সরকারের শাখাসমূহ: আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ

সরকারের শাখাসমূহ: আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ (Legislature, Executive and Judiciary)

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

  1. সরকারের কটি বিভাগ ও কী কী?
    উত্তর: সরকারের তিনটি বিভাগ আছে। যথা— (ক) আইন বিভাগ, (খ) শাসন বিভাগ এবং (গ) বিচার বিভাগ।
  2. একক শাসন কর্তৃপক্ষ কাকে বলে?
    উত্তর: যখন কোনাে একজন ব্যক্তির হাতে শাসন বিভাগের সমস্ত ক্ষমতা থাকে, তখন তাকে একক শাসন কর্তৃপক্ষ বলে।
  3. বহু শাসন কর্তৃপক্ষ কাকে বলে?
    উত্তর: শাসন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ একাধিক ব্যক্তি সমন্বিত কোনাে সংস্থার হাতে থাকলে তখন তাকে বহু শাসন কর্তৃপক্ষ বলে।
  4. এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কাকে বলে?
    উত্তর: যে-সকল আইনসভা একটিমাত্র কক্ষ বা পরিষদ নিয়ে গঠিত হয় সেরূপ আইনসভাকে বলা হয় এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা।
  5. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কাকে বলে?
    উত্তর: যে সকল আইনসভা দুটি কক্ষ বা পরিষদ নিয়ে গঠিত হয়, তাকে বলা হয় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা।
  6. নামসর্বস্ব শাসক কাকে বলে ?
    উত্তর: যে শাসনব্যবস্থায় শাসক প্রধানের নামে শাসনকার্য পরিচালিত হয়, কিন্তু বাস্তবে শাসক প্রধান শাসনকার্য পরিচালনা করেন না, এই ধরনের শাসককে বলা হয় নামসর্বস্ব শাসক।
  7. ভারতের রাষ্ট্রপতি কী ধরনের শাসক ?
    উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন নামসর্বস্ব শাসক।
  8. আমলা কাদের বলা হয় ?
    উত্তর: শাসক প্রধান বা মন্ত্রীদের সাহায্যকারী উচ্চ পর্যায়ের স্থায়ী সরকারি কর্মচারীদের বলা হয় আমলা।
  9. আইন বিভাগ ছাড়া সরকারের কল্পনা করা সম্ভব হলেও বিচার বিভাগ ছাড়া সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না” —এ কথা কে বলেছেন?
    উত্তর: অধ্যাপক গার্নার বলেছেন,—“আইন বিভাগ ছাড়া সরকারের কল্পনা করা সম্ভব হলেও বিচার বিভাগ ছাড়া সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না।”
  10. ‘Government of England’ গ্রন্থটির। রচয়িতা কে?
    উত্তর: ‘Government of England’ গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন লাওয়েল
  11. একক পরিচালকবিশিষ্ট শাসন বিভাগের কয়েকটি উদাহরণ দাও।
    উত্তর: হিটলার, নাসের ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসন বিভাগ হল একক পরিচালিত শাসন বিভাগ।
  12. শাসন বিভাগের দুটি কাজ উল্লেখ করাে।
    উত্তর: শাসন বিভাগের দুটি কাজ—প্রতিরক্ষামূলক ও জনকল্যাণমূলক।
  13. এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার দুজন সমর্থকের নাম লেখাে।
    উত্তর: অধ্যপক ল্যাস্কিবেন্থাম হলেন এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার দুই জন সমর্থক।
  14. এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার দুজন সমালােচকের নাম লেখাে।
    উত্তর: জে. এস. মিল এবং লর্ড ব্রাইস হলেন এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার দুজন সমালােচক।
  15. বিচার বিভাগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ উল্লেখ করাে।
    উত্তর: বিচার বিভাগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং আইনের ব্যাখ্যা দান করা।
  16. জনগণের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়ােগের পদ্ধতিকে একটি নিকৃষ্ট পদ্ধতি বলে অভিহিত করেছেন কে?
    উত্তর: বিচারপতি নিয়ােগের পদ্ধতিকে একটি নিকৃষ্ট পদ্ধতি বলে অভিহিত করেছেন অধ্যাপক ল্যাস্কি।
  17. ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির মুখ্য প্রবক্তা কে ?
    উত্তর: ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতির মুখ্য প্রবক্তা হলেন মন্টেস্কু
  18. “একজনের হাতে সকল ক্ষমতার সমন্বয়কে স্বেচ্ছাচারিতার সংজ্ঞা বলা যেতে পারে।” —এ কথা বলেছেন কে ?
    উত্তর: “একজনের হাতে সকল ক্ষমতার সমন্বয়কে স্বেচ্ছাচারিতার সংজ্ঞা বলা যেতে পারে।”—এ কথা বলেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাসিডন
  19. ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণনীতি কি ভারতে গৃহীত হয়েছে?
    উত্তর: ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতি ভারতে গৃহীত হয়নি।
  20. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার দুজন সমর্থকের নাম লেখাে।
    উত্তর: জে. এস. মিল এবং লর্ড ব্রাইস হলেন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার সমর্থক।
  21. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার দুজন সমালােচকের নাম লেখাে।
    উত্তর: অধ্যাপক ল্যাস্কি এবং বেন্থাম হলেন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার সমালােচক।
  22. গুডনাউ ও জেঙ্কসের মতে সরকারের বিভাগ কয়টি ও কী কী?
    উত্তর: গুডনাউ ও জেঙ্কসের মতে সরকারের বিভাগ দুটি—আইন ও শাসন বিভাগ।
  23. “সমগ্র জাতি তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করেছে এবং তারা পুরােপুরি সচেতন যে, তাদের অন্য কোনাে মুখপাত্র নেই। শাসনকার্যে তার মতামতই জাতীয় মতামত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ চায়
    ঐক্যবদ্ধ শাসনকার্য। সুতরাং তারা প্রত্যাশা করে একক নেতৃত্ব” —মার্কিন রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এ কথা বলেছেন কে?
    উত্তর: “সমগ্র জাতি তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করেছে এবং তারা পুরােপুরি সচেতন যে, তাদের অন্য কোনাে মুখপাত্র নেই। শাসনকার্যে তার মতামতই জাতীয় মতামত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ চায় ঐক্যবদ্ধ শাসনকার্য। সুতরাং তারা প্রত্যাশা করে একক নেতৃত্ব”। —মার্কিন রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এ কথা বলেছেন প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন
  24. দুটি নামসর্বস্ব শাসকের উদাহরণ দাও।
    উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং ব্রিটেনের রাজা বা রানি হলেন নামসর্বস্ব শাসক।
  25. দুজন মনােনীত শাসকের উদাহরণ দাও।
    উত্তর: ব্রিটেনের রাজা বা রানি ও জাপানের রাজা মনােনীত শাসকের উদাহরণ।
  26. কত খ্রিস্টাব্দে ‘Spirit of Laws’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়?
    উত্তর: ‘Spirit of Laws’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে
  27. বহু পরিচালক শাসন বিভাগ কাকে বলে?
    উত্তর: যে শাসনব্যবস্থায় শাসন বিভাগের সমস্ত কাজ একজনের পরিবর্তে সমক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তির হাতে থাকে সেই শাসনব্যবস্থাকে বহু পরিচালক শাসন বিভাগ বলে।
  28. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি কী ধরনের পরিচালক ?
    উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি একক পরিচালক শাসক।
  29. আইন বিভাগের দুটি কাজের উল্লেখ করাে।
    উত্তর: আইন তৈরি করা এবং সংবিধান সংশােধন করা হল আইন বিভাগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
  30. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নির্ভর করে এমন দুটি বিষয়ের নাম উল্লেখ করাে।
    উত্তর: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নির্ভর করে বিচারপতিদের কার্যকাল ও অপসারণ পদ্ধতির ওপর।
  31. উইলােবির মতে সরকারের বিভাগ কয়টি ?
    উত্তর: উইলােবির মতে সরকারের বিভাগ পাঁচটি।
  32. পূর্ণক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ সম্ভব কি?
    উত্তর: পূর্ণক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ সম্ভব নয়, কাম্যও নয়।
  33. ‘বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব ব্যতিরেকে সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না’ – এ কথা বলেছেন কে?
    উত্তর: ড. গার্নার বলেছেন, —“বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব ব্যতিরেকে সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না।
  34. গুডনাউ ও জেঙ্কসের মতে সরকারের বিচার বিভাগের অবস্থান কীরূপ?
    উত্তর: গুডনাউ ও জেঙ্কসের মতে, বিচার বিভাগ শাসন বিভাগের অন্তর্গত।
  35. সরকারের কয় ধরনের কার্যাবলির কথা অ্যারিস্টটল উল্লেখ করেছেন?
    উত্তর: সরকারের তিন ধরনের কার্যাবলির কথা অ্যারিস্টটল উল্লেখ করেছেন।
  36. দুটি প্রকৃত শাসকের উদাহরণ দাও।
    উত্তর: ভারত এবং ব্রিটেনের মন্ত্রীপরিষদ প্রকৃত শাসকের উদাহরণ।
  37. সরকারের তিন বিভাগের মধ্যে কোনটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ?
    উত্তর: সরকারের তিন বিভাগের মধ্যে আইন বিভাগটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
  38. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নিম্নকক্ষকে ‘জনপ্রিয় কক্ষ’ বলা হয় কেন?
    উত্তর: জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় বলে আইনসভার  নিম্নকক্ষকে ‘জনপ্রিয় কক্ষ’ বলা হয়।
  39. আইনসভার উচ্চকক্ষ স্বৈরাচার প্রতিরােধ করে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করে’ -এটি কার উক্তি?
    উত্তর: অধ্যাপক গেটেল বলেছেন,—“আইনসভার উচ্চকক্ষ স্বৈরাচার প্রতিরােধ করে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করে।
  40. মন্টেস্কু কোন গ্রন্থে ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির আলােচনা করেছেন?
    উত্তর: মন্টেস্কু ‘Spirit of Laws’ নামক গ্রন্থে ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতির আলােচনা করেছেন।
  41. গুডনাউ ও জেঙ্কসের মতে সরকারের বিভাগ কটি ?
    উত্তর: গুডনাউ ও জেঙ্কসের মতে সরকারের বিভাগ দুটি।
  42. আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একক পরিচালক শাসন বিভাগের একটি উদাহরণ দাও।
    উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হলেন আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একক পরিচালক শাসন বিভাগের একটি উদাহরণ।
  43. দুটি বহু পরিচালক শাসন বিভাগের উদাহরণ দাও।
    উত্তর: অতীতে এথেন্স, স্পার্টা ও রােমে বহু পরিচালক শাসন বিভাগ ছিল।
  44. একজন নির্বাচিত শাসকের উদাহরণ দাও।
    উত্তর: একজন নির্বাচিত শাসক হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি।
  45. এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আছে এমন তিনটি রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করাে।
    উত্তর: এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আছে এমন তিনটি রাষ্ট্র হল গণপ্রজাতন্ত্রী চিন, বাংলাদেশ ও গ্রিসের আইনসভা।
  46. আইনসভার ‘দ্বিতীয় পরিষদ হল স্বাধীনতার একটি অপরিহার্য নিরাপত্তা’ -উক্তিটি কার?
    উত্তর: বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লর্ড অ্যাকটন বলেছেন—আইনসভার ‘দ্বিতীয় পরিষদ হল স্বাধীনতার একটি অপরিহার্য নিরাপত্তা।
  47. এমন দুটি বিষয়ের নাম লেখাে যেগুলি বিচার বিভাগের উৎকর্ষ নির্ভর করে।
    উত্তর: বিচারপতিদের যােগ্যতা ও বেতন-ভাতার উপর বিচারপতিদের উৎকর্ষ নির্ভর করে।
  48. “উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের সঙ্গে একমত হলে তা বাহুল্যমাত্র আর উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের সঙ্গে যদি একমত না হয়, তবে তা ক্ষতিকর” —এ কথা কে বলেছেন?
    উত্তর: আবেসিয়ে বলেছেন, —“উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের সঙ্গে একমত হলে তা বাহুল্যমাত্র আর উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের সঙ্গে যদি একমত না হয়, তবে তা ক্ষতিকর।”
  49. “বিশ্বের অপর কোনাে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির মতাে এরকম শক্তিশালী ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রপ্রধান পরিলক্ষিত হয় না”—এ কথা বলেছেন কে?
    উত্তর: অধ্যাপক স্ট্রং (C.E.Strong) বলেছেন, “বিশ্বের অপর কোনাে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির মতাে এরকম শক্তিশালী ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রপ্রধান পরিলক্ষিত হয় না।”
  50. এমন একটি রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করাে যেখানে বহু পরিচালক শাসন বিভাগ আছে?
    উত্তর: বহুপরিচালকবিশিষ্ট শাসন বিভাগ আছে এমন একটি দেশ হল সুইজারল্যান্ড
  51. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আছে এমন কয়েকটি রাষ্ট্রের নাম লেখাে।
    উত্তর: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আছে এমন কয়েকটি রাষ্ট্রের নাম হল—ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন
  52. ‘নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে সঠিক সংবাদ ও তথ্য তুলে ধরাই আইনসভার প্রধান কাজ’ -কে এ কথা বলেছেন?
    উত্তর: বার্নাড ক্লিক বলেছেন, —“নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে সঠিক সংবাদ ও তথ্য তুলে ধরাই আইনসভার প্রধান কাজ”।
  53. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভাকে বিপরীতগামী ঘােড়া ও ঘােড়ার গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন কে?
    উত্তর: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভাকে বিপরীতগামী ঘােড়া ও ঘােড়ার গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন অধ্যাপক ফ্রাঙ্কেল
  54. শাসন বিভাগের কয়টি অংশ ও কী কী?
    উত্তর: শাসন বিভাগের দুটি অংশ— (ক) রাজনৈতিক এবং (খ) অরাজনৈতিক অংশ।
  55. নির্বাচিত শাসক কাকে বলে?
    উত্তর: যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের শাসক প্রধান জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ ভােটে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হন সেই শাসক প্রধানকে নির্বাচিত শাসক বলে।
  56. ‘সরকারের উৎকর্ষ বিচারব্যবস্থার উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করে’—এ কথা
    কে বলেছেন?
    উত্তর: অধ্যাপক লর্ডব্রাইস বলেছেন,—“সরকারের উৎকর্ষ  নির্ভর করে বিচারব্যবস্থার উৎকর্ষের ওপর।”
  57. কোন সময় থেকে ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রচলন হয় ?
    উত্তর: ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রচলন হয় অ্যারিস্টটলের সময়কাল থেকে।
  58. ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতির দুজন প্রবক্তার নাম লেখাে।
    উত্তর: অ্যারিস্টটল এবং মন্টেস্কু হলেন ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রবক্তা।
  59. ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতি গৃহীত হয়েছে এমন দুটি রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করাে।
    উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিলে ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ নীতি গৃহীত হয়েছে।
  60. “ন্যায়বিচারের দীপশিখাটি অন্ধকারের মধ্যে নিভে গেলে কী ভীষণ সেই অন্ধকার” —এ অভিমত কার ?
    উত্তর: অধ্যাপক লর্ড ব্রাইস বলেছেন,—“ন্যায়-বিচারের দীপশিখাটি অন্ধকারের মধ্যে নিভে গেলে কি ভীষণ সেই অন্ধকার”।
  61. “চিরন্তন সতর্কতাই স্বাধীনতার মূল্য এবং সাহসিকতাই স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকার উক্তি ?
    উত্তর: অধ্যাপক পেরিক্লিস বলেছেন, —“চিরন্তন সতর্ক তাই স্বাধীনতার মূল্য এবং সাহসিকতাই স্বাধীনতার মূলমন্ত্র”।

