ট্রপতি পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের নিকট দায়িত্বশীল।

19. কী ধরনের সরকারে আইন ও শাসন বিভাগের গভীর সম্পর্ক লক্ষ করা যায় ?
উত্তর: মন্ত্রীপরিষদশাসিত সরকারে আইন ও শাসন বিভাগের গভীর সম্পর্ক লক্ষ করা যায়।

20. ভারতে সংসদীয় শাসনব্যবথায় রাষ্ট্রপতি কী ধরনের শাসক ?
উত্তর: ভারতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি হল নিয়মতান্ত্রিক শাসক।

21. ভারতবর্ষের শাসনব্যবথায় কোন বিভাগের প্রাধান্য আছে ?
উত্তর: ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থায় বিচার ও আইন বিভাগের প্রাধান্য আছে।

22. ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি কত বছরের জন্য নির্বাচিত হন ?
উত্তর: ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।

23. কত নং ধারায় ভারতীয় রাষ্ট্রপতিকে ‘ইমপিচমেন্ট’ পদ্ধতির দ্বারা পদচ্যুত করা যায় ?
উত্তর: সংবিধানের ৬১নং ধারায় ভারতীয় রাষ্ট্রপতিকে ‘ইমপিচমেন্ট’ পধতির দ্বারা পদচ্যুত করা যায়।

24. ভারতের সর্বোচ্চ শাসন বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ কে ?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের সর্বোচ্চ শাসন বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ।

25. ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় শাসনকার্য কার নামে সম্পাদিত হয়?
উত্তর: ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনকার্য রাষ্ট্রপতির নামে সম্পাদিত হয়।

26. কেন্দ্রশাসিত এবং উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহের প্রধান প্রশাসক কে ?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন কেন্দ্রশাসিত এবং উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহের প্রধান প্রশাসক।

27. ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কে ?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক

28. ভারতের রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টে কত সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন ?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টে ১৪ জন সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন।

29. কত নং ধারায় ভারতের রাষ্ট্রপতি মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারেন ?
উত্তর: সংবিধানের ৭২ নং ধারায় ভারতের রাষ্ট্রপতি মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারেন।

30. সংবিধানের কত নং ধারায় সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে শপথ গ্রহণ করতে হয় ?
উত্তর: সংবিধানের ৬০নং ধারায় সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে শপথ গ্রহণ করতে হয়।

31. উপরাষ্ট্রপতির প্রধান কাজ কী?
উত্তর: উপরাষ্ট্রপতির প্রধান কাজ হল রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করা।

32. তত্ত্বগতভাবে ভারতের প্রথম নাগরিক কে ?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি তত্ত্বগতভাবে ভারতের প্রথম নাগরিক

33. তত্ত্বগতভাবে ভারতের দ্বিতীয় নাগরিক কে?
উত্তর: তত্ত্বগতভাবে ভারতের দ্বিতীয় নাগরিক ভারতের উপরাষ্ট্রপতি

34. কত নং ধারা অনুসারে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন ?
উত্তর: সংবিধানের ৭৫(১)নং ধারা অনুসারে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন।

35. ‘মার্কিন রাষ্ট্রপতির সঙেগ ভারতের রাষ্ট্রপতির কেবল নামে মিল, ক্ষমতার বিচারে কোনো , সাদৃশ্য নেই’ -কে বলেছেন?
উত্তর: ড. আম্বেদকর বলেছেন ‘মার্কিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রপতির কেবল নামে মিল, ক্ষমতার বিচারে কোনো সাদৃশ্য নেই’।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার কাকে বলে?
উত্তর : রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার হল এমন একটি সরকার যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী এবং যেখানে শাসন বিভাগ তার কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে না। এই ধরনের সরকারকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার বলে। যেমন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এর উদাহরণ।

প্রশ্ন ২। রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে।
উত্তর : প্রথমত, রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন বিভাগের চরম ক্ষমতার অধিকারী। তিনি একইসঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারেরও প্রধান। দ্বিতীয়ত, এখানে শাসন বিভাগ আইন বিভাগের কাছে দায়ী থাকে না। আইন বিভাগও অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে শাসন বিভাগকে অপসারিত করতে পারে না।

প্রশ্ন ৩। রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার দুটি সুবিধা উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থা স্থায়ী হয়। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট কাল ক্ষমতায় থাকেন। অনাস্থার মাধ্যমে তাঁকে সরানাে যায় না। তাই তাঁর পক্ষে শাসনকার্যে মনােনিবেশ করা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব। (ii) এই শাসন জরুরি অবস্থার পক্ষে বিশেষ উপযােগী। রাষ্ট্রপতি এককভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মন্ত্রীসভার সঙ্গে আলােচনা করা তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন ৪। রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার দুটি অসুবিধা উল্লেখ করাে।
উত্তর (i) রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি আইনসভার কাছে দায়ী থাকেন না। আইনসভাও তাঁকে সহজে সরাতে পারে না। ফলে রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন। (ii) এই ব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি থাকায় আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করায় উভয়ের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে।

প্রশ্ন ৫। রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পার্থক্য উল্লেখ করাে।
উত্তর : (6) আইনসভার গঠনের দিক থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি আইনসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে কাজ করেন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি আইনসভার অংশ নন। (ii) সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান কিন্তু প্রকৃত শাসক নন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের প্রকৃত শাসক।

প্রশ্ন ৬। সংসদীয় সরকার কাকে বলে?
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় একজন নামসর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান থাকে এবং যেখানে মন্ত্রীসভা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ও তারা তাদের কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে, তাকে বলা হয় সংসদীয় সরকার। যেমন—ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশের সরকার এর উদাহরণ।

