মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও পরবর্তী মুঘল শাসকগণ (১৭০৭- ১৮৫৭) এবং আঞ্চলিক শক্তির উত্থান || Fall of Mughal Dynasty & Post Mughal Emperors (1707-1857) and Rise of Regional Powers

মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও পরবর্তী মুঘল শাসকগণ

বাহাদুর শাহ (১৭০৭-১৭১২)

ঔরঙ্গজেবের তিন পুত্র মুয়াজ্জম, আজম ও কামবক্স-এর মধ্যে মুয়াজ্জম ‘বাহাদুরি শাহ’ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে। আজম নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘােষণা করলে চিন কিলিজ খান, গাজিউদ্দিন খান ও মহম্মদ আমিন খান আজমের বিরােধিতা করেন। কামবক্স ‘দিনপনাহা’ উপাধি নিয়ে আসান খানকে মীরবঙ্গী ও তাকরাব খানকে উজীর পদে নিয়োগ করেন। বাহাদুর শাহ তার ভাইদের পরাস্ত করে প্রথম শাহ আলম’ উপাধি নেন। ঐতিহাসিক কাফী খাঁ তাঁকে ‘শাহ-ই-বেখবর’ উপাধি দেন। তিনি শাহুকে ছেড়ে দেন এবং মারওয়াড়ের অজিত সিংকে রাজা হিসাবে মেনে নেন। তিনি জিজিয়া কর তুলে দেন এবং মেবারের স্বাধীনতা স্বীকার করেন।

জাহানদার শাহ (১৭১২-১৭১৩)

বাহাদুর শাহের ৪ পুত্রের মধ্যে জাহানদার শাহ অন্য ভাইদের হারিয়ে ১৭১২ সিংহাসনে বসেন। লাল কানুয়া নামে এক মহিলাকে তিনি ভালবাসতেন। ক্ষমতা পেতে তাকে সাহায্য করেছিল জুলফিকার খান এবং সাবা চাঁদ। জুলফিকার খান নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা ইজারা বা জায়গীরদার প্রবর্তন করেন।

ফারুকশিয়র (১৭১৩-১৭১৯) 

জাহানদার শাহকে পরাস্ত ও হত্যা করে ফারুখশিয়র সিংহাসনে বসেন। ফারুকশিয়রের সমর্থক এলাহাবাদের সৈয়দ আবদুল্লা আলি এবং পাটনার সৈয়দ হুসেন আলিকে যথাক্রমে উজীর ও মীরবক্সী পদে নিয়ােগ করেন। শিখ নেতা বান্দা বাহাদুরকে ১৭১৬ খ্রিস্টাব্দে ফারুখশিয়র মৃত্যুদন্ড দেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ দুত সুরম্যানকে ফারুখশিয়র বিনা শুল্কে বাণিজ্যের ফরমান দেন। হুসেন আলি পেশােয়া বালাজি বিশ্বনাথের সঙ্গে সন্ধি করেন এবং মারাঠাদের সহযােগিতায় সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় ফারুখশিয়রকে হত্যা করে সিংহাসনে বসান রফি-উদ-দর জাতকে ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে এবং জুন মাসে রফি-উদ-দৌলাকে সিংহাসনে বসান। রফি-উদ-দৌলা ‘দ্বিতীয় শাহজাহান’ উপাধি নেন। সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় জিজিয়া ও তীর্থকর সম্পূর্ণভাবে তুলে দেন। কানুয়ার খানের রচনা থেকে সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় ও ফারুখশিয়র সম্পর্কে জানা যায়। ফারুখশিয়র জুলফিকার খানকে হত্যা করেন।

মহম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮) 

সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহযােগিতায় মহম্মদ শাহ সিংহাসনে বসেন এবং ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়কে হত্যা করেন। মহম্মদ শাহের নাম ছিল রােশন আখতার। তিনি কথক নৃত্য ও সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলন। তার নাম ছিল ‘রঙ্গীনা বাদশা’। তার সময় হায়দরাবাদের নিজাম বংশ, মুর্শিদকুলি খাঁর নেতৃত্বে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা স্বাধীন হয়। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন। নাদির শাহ কোহিনুর হীরা, ময়ূর সিংহাসন, ৬০ লক্ষ টাকা, ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা ও ৫০ কোটি টাকার অলঙ্কার নিয়ে যান। ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে গুজরাট ও ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে মালব মুঘলদের হাতছাড়া হয়।

আহম্মদ শাহ (১৭৪৮-১৭৫৪)

আফগানিস্তানের শাসক আহম্মদ শাহ আবদালী তার সময় ভারত আক্রমণ করেন। তার মা ছিল উধম বাঈ। উধম বাঈ ছিলেন মহম্মদ শাহের নর্তকী। আহম্মদ শাহ উধম বাঈকে ‘কিবলাইয়া আলম’ উপাধি দেন। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে মলহার রাও হােলকার দিল্লী আক্রমণ করেন। আহম্মদের উজির ইমাদ-উল-মুলক আহম্মদকে অন্ধ করে দেন এবং আলমগীরকে সিংহাসনে বসান।

দ্বিতীয় আলমগীর (১৭৫৪-১৭৫৯)

আজিজুদ্দিন ‘দ্বিতীয় আলমগীর’ নামে সিংহাসনে বসেন। ইমাদুল মুলক-এর সেনাপতি বলবাস খানকে হত্যা করলে ইমাদুল মুলক দ্বিতীয় আলমগীরকে হত্যা করেন এবং তার পুত্র দ্বিতীয় শাহআলমকে সিংহাসনে বসান।

দ্বিতীয় শাহআলম (১৭৫৯-১৮০৬)

যুবরাজ আলি গহর ‘দ্বিতীয় শাহ আলম’ উপাধি নেন। তিনি ছিলেন তুর্কী, আরবী, ফার্সী ও হিন্দী ভাষায় পণ্ডিত। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে তিনি পরাস্ত হন। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা দিল্লী অধিকার করে।

দ্বিতীয় আকবর (১৮০৬-১৮৩৭)

দ্বিতীয় আকবর রামমােহন রায়কে ‘রাজা’ উপাধি দিয়ে ইংল্যান্ডে পাঠান। দ্বিতীয় আকবর ইংল্যান্ডের রাজার কাছে চিঠি লেখেন মুঘল সম্রাটের ভাতা বৃদ্ধির জন্য।

দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (১৮৩৭-১৮৬২)

দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের পর তাকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেওয়া হয় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে। সেখানে তিনি ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। মুঘল যুগে ভারতীয় মুসলমানদের শেখজাদা বলা হত। মুঘল দরবারে তিনটি গােষ্ঠী ছিল। যথা ইরানী, তুরানী ও হিন্দুস্থানী। ইরানী গােষ্ঠীর নেতা জুলফিকার খাঁ, আশাদ খাঁ, তুরানি গােষ্ঠীর নেতা ছিলেন হাজিউদ্দিন ফিরােজ জঙ, আমিন খান ও চিন কিলিজখান এবং হিন্দুস্থানী গােষ্ঠীর নেতা ছিলেন সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় ও খান-ই-দাউরান।