কুইজ সেট

1. “বিচার বিভাগ ছাড়া সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না” —বলেছেন
(A) মার্কস
(B) হবসহাউস
(C) গেটেল
(D) গার্নার


2. “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আধা-অলীক কাহিনি ছাড়া কিছুই নয়” —বলেছেন
(A) গেটেল
(B) গার্নার
(C) অ্যালান বল
(D) স্তালিন

3. “দ্বিতীয় কক্ষ যদি প্রথম কক্ষের সঙ্গে একমত হয় তাহলে তা অনাবশ্যক আর যদি ভিন্ন মত পােষণ করে, তাহলে তা ক্ষতিকর”, বলেছেন
(A) অ্যালান বল
(B) আবেসীয়
(C) লেনিন
(D) রুশাে

4. সােভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে __________ দেখতে পাওয়া যায়।
(A) একক শাসন কর্তৃপক্ষ
(B) বহুশাসন কর্তৃপক্ষ

5. পশ্চিমবঙ্গের আইনসভা
(A) এককক্ষবিশিষ্ট
(B) দ্বিকক্ষবিশিষ্ট

6. জনপালনকৃত্যকগণ __________ সরকারি কর্মী।
(A) স্থায়ী
(B) অস্থায়ী

7. “Government of England” গ্রন্থটির লেখক হলেন
(A) লাওয়েল
(B) স্তালিন
(C) রুশাে
(D) ম্যাক্স ওয়েবার

8. “বিচার বিভাগের দক্ষতা ও কর্মকুশলতার দ্বারাই সরকারের উৎকর্যের পরিমাপ করা সম্ভব” বলেছেন
(A) ম্যাক্স ওয়েবার
(B) লর্ড ব্রাইস
(C) ল্যাস্কি
(D) অ্যারিস্টটল

9. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির মুখ্য প্রবক্তা ছিলেন
(A) হবস
(B) লক
(C) মন্তেস্কু
(D) রুশো

10. পূর্ণ ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ
(A) সম্ভবপর
(B) সম্ভবপর নয়

11. “স্পিরিট অব লজ” গ্রন্থটি রচনা করেন
(A) মন্তেস্কু
(B) ব্ল্যাকস্টোন
(C) রুশো
(D) অ্যারিস্টটল

12. আইনসভার জননী বলা হয় __________ -কে।
(A) ভারতের পার্লামেন্ট
(B) ব্রিটিশ পার্লামেন্ট
(C) মার্কিন পার্লামেন্ট
(D) ফ্রান্সের পার্লামেন্ট

13. ভারতের পার্লামেন্ট
(A) এককক্ষবিশিষ্ট
(B) দ্বিকক্ষবিশিষ্ট

14. ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়স যথাক্রমে __________ বছর।
(A) ৬৫ ও ৬২
(B) ৬০ ও ৬২
(C) ৬১ ও ৬৩
(D) ৬০ ও ৬৫

15. সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতি
(A) স্বীকৃত
(B) স্বীকৃত নয়

16. সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় __________ জন শাসকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
(A) এক
(B) বহু
(C) দুই
(C) তিন

17. ভারতের শাসনব্যবস্থা __________ চালিত।
(A) রাষ্ট্রপতি শাসিত
(B) সংসদীয় বা মন্ত্রীসভা

18. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা
(A) রাষ্ট্রপতি শাসিত
(B) সংসদীয়

19. গ্রেট ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থা
(A) রাষ্ট্রপতি শাসিত
(B) সংসদীয়

20. রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতি
(A) স্বীকৃত
(B) অস্বীকৃত

বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) শাসন বিভাগ বলতে কী বােঝ?
উত্তর : ‘শাসন বিভাগ’ শব্দটি সংকীর্ণ এবং ব্যাপক এই দুই অর্থেই ব্যবহার করা হয়। সংকীর্ণ অর্থে প্রধান কর্মকর্তা এবং অন্যান্য পরিচালকগণকে নিয়ে শাসন বিভাগ গঠিত হয়। এরা দেশ শাসনের মূলনীতি নির্ধারণ করেন এবং প্রশাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত স্থায়ী কর্মচারীগণের মাধ্যমে ওই নীতি কার্যকর করেন। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসভাকে শাসন বিভাগ বলা যায়। কিন্তু ব্যাপক অর্থে শাসন বিভাগ বলতে রাষ্টের প্রধান কর্মকর্তা ও প্রধান পরিচালকবৃন্দসহ প্রশাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সকল কর্মচারীদের বােঝায়। আইন অনুযায়ী শাসননীতি নির্ধারণ এবং তা কার্যকর করবার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্মসচিব ও কর্মচারী নিয়ে শাসন বিভাগ গঠিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংকীর্ণ অর্থেই শাসন বিভাগ কথাটির ব্যবহার করা হয়। শাসক-প্রধান বা শাসন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা নির্বাচনের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। ব্রিটেনের রানি উত্তরাধিকার-সূত্রে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জনগণের দ্বারা পরােক্ষভাবে নির্বাচিত হন। ফরাসি রাষ্ট্রপতি জনগণের প্রত্যক্ষ ভােটে নির্বাচিত হন। ভারতের রাষ্ট্রপতি আইনসভার সদস্যগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থায় শাসক প্রধানের নির্বাচন পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