প্রশ্ন ৭। সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) নামসর্বস্ব রাষ্ট্রপ্রধান : সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় একজন নামসর্বস্ব রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন। তাঁর নামে সকল ক্ষমতা প্রয়ােগ করা হয়। অথচ তাঁর প্রকৃত ক্ষমতা নেই। মন্ত্রীপরিষদ হল প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী। যেমন—ব্রিটেনের রাজা বা রানি নামসর্বস্ব শাসক প্রধান।
(ii) যৌথ দায়িত্ব : এখানে মন্ত্রীসভা যৌথভাবে আইনসভার কাছে দায়ী থাকে। যৌথ দায়িত্বের অর্থ হল, মন্ত্রীসভার সকলে দায়ী থাকবে। অর্থাৎ কোনাে একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলে গােটা মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রশ্ন ৮। সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দুটি সুবিধা উল্লেখ করে।
উত্তর : (1) সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকে, অর্থাৎ কাজের জবাবদিহি করতে হয়। তাই শাসন বিভাগ স্বৈরাচারী হতে পারে না। (ii) এই শাসনব্যবস্থায় প্রয়ােজন হলে এক সরকারকে সরিয়ে অন্য সরকারকে ক্ষমতায় বসানাে যায়। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের দুর্বল প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেনকে সরিয়ে চার্চিলকে প্রধানমন্ত্রী করার ফলে দেশরক্ষা পেয়েছিল।

প্রশ্ন ৯। সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দুটি অসুবিধা উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি প্রয়ােগ করা হয় না। ফলে মন্ত্রীরা আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযােগ নিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করতে পারে। (ii) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সরকারের স্থায়িত্বের প্রয়ােজন। কিন্তু সংসদীয় সরকারের যে-কোনাে সময়ে পরিবর্তন হয়। ফলে অন্যের পরিকল্পনা মাঝপথে পরিত্যক্ত হয়।

প্রশ্ন ১০। রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ দাও।
উত্তর : রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ হল—ব্রিটেন, ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি।

প্রশ্ন ১১। সংসদীয় শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ দাও।
উত্তর : সংসদীয় শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ হল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, ১৯৭৭ সালের সােভিয়েত ইউনিয়ন প্রভৃতি।

প্রশ্ন ১২। রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতা কাকে বলে? এই ক্ষমতাকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
উত্তর : রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিল বাতিল করার ক্ষমতাকে ‘ভেটো ক্ষমতা’ (Veto Power) বলা হয়। রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—(ক) চরম ভেটো (Absolute Veto), (খ) স্থগিতকারী ভেটো (Suspensive Veto) এবং (গ) পকেট ভেটো (Pocket Veto)

প্রশ্ন ১৩। আর্থিক জরুরি অবস্থা কাকে বলে?
উত্তর : সংবিধানের 360নং ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি যদি সন্তুষ্ট হন যে, সমগ্র ভারত কিংবা তার যে-কোনাে অংশের আর্থিক স্থায়িত্ব বা সুনাম বিপন্ন হয়েছে, তাহলে তিনি আর্থিক জরুরি অবস্থা ঘােষণা করতে পারেন। একেই বলা হয় আর্থিক জরুরি অবস্থা। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদালতে প্রশ্ন তােলা যায় না।

বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
উত্তর : রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা হল এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রপতি দেশের প্রকৃত শাসক এবং যেখানে শাসনবিভাগ (রাষ্ট্রপ্রধান ও তার মন্ত্রীপরিষদ) তাদের কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে না।
বৈশিষ্ট্য : অধ্যাপক গার্নার রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করলে আমরা তার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখতে পাই-
প্রথমত, এই শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল—এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন বিভাগে চরম ক্ষমতার অধিকারী।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি চালিত শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল—এখানে শাসন বিভাগ আইন বিভাগের কাছে দায়ী থাকে না। আইন বিভাগও অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে শাসন বিভাগকে অপসারিত করতে পারে না।
তৃতীয়ত, এই শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি স্বীকৃত। সরকারের তিনটি বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে। আইন বিভাগের সদস্যরা শাসন বিভাগের সদস্য নয়। শাসন বিভাগের সদস্যরা আইনসভার কাজে যােগ দিতে পারে না। আবার শাসন বিভাগ আইনসভাকে ভেঙে দিতে পারে না। আইনসভাও অনাস্থা প্রস্তাব এনে শাসন বিভাগকে সরাতে পারে না।
চতুর্থত, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—এখানে মন্ত্রীসভার বিশেষ মর্যাদা নেই। মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির সহকর্মী নন।
পঞ্চমত, এই শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল—এখানে রাষ্ট্রপতি যে দলের সদস্য সেই দলের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও থাকতে পারে। কারণ, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ও আইনসভার নির্বাচন পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
ষষ্ঠত, এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—এখানে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে অন্য দলের কাউকে নিজের মন্ত্রীসভায় আনতে পারেন। যেমন, মার্কিন রাষ্ট্রপতি কেনেডি অন্য দলের দুজনকে নিজের মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন ২) রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় কী কী সুবিধা আছে।
উত্তর :  যে শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী এবং যেখানে শাসন বিভাগ তার কাজের জন্য আইন বিভাগের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না, তাকে রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থা বলে। এই শাসনব্যবস্থার কয়েকটি সুবিধা নিম্নে আলােচনা করা হল :
(i) এই শাসনব্যবস্থা স্থায়ী হয়। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকেন। অনাস্থার মাধ্যমে তাঁকে সরানাে যায় না। তাই তাঁর পক্ষে শাসনকার্যে মনােনিবেশ করা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব।
(ii) এই শাসন জরুরি অবস্থার পক্ষে বিশেষ উপযােগী। রাষ্ট্রপতি এককভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মন্ত্রীসভার সঙ্গে আলােচনা করা তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
(ii) এখানে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি থাকায় শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে উভয়ের মধ্যে বিরােধের সম্ভাবনা কম থাকে। প্রতিটি বিভাগ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে।
(iv) যে দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা আছে, সেখানে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা কাম্য। কারণ, বহু দল থাকলে অনেক সময় একটি দলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হয় না। তখন কয়েকটি দল নিয়ে ফ্রন্ট সরকার গড়তে হয়। তাতে সরকার ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল হয়।
(v) রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির মন্ত্রী নির্বাচনে অনেক স্বাধীনতা থাকে বলে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়ােগ করতে পারেন। এমনকি বিরােধী দলে দক্ষ লােক থাকলে তাকেও আনতে পারেন।