মারাঠা শক্তির উত্থান ও পতন

বালাজি বিশ্বনাথ (১৭১৩-১৭২০)

১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে শাহু বালাজি বিশ্বনাথকে পেশােয়া পদে নিয়ােগ করেন এবং সেনাকর্তা উপাধি দেন। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে খেদ-এর যুদ্ধে শাহু সাতারা দখল করেন। এবং সাতারার সিংহাসনে বসেন। বালাজি বিশ্বনাথ সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের সঙ্গে একটি সন্ধি করেন ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে। মুঘলরা শাহুকে নিজ রাজ্যের রাজা হিসাবে স্বীকার করেন এবং শাহুকে ছটি মুঘল প্রদেশ (ঔরঙ্গাবাদ, বেরার, বিদর, বিজাপুর, গােলকুন্ডা ও খান্দেশ) এর চৌথ ও সরদেশমুখী কর আদায়ের অনুমতি দেন। শাহু মুঘলদের বার্ষিক ১০ লক্ষ টাকা কর দিতে সম্মত হন। ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দে মারাঠা নৌবাহিনীর প্রধান কঙ্গোজি আংরের সঙ্গে বালাজি বিশ্বনাথের নােনাবেলার সন্ধি হয়। ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে মুঘলদের সঙ্গে সন্ধিকে স্যার রিচার্ড টেম্পল ‘মারাঠা সাম্রাজ্যের ম্যাগনাকার্টা’ বলে অভিহিত করেন।

প্রথম বাজিরাও (১৭২০-১৭৪০)

১৭২০ খ্রিস্টাব্দে ২০ বছর বয়সে পেশােয়া পদে বসেন। তিনি গেরিলাযুদ্ধ পদ্ধতিতে পারদর্শী ছিলেন। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে বলপুরের যুদ্ধে, ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দে পালখেটের যুদ্ধে, ১৭৩১ খ্রিস্টাব্দে ধাবােই-এর যুদ্ধে এবং ১৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে দুরাইশারাই-এর যুদ্ধে নিজামকে পরাস্ত করেন। দুরাইশারাই সন্ধি দ্বারা নিজামের কাছ থেকে মালব ও বুন্দেলখন্ড দখল করেন। নিজামের সঙ্গে ধাবই-এর যুদ্ধের ফলে নিজাম শাহুকে মারাঠা অধিপতি ও দাক্ষিণ্যাত্যে চৌথ ও সরদেশমুখী অধিকারের অধিকারী বলে মেনে নেন। দুরাইশরাই সন্ধি দ্বারা প্রথম বাজিরাও নিজামের থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পান। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে জানজিরার সিদ্ধিদের তিনি পরাস্ত করে বিতাড়িত করেন। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাজিরাওয়ের ভাই চিমজি আপ্পারাও-এর নেতৃত্বে । মারাঠারা পাের্তুগীজদের পরাজিত করে সলসেট ও বেসিন দখল করেন। প্রথম বাজিরাওয়ের সময় নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন। প্রথম বাজিরাও ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহি’র আদর্শ প্রচার করেন।
   প্রথম বাজিরাওয়ের সময় মারাঠা শক্তি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যথা বরােদার গায়কোয়াড, নাগপুরের ভোসলে, ইন্দোরের হােলকার, গােয়ালিয়রের সিন্ধিয়া এবং পুনার পেশােয়া। প্রথম বাজিরাওকে বলা হয় মারাঠা জাতির নেপােলিয়ান ও মারাঠা জাতির দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা।

বালাজি বাজিরাও (১৭৪০-১৭৬১)

১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে শাহুর মৃত্যুর পর রাজারামকে সিংহাসনে বসান এবং পরবর্তীকালে তাকে সাতারায় বন্দী করে রাখেন। ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আহম্মদ শাহের সঙ্গে তাঁর সন্ধি হয়। মুঘল সম্রাট উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল, আগ্রা ও আজমীরের চৌথ আদায়ের দায়িত্ব বালাজি বাজিরাওকে দেন। তার আমলে মারাঠারা, মহীশূর,কর্ণাটক, অ্যাটক এবং পাঞ্জাব দখল করে। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে উদগীরের যুদ্ধে মারাঠারা নিজামকে পরাস্ত করে। ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁর সঙ্গে মারাঠাদের সন্ধি হয় ও আলিবর্দী বার্ষিক ১২লক্ষ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আফগান নেতা আহম্মদশাহ আবদালীর হাতে মারাঠারা পরাস্ত হয়। বালাজি বাজিরাও-এর ভাই সদাশিব রাও, পুত্র বিশ্বাস রাওসহ অন্যান্য মারাঠা নেতা এবং ১৮ হাজার মারাঠা সেনা নিহত হয়। বালাজি বাজিরাও ভগ্ন হৃদয়ে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ২৩ জুন মারা যান।

প্রথম মাধবরাও (১৭৬১-১৭৭২)

মালব ও বুন্দেলখন্ড মারাঠা সাম্রাজ্যভুক্ত করেন এবং জাঠ ও রাজপুতরা মারাঠাদের চৌথ দানে বাধ্য হয়। মুঘলসম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে দিল্লীর সিংহাসনে বসতে সাহায্য করেন এবং হায়দারআলিকে সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে নিজামের কাছে মারাঠারা পরাস্ত হয় ও নিজাম শিবানির দৌলতাবাদ, আসীরগড় ও আহম্মদনগর দুর্গ দখল করেন। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে নিজাম পুনা লুঠ করেন জ্ঞানজি ভোসলে গােপাল রাও পটবর্ধনের সহযােগিতায়। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে রাক্ষসভূবনের যুদ্ধে মারাঠার নিজাম সেনাপতি ভিত্তাল সুন্দরকে পরাস্ত করেন। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম মাধবরাওয়ের মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় শাহ আলমকে সিংহাসনে বসানাের জন্য তিনি মহাদজি সিন্ধিয়াকে পাঠান।

নারায়ণ রাও (১৭৭২-১৭৭৩)

নারায়ণ রাও সিংহাসনে বসলে কাকা রঘুনাথ রাও তাকে হত্যা করে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে নিজে পেশােয়াপদ দখল করেন। কিন্তু নানাফড়নবীশ ও অন্যান্য মারাঠা নেতা রঘুনাথ রাওকে মানতে অস্বীকার করেন এবং মৃতনারায়ণ রাওয়ের বিধবা পত্নী গঙ্গাবাই এর একটি পুত্রসন্তান হলে মারাঠা নেতৃবৃন্দ রঘুনাথ রাওকে বিতাড়িত করে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় মাধবরাও বা মাধবরাও নারায়ণকে পেশােয়া পদে প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রথম ঈঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৭৭৫-১৭৮২)