প্রশ্ন ২) একক শাসন কর্তৃপক্ষ বলতে কী বােঝায়? এর গুণাগুণ আলােচনা করাে।
উত্তর : অধ্যাপক গার্নারের মতে শাসন বিভাগের সংগঠন এক বা একাধিক ব্যক্তির ভিত্তিতে হতে পারে। শাসন বিভাগের ক্ষমতা চরমভাবে যখন একজন ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত হয়, তাকে একক শাসন কর্তৃপক্ষ বলা যেতে পারে। একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একক শাসন কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব সুস্পষ্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে এবং ইটালিতে মুসােলিনির নেতৃত্বে গঠিত সরকার একক শাসন কর্তৃপক্ষের উদাহরণ বলা যেতে পারে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে একক শাসন কর্তৃপক্ষের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
     একক শাসন কর্তৃপক্ষের সপক্ষে কতকগুলি যুক্তির অবতারণা করা হয়। এই যুক্তিগুলি হল—
(ক) এই শাসনব্যবস্থায় সরকারের পক্ষে দ্রুত এবং বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় এবং তা কার্যকর করা যায়। একজন দক্ষ সেনাপতি দুজন অদক্ষ সেনাপতি অপেক্ষা শ্রেয় নেপােলিয়নের এই বিখ্যাত উক্তি একক শাসন কর্তৃপক্ষের মূলনীতি বলে গৃহীত।
(খ) এই শাসনব্যবস্থায় একটি সুসংহত শাসননীতি হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
(গ) দায়িত্বশীলতার দিক থেকে বলা যায় যে, একক শাসন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও সুনির্দিষ্ট।
(ঘ) সুষ্ঠ শাসন পরিচালনার জন্য শাসন বিভাগীয় তথ্যের গােপনীয়তা রক্ষা বিশেষ প্রয়ােজন বলে মনে হয়। এই শাসনব্যবস্থায় তা সম্ভব হয়।
     একক শাসন কর্তৃপক্ষের বিপক্ষে কয়েকটি যুক্তির অবতারণা করা হয়-
(ক) শাসন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার অপব্যবহার করার বা স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা উপেক্ষা করা যায় না।
(খ) একজন ব্যক্তির হাতে সকল ক্ষমতা চরমভাবে কেন্দ্রীভূত হলে ক্ষমতার অপব্যবহারে ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবার আশঙ্কা থাকে।

প্রশ্ন ৩) বহুশাসন কতৃপক্ষের সংজ্ঞা দাও। এর গুণাগুণ আলােচনা করাে।
উত্তর : শাসনক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ একাধিক ব্যক্তি-সমন্বিত কোনাে সংস্থার হাতে ন্যস্ত থাকলে তাকে বহুব্যক্তিবিশিষ্ট শাসন বিভাগ বা বহুশাসন কর্তৃপক্ষ বলে অভিহিত করা যায়। ইতিহাসে বহুশাসন-কতৃপক্ষের অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স ও স্পার্টা এবং প্রাচীন রােমে একাধিক শাসন কর্তৃপক্ষের দ্বারা শাসন পরিচালনার কথা জানতে পারা যায়। বর্তমানকালে সুইজারল্যান্ড এবং সােভিয়েত ইউনিয়নের শাসন বিভাগকে একাধিক ব্যক্তি-সমন্বিত শাসন বিভাগ বলে উল্লেখ করা যেতে পারে। বহুশাসন কর্তৃপক্ষের সপক্ষে কতকগুলি যুক্তির অবতারণা করা হয়।
এই যুক্তিগুলি হল—
(i) বহুশাসন কর্তৃপক্ষ বা একাধিক ব্যক্তি-সমন্বিত শাসন বিভাগের ক্ষেত্রে শাসন ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা কম থাকে।
(ii) শাসনকার্য পরিচালনায় বহু ব্যক্তি আলাপ-আলােচনা, বিচারবিবেচনার সুযােগ থাকে বলে শাসনব্যবস্থায় উৎকর্ষ সাধিত হয়।
(iii) শাসনব্যবস্থায় জনগণের স্বাধীনতা হরণের সুযােগ থাকে না।
     বহু বা সমষ্টিগত শাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযােগ হল এই যে—
(ক) বহুজনের মধ্যে শাসন ক্ষমতা বিভক্ত হওয়ার ফলে শাসনের বলিষ্ঠতা লক্ষ করা যায় না।
(খ) তা ছাড়া জরুরি অবস্থায় বা সংকটকালে এই শাসনব্যবস্থা প্রয়ােজনীয় ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়।
(গ) শাসন পরিচালনায় অনেকের অংশগ্রহণের ফলে গােপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থাও সম্ভব হয় না।।

প্রশ্ন ৪) “পূর্ণ ক্ষমতারস্বতন্ত্রীকরণ সম্ভব নয়, কাম্যও নয়।” -ব্যাখ্যা করাে।
উত্তর : বাস্তব প্রয়ােগ সম্ভব নয়
প্রথমত, এই নীতিতে বলা আছে,—এক বিভাগের ব্যক্তি অন্য বিভাগে যাবে না। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে আইনসভার সদস্যরা শাসন বিভাগে যান। তা ছাড়া মন্ত্রীরা আইন বিভাগের সদস্য হিসাবে আইনসভায় গিয়ে বিতর্কে অংশ নেন।
দ্বিতীয়ত, এই নীতিতে বলা আছে,—এক বিভাগের কোনাে ব্যক্তি অন্য বিভাগে কাজ করবে না। কিন্তু বাস্তব ঘটনা আলাদা। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বিচার বিভাগ বিচার করতে গিয়ে আইন তৈরি করে তা ছাড়া শাসন বিভাগও আইন তৈরি করে। যেমন, আমাদের রাষ্ট্রপতি জরুরি আইন জারি করেন।
তৃতীয়ত, এই নীতিতে বলা আছে—এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। তাই দেখা যায়, আমাদের দেশে আইনসভা অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে মন্ত্রীসভাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
চতুর্থত, বেশ কিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, সরকারের কার্যাবলি তিন ভাগে বিভক্ত নয়। যেমন, গুডনাউ বলেছেন, সরকারের দুটি বিভাগ, আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ। বিচার বিভাগ শাসন বিভাগের মধ্যে পড়ে। আবার উইলােবি বলেছেন, সরকারের পাঁচটি বিভাগ আছে।

এই নীতি কাম্য নয় :

প্রথমত, সরকার একটি জীবদেহের মতাে। জীবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করতে পারে না। সেরুপ সরকারের বিভাগগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করবে—তা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক বিভাগ যদি পৃথকভাবে কাজ করার সুযােগ পায় তাহলে প্রত্যেকে কাজের খুঁত ধরতে ব্যস্ত থাকবে। অপরকে হেয় করার চেষ্টা করবে। এটি কাম্য নয়।
তৃতীয়ত, এই নীতি স্বাধীনতার একমাত্র রক্ষাকবচ নয়। স্বাধীনতার সব থেকে বড়াে রক্ষাকবচ হল জনগণের সতর্কতা। পেরিক্লিসের ভাষায় বলা যায়, “Eternal vigilance is the price of liberty” অর্থাৎ চিরন্তন সতর্কতাই স্বাধীনতার মূল্য।
চতুর্থত, এই নীতিতে বলা আছে -সরকারের তিনটি বিভাগ সমান ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগের প্রাধান্যই স্বীকৃত।
পঞ্চমত, স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করতে অষ্টদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এই মতবাদের গুরুত্ব ছিল। বর্তমানে গণতন্ত্রে এটি কাম্য নয়। কারণ, গণতন্ত্রে শাসন বিভাগের সঙ্গে আইন বিভাগের সুসম্পর্ক গড়ে তােলার উপর জোর দেওয়া হয়। অধ্যাপক গার্নার বলেছেন—দুটি বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকলে, সুশাসন গড়ে তােলা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় পূর্ণ ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রয়ােগ কাম্য নয়।

প্রশ্ন ৫) আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের কার্যাবলি আলােচনা করাে।
উত্তর : পূর্বের পুলিশি রাষ্ট্র বর্তমানে জনকল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে শাসন বিভাগের কাজের পরিধি বেড়েছে। শাসন বিভাগের কাজকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করে আলােচনা করা যায় :
(ক) অভ্যন্তরীণ শাসন সংক্রান্ত কাজ
রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা শাসন বিভাগের প্রধান কাজ। এই কাজের মধ্যে পড়ে রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা, কর্মচারীদের নিয়ােগ, বদলি ও তাদের জন্য নিয়মকানুন প্রস্তুত প্রভৃতি।
(খ) পররাষ্ট্র সংক্রান্ত কাজ
পররাষ্ট্র সংক্রান্ত কাজ শাসন বিভাগের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। পররাষ্ট্র সংক্রান্ত কাজ বলতে, অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধি ও চুক্তি করা, অন্য রাষ্ট্রে কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠানাে, অন্য রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে গ্রহণ করা প্রভৃতি।
(গ) আইন সংক্রান্ত কাজ
শাসন বিভাগ আইন প্রণয়নের কাজ করে থাকে। মন্ত্রীসভা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীরাই আইনসভায় গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন করেন এবং বিলের সপক্ষে বক্তব্য রাখেন। আবার শাসন বিভাগ সম্মতি না দিলে কোনাে বিল আইনে পরিণত হতে পারে না।
(ঘ) অর্থসংক্রান্ত কাজ
শাসন বিভাগ অর্থসংক্রান্ত কাজও করে থাকে। কোন্ খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, কোন্ নীতিতে কর ধার্য করা হবে, তা নির্ধারণ করে শাসন বিভাগ। বাজেট তৈরি করে শাসন বিভাগের অর্থমন্ত্রী। ঋণ গ্রহণের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেয় শাসন বিভাগ।
(ঙ) বিচার সংক্রান্ত কাজ
শাসন বিভাগ বিচার সংক্রান্ত কাজও করে থাকে। বর্তমানে শাসন বিভাগ বিভিন্ন ধরনের বিচার সংক্রান্ত কাজ করে থাকে। বেশির ভাগ দেশে শাসন বিভাগের প্রধান উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নিয়ােগ করেন। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ােগ করেন। আবার শাসক প্রধান দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা প্রদর্শন বা দণ্ডমুকুব বা দণ্ড হ্রাস করতে পারেন।
(চ) নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত কাজ
শাসন বিভাগের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল নীতি নির্ধারণ করা। ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা এই নীতি নির্ধারণ করে।