প্রশ্ন ৩) রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থার অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে। 
উত্তর : (i) স্বৈরাচারিতার সম্ভাবনা : রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির হাতে প্রভৃত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনাে ক্ষমতা আইন বিভাগের থাকে না। ফলে রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন। (“The executive can turn into Autocrat.”)
(ii) ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির কুফল : ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বলে এরূপ শাসনব্যবস্থায় সরকারের তিনটি বিভাগের মধ্যে সহযােগিতার পরিবর্তে সংঘাত দেখা দিতে পারে। ফলে শাসনকার্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
(iii) দায়িত্বের অবস্থান নির্ণয় কঠিন : রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা থাকার ফলে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব বিভিন্ন কমিটির মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দায়িত্ব বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে আইন প্রণয়নের জন্য কে দায়ী তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে ওঠে।
(iv) বিচার বিভাগের প্রাধান্য বৃদ্ধি : এরূপ শাসনব্যবস্থায় আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করার এবং উভয় বিভাগের মধ্যে বিরােধের নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকে। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিচারবিভাগ আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের ওপর নিজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
(v) জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী : এরূপ শাসনব্যবস্থায় কমিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে আইন প্রণীত হয়। কমিটিগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থ অপেক্ষা আঞ্চলিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। ফলে জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ।
এই সমস্ত ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত দুশাে বছরের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে চলেছে। বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বহুদলীয় রাষ্ট্রের পক্ষে এই শাসনব্যবস্থা বিশেষ উপযােগী। 

প্রশ্ন ৪) মন্ত্রীপরিষদচালিত (সংসদীয়) শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করাে। 
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় একজন নামসর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান থাকে এবং যেখানে মন্ত্রীসভা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ও তারা তাদের কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে, তাকে বলে মন্ত্রীপরিষদ চালিত বা সংসদীয় শাসনব্যবস্থা। এই সংজ্ঞার আলােকে এই শাসনব্যবস্থার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায় :
(i) নামসর্বস্ব রাষ্ট্রপ্রধান : এই শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল —এখানে একজন নামসর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন। তাঁর নামে সমস্ত ক্ষমতা প্রয়ােগ করা হয়। অথচ তাঁর প্রকৃত ক্ষমতা নেই। মন্ত্রীপরিষদ হল প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী। যেমন, ব্রিটেনের রানি নামসর্বস্ব শাসক প্রধান। মন্ত্রীসভার পরামর্শে তাঁকে চলতে হয়।
(ii) দায়িত্বশীলতা : এই শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—এখানে মন্ত্রীপরিষদ আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকে। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনসভা অনাস্থা এনে তাদের সরিয়ে দিতে পারে।
(iii) যৌথ দায়িত্ব : এখানে মন্ত্রীসভা যৌথভাবে আইনসভার কাছে দায়ী থাকে। যৌথ দায়িত্বের অর্থ হল, মন্ত্রীসভার সকলে দায়ী থাকবে। অর্থাৎ কোনাে একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলে গােটা মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগ করতে হয়।
(iv) প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব : প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রীপরিষদ চালিত শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীগণ নিযুক্ত হন। তিনি তাদের ক্ষমতা ভাগ করে দেন। প্রয়ােজন হলে কোনাে মন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারেন।
(v) বিরােধী দলের অস্তিত্ব : এই শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল বিরোধী দলের অস্তিত্ব। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেই দল মন্ত্রীসভা গঠন করে। সংখ্যালঘিষ্ট দল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। তারা সরকারের ত্রুটিগুলি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরে সরকারকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করে। সরকারের স্বৈরাচারিতার পথে বাধার সৃষ্টি করে।
(vi) ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির অস্বীকৃতি : মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি স্বীকার করা হয় না। আইনসভার সদস্যরা শাসন বিভাগে যায়। শাসন বিভাগের মন্ত্রীরা আইনসভায় গিয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করে। আইন বিভাগ শাসন বিভাগকে সরিয়ে দিতে পারে। আবার শাসন  বিভাগ আইনসভাকে ভেঙে দিতে পারে।