রঘুনাথ রাও পেশােয়া পদ পুনরুদ্ধারের জন্য ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৭ মার্চ ইংরেজদের সঙ্গে সুরাটের সন্ধি করেন। সন্ধির শর্তানুসারে স্থির হয় রঘুনাথ রাওকে ইংরেজ ২৫০০ সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবে ও তার ব্যয় রঘুনাথ রাও বহন করবেন। রঘুনাথ রাও সুরাট ও ব্রোচ-এর রাজস্বের এক অংশ এবং সলসেট ও বেসিন ইংরেজদের দিতে রাজি হন। রঘুনাথ রাও ও ইংরেজদের যুগ্ম বাহিনী আরাসের যুদ্ধে পেশােয়াকে পরাস্ত করে ১৭৭৫ এর মে মাসে। ওয়ারেন হেস্টিংস সুরাট সন্ধি মানেন নি ও কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট সুরাটের সন্ধি বাতিল করে ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে পুরন্দরের সন্ধি করেন। সন্ধির শর্তানুসারে ইংরেজরা রঘুনাথ রাওয়ের পক্ষ ত্যাগ করে এবং রঘুনাথ রাওকে গুজরাটের কোষারগাঁওয়ে বসবাস করার এবং বছরে তিনলক্ষ টাকার বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করেন। সলসেট ও থানা ইংরেজরা পায় এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ১২লক্ষ টাকা নিয়ে দ্বিতীয় মাধবরাওকে পেশােয়া বলে মেনে নেয়। ভারতের মেকিয়াভেলি’ নানাফড়নবীশের কাছে রঘুনাথ রাও ও ইংরেজদের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। নানা ফড়নবীশের আসল নাম ছিল বালাজি জনার্দন এবং ফড়নবীশ ছিল তার পদ। ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে তেলেগাঁওয়ের যুদ্ধে ইংরেজরা পরাস্ত হয় এবং ওয়াড়গাঁওয়ের সন্ধি করে। ওয়ারেন হেস্টিংস সন্ধি মানেন না ও যুদ্ধ চালিয়ে যান। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে ১৭ মে মহাদজি সিন্ধিয়ার মধ্যস্থতায় পেশােয়া ও ইংরেজদের মধ্যে সবাইয়ের সন্ধি হয়।

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৮০৩-১৮০৫)

১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে মহান রাজনীতিবিদ নানাফড়নবীশকে বন্দী করেন মিখেল তিলাে। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে মারাঠারা টিপু সুলতান ও ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে নিজামের সঙ্গে খারদার চুক্তি করে। নানাফড়নবীশের বদলে মারাঠা রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন নরপন্থ চক্রদেব। দৌলতরাও সিন্ধিয়া ও যশবন্তরাও হােলকার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব হলে দ্বিতীয় বাজীরাও সিন্ধিয়ার পক্ষ নেন এবং হােলকারের কাছে পরাস্ত হয়ে পালান। ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বাজিরাও ইংরেজদের সঙ্গে বেসিনের চুক্তি করেন। সিন্ধিয়া ও ভোসলে বেসিনের চুক্তি মানতে অস্বীকার করলে আর্থার ওয়েলেসলি ১৮০৩-০৫ খ্রিস্টাব্দে অসই, ওয়াড়গাঁও, দিল্লী ও লাসওয়ারির যুদ্ধে সিন্ধিয়া ও ভেঁসলেকে পরাস্ত করে। ইংরেজদের সঙ্গে ভোঁসলে সুরজ, অর্জুনগাঁও ও দেওগাঁওয়ের সন্ধি স্বাক্ষর করেন ও অধীনতামূলক মিত্ৰতা নীতি মেনে নেন। হােলকার এরপর ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে দিগের যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে রণজিৎ সিং-এর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে রণজিৎ সিং ফিরিয়ে দেন। কিন্তু ওয়েলেসলি স্বদেশে ফিরে গেলে হােলকার রক্ষা পান।

তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৮১৭-১৮১৯)

গায়কোড়দের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন গঙ্গাধর শাস্ত্রী। পেশােয়ার বিশ্বস্ত মন্ত্রী ত্রিম্বকজি ডিংলেকে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট এলফিনস্টোন গ্রেপ্তার করলে পেশােয়া ক্ষুব্ধ হন। কোম্পানী পিন্ডারী দস্যুদের দমনে উদ্যোগী হলে পিন্ডারী নেতা করিম খাঁ, ওয়াশিল মহম্মদ ও চিতু পেশােয়ার সঙ্গে যােগ দেন। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে লর্ড হেস্টিংস পেশােয়াকে পুনার সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। সন্ধির শর্তানুসারে পেশােয়া দ্বিতীয় বাজিরাও মারাঠা সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব ত্যাগ করেন, রাজ্যের একাংশ ছেড়ে দেন এবং বিনা অনুমতিতে কারাের যােগাযােগ স্থাপনে বিরত থাকেন।
   পেশােয়া বিদ্রোহ ঘােষণা করলে সিন্ধিয়া, হােলকার ও ভোসলে তার সঙ্গে যােগ দেয়। ভোসলের আগ্লা সাহেব ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে সীতাবলদীর যুদ্ধে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ফিটজেরাল্ডের কাছে পরাস্ত হন। তিনি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি মেনে নেন। হােলকার বিতল বা ভিটল রাও ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের কাছে মাহিতপুরের যুদ্ধে পরাস্ত হন। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে পেশােয়া কোরেগাঁও, কিরকি এবং অস্টির যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অধীনতামূলক মিত্ৰতা নীতি মেনে নেন। পেশােয়া পদ লুপ্ত করে তার রাজ্য কোম্পানীর সাম্রাজ্যভুক্ত হয় ও তাকে বার্ষিক ৮.৫ লক্ষ টাকা বৃত্তি দিয়ে বিরে নির্বাসন দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বাজিরাও ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। সারা রাজ্যে শিবাজির বংশধর প্রতাপ সিংহকে বসানাে হয়। দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের দত্তকপুত্র ছিলেন নানাসাহেব বা ধপন্থ।
   ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে লর্ড হেস্টিংস শাহবাদের যুদ্ধে করিম খা ও আসমান খানকে পরাস্ত করেন। পিন্ডারীদের দমন করতে কোটা বুন্ডি, ভােপাল, যােধপুর ও জয়পুরের রাজাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। তাতিয়া যােগ ও ম্যালকমের মধ্যস্থতায় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ৬ জানুয়ারী মান্দাশাের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় দ্বিতীয় মলহর রাও হােলকার ও ইংরেজদের মধ্যে। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে গোয়লিয়রের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় দৌলতরাও সিন্ধিয়া ও ইংরেজদের মধ্যে।