প্রশ্ন ৬) দ্বিকক্ষ সমন্বিত আইনসভার সপক্ষে মতামত দাও।
উত্তর : (ক) আকস্মিক বা ভাবাবেগপ্রসূত আইন প্রণয়ন রদ করে
আইনসভার দুটি কক্ষ থাকলে জাতীয় স্বার্থের অনুপন্থী আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়। এককক্ষ ব্যবস্থায় সকল বিষয়ে বিস্তৃত ও সুচিন্তিত আলােচনা সম্ভব হয় না। অবিবেচনাপ্রসূত আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা থেকে যায়।
(খ) এককক্ষের স্বৈরাচারী মনােভাব রদ করে
অধ্যাপক ব্রাইস (Lord Bryce)-এর মতে, আইনসভার অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তি হল অসংযমী ও স্বৈরাচারী হওয়া। আইনসভা এককক্ষ বিশিষ্ট হলে স্বৈরাচারী ও নীতিভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অধিক হয়। দুটি কক্ষ একে অপরের স্বৈরাচারী মনােভাবকে সংযত রাখতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় দুটি কক্ষের বিশেষ প্রয়ােজন।
(গ) জনমতের সুষ্ঠু প্রতিফলন হয়
আইনসভার দটি কক্ষ থাকলে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন সম্ভব হয়। একটি কক্ষ থাকলে এবং একই সময়ে সদস্যগণ নির্বাচিত হলে ওই নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে জনমতের পরিবর্তন আইনসভায় প্রতিফলিত হতে পারে না। দুটি কক্ষ থাকলে তাদের গঠন পদ্ধতি ও নির্বাচন বিভিন্ন হয়।
(ঘ) সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব সম্ভব
দ্বিকক্ষ ব্যবস্থায় সমাজের সকল  শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব সম্ভব হয়। এককক্ষবিশিষ্ট আইন সভায় প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতির  মাধ্যমে সকল শ্রেণির উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব সম্ভব হয় না।
(ঙ) কর্মধারার সম্প্রসারণ দ্বিকক্ষ ব্যবস্থাকে সমর্থন করে
বর্তমান যুগে রাষ্ট্রের কর্মধারা বিচিত্র ও বহুধা বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। আইনসভার কাজও বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি কক্ষের মাধ্যমে তাই সমস্ত কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। সেজন্য দুটি কক্ষের প্রয়ােজন হয়।
(চ) যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় কক্ষ বিশেষ প্রয়ােজন
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় জাতীয় (National) স্বার্থ ও আঞ্চলিক (regional) স্বার্থের সমন্বয়সাধন করা হয়। জনসংখ্যার ভিত্তিতে গঠিত, নিম্নকক্ষে জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিগণ এবং অঙ্গরাজ্যের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় কক্ষ যথার্থ সমন্বয়সাধন করতে পারে।

প্রশ্ন ৭) দ্বিকক্ষ সমন্বিত আইনসভার বিপক্ষে যুক্তি দেখাও।
উত্তর : (ক) গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিফলন হয় না : গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আইন বিভিন্ন ধারায় প্রকাশ হতে পারে না। গণতন্ত্রে দু-মুখো কথা বলতে পারে না। আইন হল জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ ও সমাজের দর্পণ। গণতন্ত্রে সফলতার জন্যে তাই প্রয়ােজন আইনসভার ঐক্য। ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ‘বিপরীতমুখী গতি সম্পন্ন অশ্ব ও অশ্বয়ানের মতাে।’
(খ) প্রতিক্রিয়ার দুর্গ হয়ে দাঁড়ায় : দ্বিতীয় কক্ষ বিভিন্ন শ্রেণি ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে সাধারণ স্বার্থ উপেক্ষিত হয়ে শ্রেণিস্বার্থ রক্ষিত হয়। অনেকে বলেন দ্বিতীয় কক্ষ প্রতিক্রিয়ার দুর্গবিশেষ হয়ে দাঁড়ায়।
(গ) অগণতান্ত্রিক গঠন : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনসভা জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে—এটি অন্যতম মৌল গণতান্ত্রিক নিয়ম। কিন্তু দ্বিতীয় কক্ষের আইনসভায় লক্ষ করা যায় যে, সমাজের বিত্তশালী, রক্ষণশীল ও মনােনীত ব্যক্তিরাই এতে সদস্য হওয়ার সুযােগ লাভ করেন।
(ঘ) বর্তমানে আকস্মিক আইন প্রণয়ন সম্ভব নয় : অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে, বর্তমানে আইন প্রণয়নের যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাতে আকস্মিকভাবে বা অবিবেচনাপ্রসূত আইন প্রণয়ন সম্ভব না। প্রতিটি আইনের খসড়া বিল আলােচনার সময় সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণের অবগতির জন্যে প্রকাশিত হয়।
(ঙ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণ : সংখ্যালঘু স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে দ্বিতীয় কক্ষের প্রয়ােজন বলা হয়। এর উত্তরে বলা যায় যে, সংখ্যালঘু স্বার্থ রক্ষার জন্যে দ্বিতীয় করে প্রয়ােজন নেই। দেশের সংবিধান ও আইনে নানাভাবে সংখ্যালঘু স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। দ্বিতীয় কক্ষ সংস্কারকার্যে বিলম্ব ঘটিয়ে কায়েমি স্বার্থের পৃষ্ঠপােষকতা করে মাত্র।
(চ) যুক্তরাষ্ট্রেও অপরিহার্য নয় : যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দ্বিতীয় কক্ষের অপরিহার্যতার কথা অনেকে স্বীকার করেন না। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। সংবিধানের প্রাধান্যের জন্যেই আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে।

প্রশ্ন ৮) আমলাতন্ত্র বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শাসন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত বিরাট সংখ্যক সরকারি কর্মচারী নীতি ও কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপায়িত করেন। এরা রাষ্ট্রকৃত্যকের (Civil Service) সদস্য বলে গণ্য। এই স্থায়ী কর্মচারীগণ ‘আমলা’ বলে পরিচিত। বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ‘আমলাতন্ত্র বা Bureaucracy নিন্দাসূচক অর্থে ব্যবহার করা হলেও শাসন পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ‘আমলাতন্ত্র’ বা ইংরেজি Bureaucracy’ কথাটি ফরাসি ব্যুরাে (Bureau) থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ডেস্ক বা লেখার টেবিল। সুতরাং, আক্ষরিক অর্থ হল ‘টেবিল শাসনব্যবস্থা’ (desk Government)। পরবর্তী সময়ে ব্যুরাে কথাটি এক-একটি দপ্তর হিসাবে গৃহীত হয় এবং সহজ ভাষায় আমলাতন্ত্র বলতে বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা বােঝায়। আব্রাহাম লিঙ্কন প্রদত্ত গণতয়ের বিখ্যাত সংজ্ঞাটি অনুসরণে বলা হয় ‘আমলাতন্ত্র হ’ল বিভিন্ন দপ্তর দ্বারা দপ্তরের স্বার্থে দপ্তরের শাসনব্যবস্থা। অধ্যাপক ফাইনার (H. Finer) বলেছেন, ‘স্থায়ী, অভিজ্ঞ ও বেতনভুক কর্মচারীগণের দ্বারা পরিচালিত প্রশাসন ব্যবস্থা হল আমলাতন্ত্র।’ অধ্যাপক গার্নার (Garner) বলেছেন, “আমলাতন্ত্র বলতে এমন এক শাসনব্যবস্থা বােঝায় যেখানে সরকারের কার্যাবলি প্রধানত বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে সম্পাদিত হয় এবং দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে উল্লেখযােগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। মার্কসের মতে,—“রাষ্ট্রের সারবস্তু ও আত্মিক সমাজের আত্মিক সত্তা আমলাতন্ত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতাে নিয়ন্ত্রণ করে।”

প্রশ্ন ৯) আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) আমলাতন্ত্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল—(ক) প্রত্যেক কর্মচারীর ওপর নির্দিষ্ট দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। (খ) প্রত্যেক কর্মচারী যাতে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন, তার জন্যে কর্তৃত্বের বণ্টন, (গ) স্থায়ীভাবে এবং নিয়মিত দায়িত্ব পালনের জন্যে সুস্পষ্ট নিয়মকানুনের প্রবর্তন, (ঘ) বিভিন্ন স্তরে বিখ্যাত সরকারি কর্মচারীগণের পিরামিড সদৃশ সংগঠন এবং (ঙ) সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত, কার্যাবলি লিখিতভাবে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা। ওয়েবার (Weber) বলেছেন, স্থায়িত্ব, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ও নিয়মনিষ্ঠার মাপকাঠিতে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা অন্য শাসনব্যবস্থা অপেক্ষা অধিক উৎকর্ষের দাবি করতে পারে।

প্রশ্ন ১০) সরকারের তৃতীয় অঙ্গ হিসাবে বিচার বিভাগের গুরুত্ব আলােচনা করাে।
উত্তর : সরকারের তৃতীয় অঙ্গ হল বিচার বিভাগ। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিচার বিভাগের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়। অধ্যাপক ল্যাস্কি (Harold Laski) বলেছেন, কোনাে জাতীয় রাষ্ট্রের বিচার পরিচালনা পদ্ধতির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক প্রকৃতি উপলব্ধি করা যায়। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, ব্যক্তির সঙ্গে সরকারের বিরােধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার
শ্রেষ্ঠ সংস্থা হল বিচারালয়। লর্ড ব্রাইস (Lord James Bryce) এর মতে, বিচার বিভাগের কর্মকুশলতাই পরকারের যােগ্যতা বিচারের উপযুক্ত মানদণ্ড। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের নিরিখে বিচার করা এবং আইন অনুযায়ী উপযুক্ত দণ্ড বিধানের দায়িত্ব বিচার বিভাগের। ন্যায়বিচারের অভাব ঘটলে এবং জনগণের মনে বিচার বিভাগের ওপর আস্থার অভাব হলে রাষ্ট্রের বিপর্যয় দেখা দেবে।
     রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকগণের মধ্যে অনেকে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিরপেক্ষ বলে মনে করেন না। বিচার বিভাগ রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অঙ্গ। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার ওপর যে প্রাধান্য আরােপ করা হয়, অধ্যাপক অ্যালান বল (Alan R. Ball) তাকে ‘আধা অলীক’ (Semi-fiction) বলে মনে করেন। মার্কসীয় দৃষ্টিতে বিচার বিভাগও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি অনুযায়ী ভূমিকা পালন করে। শ্রেণি বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় আইন শ্রেণিস্বার্থের রক্ষক হয়ে পড়ে এবং বিচার বিভাগও সেই আইনের প্রেক্ষিতে বিচার সম্পাদন করে। চিন, ভিয়েতনাম, কিউবা প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের পৃথক গুরুত্ব স্বীকার করা হয় ​না।

প্রশ্ন ১১) আধুনিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগের কার্যাবলি বর্ণনা করাে।
উত্তর : বর্তমানে বিশ্বে সরকারের আইনসভার গুরুত্ব সবাই স্বীকার করেন। ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত প্রভৃতি দেশে আইনসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর কার্যাবলি নিম্নরূপ :
(ক)আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কাজ
আইনসভার মূল কাজ হল, আইন তৈরি করা। আইনের অন্যান্য উৎসগুলির গুরুত্ব কমে যাওয়ার ফলে আইনসভা আইন প্রণয়নের মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনসভা নতুন আইন তৈরি করে এবং পুরাতন আইনকে সংশােধন করে সময়ের উপযােগী করে তােলে।
(খ) শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাজ
আইন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল,—শাসন বিভাগ তৈরি করা এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যেমন, ভারতের আইনসভা মন্ত্রীসভাকে তৈরি করে। মন্ত্রীসভার প্রতিটি সদস্যকে পার্লামেন্টের সদস্য হতে হয়। শুধু তাই নয়, মন্ত্রীপরিষদকে তাদের কাজের জন্য পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
(গ) বিচার সংক্রান্ত কাজ
আইন বিভাগ বেশ কিছু বিচার সংক্রান্ত কাজ করে। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রপতি সংবিধান লঙ্ঘন করলে পার্লামেন্ট ইমপিচমেন্টের মাধ্যমে বিচার করে তাকে অপসারিত করতে পারে।
(ঘ) সংবিধান সংশােধন সংক্রান্ত কাজ
আইনসভার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল—সংবিধান সংশােধন করা। আইনসভা এককভাবে অথবা অন্যের সহযােগিতায় এই কাজ করে থাকে। যেমন, ব্রিটেনে আইনসভা একাই সংবিধান সংশােধন করতে পারে। ভারতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট একা সংবিধান সংশােধন করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যের সম্মতি লাগে।
(ঙ) অর্থ সংক্রান্ত কাজ
আইনসভার অনুমােদন ছাড়া সরকার কোনাে অর্থ ব্যয় করতে পারে না। আর্থিক বছরের শুরুতে আইনসভা বাজেট অনুমােদন করে। আবার অর্থ ঠিকমতাে খরচ হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে আইনসভায় বিভিন্ন কমিটি গঠিত হয়। যেমন, সরকারি হিসাব কমিটি, আনুমানিক ব্যয় কমিটি প্রভৃতি।
(চ) নির্বাচন সংক্রান্ত কাজ
আইনসভা কিছু কিছু নির্বাচন সংক্রান্ত কাজ করে থাকে। যেমন, রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচনে ভারতের পার্লামেন্ট অংশগ্রহণ করে।