প্রশ্ন ৫) মন্ত্রীপরিষদচালিত (সংসদীয়) শাসনব্যবস্থার সুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : ব্রিটেন, ভারত প্রভৃতি দেশে মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থা সাফল্য অর্জন করেছে। তার কারণ, এর কতকগুলি সুবিধা আছে। সেগুলি নিম্নে আলােচিত হল :
(i) অধ্যাপক গার্নার বলেছেন- সুশাসনের জন্যে আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা প্রয়ােজন। আইনবিভাগ অর্থ মঞ্জুর করে, শাসন বিভাগ অর্থ ব্যয় করে। সুতরাং দুটির মধ্যে সম্পর্ক না থাকলে, শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে অচল অবস্থা দেখা দেবে। মন্ত্রীপরিষদ চালিত শাসনব্যবস্থায় এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
(ii) এই শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকে। অর্থাৎ কাজের জবাবদিহি করতে হয়। তাই শাসন বিভাগ স্বৈরাচারী হতে পারে না।
(iii) এই শাসনব্যবস্থায় প্রয়ােজন হলে এক সরকারকে সরিয়ে অন্য সরকারকে ক্ষমতায় বসানাে যায়। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেনকে সরিয়ে চার্চিলকে বসানাের ফলে দেশ রক্ষা পেয়েছিল। রাষ্ট্রপতি পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়।
(iv) মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকারের আর একটি গুণ হল—এখানে রাজনৈতিক শিক্ষার বেশি সুযােগ আছে। এখানে যে-কোনাে সময় নির্বাচনের সম্ভাবনা থাকায় রাজনৈতিক দলগুলি সব সময় রাজনৈতিক প্রচারকার্য চালায়। এতে জনসাধারণ রাজনৈতিক শিক্ষার সুযােগ পায়।
(v) এই শাসনব্যবস্থায় রাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গণতন্ত্রের সমন্বয়সাধন করা যায়। যেমন, ব্রিটেনে একজন নামসর্বস্ব শাসক প্রধান রাজা বা রানি আছেন। তার অভিজ্ঞতা ও দুর্লভ পরামর্শদানের মাধ্যমে গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হয়েছে।

প্রশ্ন ৬) মন্ত্রীপরিষদচালিত (সংসদীয়) শাসনব্যবস্থার অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : বিভিন্ন গুণ থাকলেও এই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিরূপ সমালােচনা হয়েছে। এগুলি হল :
(i) অনেকে মনে করেন ব্যক্তিস্বাধীনতার বড়াে রক্ষাকবচ হল—ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থায় তা নেই। ফলে মন্ত্রীরা আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযােগ নিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করতে পারে।
(ii) এই শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরা বেশি সময় আইনসভার প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং তার জন্যে পূর্ব প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত থাকে। ফলে শাসনকার্য পরিচালনায় বেশি সময় দিতে পারে।
(iii) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সরকারের স্থায়িত্বের প্রয়ােজন। কিন্তু মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকারের যে-কোনাে সময় পরিবর্তন হয় বলে অনেক পরিকল্পনা মাঝপথে পরিত্যক্ত হয়। ভারত তার সবথেকে বড় উদাহরণ।
(iv) এই শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীপরিষদের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্য মতে পৌঁছানাে যায় না। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে পাঁচমিশেলি সরকার হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না।
(v) দলীয় ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকার গড়ে ওঠে। তাই সরকারি ক্ষমতা দখলের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে অবিরাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। এতে দলীয় ব্যবস্থার কুফলগুলি প্রকট হয়।
(vi) মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকারে যারা মন্ত্রী হয়, তারা সবসময় যোগ্যতার ভিত্তিতে মনােনীত হয় না। রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা মন্ত্রীত্ব পায়। এতে শাসনব্যবস্থায় দক্ষতার অভাব ঘটে।
(vii) এই শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা লাভের বা বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলি অনেক সময় বিধায়ক কেনাবেচা করে। তাই এই শাসনব্যবস্থাকে দুনীতির উৎস বলে মনে করা হয়।

