মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি (Fundamental Rights and Directive Principles)

মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি (Fundamental Rights and Directive Principles)

মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

1. মৌলিক অধিকার ও সাধারণ অধিকারের মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমন, সাধারণ অধিকারগুলি দেশের সাধারণ আইনের দ্বারা সংরক্ষিত ও রূপায়িত হয়। কিন্তু মৌলিক অধিকারগুলি দেশের মৌলিক আইন অর্থাৎ সংবিধানের দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়। ভারতীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ Prof. D. D. Basu-র মতে, “A fundamental right is one which is protected and guaranteed by the written constitution of the state.” এছাড়া মৌলিক অধিকারগুলির কোনাে পরিবর্তন বা সংশােধন সংবিধানের সংশােধন না ঘটিয়ে করা যায় না। কিন্তু সাধারণ অধিকারগুলি সাধারণ আইন পাসের পদ্ধতির মাধ্যমেই সংশােধন করা যায়।

2. মৌলিক অধিকারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল :
(a) মৌলিক অধিকার হল ব্যক্তিজীবনের প্রয়ােজন পূরণের ক্ষেত্রে মৌলিক ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। (b) দেশের সংবিধান কর্তৃক এই অধিকারগুলি স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়। (c) মৌলিক অধিকার আদালত কর্তৃক বলবৎযােগ্য। (d) মৌলিক অধিকারগুলি আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত।

3. ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলি রচনার সময় সংবিধান রচয়িতাদের উপর বিভিন্ন সংবিধান ও মতবাদের প্রভাব পড়েছে। যেমন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকারের সনদ। এছাড়াও মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম ও চতুর্দশ সংশােধন, মানবাধিকার সম্পর্কে ফরাসী ঘােষণা, মানবাধিকার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ঘােষণা, ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের আয়ারল্যাণ্ডের সংবিধান, ডাইসীর আইনের অনুশাসন তত্ত্ব (Theory of Rule of Law) গান্ধীবাদ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য।

4. ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত সকল মৌলিক অধিকার দেশের সকল অধিবাসী ভােগ করতে পারে না। কতকগুলি মৌলিক অধিকার আছে যা কেবলমাত্র ভারতীয় নাগরিকগণই ভােগ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সরকারী চাকরীর ক্ষেত্রে সমানাধিকার, ভারতের যে-কোনাে জায়গায় যাতায়াত ও বসবাসের অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার, সমিতি গঠনের অধিকার প্রভৃতি। আবার কতকগুলি মৌলিক অধিকার আছে যা নাগরিক ও বিদেশী উভয়েই ভােগ করতে পারেন। যেমন, আইনের চোখে সমানাধিকার, জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার, ধর্মীয়-স্বাধীনতার অধিকার প্রভৃতি।

5. কর্মের অধিকার (Right to work), শ্রমমানভিত্তিক মজুরী পাবার অধিকার (Right to a standard minimum wage) প্রভৃতি অর্থনৈতিক অধিকারগুলি ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত হয়নি।

6. স্বাভাবিক অবস্থায় মৌলিক অধিকার কোনােভাবে খর্বিত হলে, নাগরিকগণ আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারে। কিন্তু জরুরী অবস্থা বলবৎ থাকাকালীন সময়ে মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে নাগরিকগণ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন না। ফলে এই সময়ে মৌলিক অধিকারকে লন করে আইনবিভাগ আইন প্রণয়ন ববে, এবং শাসন-বিভাগ কোনাে নির্দেশ জারী করলে তা আদালত কর্তৃক বিবেচনাধীন নয়। তবে সংবিধানের 44তম সংশােধনের (44th Amendment Act, 1978) মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, কোনাে অবস্থাতেই ২১নং ধারার জীবন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারকে স্থগিত বা লঙ্ঘন করা যাবে না।

7. মৌলিক অধিকারগুলি অবাধ বা অনিয়ন্ত্রিত নয়। ভারত রাষ্ট্র সমাজ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মৌলিক অধিকারগুলির উপর সাধারণ অবস্থাতেও যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরােপ করতে পারে।

৪. ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলি বিচারবিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। স্বাভাবিক অবস্থায় সুপ্রীমকোর্ট ৩২নং ধারা অনুসারে ও হাইকোর্ট ২২৬ ধারা অনুসারে লেখ, বা নির্দেশ বা আদেশ (writs) জারীর মাধ্যমে মৌলিক অধিকারগুলিকে সংরক্ষিত করে থাকেন।

9. মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতির মধ্যে সাদৃশ্য হল : উভয়েই প্রকৃতিগতভাবে একপ্রকার অধিকার। কিন্তু বৈসাদৃশ্য হল : মৌলিক অধিকারের আইনগত স্বীকৃতি ও ভিত্তি আছে। অপরদিকে, নিদের্শমূলক নীতিগুলির তা নেই। ফলে মৌলিক অধিকারগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযােগ্য, কিন্তু নির্দেশমূলক নীতিগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযােগ্য নয়।

10. অধ্যাপক কে. সি. হােয়ার (K. C. Wheare)-এর মতে, রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতিগুলির মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনার ধারা অনুযায়ী ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী প্রভৃতি রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শ ঘােষিত হয়েছে। এই আদর্শগুলি নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও দায়িত্ববােধ সৃষ্টি করে।

11. ড. বি. আর. আম্বেদকর গণপরিষদে নির্দেশমূলক নীতি সম্পর্কে বলেন যে, নীতিগুলি ক্ষমতাসীন দলের পরীক্ষাকেন্দ্র হিসাবে ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন যে, এই নীতিগুলি হল ভারতীয় সংবিধানের এক অভিনব বৈশিষ্ট্য (The most ‘novel’ feature of the Indian Constitution).