প্রশ্ন ১২) আধুনিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের কার্যাবলি বর্ণনা করাে।
উত্তর : (ক) আইনের ব্যাখ্যা করে
আইন কর্তৃক প্রণীত আইনের মধ্যে অস্পষ্টতা থাকলে, বিচার বিভাগ তা ব্যাখ্যা করে অস্পষ্টতা দূর করে। শুধু তাই নয়, সেই আইন ঠিকমত পালিত হচ্ছে কিনা বিচার বিভাগ তা লক্ষ রাখে।
(খ) বিরােধের মীমাংসা করে
ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বা রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে, রাষ্ট্রের আইন অনুসারে বিচার বিভাগ তার মীমাংসা করে। এর মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে বিচার বিভাগ।
(গ) আইন তৈরি করে
দেশের প্রচলিত আইন দিয়ে সব সময় বিরােধের মীমাংসা করা যায় না। অনেক সময় বিচারকরা নিজেদের বিচারবুদ্ধি ও ন্যায়নীতি অনুসারে তার মীমাংসা করে। এই মীমাংসার ক্ষেত্রে বিচারকরা যে রায় দেন দেন সেটি ভবিষ্যতে বিচারের কাজে আইন হিসেবে গণ্য হয়।
(ঘ) অধিকার সংরক্ষণ করে
বিচার বিভাগ জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে। লিখিত সংবিধানে সাধারণত মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ থাকে। বিচার বিভাগকে সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
(ঙ) পরামর্শ দেয়
ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে বিচার বিভাগ শাসন বিভাগকে পরামর্শ দেয়। যেমন, ভারতে, “কেরালা শিক্ষা বিল” সম্পর্কে সুপ্রিমকোর্ট রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়েছিল।
(চ) সংবিধানের ব্যাখ্যা করে
বিচার বিভাগকে সংবিধানের অভিভাবক বলা হয়। সংবিধানের কোনাে শব্দ বা বাক্যের মধ্যে যদি কোনাে অস্পষ্টতা থাকে, তাহলে বিচার বিভাগ অভিভাবক হিসাবে যে ব্যাখ্যা দেবে সেটি হবে চূড়ান্ত। আবার, কোনাে আইন যদি সংবিধান বিরােধী হয়, তাহলে বিচার বিভাগ তাকে অবৈধ বলে বাতিল করতে পারে।
(ছ) যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামাে বজায় রাখে
যুক্তরাষ্ট্রে দু-ধরনের সরকার থাকে,—কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার। সংবিধান দ্বারা উভয়ের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রত্যেকে যাতে নিজ এক্তিয়ারের মধ্যে কাজ করে তা লক্ষ রাখার অধিকার বিচার বিভাগের রয়েছে।
(জ) অন্যান্য কাজ
এ ছাড়াও বিচার বিভাগ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। এর মধ্যে আছে কর্মচারী নিয়ােগ, লাইসেন্স দেওয়া, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি দেখাশােনা করা প্রভৃতি।

প্রশ্ন ১৩) আইন বিভাগ কীভাবে শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রিত করে?
উত্তর : পার্লামেন্টীয় ব্যবস্থায় শাসন বিভাগকে গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে আইন বিভাগ কার্যকারী ভূমিকা গ্রহণ করে। পার্লামেন্টীয় ব্যবস্থার রীতি অনুযায়ী মন্ত্রীপরিষদ যাবতীয় কার্যের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ও যৌথভাবে পার্লামেন্টের প্রতি দায়িত্বশীল থাকেন। পার্লামেন্ট বা আইন বিভাগ প্রশ্ন, আলােচনা, প্রস্তাব ইত্যাদির মাধ্যমে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় আইন বিভাগের এই ভূমিকা থাকে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় আইন বিভাগ শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে না।
     এ ছাড়া আইনসভা অনেক সময় রাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিয়ােগ করে, সন্ধি বা চুক্তি অনুমোদন করে এবং যুদ্ধ ঘােষণা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি সেনেটের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিয়ােগ করেন। মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ ঘােষণা করা যায় না।
     গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগ জনগণের অর্থকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাষ্ট্রের মধ্যে কর ধার্য, কর সংগ্রহ, আয় বা ব্যয়ের জন্য আইনসভার অনুমােদন প্রশ্নে ব্রিটেন ও ভারতে আইন সভার সরকারি আয় ও ব্যয়ের প্রশ্নে নিয়ন্ত্রণ আরােপ করে।

প্রশ্ন ১৪) আধুনিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা কীভাবে রক্ষা করা যায়?
উত্তর : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ হল প্রধান স্তম্ভ। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ ও অন্যান্য প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা প্রয়ােজন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য কয়েকটি শর্তের উপর গুরুত্ব আরােপ করেন।
প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যােগ্য বিচারপতি প্রয়ােজন। শিক্ষাগত দিক থেকে বিচারপতিকে আইনজ্ঞ হতে হবে এবং সৎ, সাহসী ও নিষ্ঠাবান হওয়া প্রয়ােজন।
দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেকাংশে বিচারপতিকে নিয়ােগ পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে বিচারপতি নিয়ােগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ নির্বাচন, আইনসভা দ্বারা নির্বাচন এবং শাসন বিভাগ কর্তৃক নিয়ােগের পদ্ধতি লক্ষ করা যায়।
তৃতীয়ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য বিচারপতিদের কার্যকালের স্থায়িত্ব প্রয়ােজন। বিচারপতিদের কার্যকালের স্থায়িত্ব না থাকলে ন্যায়বিচার উপেক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চতুর্থত, বিচারপতিদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত বেতন প্রয়ােজন। নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে বিচারপতিগণকে অর্থনৈতিক অভাব থেকে মুক্ত করা প্রয়ােজন।
পঞ্চমত, ফরাসি চিন্তাবিদ মন্তেস্কু বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণের উপর গুরুত্ব আরােপ করেছেন।
     বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য এই সমস্ত শর্তগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অধ্যাপক ল্যাস্কি মন্তব্য করেন যে, প্রতিটি দেশেই বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠিত সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করে থাকে।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণনীতি ব্যাখ্যা করাে। “পূর্ণ ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ সম্ভব নয়, কাম্যও নয়।” ব্যাখ্যা করাে।
উত্তর : অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ব্যক্তিস্বাধীনতার রক্ষাকবচ হিসাবে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির জন্ম হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন, দলীয় ব্যবস্থার উদ্ভব, কল্যাণকর রাষ্ট্রের ধারণা প্রভৃতি কারণে এই নীতির প্রভাব কিছুটা কমেছে। কিন্তু একেবারে মূল্যহীন হয়ে যায় নি।
এই নীতির অর্থ :
আধুনিক রাষ্ট্রের সরকারের কাজগুলিকে সাধারণভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, (i) আইন সংক্রান্ত কাজ, (ii) শাসন সংক্রান্ত কাজ এবং (iii) বিচার সংক্রান্ত কাজ। এই তিন ধরনের কাজ করার জন্যে সরকারের তিনটি বিভাগ আছে, (i) আইন বিভাগ, (ii) শাসন বিভাগ এবং (iii) বিচার বিভাগ।
ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির মূল বক্তব্য হল-
এই তিনটি বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বলতে তিনটি অর্থ বােঝায় ? (i) এক বিভাগের কোনাে ব্যক্তি অপর বিভাগে যাবে না। (ii) এক বিভাগ অন্য বিভাগের কাজ করবে না। এবং (iii) এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
এই নীতির সুবিধা :
প্রথমত, সরকারের প্রত্যেক বিভাগ যদি স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার সুযােগ পায়, তাহলে প্রতিটি বিভাগ নিজের দক্ষতার পূর্ণবিকাশ ঘটিয়ে কাজ করতে সক্ষম হবে।
দ্বিতীয়ত, এই নীতি কার্যকর হলে ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা পাবে। কারণ, ম্যাডিসন (Madison) বলেছেন,—“একই হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করাকে স্বেচ্ছাচারিতার সংজ্ঞা বলা যায়।” সরকার স্বেচ্ছাচারী হলে ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে না।
তৃতীয়ত, এই নীতি রূপায়িত হলে প্রতিটি বিভাগের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট হবে। ফলে তাদের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
সমালােচনা
ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি দু-দিক থেকে সমালােচিত হয়েছে—(ক) এই নীতির বাস্তবে প্রয়ােগ করা যায় না এবং (খ) এই নীতি কাম্য নয়।
(ক) বাস্তব প্রয়ােগ সম্ভব নয়
প্রথমত, এই নীতিতে বলা আছে—এক বিভাগের ব্যক্তি অন্য বিভাগে যাবে না। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। ভারত, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে আইনসভার সদস্যরা শাসন বিভাগে যান। তা ছাড়া মন্ত্রীরা আইন বিভাগের সদস্য হিসাবে আইনসভায় গিয়ে বিতর্কে অংশ নেন।
দ্বিতীয়ত, এই নীতিতে বলা আছে,—এক বিভাগের কোনাে ব্যক্তি অন্য বিভাগের কাজ করবে। কিন্তু বাস্তব ঘটনা আলাদা। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বিচার বিভাগ বিচার করতে গিয়ে আইন তৈরি করে। তা ছাড়া শাসন বিভাগও আইন তৈরি করে। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রপতি জরুরি আইন জারি করেন।
তৃতীয়ত, এই নীতিতে বলা আছে,—এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভজ্জ নয়। তাই দেখা যায় ভারতের আইনসভা অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে মন্ত্রীসভাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
চতুর্থত, বেশ কিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, সরকারের কার্যাবলি তিন ভাগে বিভক্ত নয়। যেমন, গুডনাউ বলেছেন, সরকারের দুটি বিভাগ—আইন বিভাগ এবং শাসন বিভাগ। বিচার বিভাগ শাসনবিভাগের মধ্যে পড়ে। আবার উইলােবি বলেছেন, সরকারের পাঁচটি বিভাগ আছে।
এই নীতি কাম্য নয় :
প্রথমত,
সরকার একটি জীবদেহের মতাে। জীবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করতে পারে না। সেরুপ সরকারের বিভাগগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করবে—তা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক বিভাগ যদি পৃথকভাবে কাজ করার সুযােগ পায়, তাহলে প্রত্যেকে কাজের খুঁত ধরতে ব্যস্ত থাকবে। অপরকে হেয় করার চেষ্টা করবে—এটি কাম্য নয়।
তৃতীয়ত, এই নীতি স্বাধীনতার একমাত্র রক্ষাকবচ নয়। স্বাধীনতার সব থেকে বড়াে রক্ষাকবচ হল জনগণের সতর্কতা। গ্রিক দার্শনিক পেরিক্লিসের ভাষায় বলা যায়,—“Eternal vigilance is the price of liberty” অর্থাৎ চিরন্তন সতর্কতাই স্বাধীনতার মূল্য।
চতুর্থত, এই নীতিতে বলা আছে,—সরকারের তিনটি বিভাগ সমান ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগের প্রাধান্যই স্বীকৃত।
পঞ্চমত, স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এই মতবাদের গুরুত্ব ছিল। বর্তমানে গণতন্ত্রে এটি কাম্য নয়। কারণ, গণতন্ত্রে শাসন বিভাগের সঙ্গে আইনবিভাগের সুসম্পর্ক গড়ে তােলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সমালােচনা
বর্তমানে এই নীতির প্রয়ােগ সম্ভব নয়, কাম্যও নয়। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই নীতি স্বীকৃত হলেও কার্যত সেখানে একটি বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেমন, রাষ্ট্রপতি চাকরি দিয়ে বা বাণী পাঠিয়ে আইনসভাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আইনসভারসম্মতি না নিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধি বা চুক্তিকে কার্যকর করতে পারেন না।
মূল্যায়ন
সমালােচিত হলেও এই নীতির কিছুটা মূল্য আছে। কাজের সুবিধার জন্য তিনটি বিভাগের পৃথকীকরণ প্রয়ােজন। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র রক্ষা একান্ত প্রয়ােজন। প্রায় সব দেশে এটি স্বীকৃত। তবে সুশাসনের স্বার্থে শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ পৃথক থাকলেও, উভয়ের মধ্যে সহযােগিতার সম্পর্ক একান্ত অপরিহার্য।