প্রশ্ন ৭) রাষ্ট্রপতিশাসিত ও সংসদীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করো।
উত্তর : (i) শাসকের প্রকৃতির ক্ষেত্রে : পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থায় নামসর্বস্ব শাসক ও প্রকৃত শাসকের মধ্যে পার্থক্য থাকে না, তার নামেই সব কাজ চলে। প্রকৃত শাসক হল মন্ত্রীসভা। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান, আবার তিনি প্রকৃত শাসন ক্ষমতার অধিকারী।
(ii) ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির ক্ষেত্রে : পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির স্বীকৃতি নেই। আইনসভার সঙ্গে মন্ত্রীসভার ঘনিষ্ঠ যােগ আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় দুটি বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যােগ নেই। মন্ত্রীরা আইনসভা থেকে নির্বাচিত হয় না।
(iii) দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে : পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা আইনসভার কাছে যৌথভাবে দায়িত্বশীল। আইনসভার আস্থা হারালে তাদের সরে যেতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি বা মন্ত্রীসভা আইনসভার কাছে দায়ী থাকে না। মন্ত্রীরা ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে দায়ী থাকে।
(iv) স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে : সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সরকার সাধারণত স্থায়ী হয় না। কারণ, আইনসভার আস্থা হারালে যে-কোনাে সময় পদত্যাগ করতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি তাঁর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থার কোনাে ব্যবস্থা নেই।
(v) দলীয় সংহতির ক্ষেত্রে : পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে মনােনীত হয় বলে, তাদের মধ্যে দলীয় সংহতি থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত বন্ধুবান্ধব, এমনকি বিরােধী দলের কোনাে ব্যক্তিকে মন্ত্রীসভায় মনােনীত করেন।
(vi) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে : পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরা আইন প্রণয়নে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। তারাই আইনসভায় বিল উত্থাপন করে ও তাকে আইনে পরিণত করার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীদের এ ব্যাপারে কোনাে ভূমিকা নেই। আইনসভায় কমিটিগুলি এই দায়িত্ব পালন করে।
(vii) মন্ত্রীসভার পদমর্যাদার ক্ষেত্রে : মন্ত্রীপরিষদশাসিত শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হলেও প্রত্যেক মন্ত্রী সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির অধস্তন কর্মচারী ছাড়া আর কিছুই নয়।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) ভারতীয় সরকারের প্রকৃতি পর্যালােচনা করাে। ইহা কি সংসদীয়, না রাষ্ট্রপতি- শাসিত?
উত্তর : ভারতীয় সরকারের প্রকৃতি
ভারতীয় সংবিধানে যে শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে তার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে ভারতীয় সরকার রাষ্ট্রপতিশাসিত না সংসদীয় তা জানা যাবে।
(i) রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের সঙ্গে তুলনা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার হল রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদের সৃষ্টি করা হয়। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনগণের পরােক্ষ ভােটে নির্বাচিত হন। এই মিল ছাড়া রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের সঙ্গে ভারতের শাসনব্যবস্থার কোনাে সাদৃশ্য নেই। ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত হলেও প্রকৃত ক্ষমতা ভােগ করেন না। মার্কিন শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় শাসনব্যবস্থার মিল কেবল নামকরণে দেখা যায়।
(ii) পার্লামেন্টীয় বা সংসদীয় শাসনব্যবস্থা : সংবিধান প্রণেতাগণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও ব্রিটেনের পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক বিচারবিশ্লেষণ করে ব্রিটেনের পার্লামেন্টীয় বা ক্যাবিনেট ব্যবস্থায় ভারতের পক্ষে কাম্য বলে মনে করে। ভারতের সংবিধান কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি হবেন নিয়মতান্ত্রিক শাসক এবং জাতির প্রতীক হিসাবে তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদা ভােগ করবেন। ভারতে প্রকৃত শাসন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আইনসভার নিকট দায়িত্বশীল মন্ত্রীপরিষদের ওপর।
(iii) ব্রিটেনের সঙ্গে তুলনা : ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থার আদর্শ হিসাবে ব্রিটেনের পার্লামেন্টীয় ব্যবস্থাকে গ্রহণ করা হয়েছে। তত্ত্বগতভাবে সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ওপর ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীপরিষদের সাহায্য ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটেনের সংবিধানে মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করার ব্যবস্থা শাসনতান্ত্রিক রীতি হিসাবে গড়ে উঠেছে।
(iv) মন্ত্রীপরিষদের দায়িত্বশীলতা : প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হলেও লােকসভার নিকট যৌথভাবে দায়ী থাকেন। ব্রিটেনের যৌথ দায়িত্বের নীতি প্রথাগতভাবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানে তা আইনগত স্বীকৃতি লাভ করেছে। রাষ্ট্রপতির পক্ষে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপুষ্ট মন্ত্রীপরিষদকে উপেক্ষা করার উপায় নেই।
(v) অঙ্গরাজ্যের ব্যবস্থা : ভারতীয় সংবিধানে শুধু কেন্দ্র নয় অঙ্গরাজ্যগুলিতেও পার্লামেন্টীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে। অঙ্গরাজ্যের শাসক প্রধান রাজ্যপাল নিয়মতান্ত্রিক শাসক, প্রকৃত শাসন ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যের মন্ত্রীপরিষদের উপর ন্যস্ত। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নিয়ােগ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীগণকে নিয়ােগ করে থাকেন। মন্ত্রীগণ যৌথভাবে বিধানসভার নিকট দায়িত্বশীল থাকেন। তত্ত্বগতভাবে সংবিধানে রাজ্যপালের হাতে যে-সকল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বাস্তবে তা মন্ত্রীপরিষদ কার্যকর করে।
(vi) সংসদীয় ব্যবস্থার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য : ভারতীয় সংবিধানে সংসদীয় ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্বীকৃত হয়েছে। ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি অস্বীকার করে মন্ত্রীপরিষদের সদস্যগণকে পার্লামেন্ট এবং বিধানসভার সদস্য হতে হয়। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের এই সুযােগ থাকে না। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর যে মর্যাদা স্বীকৃত হয় ভারতীয় সংবিধানেও তা অনুসরণ করা হয়েছে। দলের নেতা, মন্ত্রীসভার নেতা, আইনসভার নেতা এবং জাতির নেতা হিসাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশেষ ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী। ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থার ন্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অবিসংবাদী প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংসদীয় শাসনব্যবস্থার অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল বিরােধী দলের অস্তিত্ব। ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় বিরােধী দলের অস্তিত্ব অস্বীকার করবার উপায় নেই।

শাসনব্যবস্থা সংসদীয় না রাষ্ট্রপতিশাসিত
উপরিউক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে যে, ভারতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতাে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি; ব্রিটেনের অনুকরণে সংসদীয় এবং পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থাই প্রবর্তন হয়েছে। ভারতীয় সমাজজীবনের প্রয়ােজনের সঙ্গে সমন্বয়সাধন করবার পার্লামেন্টীয় ব্যবস্থার উপযােগিতা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রশ্ন ২) রাষ্ট্রপতিচালিত সরকার বলতে কী বােঝায়? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার হল এমন একটি সরকার যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী এবং যেখানে শাসন বিভাগ তার কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে না। এই ধরনের সরকারকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার বলে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এর উদাহরণ।