জাঠ শক্তির উত্থান – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Rise of Jat power)

জাঠদের রাজধানী ছিল ভরতপুর। 
চুড়ামন জাঠবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
বাদান সিং (১৭২২-১৭৫৬) : জাঠ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মহেন্দ্র’ উপাধি নেন। তিনি ভরতপুরে একটি রাজপ্রাসাদ ও ‘বৃন্দাবন ধীরে সমীর’ নামে একটি মন্দির তৈরী করে ব্রহ্মরাজ’ উপাধি নেন। ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি রােহিলাদের বিরুদ্ধেএবং মারাঠাদের সঙ্গে ভাগরূর যুদ্ধে পরাস্ত হন।
সুরজমল (১৭৫৬-১৭৬৫) : সুরজমল সবচেয়ে শক্তিশালী জাঠ নেতা ছিলেন এবং তাকে বলা হত জাঠদের প্লেটো ও ইউলিসিস। সুরজমল সুরজকুন্ত, গােপালভবন, সুরজভবন এবং কৃষ্ণভবন নির্মাণ করেন।

বুন্দেলা রাজবংশের উত্থান – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Rise of the Bundela Dynasty)

বুন্দেলা রাজবংশের উত্থান : ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর আবুল ফজলকে হত্যা করার জন্য বীর সিং বুন্দেলাকে নিয়ােগ করেন। জাহাঙ্গীর ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে পুরস্কার হিসাবে বীর সিং বুন্দেলাকে ৩০০০ মনসব এবং উর্চার শাসনকর্তা নিয়ােগ করেন। ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে বুন্দেলার মৃত্যুর পর ঝুঝার সিং সিংহাসনে বসেন। বুঝর সিং ১৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে চৌরগড়ের শাসক প্রেম নারায়ণকে পরাস্ত করে রাজধানী গােন্ড অধিকার করেন। শাহজাহানের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হলে শাহজাহান ঔরঙ্গজেবকে পাঠান তার বিদ্রোহ দমনে।

অযােধ্যা – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Ayodhya – Rise of regional power)

অযােধ্যা (১৭২২-১৮৫৬)
সাদাত খান (১৭২২-১৭৩৯) : মহম্মদ শাহ তাঁকে অযােধ্যার শাসক নিযুক্ত করেন। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বাধীনতা ঘােষণা করেন এবং সাদাতখান বুরহান-উল-মুলক’ উপাধি নেন। তিনি বাংলা-ই-ফৈজাবাদ নামে একটি আবাসিক প্রাসাদ নির্মাণ করেন। নাদির শাহ তাকেভকিল-ই-মুতলাখ পদে নিয়ােগ করেন। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

সফদরজঙ (১৭৩৯-১৭৫৪) : সফদরজঙ ছিলেন মুঘলদের উজীর। তার আসল নাম ছিল মনসুর খাঁ। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আহম্মদ শাহের উজীর নিযুক্ত হন ও নায়েব উজীর নামে পরিচিতি পান। মহম্মদ শাহ তাকে অযােধ্যার সুবাদার নিযুক্ত করেন ও সফদরজঙ’ উপাধি দেন। তিনি রােহিলা, জাঠ ও মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

সুজাউদদৌল্লা (১৭৫৪-১৭৭৫) : তিনি বক্সারের যুদ্ধে বাংলার নবাব মিরকাশিমের পক্ষ নেন এবং কারা ও এলাহাবাদ হারান। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে বেনারসের সন্ধি করেন এবং কারা ও এলাহাবাদ ইংরেজদের কাছ থেকে কিনে নেন। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি রােহিলাদের হারিয়ে রােহিলখন্ড অযােধ্যার সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি দ্বিতীয় শাহ আলমের উজীর নিযুক্ত হন এবং মারাঠাদের বিপক্ষে আহম্মদ শাহ আবদালীর পক্ষে যােগ দেন।

আসাফ-উদ-দৌলা (১৭৭৫-১৭৯৭) : ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ও আসা-উদ্-দৌলার মধ্যে ফৈজাবদের চুক্তি হয়। তিনি রাজধানী ফৈজাবাদ থেকে লক্ষ্ণৌ নিয়ে যান ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে আসাফের মৃত্যুর পর ওয়াজির আলিকে অযােধ্যার সিংহাসনে বসান ইংরেজরা।

ওয়াজির আলি শাহ (১৭৯৭-১৭৯৮) : তিনি ইংরেজদের ৭৬ লক্ষ টাকা দেন। তাকে সরিয়ে সিংহাসনে বসেন সাদাত খান (১৭৯৮)। ওয়াজির জামান শাহের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। ওয়াজির আলিকে ইংরেজরা বন্দী করে ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গে পাঠিয়ে দেন। তিনি ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়ামে মারা যান।

সাদাত আলি : ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি লর্ড ওয়েলেসলির সঙ্গে অধীনতামুলক মিত্ৰতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ও তার রাজ্যের অধিকাংশ কেড়ে নেওয়া হয় ব্রিটিশ সৈন্যের ভরণ পােষণের জন্য। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে নাসিরুদ্দীন সিংহাসনে বসেন সাদাত আলির মৃত্যুর পর। এরপর গাজিউদ্দীন ও নাসিরুদ্দীন-এর বেগমের মধ্যে উত্তরাধিকার প্রশ্নে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ গাজিউদ্দিনকে অযােধ্যার সিংহাসনে বসান।

ওয়াজিদ আলি শাহ : তিনি ছিলেন অযােধ্যার শেষ নবাব। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কুশাসনের অজুহাতে লর্ড ডালহৌসি অযােধ্যা রাজ্যটি অধিগ্রহণ করেন এবং ওয়াজিদ আলি শাহকে ভাতা দিয়ে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। তিনি কোলকাতায় মেটিয়াবুরুজে এসে নাটক লেখা এবং একাধিক বিবাহের কাজে মন দেন।

হায়দরাবাদ – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান

হায়দরাবাদনিজাম-উল-মুলক আসফ ঝ (১৭২৪-১৭৪৮) : ১৭১৩ থেকে ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা। তার আসল নাম ছিল চিন কিলিজ খান। সম্রাট ফারুকশিয়র তাকে ‘খান-ই-দুরান’ ও ‘নিজাম-উল-মুলক’ উপাধি দেন। ১৭২২-২৪ এর মধ্যে তিনি মহম্মদ শাহের উজীর নিযুক্ত হন। ১৭৩১ খ্রিস্টাব্দে ধাবােই-এর যুদ্ধে তিনি মারাঠাদের কাছে পরাস্ত হন। ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিদ্রোহী নাসির জঙকে পরাস্ত করেন। তিনি শাকি নামে ফার্সি ভাষায় একটি গ্রন্থ লেখেন। তিনি মুজাফফর জঙকে “হিদায় মুহীউদ্দীন খান” উপাধি দেন।