প্রশ্ন ২) আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন বিভাগের কার্যাবলি আলােচনা করাে।
উত্তর : পূর্বের পুলিশি রাষ্ট্র বর্তমানে জনকল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে শাসন বিভাগের কাজের পরিধি বেড়েছে। শাসন বিভাগের কাজকে নিম্নলিখিতভাবে ভাগে ভাগ করে আলােচনা করা যায়।
(ক) শাসন পরিচালনা
রাষ্ট্রে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা শাসন বিভাগের অন্যতম কাজ। এর জন্য রাষ্ট্রের পুলিশবাহিনী আছে। তার নাম “স্বরাষ্ট্র দপ্তর”। কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। আইন বিভাগ যে আইন প্রণয়ন করে তা যথাযথ প্রয়ােগ করে শাসন বিভাগ। সরকারি কর্মচারীদের চাকুরির নিয়মাবলি প্রণয়ন করে শাসন বিভাগ।
(খ) পররাষ্ট্র সংক্রান্ত কাজ
বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে শাসন বিভাগকে নীতি নির্ধারণ করতে হয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনার মাধ্যমে সেই নীতিকে কার্যকর করতে হয়। বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক প্রতিনিধি প্রেরণ, চুক্তি সম্পাদন ইত্যাদি কাজ শাসন বিভাগ করে থাকে। এর জন্য যে বিশেষ দপ্তর থাকেতাকে বলে পররাষ্ট্র দপ্তর।
(গ) বহিঃশত্রুর আক্রমণ রােধ
রাষ্ট্রকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা শাসন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেনাবাহিনী পরিচালনা, যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যুদ্ধের সময় ব্যবস্থা গ্রহণ, এই সবই শাসন বিভাগকে করতে হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন শাসক প্রধান। তিনিই সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক।
(ঘ) আইনমূলক কাজ
আইন প্রণয়নের দায়িত্ব আইনসভার ওপর ন্যস্ত হলেও, শাসন বিভাগকে আইন প্রণয়নের কাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। প্রয়ােজনে শাসন বিভাগের প্রধান হিসাবে রাষ্ট্রপতি বিশেষ আইন (Ordinance) জারি করতে পারেন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় শাসন ও আইন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা-স্বতন্ত্রীকরণ হয় না বলে শাসন বিভাগের পরিচালকরা আইন প্রণয়নেও অংশ নিতে পারে। আইনসভা প্রণীত বিলে শাসক প্রধান রাষ্ট্রপতিকে স্বাক্ষর করতে হয়।
(ঙ) আর্থিক কাজ
শাসন বিভাগকে আর্থিক কাজও করতে হয়। কর আদায়, সরকারের আয়ের ব্যবস্থা করা, আইনসভার অনুমােদন অনুসারে ব্যয় নির্বাহ, হিসাব পরীক্ষা ইত্যাদি কাজ শাসন বিভাগকে করতে হয়। শাসন বিভাগের অর্থ দপ্তর এই কাজ করে থাকে।
(চ) বিচারমূলক কাজ
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারপতিদের নিয়ােগ করে শাসন বিভাগ। তাদের পদোন্নতি, বদলি প্রভৃতি কাজও শাসন বিভাগ করে থাকে। বহু দেশে সরকারি কর্মচারীদের বিচারের জন্য প্রশাসনিক বিচারব্যবস্থাও আছে। শাসন বিভাগ এটি পরিচালনা করে।
(ছ) বিবিধ কাজ
এই কাজগুলি ছাড়াও শাসন বিভাগকে জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা ও জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয়। কোনাে শিল্পকে জাতীয়করণ করলে তার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া, দ্রুত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার রূপায়ণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শাসন বিভাগকে করতে হয়। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করা শাসন বিভাগের কাজ। কাজের ক্ষেত্র যত সম্প্রসারিত হচ্ছে, শাসন বিভাগের ক্ষমতাও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মূল্যায়ন
বর্তমানে কল্যাণকর রাষ্ট্রের পটভূমিতে রাষ্ট্রের কর্মপরিধি যতই বাড়ছে, শাসন বিভাগের কর্মক্ষেত্রও সমভাবে প্রসারিত হয়েছে। কেবলমাত্র শাসন সংক্রান্ত কাজে নয়, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও আইন বিভাগের ক্ষমতার অনেকটা শাসন বিভাগে চলে আসছে। তাই অধ্যাপক গেটেল বলেছেন,—“অদূর ভবিষ্যতে যতই রাজনীতির ক্ষেত্র পরিবর্তন হবে, ততই শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।”

প্রশ্ন ৩) আধুনিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগের কার্যাবলি আলােচনা করাে।
উত্তর : বর্তমান বিশ্বে আইনসভার গুরুত্ব সকলেই স্বীকার করেন। ব্রিটেন এবং ভারতের মতাে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনসভার যেমন প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত, তেমনি গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের মতাে সমাজতন্ত্রী দেশেও আইনসভাই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। এই ক্ষমতার বলে আইনসভাআইন তৈরি ছাড়াও বিভিন্ন রকমের কাজ করতে থাকে। সেগুলি নিম্নলিখিতভাবে আলােচনা করা যেতে পারে :
(ক) আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কাজ
আইনসভার প্রধান কাজ হল,—আইন তৈরি করা। আইনের অন্যান্য উৎসগুলির গুরুত্ব কমে যাওয়ার ফলে আইনসভা আইন প্রণয়নের মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনসভা নতুন আইন তৈরি করে এবং পুরাতন আইনকে সংশােধন করে সময়ের উপযােগী করে তােলে।
(খ) শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাজ
আইন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল,—শাসন বিভাগ তৈরি করা এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যেমন, ভারতের আইনসভা মন্ত্রীসভাকে তৈরি করে। মন্ত্রীসভার প্রতিটি সদস্যকে মন্ত্রী পরিষদকে তাদের কাজের জন্য পার্লামেন্টের নিকট জবাবদিহি করতে হয়।
(গ) বিচার সংক্রান্ত কাজ
আইন বিভাগ বেশ কিছু বিচার সংক্রান্ত কাজ করে। যেমন, ব্রিটেনের আইনসভা সর্বোচ্চ আদালত হিসাবে কার্য সম্পাদন করে। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রপতি সংবিধান লঙ্ঘন করলে পার্লামেন্ট ইমপিচমেন্টের মাধ্যমে বিচার করে। তাঁকে অপসারিত করে। আবার কিছু দেশে বিচারপতিরা আইনসভার দ্বারা নির্বাচিত হয়ে থাকেন।
(ঘ) সংবিধান সংশােধন সংক্রান্ত কাজ
আইনসভার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল,—সংবিধান সংশােধন করা। আইনসভা এককভাবে অথবা অন্যের সহযােগিতায় এই কাজ করে থাকে। যেমন, ব্রিটেনে আইনসভা একাই সংবিধান সংশােধন করতে পারে। ভারতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট একা সংবিধান সংশােধন করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যের সম্মতি লাগে।
(ঙ) অর্থ সংক্রান্ত কাজ
আইনসভার অনুমােদন ছাড়া সরকার কোনাে অর্থ ব্যয় করতে পারে না। আর্থিক বছরের শুরুতে আইনসভা বাজেট অনুমােদন করে। আবার অর্থ ঠিকমতাে খরচ হচ্ছে কি না তার পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইনসভায় বিভিন্ন কমিটি গঠিত হয়। যেমন, সরকারি হিসাব কমিটি, আনুমানিক ব্যয় কমিটি প্রভৃতি।
(চ) নির্বাচন সংক্রান্ত কাজআইনসভা কিছু কিছু নির্বাচন সংক্রান্ত কাজ করে থাকে। যেমন, রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভারতের পার্লামেন্ট অংশগ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট সংখ্যক ভােট পেলে, আইনসভা রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করে।
মূল্যায়ন
তত্ত্বগতভাবে আইনসভা ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু বাস্তবে এর ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে, ফলে শাসন বিভাগ শক্তিশালী হচ্ছে। যেমন, ব্রিটেনে “ক্যাবিনেটের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পার্লামেন্ট রবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা, আইনের জটিলতা প্রভৃতি কারণে আইনসভার হাত থেকে ক্ষমতা সরে গিয়ে শাসন বিভাগের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