বৈশিষ্ট্য
অধ্যাপক গার্নার রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করলে আমরা তার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখতে পাই :
(i) এই শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল—এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন বিভাগে চরম ক্ষমতার অধিকারী। তিনি একইসঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারেরও প্রধান। ব্রিটেনে মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় রানি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের প্রধান।
(ii) রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল—এখানে শাসন বিভাগ আইন বিভাগের কাছে দায়ী থাকে না। আইন বিভাগও অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে শাসন বিভাগকে অপসারিত করতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনসভা একমাত্র সংবিধান ভঙ্গের মতাে। গুরুতর অভিযােগে ইমপিচমেন্ট পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতিকে পদচ্যুত করতে পারে।
(iii) এই শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি স্বীকৃত। সরকারের তিনটি বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে। আইন বিভাগের সদস্যরা শাসন বিভাগের সদস্য নয়। শাসন বিভাগের সদস্যরা আইনসভার কাজে যােগ দিতে পারে না। আবার শাসন বিভাগ আইনসভাকে ভেঙে দিতে পারে না। আইনসভাও অনাস্থা প্রস্তাব এনে শাসন বিভাগকে সরাতে পারে না।
(iv) রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—এখানে মন্ত্রীসভার বিশেষ মর্যাদা নেই। মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির সহকর্মী নন। রাষ্ট্রপতির অধীনস্থ কর্মচারী মাত্র। রাষ্ট্রপতি তাদের পরামর্শ নাও নিতে পারেন। নিজের খুশিমতাে কাউকে অপসারিত করতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রীপরিষদ- চালিত শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর সহকর্মী ও সমান মর্যাদাসম্পন্ন।
(v) এই শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল—এখানে রাষ্ট্রপতি যে দলের সদস্য সেই দলের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও থাকতে পারে। কারণ, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ও আইনসভার নির্বাচন পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু, মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় যে দল মন্ত্রীসভা গঠন করে, আইনসভায় সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে।
(vi) এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—এখানে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে অন্য দলের কাউকে নিজের মন্ত্রীসভায় আনতে পারেন। যেমন—মার্কিন রাষ্ট্রপতি কেনেডি অন্য দলের দুজনকে নিজের মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন ৩) রাষ্ট্রপতিচালিত সরকারের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার হল এমন একটি সরকার যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী এবং যেখানে শাসন বিভাগ তার কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে না। এই ধরনের সরকারকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার বলে, যেমন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এর উদাহরণ। নিম্নে এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলি উল্লেখ করা হল –

সুবিধা
(i) এই শাসনব্যবস্থা স্থায়ী। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকেন। অনাস্থার মাধ্যমে তাঁকে সরানাে যায় না। তাই তাঁর পক্ষে শাসনকার্যে মনােনিবেশ করা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব। স্থায়িত্বের জন্য রাষ্ট্রের এবং সরকারের আন্তর্জাতিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়।
(ii) এই শাসন জরুরি অবস্থার পক্ষে বিশেষ উপযােগী। রাষ্ট্রপতি এককভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মন্ত্রীসভার সঙ্গে আলােচনা করা তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। পার্লামেন্টীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর এই সুযােগ নেই।
(iii) এখানে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি থাকায় শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে উভয়ের মধ্যে বিরােধের সম্ভাবনা কম থাকে। প্রতিটি বিভাগ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে।
(iv) যে দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা আছে, সেখানে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা কাম্য। কারণ, বহু দল থাকলে অনেক সময় একটি দলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হয় না। তখন কয়েকটি দল নিয়ে ফ্রন্ট সরকার গড়তে হয়। তাতে সরকার ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল হয়। রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় এ সমস্যা নেই।
(v) রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির মন্ত্রী নির্বাচনে অনেক স্বাধীনতা থাকে বলে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়ােগ করতে পারেন। এমনকি বিরােধী দলে দক্ষ লােক থাকলে তাকেও আনতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রীসভা পরিচালিত ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে দলীয় বাঁধনে থাকতে হয়। মন্ত্রী নির্বাচনে যােগ্যতা সবসময় মাপকাঠি হয় না। বিশেষ করে এই ব্যবস্থায় একাধিক দলকে নিয়ে ফ্রন্ট সরকার হলে মন্ত্রী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আরাে সীমিত হয়ে পড়ে। ভারত তার উদাহরণ।

অসুবিধা
(i) এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি আইনসভার কাছে দায়ী থাকে না। আইনসভাও তাঁকে সহজে সরাতে পারে না। ফলে রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন।
(ii) এই ব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি থাকায় আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করায় উভয়ের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। তাতে শাসনকার্যে অচল অবস্থা দেখা দেবে। যেমন, উইলসন জাতিসংঘের সনদে স্বাক্ষর করলেও আইনসভা তাকে বাতিল করে দেয়।
(iii) রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারে আইনসভায় বিভিন্ন কমিটি আইন তৈরি করে। আইন তৈরি হলে এদের কাজ শেষ হয়। ফলে আইনের মধ্যে কোনাে ত্রুটি থাকলে, কমিটিগুলি দায়িত্ব এড়াবার চেষ্টা করে।
(iv) এই শাসনব্যবস্থা সাধারণত অনমনীয় হয়। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তাতে জনসাধারণের মনে ক্ষোভ জমতে পারে।
(v) এই ব্যবস্থায় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে তার মীমাংসার দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে চলে যায়। এই সুযােগে বিচার বিভাগ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রে এটি কাম্য নয়।
(vi) এই শাসনব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হয়। কারণ, আইন প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটিগুলি জাতীয় স্বার্থ অপেক্ষা আঞ্চলিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ল্যায়ন রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় ত্রুটি আছে সত্য। কারণ, এখানে দায়বদ্ধতার নীতি স্বীকৃত নয়। ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি অনেক সময় শাসনব্যবস্থায় অচল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তা সত্ত্বেও দেশ ও কাল ভেদে এটি সফল হতে পারে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুশাে বছরের বেশিকাল ধরে এই শাসনব্যবস্থা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। 

প্রশ্ন ৪) মন্ত্রীপরিষদচালিত (সংসদীয় বা পার্লামেন্টীয়) শাসনব্যবস্থা কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির আলােকে শাসনব্যবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়— মন্ত্রীসভাচালিত শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থা। এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অধ্যাপক গার্নার (Garner) বলেছেন—যে শাসনব্যবস্থায় একজন নামসর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান থাকে এবং যেখানে মন্ত্রীসভা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ও তারা তাদের কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে, তাকে বলে মন্ত্রীপরিষদচালিত বা সংসদীয় শাসনব্যবস্থা। ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশের শাসনব্যবস্থা এর উদাহরণ।