নাসির জঙ (১৭৪৮-১৭৫০) : নাসির জকে হত্যা করে ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসেন বসেন তার ভাগ্নে ও নিজাম-উ-মুলক-এর পৌত্র মুজাফফর জঙ্গ।

মুজাফফর জঙ্গ (১৭৫০-১৭৫১) : তিনি ফরাসীদের সাহায্যে সিংহাসনে বসেন। কর্ণাটকের চাঁদা সাহেব ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে মুজাফফর জঙকে দিওয়ান নিযুক্ত করেন ও ‘খুদা-নওয়াজ খান বাহাদুর’ উপাধি দেন এবং কর্নাটক রাজ্য দখলের পরামর্শ দেন।

সালাবত জঙ (১৭৫১-১৭৬০) : মুজাফফর জঙের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে ফরাসীদের সাহায্যে সালাবত জঙ সিংহাসনে বসেন। সম্রাটের নিরাপত্তার তাগিদে বুশি হায়দরাবাদে একটি বিশাল সেনাবাহিনী মােতায়েন রাখেন। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ কর্নেল ফোর্ডের সঙ্গে সালাবত জঙ মসলিপত্তনমের সন্ধি করেন। এরপরে যথাক্রমে সিংহাসনে বসেন নিজাম আলি (১৭৬০-১৮০৩), সিকান্দার আঁ (১৮০৩-২৯), নাসির-উদ-দৌলা (১৮২৯-৫৭), আফজল-উদ-দৌলা (১৮৫৭-৬৯), মহব্রত আলি খাঁ (১৬৬৯-১৯১১) এবং শেষ সুলতান ওসমান-আলি-খা (১৯১১-১৯৪৯)।

নিজাম আলি (১৭৬০-১৮০৩) : তিনি ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে হায়দরাবাদ চুক্তি করেন। দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে নিজাম নিরপেক্ষ থাকেন, তৃতীয় ও চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের সাহায্য করেন। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ওয়েলেসসি এবং নিজাম আলির মধ্যেঅধীনতামুলক মিত্রতা নীতি স্বাক্ষরিত হয়। নিজাম ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মহীশূর রাজ্যের অধিকাংশ স্থান অর্জন করেন। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ডালহৌসি বেরার প্রদেশটি নিজামের কাছ থেকে কেড়ে নেন অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির খরচ হিসাবে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের সময় নিজাম ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিলেন।

রােহিলা

রােহিলারা ছিল আফগান। মুঘলরা পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আফগানদের পরাস্ত করে। সপ্তদশ শতকে এলাহাবাদ, দ্বারভাঙা, উড়িষ্যা ও শিলেটে তাদের রাজ্য বিস্তৃত ছিল। তাদের রাজধানী ছিল রামগঙ্গা নদীর তীরে রামপুর। প্রাথমিকভাবে একে বলা হত কাটিহার।

আহম্মদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণ

আহম্মদ শাহ আবদালী চারবার ভারত আক্রমণ করেন। তিনি প্রথমবার মানপুরের যুদ্ধে মুঘলদের কাছে পরাজিত হন এবং মীর মনু তাকে পরাস্ত করেন। তার পঞ্চম বার ভারত আক্রমণের সময় মারাঠাদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা পরাস্ত হয়। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে আবদালির সেনাপতি জাহান খান শিখনেতা শােভা সিং ও হীরা সিং-এর কাছে পরাস্ত হন। পাতিয়ালার অমর সিং আহমেদ শাহ আবদালিকে সাহায্য করেন। আহমেদ শাহ আবদালা অমর সিংকে ‘রাজা-ই রাজান’ উপাধি দেন। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে আহম্মদ শাহ আবদালী মারা যান।

রাজপুত – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Rajput dynasties and states)

রাজপুত বংশ : অষ্টাদশ শতকে সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা ছিলেন দ্বিতীয় রাজা সােয়াই জয় সিংহ (১৬৯৯-১৭৪৩)। ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার নিজের নামে জয়পুর শহর প্রতিষ্ঠা করেন। অম্বরের আগের রাজধানী কাছােয়া তার সময় গুরুত্ব হারায়। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের নাম ধুন্দার রাজবংশ। তার সাম্রাজ্য গঠিত ছিল অম্বর, দোসা এবং সােয়া নিয়ে। ১৭ ২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি সৈয়দ বংশকে সরিয়ে দিয়ে মামুদ শাহকে সিংহাসনে বসান। তিনি সংস্কৃত, ফার্সি ভাষা, অঙ্ক, জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি দিল্লী, জয়পুর, উজ্জয়িনী, মথুরা ও বারানসীতে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (Observatory) নির্মাণ করেন। পাের্তুগালের রাজা তার কাছে ডেলাহায়ারের জ্যোতির্বিদ্যার টেবিল পাঠালে তিনি তার ভুল ধরেন। উলুঘ বেগের যন্ত্রপাতি যেগুলি সমরখন্দ ও তুরস্কের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করত তারা ভুল ধরতে ব্যর্থ হন। ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে সােয়াই জয় সিংহ জিয়ামহম্মদ শাহি নামে তার টেবিল প্রকাশ করেন। জগন্নাথ ভট্ট ছিলেন তার একজন অনুরাগী। জয়পুর শহরের পরিকল্পক দলরাম ছিলেন তার মুখ্য বাস্তুকার। জয়সিংহ বহু সরাইখানা নির্মাণ করেন। তিনি সংস্কৃতে ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস অফ জিওমেট্রি’ বইটি অনুবাদ করেন এবং নেপিয়ারের ‘লগারিদমস’ গ্রন্থটিও সংস্কৃতে অনুবাদ করেন। সােয়াই জয় সিংহ ছিলেন সঙ্গীত ও নারী ভক্ত। তিনি ৩১ টি বিবাহ করেন। তিনি আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করতেন। তার মৃত্যুর পর ব্রহ্মপুরীতে একটি মার্বেল পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

কর্ণাটক – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Karnataka – Rise of regional power)

কর্ণাটক : স্বশাসিত কর্ণাটক রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন সাদাতুল্লা খান। কর্ণাটকের রাজধানী ছিল আর্কট। এরপর সিংহাসনে বসেন দোস্ত আলি। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে মারাঠাদের সঙ্গে সংঘর্ষে দোস্ত আলি মারা যান। এরপর নিজামের মনােনীত প্রার্থী আনােয়ারউদ্দীন কর্ণাটকের সিংহাসনে বসলে দোক্ত আলীর জামাতা চাদা সাহেব তা মানতে অস্বীকার করেন। ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি কমােডের বানেট কয়েকটি ফরাসী জাহাজ দখল করে নিলে ইঙ্গ-ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। পন্ডিচেরীর ফরাসী শাসনকর্তা ডুপ্লে মরিশাসের ফরাসী গভর্নর লা বুদানের কাছে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠানাের আবেদন জানান।