প্রশ্ন ৪) দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তিগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল আইন প্রণয়ন করা। আইন প্রণয়ন করার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রে আইনসভা তৈরি হয়েছে। আইনসভা একটি কক্ষ বা দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত হতে পারে। যে আইনসভা একটি কক্ষ নিয়ে গঠিত হয় তাকে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বলা হয়। অপরদিকে যে আইনসভা দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত হয় তাকে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা বলা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী চিন, গ্রিস, তুরস্ক, রােমানিয়া প্রভৃতি দেশের আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট। অন্যদিকে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ভারত প্রভৃতি দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা আছে।
পক্ষে যুক্তি
(ক) সুবিবেচনা সম্ভব
আইনসভার দুটি কক্ষ থাকলে জাতীয় স্বার্থের উপযােগী আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়। এক-কক্ষ ব্যবস্থায় সকল বিষয়ে বিস্তৃত ও সুচিন্তিত আলােচনা সম্ভব হয় না। অবিবেচনাপ্রসূত আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা থেকে যায়।
(খ) স্বৈরাচারিতারােধ
অধ্যাপক ব্রাইস-এর মতে আইনসভার অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তি হল অসংযমী ও স্বৈরাচারী হওয়া। আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট হলে স্বৈরাচারী ও নীতিভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অধিক হয়। দুটি কক্ষ একে অপরের স্বৈরাচারী মনােভাবকে সংযত রাখতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় দুটি কক্ষের বিশেষ প্রয়ােজন।
(গ) জনমতের প্রতিফলন
আইনসভায় দুটি কক্ষ থাকলে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন সম্ভব হয়। একটি কক্ষ থাকলে এবং একই সময়ে সদস্যগণ নির্বাচিত হলে ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জনমতের পরিবর্তন আইনসভায় প্রতিফলিত হতে পারে না। দুটি কক্ষ থাকলে তাদের গঠনপদ্ধতি ও নির্বাচন বিভিন্ন হয়।
(ঘ) সকল শ্রেণির প্রতিনিধি
দ্বিকক্ষ ব্যবস্থায় সমাজের সকল শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব সম্ভব হয়। এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভায় প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে সকল শ্রেণির উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব সম্ভব হয় না।
(ঙ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়ােজনীয়তা
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্বার্থের সমন্বয়সাধন করা হয়। জনসমর্থনের ভিত্তিতে গঠিত, নিম্নকক্ষে জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিগণ এবং অঙ্গরাজ্যের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় কক্ষ যথার্থ সমন্বয়সাধন করতে পারে।
(চ) সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা
গণতন্ত্রের স্বার্থে আইনসভায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি থাকা একান্ত প্রয়ােজন। নিম্নকক্ষে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে অনেক সময় তা সম্ভব হয় না। উচ্চকক্ষ থাকলে রাষ্ট্রপতি মনােনয়নের মাধ্যমে প্রতিনিধি পাঠানাের ব্যবস্থা করে থাকে।

বিপক্ষে যুক্তি
(ক) গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিফলন হয় না
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইন বিভিন্ন ধারায় প্রকাশ হতে পারে না। গণতন্ত্র দু-মুখাে কথা বলতে পারে না। আইন হল জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ ও সমাজের দর্পণ। গণতন্ত্রে সফলতার জন্যে প্রয়ােজন আইনসভার ঐক্য। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কাম্য নয়।
(খ) অগণতান্ত্রিক গঠন
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনসভা জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে—এটি অন্যতম মৌল গণতান্ত্রিক নিয়ম। কিন্তু দ্বিতীয় কক্ষ গঠনে লক্ষ করা যায় যে, সমাজের বিত্তশালী, রক্ষণশীল ও মনােনীত ব্যক্তিরাই এতে সদস্য হওয়ার সুযােগ লাভ করেন।
(গ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণ নয়
সংখ্যালঘু স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে দ্বিতীয় কক্ষের প্রয়ােজন বলা হয়। এর উত্তরে বলা যায় যে, সংখ্যালঘু স্বার্থ রক্ষার জন্যে দ্বিতীয় কক্ষের প্রয়ােজন নেই। দেশের সংবিধান ও আইনে নানাভাবে সংখ্যালঘু স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। দ্বিতীয় কক্ষ সংস্কারকার্যে বিলম্ব ঘটিয়ে কায়েমি স্বার্থের পৃষ্ঠপােষকতা করে মাত্র।
(ঘ) যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য নয়
যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দ্বিতীয় কক্ষের অপরিহার্যতার কথা অনেকে স্বীকার করেন না। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। সংবিধানের প্রাধান্যের জন্যেই আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে।
(ঙ) অকারণ বিলম্ব ঘটে
দ্বিতীয় কক্ষ থাকলে বিল পাশে অকারণ বিলম্ব ঘটে। এর ফলে দেশের ও জাতির স্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে। এমনিতেই একটি কক্ষে বিল পাশ হতে সময় লাগে। কারণ, বিভিন্ন পর্যায়ে বিলগুলি ভালােভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। সেই সময়ের মধ্যে জনসাধারণ প্রচারমাধ্যমগুলির মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। তার জন্যে আবার উচ্চকক্ষের প্রয়ােজন থাকে না।
(চ) ব্যয়বহুল
উচ্চকক্ষ থাকলে তাদের সদস্যদের বেতন, ভাতা ইত্যাদি দিতে প্রচুর অর্থের প্রয়ােজন হয়। অনেকে এই ব্যয়কে অর্থের অপচয় বলে মনে করে। বিশেষ করে অনুন্নত দেশে দ্বিতীয় কক্ষ রাখার কোনাে যুক্তি নেই।

মূল্যায়ন
সমালােচিত হলেও উচ্চকক্ষের প্রয়ােজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রে দ্বিতীয় বা উচ্চকন স্বীকৃত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Ogg and Zink বলেছেন, এই সভা অবিবেচনাপ্রসূত বিলকে বাদ দিয়ে দেশকে অনেক সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা এখন উচ্চকক্ষে আসছেন। তাদের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। তাই এর অবলুপ্তি কাম্য নয়।

প্রশ্ন ৫) আধুনিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের গুরুত্ব ও কার্যাবলি আলােচনা করাে।
বিচার বিভাগের গুরুত্ব ও সরকারের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হল বিচার বিভাগ। প্রাচীনকালে যখন আইনসভা ছিল না, তখনও বিচার বিভাগের অস্তিত্ব দেখা যায়। বর্তমান যুগে বিচার বিভাগ বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। অধ্যাপক গার্নার যথার্থই বলেছেন,—“বিচার বিভাগের অস্তিত্ব ছাড়া সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে এই বিভাগের এতই গুরুত্ব যে লর্ড ব্রাইস বলেছেন,—“একটি সরকার কতটা ভালাে, তার বিচারের মাপকাঠি হল,—সেই দেশের বিচারব্যবস্থার দক্ষতা।
   বিচার বিভাগের এই বিশেষ মর্যাদার কারণ হল,—শাসনব্যবস্থায় এই বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইনসভা যে আইন তৈরি করে তা ঠিকমতাে কার্যকর হচ্ছে কি না তা বিচার বিভাগ দেখে, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে, সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা করে জটিলতা দূর করে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র যাতে রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুন্ন না করে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে। বর্তমানে জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের মধ্যে দুর্নীতি ব্যাপকহারে প্রবেশ করেছে। বিচারবিভাগ এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে জনগণের শ্রদ্ধা পাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বিচারব্যবস্থা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসনব্যবস্থার এই ব্যাপক ভূমিকার জন্য বিচার বিভাগের গুরুত্ব স্বীকৃত।

বিচার বিভাগের কার্যাবলি
(ক) আইন লঙ্ঘন ও অপরাধের বিচার
বিচার বিভাগ আইন লঙ্ঘনজনিত অভিযােগ বিচার করে। আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করে। বিচার বিভাগ দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় প্রকার মামলার বিচার করে।
(খ) আইনের ব্যাখ্যা
আদালত আইন ব্যাখ্যা করে। অনেকক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় যে, আইনের অর্থ স্পষ্ট নয়। আইনের অর্থ সঠিকভাবে নির্ধারণের প্রয়ােজন। আদালত কোনাে মামলার সঙ্গে জড়িত আইনের ব্যাখ্যা করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ব্যাখ্যাই এক্ষেত্রে চূড়ান্ত।
(গ) সংবিধানের ব্যাখ্যা
সাধারণভাবে আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যাকর্তা। সংবিধানের কোনাে অংশের অর্থ অস্পষ্ট থাকতে পারে। এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কোনাে ব্যক্তি বা সংস্থা নিজের ইচ্ছামতাে সংবিধান ব্যাখ্যা করতে পারে না। এক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ই চূড়ান্ত।
(ঘ) কেন্দ্ররাজ্য বিরােধের মীমাংসা
যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরােধ মীমাংসা করা। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার থাকে। সংবিধান কর্তৃক উভয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত থাকে। কিন্তু কোনাে কারণে যদি সাংবিধানিক কোনাে বিষয় নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়। তাহলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ওই বিষয়ে নিষ্পত্তি করে।
(ঙ) রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব রক্ষা
আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা প্রতিষ্ঠা, তার প্রতি সমর্থন আদায় এবং তার স্থিতিশীলতা রক্ষা। বিচারবিভাগ রাজনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্য ও মূল্যবােধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
(চ) নাগরিক অধিকার রক্ষা
আদালতকে নাগরিকদের স্বাধীনতা এবং অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে এই ধারণাই ব্যক্ত করা হয় যে, আইন এবং শাসন বিভাগের স্বেচ্ছাচার রােধ, দমনমূলক ব্যবস্থা প্রতিরােধ এবং অধিকার ভঙ্গের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগই একমাত্র প্রতিরােধের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম।
(ছ) পরামর্শদানমূলক ক্ষমতা
আদালতের পরামর্শদানমূলক ক্ষমতাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। এই ক্ষমতার সাহায্যে আদালত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে শাসন বিভাগকে পরামর্শ দিতে পারে। উল্লেখ করা যায় যে, ভারতের রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের নিকট গুরুত্বপূর্ণ আইনের প্রশ্নে পরামর্শ চাইলে সুপ্রিমকোর্ট ওই বিষয়ে পরামর্শ দিতে বাধ্য নয় এবং রাষ্ট্রপতিও তা গ্রহণ করতে বাধ্য নন।
(জ) অন্যান্য ক্ষমতাউপরিউক্ত ক্ষমতা ছাড়াও আদালতকে অনেক সময় অপ্রাপ্ত বয়স্কের তত্ত্বাবধায়ক ও অছি নিয়ােগ, মৃতব্যক্তির উইল অনুমােদন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়।

মূল্যায়ন
দেশের শাসনব্যবস্থায় বিচার বিভাগ সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এই কাজ যদি সে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সম্পাদন করে, তবেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর জন্যে বিচারকের নিয়ােগ, বেতন, অপসারণ প্রভৃতি বিষয়ে লক্ষ দেওয়া দরকার। তা ছাড়া বিচারকের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিত যাতে সাধারণ মানুষের কল্যাণ হয়। সব মানুষ যাতে সমান দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার পায় তার জন্যে বিচারকদের মানসিকতা থাকা একান্ত অপরিহার্য।