বৈশিষ্ট্য
এই সংজ্ঞার আলােকে মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায় :
(i) নামসর্বস্ব রাষ্ট্রপ্রধান : এই শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল—এখানে একজন নামসর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন। তাঁর নামে সমস্ত ক্ষমতা প্রয়ােগ করা হয়। অথচ তাঁর প্রকৃত ক্ষমতা নেই। মন্ত্রীপরিষদ হল প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী। যেমন—ব্রিটেনের রাজা বা রানি নামসর্বস্ব শাসক প্রধান। মন্ত্রীসভার পরামর্শে তাঁকে চলতে হয়।
(ii) দায়িত্বশীলতা : এই শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—এখানে মন্ত্রীপরিষদ আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকে। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনসভা অনাস্থা এনে তাদের সরিয়ে দিতে পারে।
(iii) যৌথ দায়িত্ব : এখানে মন্ত্রীসভা যৌথভাবে আইনসভার কাছে দায়ী থাকে। যৌথ দায়িত্বের অর্থ হল—মন্ত্রীসভার সকলে দায়ী থাকবে। অর্থাৎ কোনাে একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হলে গােটা মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগ করতে হয়।
(iv) প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব : প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রীপরিষদ চালিত শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীগণ নিযুক্ত হন। তিনি তাদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেন। প্রয়ােজন হলে কোনাে মন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারেন।
(v) বিরােধী দলের অস্তিত্ব : এই শাসনব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল—বিরােধী দলের অস্তিত্ব। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেই দল মন্ত্রীসভা গঠন করে। সংখ্যালঘিষ্ট দল বিরােধী দলের ভূমিকা পালন করে। তারা সরকারের ত্রুটিগুলি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরে সরকারকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করে। সরকারের স্বৈরাচারিতার পথে বাধার সৃষ্টি করে।
(vi) ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির অস্বীকৃতি : মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি স্বীকার করা হয় না। আইনসভার সদস্যরা শাসন বিভাগে যায়। শাসন বিভাগের মন্ত্রীর আইনসভায় গিয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করে। আইন বিভাগ শাসন বিভাগকে সরিয়ে দিতে পারে। আবার শাসন বিভাগ আইনসভাকে ভেঙে দিতে পারে। 

প্রশ্ন ৫) মন্ত্রীপরিষদচালিত (সংসদীয় বা পার্লামেন্টীয়) শাসনব্যবস্থার সুবিধা ও অসুবিধাগুলি উল্লেখ করাে।
উত্তর : ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির আলােকে শাসনব্যবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়— মন্ত্রীসভাচালিত শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপতিচালিত শাসনব্যবস্থা। এদের মধ্যে মন্ত্রীপরিষদ- চালিত শাসনব্যবস্থা ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অধ্যাপক গার্নার (Garner) বলেছেন—যে শাসনব্যবস্থায় একজন নামসর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান থাকে এবং যেখানে মন্ত্রীসভা প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ও তারা তাদের কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে, তাকে বলে মন্ত্রীপরিষদচালিত বা সংসদীয় শাসনব্যবস্থা। ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশের শাসনব্যবস্থা এর উদাহরণ। নিম্নে এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলি উল্লেখ করা হল :

সুবিধা
(i) অধ্যাপক গার্নার বলেছেন—সুশাসনের জন্যে আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা প্রয়ােজন। আইন বিভাগ অর্থ মঞ্জুর করে, শাসন বিভাগ অর্থ ব্যয় করে। সুতরাং দুটির মধ্যে সম্পর্ক না থাকলে, শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে অচল অবস্থা দেখা দেবে। মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
(ii) এই শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা আইনসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকে। অর্থাৎ কাজের জবাবদিহি করতে হয়। তাই শাসন বিভাগ স্বৈরাচারী হতে পারে না।
(iii) এই শাসনব্যবস্থায় প্রয়ােজন হলে এক সরকারকে সরিয়ে অন্য সরকারকে ক্ষমতায় বসানাে যায়। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেনকে সরিয়ে চার্চিলকে বসানাের ফলে দেশরক্ষা পেয়েছিল। রাষ্ট্রপতি পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়।
(iv) মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকারের আর একটি গুণ হল—এখানে রাজনৈতিক শিক্ষার বেশি সুযােগ আছে। এখানে যে-কোনাে সময় নির্বাচনের সম্ভাবনা থাকায় রাজনৈতিক দলগুলি সবসময় রাজনৈতিক প্রচারকার্য চালায়। এতে জনসাধারণ রাজনৈতিক শিক্ষার সুযােগ পায়।
(v) এই শাসনব্যবস্থায় রাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গণতন্ত্রের সমন্বয়সাধন করা যায়। যেমন, ব্রিটেনে একজন নামসর্বস্ব শাসক প্রধান রাজা বা রানি আছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও দুর্লভ পরামর্শদানের মাধ্যমে গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হয়েছে।