প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৬-১৭৪৮) : ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে ডুপ্লে মাদ্রাজ দখল করেন। ইংরেজরা কর্ণাটকের সুলতানের কাছে আবেদন জানায় ফরাসীদের হটিয়ে মাদ্রাজ পুনরায় তাদের ফিরিয়ে দেবার জন্য। ফরাসীরা নবাব আনােয়ারউদ্দীনকে মাদ্রাজ ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করলে ১০ হাজার নবাব বাহিনীর সঙ্গে ৯৩০ জন ফরাসী বাহিনীর সেন্ট থােম বা মাইলাপুরের যুদ্ধ হয়। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধের পরিমাপ্তি ঘটলে এই-লা-শ্যাপেলের সন্ধি হয় এবং ফরাসীরা মাদ্রাজ ইংরেজদের ফিরিয়ে দেয়।

দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৯-১৭৫৪) : ফরাসীরা হায়দরাবাদের মুজাফফর জঙ্গ ও কর্ণাটকের চাদা সাহেবকে সমর্থন করেন। অপরদিকে ইংরেজরা হায়দরাবাদের নাসির জঙ ও কর্ণাটকের আনােয়ারউদ্দিনকে সমর্থন করেন। ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে অম্বরের যুদ্ধে আনােয়ারউদ্দিনকে হত্যা করে চাদা সাহেব কর্ণাটকের সিংহাসনে বসেন। আনােয়ারউদ্দিনের পুত্র ত্রিচিনােপল্লীতে আশ্রয় নেন। ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে মুজাফফর জঙ নিহত হলে সলাত জঙকে সিংহাসনে বসানাে হয়। কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধে ডুপ্লের পরাজয় হলে ভারতে ফরাসী সাম্রাজ্য বিস্তারের সম্ভাবনা চিরতরে বিলীন হয়। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি দেশে ফেরেন এবং গােদে তার স্থলাভিষিক্ত হন।

তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৫৮-১৭৬৩) : ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলে ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ ও ওয়াটসন বাংলার চন্দননগর ফরাসীদের কাছ থেকে দখল করে নেন ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে। ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে কাউন্ট লালী ফরাসী শক্তিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে লালী মাদ্রাজ আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। কর্নেল ড্রোপার ও লরেন্স মাদ্রাজকে রক্ষা করেন ফরাসীদের বিরুদ্ধে। ফরাসী নৌবহরকে ১৭৫১৯ খ্রিস্টাব্দে পরাজিত করেন ইংরেজ সেনাপতি অ্যাশে। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ২২ জানুয়ারী বন্দীবাসের যুদ্ধেইংরেজ জেনারেল স্যার আয়ারকুট কাউন্ট লালীকে পরাস্ত করেন। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে পন্ডিচেরী ইংরেজরা দখল করে নেন। এরপর ফরাসী অধিকৃত জিঞ্জি ও মাহের পতন ঘটে। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটলে প্যারিসের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। সন্ধির শর্তানুসারে ফরাসীরা তাদের অধিকৃত স্থানগুলি ফিরে পায় বাণিজ্যের জন্য।

সিন্ধু – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (Indus – Rise of regional power)

সিন্ধু : ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে বালুচিস্তানের আমীর ছিলেন কালােরাস বা কলােরাস। সিন্ধু প্রদেশ হায়দরাবাদ, মীরপুর এবং ক্ষীরপুর এই তিনটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি প্রদেশে আলাদা আলাদা উপজাতি গােষ্ঠী শাসন করত। ব্রিটিশরা সিন্ধু জয়ের জন্য আগ্রহী হয়ে পড়ে। কারণ—
1. সিন্ধু প্রদেশে বাণিজ্যের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ছিল।
2. পূর্বদিকে ফরাসী ভীতি দেখা যায়।
3. সিন্ধু জয় করে ইংরেজরা পারস্য ও আফগানিস্তানের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল।
১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড মিন্টো সিন্ধুর আমীরের কাছে একজন দূত পাঠান। দূত হিসাবে আলেকজান্ডার বানেস সিন্ধু প্রদেশে যান। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধুর সঙ্গে লর্ড বেন্টিঙ্কের একটি চুক্তি হয়। সিন্ধু প্রদেশ ইংরেজদের বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড অকল্যান্ড সিন্ধুর আমীরকে বাধ্য করেন ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ নীতি গ্রহণ করতে। লর্ড এলেনবরা সিন্ধু প্রদেশ দখলের সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে চার্লস নেপিয়ারকে মেজর জেমস আউট্রাম -এর পরিবর্ত হিসাবে পাঠানাে হয়। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে নেপিয়ার ইমামগড় দুর্গ ধ্বংস করেন। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধুর বালুচিরা ইংরেজ রেসিডেন্স আক্রমণ করেন। মিয়ানির যুদ্ধে নেপিয়ার বালুচিসদের পরাস্ত করেন। দাবার যুদ্ধে স্যার চার্লসনেপিয়ার মীরপুরের আমীর শের মহম্মদকে পরাস্ত করেন এবং তাকে সিন্ধু থেকে বিতাড়িত করা হয়। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সিন্ধুদেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে স্যার চার্লস নেপিয়ারকে পাঞ্জাবের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়।

আঠারো শতকে বাংলার ইতিহাস (History of Bengal in the eighteenth century)