প্রশ্ন ৬) আধুনিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে রক্ষা করা যায় ?
উত্তর : বিশ্বে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিরােধের মীমাংসা, আইনের ব্যাখ্যা, নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করা প্রভৃতি কাজ বিচার বিভাগকে গুরুত্ব সহকারে সম্পাদন করতে হয়। বিচার বিভাগ ছাড়া সভ্য রাষ্ট্রের কল্পনা করা কঠিন। লর্ড ব্রাইস বলেছেন,—“বিচার বিভাগের উৎকর্ষের ওপর সরকারের উৎকর্য নির্ভর করে।”
   বিচার বিভাগকে এই গুরুদায়িত্ব সম্পাদন করতে হল, তাকে স্বাধীন, নির্ভীক এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। নচেৎ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে না। Laski-র ভাষায় বলা যায়, ”The independence of the judiciary is essential to freedom” অর্থাৎ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে একান্ত অপরিহার্য। অ্যালান বল (Ball), ল্যাস্কি (Laski) প্রভৃতি চিন্তাবিদরা বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ।
(ক) বিচারপতিদের যােগ্যতা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রথম রক্ষাকবচ হল যােগ্যতার ভিত্তিতে বিচারকনিয়ােগ। যােগ্যতার ওপর ভিত্তি করেই বিচারপতিদের নিয়ােগ করা হলে প্রত্যাশা করা যায় যে, উন্নত গুণমানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই নির্ভীকভাবে নিজেদের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী মামলার পর্যালােচনা ও রায় দিতে পারবেন। উপযুক্ত যােগ্যতা থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন ও প্রভাবিত হন। এই কারণেই বিচারপতিদের যােগ্যতার ভিত্তিতে নিয়ােগ করা উচিত।
(খ) বিচারপতিদের নিয়ােগ পদ্ধতি
বিচারপতিদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা তাদের নিয়ােগের ওপর নির্ভরশীল। এই পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত যেন বিচারকরা রাজনীতিবিদ, আইনসভা ও শাসন বিভাগের মর্জিমাফিক অনুগ্রহ বণ্টনকারী ব্যক্তিদের স্বার্থে রায় দিতে বাধ্য না হন। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের নিয়ােগ পদ্ধতি আছে। ভারতে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক বিচারপতি নিযুক্ত হলেও আইনসভার অনুমােদন প্রয়ােজন।
(গ) বিচারপতিদের কার্যকালের মেয়াদ
হ্যামিলটনের মতে, বিচারপতিদের কার্যকালের স্থায়িত্ব শাসনব্যবস্থার উৎকর্ষের অন্যতম পরিচায়ক। বিচারপতিগণ স্বল্পকালের জন্য নিযুক্ত হলে সুষ্ঠুভাবে বিচারকার্যে মনােনিবেশ করতে পারেন না। সর্বদাই নিয়ােগকর্তাদের সন্তুষ্টিবিধানে ব্যস্ত থাকেন। অস্থায়িত্ব তাদেরকে দুর্নীতিপরায়ণ ও আত্মকেন্দ্রিক করে তােলে। তাই বর্তমানে বিচারপতিদের কার্যকালের মেয়াদ স্থির করে দেওয়া হয়।
(ঘ) আইন ও শাসন বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য বিচার বিভাগকে আইন ও শাসন বিভাগ থেকে মুক্ত রাখা প্রয়ােজন। এই ব্যবস্থা ছাড়া বিচারপতিদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়ােজন বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
(ঙ) বিচারপতিদের বেতন ও ভাতা
বিচারপতিদের বেতন, ভাতা, অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযােগসুবিধা এমন হওয়া উচিত যেন তারা দৈনন্দিন অভাব অভিযােগ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত হয়ে বিচারকার্য সম্পাদন করেন। বেতন, ভাতা প্রভৃতি যথেষ্ট না হলে অপেক্ষাকৃত কম যােগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই বিচারপতিপদ অলংকৃত করবেন। প্রকৃত যােগ্যতাসম্পন্ন আইনজ্ঞ উকিলগণের বেতন কম হলে বিচারপতি হওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ থাকে না।
(চ) বিচারপতিদের অপসারণ
অপসারণ পদ্ধতির ওপর বিচারপতিদের স্বাধীনতা অনেকটা নির্ভর করে। সামান্য কারণে বাকোনাে একজনের খেয়াল খুশিমতাে তাঁদের অপসারিত করার ব্যবস্থা থাকলে, তাদের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা সম্ভঘ হবে না। সংবিধান অমান্য করা, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া প্রভৃতি সুনির্দিষ্ট কারণে বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁদের অপসারিত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
(ছ) বিচারপতিদের পুনর্নিয়ােগ না করা
বিচারপতিদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য তাঁদের অবসর গ্রহণের পরে কোনাে উচ্চপদে নিয়ােগ করা উচিত নয়। এই নিয়ােগের সম্ভাবনা থাকলে তাঁরা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন না। পুনর্নিয়ােগের সুযােগ পেতে তাঁরা সরকারের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে কথা বলতে দ্বিধাবােধ করবেন।

মূল্যায়ন
উপরিউক্ত ব্যবস্থাগুলি থাকলেই বিচারকরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কার্য সম্পাদন করবে তা বলা যাবে না। সমাজের সব মানুষ যাতে সমান দৃষ্টিতে বিচার পায়, তার জন্য বিচারকের নৈতিক গঠন উন্নত হওয়া চাই। যে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকে, সেখানে সাধারণত উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে বিচারকগণ নিযুক্ত হন। সেই বিচারকদের পক্ষে সাধারণ মানুষদের যন্ত্রণা অনুভব করা সম্ভব নয়। একমাত্র শ্রেণিহীন সমাজে বিচারকগণের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়-বিচার করা সম্ভব।

প্রশ্ন ৭) আধুনিক রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্রের কার্যাবলি বর্ণনা করাে।
উত্তর : বর্তমান জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের কর্মধারা যেমন বহুবিস্তৃত হয়ে পড়েছে, তেমনি আমলাতন্ত্রের কার্য সম্পাদনের এক্তিয়ারও বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। নিম্নে আমলাতন্ত্রের কার্যাবলি উল্লেখ করা হল :
(ক) শাসননীতির বাস্তব রূপায়ণ
বর্তমানে শাসন কর্তৃপক্ষের দ্বারা নীতি নির্ধারণ এবং স্থায়ী কর্মচারীগণের দ্বারা সেই নীতিসমূহের বাস্তব রূপায়ণ এই দু-ধরনের কাজের সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়েছে। শাসননীতি প্রণয়ন এবং সেই নীতি বলবৎ করা সম্পূর্ণ পৃথক কাজ, রাজনৈতিক শাসন কর্তৃপক্ষ নীতি নির্ধারণ করেন, আইনসভাতেই সেই নীতি অনুসরণের প্রয়ােজনীয় আইন প্রণয়ন করে। বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই আইন, নীতি ও সিদ্ধান্তকে সারা দেশে বলবৎ করার মূল কাজটি বাস্তবে আমলারা সম্পাদন করে থাকেন।
(খ) শাসনকার্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা
সুষ্ঠু শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে শাসনকার্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা বিশেষ প্রয়ােজন। গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে ঘন ঘন সরকারের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরকারের পরিবর্তনশীলতার জন্যে বা স্থায়িত্বের অভাবে শাসনে শৃঙ্খলা ও নিরবিচ্ছিন্নতা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। ধারাবাহিকতা সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করেন আমলারা।
(গ) পরামর্শদান সংক্রান্ত কাজ
বর্তমান যুগে সরকারের কার্যাবলি বিচিত্র ও জটিল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পক্ষে সকল বিষয়ে দক্ষ ও উপযুক্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বা জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা, সমাধানের রূপরেখা নির্ধারণ প্রভৃতি বিষয়ে মন্ত্রীদের দক্ষ, কুশলী ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্থায়ী কর্মচারীগণের ওপর আবশ্যিকভাবে নির্ভর করতে হয়। দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীদের আইনসভায় বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় এবং কুশলী আমলারাই এই উত্তর সরবরাহ করে থাকেন। সুতরাং, তত্ত্বের দিক থেকে শাসননীতি নির্ধারণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাজ হলেও আমলাদের পরামর্শ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
(ঘ) আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কাজ
সাধারণভাবে আইনসভাই আইন প্রণয়ন করে থাকে। সরকারি কর্মচারীগণ প্রত্যক্ষভাবে আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণ করে না। কিন্তু বর্তমানে আইনসভার কাজ বৃদ্ধির ফলে জটিল নিয়মকানুন রচনার দায়িত্ব অনেক সময় শাসন বিভাগের হাতে অর্পিত হয়। আমলাতন্ত্রই আইন প্রণয়নের জন্যে প্রয়ােজনীয় বিশেষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সরবরাহ করে।
(ঙ) বিচার সংক্রান্ত কাজ
বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার শাসন বিভাগীয় বিচার ও শাসন বিভাগীয় আদালতের ভূমিকার গুরুত্ব স্বীকার করা হয়। অনেক বিবাদের মীমাংসা প্রশাসনিক স্তরে হয়ে থাকে। এতে আমলাতন্ত্রের বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের সুযােগ ঘটে।
(চ) জনসংযােগ, তথ্য সরবরাহ ও বিভিন্ন গােষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয়সাধনের কাজ
বর্তমান যুগে উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনসংযােগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। দেশের সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন স্বার্থগােষ্ঠী, রাজনৈতিক দল সকলেই বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে প্রয়ােজনীয় তথ্য বা সংবাদের জন্যে আমলাদের ওপর নির্ভর করে। সমাজে বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সমন্বয়সাধনের কাজটি আমলারা করে থাকেন। শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষক সংগঠন, বণিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন প্রভৃতি আপন আপন দাবি পূরণের বিষয়ে আমলাদের সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা করে এবং আমলারাও তাদের দাবি সম্পর্কে আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে সরকার ও এইসব গােষ্ঠীর মধ্যে গ্রহণযােগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্যে সাহায্য করেন।
(ছ) রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব প্রদান
রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব সংরক্ষণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। বিগত কয়েক বছরে ফ্রান্স ও জার্মানিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামাের স্থায়িত্ব বিধান করেছে। উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্য, জাতিগত ও গােষ্ঠীগত পার্থক্য, শিল্পায়নের প্রভাব, উদারীকরণ, বিশ্বায়ন, দুর্বল দলীয় ব্যবস্থার কারণে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
(জ) অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনা
আমলাতন্ত্রের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনা। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীগণের মধ্যে সমন্বয়সাধন করে সরকারি নীতি ও কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপায়িত করার দায়িত্ব আমলাতন্ত্রের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 14 =