অসুবিধা
(i) অনেকে মনে করেন ব্যক্তিস্বাধীনতার বড়াে রক্ষাকবচ হল—ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থায় তা নেই। ফলে মন্ত্রীর আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযােগ নিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করতে পারে।
(ii) এই শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরা বেশি সময় আইনসভার প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং তার জন্যে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত থাকে। ফলে শাসনকার্য পরিচালনায় বেশি সময় দিতে পারে না।
(iii) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সরকারের স্থায়িত্বের প্রয়ােজন। কিন্তু মন্ত্রীপরিষদ চালিত সরকারের যে-কোনাে সময় পরিবর্তন হয় বলে অনেক পরিকল্পনা মাঝপথে পরিত্যক্ত হয়। ভারত সব থেকে বড়াে উদাহরণ।
(iv) এই শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীপরিষদের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছানাে যায় না। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে পাঁচমিশেলি সরকার হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না।
(v) দলীয় ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকার গড়ে ওঠে। তাই সরকারি ক্ষমতা দখলের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে অবিরাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। এতে দলীয় ব্যবস্থার কুফলগুলি প্রকট হয়।
(vi) মন্ত্রীপরিষদচালিত সরকারে যারা মন্ত্রী হয়, তারা সব সময় যােগ্যতার ভিত্তিতে মনােনীত হয় না। রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা মন্ত্রীত্ব পায়। এতে শাসনব্যবস্থায় দক্ষতার অভাব ঘটে।
(vii) এই শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা লাভের বা বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলি অনেক সময় বিধায়ক কেনাবেচা করে। তাই এই শাসনব্যবস্থাকে দুর্নীতির উৎস বলে মনে করা হয়। মূল্যায়ন মন্ত্রীপরিষদচালিত শাসনব্যবস্থায় কিছু বুটি থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিরােধী দলের ভূমিকা ও সরকারের দায়িত্বশীলতা—এই শাসনব্যবস্থার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। 

প্রশ্ন ৬) সংসদীয় (পার্লামেন্টীয়) সরকার ও রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করাে।
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় আইন ও শাসন বিভাগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান যেখানে শাসক বিভাগের বা সরকারের স্থায়িত্ব নির্ভর করে আইন বিভাগের উভয় এবং মন্ত্রীবর্গ তাঁদের কাজের জন্য আইনসভার নিকট দায়বদ্ধ থাকেন তাকে বলা হয় সংসদীয় সরকার। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার হল এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে শাসন বিভাগ আইন বিভাগের প্রভাবমুক্ত হয়ে সংবিধান অনুসারে কাজ করে। স্বভাবতই রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় মন্ত্রীবর্গ আইনসভার নিকট দায়বদ্ধ থাকেন না। উপরের দুটি সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় সরকার ও রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের মধ্যে পার্থক্য করা যায়।

পার্থক্য
(i) রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতার প্রশ্নে : সংসদীয় সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল নামসর্বস্ব ও প্রকৃত শাসকের মধ্যে পার্থক্য। এখানে নামসর্বস্ব শাসকের নামে সমস্ত শাসনকার্য পরিচালিত হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি মন্ত্রীপরিষদ শাসনকার্য পরিচালনা করেন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের নামসর্বস্ব শাসকের কোনাে পদ থাকে না। এখানে রাষ্ট্রপতি প্রকৃত শাসক এবং তত্ত্বগতভাবে ও বাস্তবে প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী।
(ii) দায়বদ্ধতার প্রশ্নে : সংসদীয় সরকারের নীতি ও কার্যাবলির জন্য মন্ত্রীপরিষদ ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে আইনসভার নিকট দায়ী থাকেন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের রাষ্ট্রপতি প্রত্যক্ষভাবে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হন। তাই তিনি আইনসভার পরিবর্তে জনগণের নিকটেই দায়ী থাকেন।
(iii) প্রকৃত শাসকের পদচ্যুতির প্রশ্নে : সংসদীয় সরকারের ক্ষেত্রে আইনসভা অনাথসূচক প্রস্তাব পাশ করে কার্যকালের মেয়াদ সমাপ্তির পূর্বেই মন্ত্রীপরিষদকে পদচ্যুত করতে পারে। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের ক্ষেত্রে আইনসভার আস্থা-অনাস্থার উপরে রাষ্ট্রপতির কার্যকলাপ নির্ভরশীল নয়। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হন।
(iv) ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রশ্নে : সংসদীয় সরকারের ক্ষেত্রে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি অনুসৃত হয় না বলে আইন ও শাসনবিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। অপরপক্ষে, রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি অনুসৃত হয় বলে আইন ও শাসনবিভাগের মধ্যে কোনাে সম্পর্ক থাকে না।
(v) মন্ত্রীপরিষদের পদমর্যাদার প্রশ্নে : সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা গঠিত হয় আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্ব স্থানীয় সদস্যদের নিয়ে। এই মন্ত্রীপরিষদের শীর্ষে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে অন্যান্য মন্ত্রীদের সম্পর্ক সহকর্মীর মতাে। অপরদিকে, রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় মন্ত্রীগণ আইনসভার সদস্য নন। তাঁরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত এবং তাঁদের কার্যকালের মেয়াদ রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টির উপর নির্ভরশীল।
(vi) ক্যাবিনেটের উৎকর্ষতার প্রশ্নে : সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ক্যাবিনেট সদস্যদের নিয়ােগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে দলীয় নির্দেশের দ্বারা পরিচালিত হতে হয়। ফলে, অনেক সময় যােগ্য নেতাকে ক্যাবিনেটে স্থান দেওয়া হয় না। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নিজের ইচ্ছামতাে বিভিন্ন বিষয়ে যােগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্যাবিনেট সদস্য হিসাবে নিয়ােগ করতে পারেন।
(vii) স্থায়িত্বের প্রশ্নে : সংসদীয় সরকারের স্থায়িত্ব নির্ভর করে আইনসভার সদস্যদের আস্থার উপর। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার স্থায়ী হয়। একবার নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতি সাধারণত তাঁর কার্যকাল পর্যন্ত শাসনকার্য চালাতে পারেন।
(viii) জরুরি অবস্থার প্রশ্নে : সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় তর্ক-বিতর্ক, আলাপ-আলােচনা প্রভৃতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় বলে অনেক মূল্যবান সময় অপচয় হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির হাতে সব ক্ষমতা ন্যস্ত থাকায় তাঁর পক্ষে জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করা সম্ভব হয়।
(ix) দলীয় ব্যবস্থায় ভূমিকার প্রশ্নে : সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা মাের্চার নেতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি যে দল থেকে নির্বাচিত হন আইনসভায় সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও থাকতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 12 =