বাংলা (১৭১৭-১৭৭২)
মুর্শিদকুলী খাঁ (১৭১৭-১৭২৭) : ঔরঙ্গজেব মুর্শিদকুলী খাঁকে বাংলার দেওয়ান হিসাবে নিযুক্ত করেন ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে সুবাদার ও দেওয়ান পদে মুর্শিদকুলী খাঁকে নিয়ােগ করেন ফারুকশিয়র। ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে তাকে উড়িষ্যার গভর্নর নিয়ােগ করা হয় মুর্শিদকুলী খাঁকে। মুর্শিদকুলী খাঁ রাজধানী ঢাকা থেকে মকসুদাবাদ বা মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ করতে নিষেধ করেন। ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা শাহসুজার কাছ থেকে
৩০০০ টাকার বিনিময়ে যে বাণিজ্য করার অনুমতি পান মুর্শিদকুলী খাঁ তার বিরােধিতা করেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ফারুকশিয়ারের কাছ থেকে জন সুরম্যান যে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার ফরমান পান তার কোন বিশেষ সুবিধা নিতে পারেন নি মুর্শিদকুলী খাঁর কাছে থেকে। তিনি বিদ্রোহী জমিদারদের দমন করার জন্য আইন প্রণয়ন করেন। তার রাজস্ব প্রথা মালজামিনী ব্যবস্থা নামে পরিচিত।
সুজাউদ্দীন (১৭২৭-১৭৩৯) : ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ শাহ সুজাউদ্দীনকে বিহারের শাসনকর্তা নিয়ােগ করেন। এরফলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা সুজাউদ্দীনের অধীনে আসে। সুজাউদ্দীনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন আলম চাঁদ, ফতেচাঁদ, জগতশেঠ, আলিবর্দী খান ও হাজি আহম্মদ। তিনি কোম্পানীর লবণ আটক করে বহু শুল্ক আদায় করেন।
সরফরাজ খাঁ (১৭৩৯-১৭৪০) : সুজাউদ্দীন এর পুত্র সরফরাজ
খাকে হত্যা করে ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মসনদে বসেন বিহারের শাসক আলিবর্দী খাঁ।
আলিবর্দী খাঁ (১৭৪০-১৭৫৬) : তিনি মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের কাছ থেকে ২কোটি টাকার বিনিময়ে নবাবি পদকে বৈধকরণের ফরমান নেন। তার সময় মারাঠারা বারবার বাংলা আক্রমণ করে। তিনি মারাঠা রঘুজি ভোসলের সঙ্গে সন্ধি করেন এবং উড়িষ্যার কিছু অংশের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব মারাঠাদের দেন এবং বার্ষিক দুলক্ষ টাকা চৌথ দেওয়ার অঙ্গীকারবদ্ধ হন ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। তিনি বিদেশী বণিক গােষ্ঠীগুলিকে মৌমাছির সঙ্গে তুলনা করেন। কলকাতা ও চন্দননগরে তিনি দুর্গ নির্মাণ থেকে ইংরেজ ও ফরাসীদের বিরত থাকতে আদেশ দেন।
১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে ঘেরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজকে পরাস্ত করে হত্যা করেন। ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘলরা অর্থের দাবী করলে তিনি দিতে অস্বীকার করেন।
সিরাজ-উদ-দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭) : সিরাজের পিতার নাম ছিল জৈনুদ্দিন ও মাতার নাম ছিল আমিনা বেগম। পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জও, ঢাকার শাসনকর্তার বিধবা পত্নী সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগম এবং প্রধান সেনাপতি মিরজাফর আলি খান সিরাজের বিরােধিতা করতে থাকেন। ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমকে সমর্থন করেন।
   সিরাজ ইংরেজ ও ফরাসীদের দুর্গ নির্মাণে নিষেধ করলে ফরাসীরা তা পালন করলেও ইংরেজরা তা অগ্রাহ্য করে। রাজবল্লভের নির্দেশে তার পুত্র কৃষ্ণদাস প্রচুর ধনরত্ন সহ কলকাতার ইংরেজ গভর্নর ড্রেকের কাছে আশ্রয় নেন। কোম্পানীর কর্মচারীরা দস্তকের অপব্যবহার করত। সিরাজ এর প্রতিবাদ করেন।
   ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ৪ জুন সিরাজ কাশিমবাজার এবং ২০ জুন কলকাতা অধিকার করেন। ইংরেজ গভর্নর ড্রেক সহ অধিকাংশ ইংরেজ ফলতায় পালিয়ে যান। কলকাতার দায়িত্ব মানিক চাদের উপর দিয়ে সিরাজ মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। হলওয়েল নামে জনৈক ইংরেজ কর্মচারী বলেন যে সিরাজ ১৪৬ জন বন্দীকে ২০ জুন রাত্রে ১৮x১৪’১০” একটি কক্ষে বন্দী করেন। এরফলে ১২৩ জন মারা যান শ্বাসকষ্টে। এই ঘটনা ‘অন্ধকূপ হত্যা’ নামে পরিচিত। সিরাজ কলকাতার নাম রাখেন আলিনগর। সিরাজের বিরুদ্ধে মীরজাফর, মানিকচাঁদ, উমিচাঁদ, রায় দুর্লভ, জগৎশেঠ প্রমুখ ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। মাদ্রাজের কর্ণেল ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কলকাতা পতনের খবর পেয়ে কলকাতার দিকে আসেন ও ২ জানুয়ারি।
৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা দখল করে নেন।
   সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তুতি নেন। ৫ ফেব্রুয়ারী ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ক্লাইভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। কিন্তু আহম্মদশাহ আবদালীর পূর্বভারত আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিলে সিরাজ ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ৯ ফেব্রুয়ারী ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের
সন্ধি করেন।
পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭) : ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২৩ জুন মুর্শিদাবাদ থেকে ২০ মাইল দূরে পলাশী নামক প্রান্তরে নবাব সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের সংঘর্ষ বাধে। এই যুদ্ধে নবাব ও ইংরেজপক্ষে ঠিককত সৈন্য সংখ্যা ছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সিরাজের পক্ষে
মীরমদন ও মােহনলাল যুদ্ধ করেন। মীরমদন যুদ্ধে নিহত হন। মীরজাফর, রায়দুর্লভ যুদ্ধ থেকে বিরত থাকেন। ৩০ জুন রাজমহলের কাছে ফকির দানাশাহ সিরাজকে ধরিয়ে দিলে সিরাজকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। মিরজাফরের পুত্র মিরণের নির্দেশে মহম্মদি বেগ সিরাজকে হত্যা করেন।
মীরজাফর (১৭৫৭-১৭৬০) : মীরজাফর বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় কোম্পানিকে মুক্ত বাণিজ্যের অধিকার দেন ও ২৪ পরগনার জমিদারি সত্ত্ব কোম্পানিকে দান করেন। তিনি কোম্পানিকে ১৭.৭ মিলিয়ন টাকা দেন কলকাতা আক্রমণের ক্ষতিপূরণ হিসাবে। তিনি ইংরেজদের বিতাড়িত করার জন্য ডাচ বা ওলন্দাজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এই অভিযােগ দিয়ে ইংরেজরা ১৭৫৯ খ্রীষ্টাব্দে বিদারার যুদ্ধে ডাচদের পরাস্ত করে। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ভ্যান্সিটার্ট মীরজাফরকে সরিয়ে তার জামাতা মীরকাশিমকে মসনদে বসান।
মীরকাশিম (১৭৬০-১৭৬৩) : ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে একটি গােপন চুক্তির দ্বারা তিনি মসনদে বসেন। মীরকাশিম কোম্পানিকে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের জমিদারী সত্ত্ব দান করেন এবং ২৯ লক্ষ টাকা দেন। ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে নিয়ে যান। তিনি দস্তকের অপব্যবহার বন্ধে সচেষ্ট হন। সমরু ও মার্কার নামে দুজন ইউরােপীয় সেনাপতির সাহায্যে তিনি তার বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করেন। তিনি বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ-আলমের কাছ থেকে নবাবী ফরমান আনেন।
   ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে মীরকাশিম ইংরেজ সেনাপতি মেজর অ্যাডামসের কাছে কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অযােধ্যায়
পালিয়ে যান। অযােধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও দিল্লীর সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে মিলিত হয়ে মীরকাশিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে
নামেন কিন্তু যুদ্ধের আগেই মীরকাশিম শিবির ছেড়ে পালিয়ে যান। বক্সারের যুদ্ধে তার বাহিনী সুজাউদ্দৌলা ও দ্বিতীয় শাহ আলমের বাহিনী পরাস্ত হয়।
মীরজাফর (১৭৬৩-১৭৬৫) : মীরকাশিমের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সময় মীরজাফরকে বাংলার মসনদে আবার বসানাে হয় ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে। মীরজাফর কোম্পানীর কর্মচারীদের কর থেকে মুক্তি দেন। কোম্পানিকে তিনি ৩০ লক্ষ টাকা দেন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে মীরজাফরের মৃত্যু হয়।
নজমউদ্দৌলা (১৭৬৫-১৭৭২) : মীরজাফরের মৃত্যুর পর তার পুত্র নজমউদ্দৌলাকে মসনদে বসানাে হয় ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে। তার সময়ে ক্লাইভ দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানী নজমউদ্দৌলাকে পেনশন দিয়ে বাংলায় শাসনভার গ্রহণ করে।
বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থা (১৭৬৫-১৭৭২) : ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ২০ ফেব্রুয়ারী বাংলার নবাবের সঙ্গে সন্ধি হয় ইংরেজদের। সন্ধির শর্তানুসারে নবাবি সেনাদল ভেঙে দিয়ে কোম্পানী নবাবকে রক্ষার দায়িত্ব নেয়। নায়েব নাজিম পদে রেজা খাঁকে কোম্পানী নিয়ােগ করে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য। বাংলার নবাবকে বার্ষিক ৫৩ লক্ষ টাকা বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করা হয়।
   ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি দ্বারা কোম্পানী সুজাউদ্দৌলার কাছ থেকে কারা ও এলাহাবাদ প্রদেশ লাভ করে। সুজাউদ্দৌলা কোম্পানীর সঙ্গে সন্ধি করেন ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৫০ লক্ষ টাকা দেন। এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি দ্বারা (১২ আগষ্ট) কোম্পানী বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে ও কারা ও এলাহাবাদ শাহ আলমকে দান করেন। এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি অনুসারে গাজিপুর ও বারানসী রাজা বলবন্ত সিংয়ের কাছেই থাকে। বিহারের নিজমত ও দেওয়ানি বিভাগের সকল দায়িত্ব অর্পণ করা হয় সিতাব রায়ের ওপর। দ্বৈতশাসনের কুফল হিসাবে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বা ১১৭৬ বঙ্গাব্দে এক ব্যাপক দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। একে বলা হয় ৭৬-এর মন্বন্তর। এরফলে বাংলায় এক তৃতীয়াংশ লােক অনাহারে মারা যান। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা রদ করেন ও কোম্পানী দেওয়ানির কার্যভার গ্রহণ করে।

