ভারতীয় সংবিধান সংশােধন পদ্ধতি (Amendment Procedure of Indian Constitution)

1. সংবিধান সংশােধনের প্রয়ােজনীয়তা (Necessity) কি?
উত্তর: যে কোনাে দেশের সংবিধান একটি বিশেষ সময় ও পরিস্থিতিতে প্রণীত হয়। এক বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিকতার ভিত্তিতে সংবিধান রচিত হয়। কিন্তু সময় ও সমাজ গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। তাই সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে কোনাে দেশের সংবিধানেরও প্রয়ােজনীয় পরিবর্তন সাধন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

2. বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় (Political Systems) বিভিন্ন সংবিধান সংশােধনের পদ্ধতিগুলি লেখ।
উত্তর: সংবিধান সংশােধনের পদ্ধতি সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একরকম হয় না। দেশের সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামাের উপর সংশােধন পদ্ধতির প্রকৃতি বহুলাংশে নির্ভরশীল। যেমন— এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধান সংশােধনের পদ্ধতি নমনীয় হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানের সংশােধন পদ্ধতির সঙ্গে অঙ্গরাজ্যগুলিকে যুক্ত করতে হয়।

3. সংবিধান সংশােধনের ক্ষেত্রে ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণের (Makers) অভিমতটি (Opinion) কি ছিল?
উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতারা দেশের সংবিধানের গতিশীলতা সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন। জনসাধারণের সংবিধান সংশােধনের অধিকার আছে। এই অধিকারকে অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে পণ্ডিত নেহরু গণপরিষদে বলেন যে, সংবিধানকে স্থায়ী ও দুষ্পরিবর্তনীয় করার অর্থ জাতির অগ্রগতিকে রুদ্ধ করা।

4. ভারতীয় সংবিধানের 368 নং ধারা অনুসারে সংবিধান সংশােধনের (Amendment) প্রথম পদ্ধতিটি লেখ।
উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের ৩৬৮নং ধারার প্রথম পদ্ধতি অনুসারে সংবিধান সংশােধনের যে কোনাে প্রস্তাব পার্লামেন্টের যে কোনাে কক্ষে পৃথকভাবে উত্থাপন করা যায়। এখানে সংবিধান সংশােধনের প্রস্তাব একটি বিল আকারে উত্থাপন করতে হয়। প্রস্তাবটি উভয়কক্ষে পৃথকভাবে মােট সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের দ্বারা সমর্থিত হওয়া দরকার। এরপর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরলাভে প্রস্তাব অনুসারে সংবিধান সংশােধিত হয়।

5. ভারতীয় সংবিধানের 368নং ধারায় বর্ণিত সংবিধান সংশােধনের দ্বিতীয় পদ্ধতিটি (Second Procedure) লেখ।
উত্তর: ৩৬৮ নং ধারায় উল্লিখিত সংবিধান সংশােধনের দ্বিতীয় পদ্ধতিটি অপেক্ষাকৃত জটিল। এই পদ্ধতি অনুসারে সংশােধনী প্রস্তাবনাটি প্রথম পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে প্রথম পদ্ধতি অনুসারে পাস হওয়া প্রয়ােজন। তারপর তা অন্তত অর্ধেক রাজ্য আইনসভার দ্বারা অনুমােদিত হওয়া দরকার। এভাবে অনুমােদিত হবার পর উক্ত সংশােধনী বিলটি রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য তার কাছে পাঠানাে হয়।

6. ভারতীয় সংবিধানের প্রথম পদ্ধতি অনুসারে সংবিধানের কোন কোন্ অংশের সংশােধন করা যায় ?
উত্তর: ভারতীয় সংবিধান সংশােধনের প্রথম পদ্ধতি অনুসারে সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের মৌলিক অধিকার, চতুর্থ অধ্যায়ের নির্দেশমূলক নীতি প্রভৃতি সংবিধানের প্রায় আশিভাগ ধারা পরিবর্তন করা যায়। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের রাজন্য ভাতা বিলােপ সংক্রান্ত সংশােধনী বিল এই পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। 

7. ভারতীয় সংবিধান সংশােধনের দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসারে সংবিধানের কোন্ কোন্ অংশের সংশােধন করা যায় ?
উত্তর: কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত ক্ষমতার বণ্টন, কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসনবিভাগের ক্ষমতার বিস্তৃতি, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন, সুপ্রীমকোর্ট এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও অঙ্গরাজ্যসমূহের হাইকোর্ট সম্পর্কিত বিষয়, সংবিধান সংশােধন প্রভৃতি বিষয়গুলি সংশােধনের জন্য দ্বিতীয় পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়ে থাকে। 

8. ভারতীয় সংবিধান সংশােধনের ক্ষেত্রে তৃতীয় পদ্ধতিটি লেখ।
উত্তর: ভারতীয় সংবিধান সংশােধনের তৃতীয় পদ্ধতিটি অত্যন্ত সরল। এক্ষেত্রে কোনাে বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয় না। সাধারণ আইন প্রণয়নের হৃতিতে সংসদের উভয় কক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে এক্ষেত্রে সংবিধান সংশােধন করা যায়। নতুন রাজ্যের সৃষ্টি বা রাজ্য পুনর্গঠন, বিধান পরিষদের সৃষ্টি বা বিলােপসাধন। সরকারী ভাষা প্রভৃতি বিষয়গুলি এই পদ্ধতির মাধ্যমে সংশােধন করা যায়। 

9. প্রথম সংশােধনটির দ্বারা ভারতীয় সংবিধানের কি কি পরিবর্তন (Changes) সাধিত হয়েছিল ?
উত্তর: ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ভারতীয় সংবিধানের প্রথম সংশােধনী আইনটি প্রণীত হয়। এই সংশােধনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কতকগুলি পরিবর্তন কার্যকর হয়। যেমন ১৫(৪) নং ধারা সৃষ্টি করে সামাজিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে অনগ্রসর তফশিলী জাতি ও উপজাতিদের উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯নং ধারায় উল্লিখিত স্বাধীনতার অধিকারের উপর কতকগুলি বাধানিষেধ আরােপ করা হয়। 

10. ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় সংশােধনটির বিষয়বস্তুগুলি কি ছিল ?
উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় সংশােধনী আইন প্রণীত হয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে। এই সংশােধনের মাধ্যমে ৮১নং ধারার কিছু পরিবর্তন করা হয় এবং বলা হয় যে, লােকসভার সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত লক্ষের কম বা বেশী অধিবাসীপিছু একজন সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন। উল্লেখ্য মূল সংবিধানের বিধান অনুসারে সাড়ে সাত লক্ষ অধিবাসীপিছু একজন করে সদস্য লােকসভায় নির্বাচিত হতে পারতেন। 

11. ভারতীয় সংবিধানের পঞ্চম সংশােধনটির বিষয়বস্তুগুলি লেখ।
উত্তর: পঞ্চম সংবিধান সংশােধনী আইন ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে প্রণীত হয়। এই সংশােধনের মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের ৩নং ধারার আংশিক পরিবর্তন করা হয়। উক্ত সংবিধানের মাধ্যমে বলা হয় যে, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রাজ্যগুলিকে রাজ্য পুনর্গঠনের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 11 =