আঠারো শতকে নেপাল ও ব্রহ্মদেশ-এর ইতিহাস (History of Nepal and Burma in the eighteenth century)

নেপাল : ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে গুখারা পৃথ্বিনারায়ণের অধীনে নেপাল অধিকার করে। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে গােরক্ষপুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হলে নেপালের দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত ব্রিটিশ অধিকার বিস্তৃত হয়। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে লর্ড হেস্টিংস বা ময়রা নেপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করেন। ২ বছর ধরে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ চলে। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি অক্টারলােনি গুর্খা নেতা অমর সিং থাপাকে হারিয়ে মালওন দুর্গ দখল করেন। বহু গুর্খা সৈন্যকে ঘুষ দিয়ে বশীভূত করা হয়। দুপক্ষের মধ্যে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নেপাল সরকার সন্ধি অনুমােদন না করলে অক্টারলােনি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু অবরােধ করেন। গুর্খা নেতারা ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে সগৌলির সন্ধি স্বাক্ষর করেন। সন্ধির শর্তানুসারে (a) সিমলা, মুসৌরি, নৈনিতাল ও আলমােড়া পার্বত্য অঞ্চল সহ কুমায়ুন ও গাড়ওয়াল জেলা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।(b) সিকিমে গুর্খা আধিপত্য বিলুপ্ত হয় এবং নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। স্বাধীন রাজ্য সিকিমের সঙ্গে ইংরেজদের এক চুক্তি হয়, এই চুক্তি অনুসারে তরাই অঞ্চলের কিছু অংশ সিকিমের অন্তর্ভুক্ত হয় ও সিকিম এবং ভারতের মধ্যে মিত্ৰতা হয়।

ব্রহ্মদেশ : ব্রহ্মরাজ বােদোপাওয়ার রাজত্বকাল থেকে ইংরেজদের সঙ্গে ব্রহ্মরাজের সংঘর্ষ শুরু হয়। বােদোপাওয়া আরাকান ও মনিপুর জয় করলে ইংরেজরা আপত্তি জানায়। বর্মীরা কোম্পানীর রাজ্যের মধ্যে প্রবেশ করে লুঠতরাজ চালায়। ব্রহ্মরাজ চট্টগ্রাম, ঢাকা, কাশিমবাজার ইত্যাদি স্থানের উপর দাবি জানায়। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মরাজ আসাম জয় করেন এবং ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে শাহপুরী দ্বীপ দখল করেন। লর্ড আর্মহাস্ট আলাপ আলােচনায় ব্যর্থ হয়ে ব্রহ্মদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করেন। ব্রহ্মরাজ পরাস্ত হয়ে ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়াদাবুর সন্ধি স্বাক্ষর করেন। সন্ধির শর্তানুসারে (a) আরাকান ও টেনাসিরম ইংরেজদের সমর্পণ করা হয়। (b) আসাম, কাছাড়, জয়ন্তিয়া ও মনিপুরের উপর ব্রহ্মরাজ তার দাবি ত্যাগ করেন। (c) ব্রহ্মরাজ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কোম্পানিকে ১ কোটি টাকা দিতে সম্মত হন এবং উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে কাছাড় ও ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে জয়ন্তিয়া এবং লর্ড অকল্যান্ড আসামের বাকি অংশ ইংরেজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। ব্ৰহ্মদেশের নতুন রাজা থরওয়াদি ইয়ান্দাবুর সন্ধি অস্বীকার করেন। লর্ড ডালহৌসী কম্বােডাের ল্যাম্বার্ট নামে জনৈক কর্মচারীকে রণতরী সহ ব্রহ্মদেশে পাঠান। ডালহৌসী ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় ইঙ্গ ব্রহ্মা যুদ্ধ শুরু করেন। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। ইংরেজপক্ষ যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং সমগ্র দক্ষিণ ব্রহ্মা ব্রিটিশ অধিকারে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 16 =