12.
গণপরিষদে ড. কে, এম, মুন্সী বলেন, “স্বৈরাচারী আইনের বিরুদ্ধে নির্দেশমূলক নীতিগুলি প্রতিবাদের ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে”।

13. মৌলিক অধিকারগুলির সাথে রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতিগুলির বিরােধ বাধলে, মৌলিক অধিকারগুলিই বলবৎ হবে। [If there is a conflict between a Fundamental Right and a Directive Policy the Fundamental Right shall prevail over the Directive (state of Madras V. Champakaran, 1951). By the 42nd Constitution Amendment Act, an attempt was made to give Directives Primacy over the Fundamental Rights, but it has been foiled. by the Supreme Court in the Minerva Mills case, 1980.]

14. ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। সুপ্রীমকোর্ট তার বিভিন্ন রায়ে এ সম্পর্কে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন—
(i) In Markandaya V. State of A. P. (1989), the Supreme Court asserted that the Fundamental Rights and the Directive Principles together form the core of the Constitution.
অর্থাৎ ভারতীয় সংবিধানের মূল কাঠামােটাই গড়ে উঠেছে মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে নিয়ে।
(ii) In Keshavananda Barati case, the Supreme Court declared that Parliament can amend the constitution to override or abrogate any Fundamental Right in order to enable the state to implement the Directives, so long as the basic features’ of the constitution are not violated.
অর্থাৎ, পার্লামেন্ট মৌলিক অধিকারগুলিকে লঙঘন করে রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে কার্যকর করতে পারবে যদি না তা সংবিধানের মৌল কাঠামাের বিরােধী না হয়। তাই মৌল কাঠামাের বিরােধী না হলে পার্লামেন্ট প্রয়ােজনে নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে কার্যকর করতে গিয়ে মৌলিক অধিকারগুলিকে খর্ব করতে পারে।

মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন 1. ভারতীয় সংবিধানে নির্দেশমূলক নীতিগুলির শ্রেণীবিভাজনের উপর একটি টীকা লেখ।
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যথা—(a) সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ সম্পর্কিত নীতিসমূহ, (b) শাসন কাঠামাের উন্নয়ন সম্পর্কিত নীতিসমূহ, (c) প্রগতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত নীতিসমূহ এবং (d) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নতিসাধন সম্পর্কিত নীতিসমূহ।

প্রশ্ন 2. নির্দেশমূলক নীতিগুলির উৎস কি কি ?
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলি বিভিন্ন উৎস থেকে উদ্ভূত। গান্ধীজীর চিন্তাধারা এবং হিন্দুধর্মের আদর্শ এক্ষেত্রে অন্যতম উৎস হিসাবে গণ্য হয়। আম্বেদকরের মতানুসারে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারতশাসন আইনে গভর্নর ও গভর্নর জেনারেলদের জন্য লিপিবদ্ধ ‘নির্দেশাবলী’ হল বর্তমান সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির প্রকৃত পূর্বসূরী। নির্দেশমূলক নীতি, উৎস হিসাবে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘােষণাপত্রের কথাও বলা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন 3. নির্দেশমূলক নীতিগুলির বৈশিষ্ট্যগুলি কি কি?
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলির বৈশিষ্ট্যগুলি হল -(a) নির্দেশমূলক নীতিগুলি বিচারালয় কর্তৃক প্রযুক্ত হতে পারে না।(b) নির্দেশমূলক নীতিগুলি রাষ্ট্রের উপর কতকগুলি দায়িত্ব ন্যস্ত করলেও রাষ্ট্র মাত্রই নির্দেশমূলক নীতির জোরে যে কোনাে আইন পাস করতে পারে না।

প্রশ্ন 4. নির্দেশমূলক নীতিগুলির মূল্যায়ন কর।
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলি আদালতে বলবৎযােগ্য নয়। এই নীতিগুলি সরকার ও আইন প্রণেতাগণের প্রতি সাধারণ নির্দেশ মাত্র। আইভর জেনিংস- এর মতে, এই নীতিগুলি লিখিত সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু নির্দেশমূলক নীতিগুলি সরকারের প্রতি কতকগুলি নৈতিক উপদেশ হলেও তাদের শিক্ষাগত মূল্য রয়েছে। দেশ শাসনের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলি আদর্শ হিসাবে গৃহীত হয়েছে।

প্রশ্ন 5. ভারতীয় সংবিধানে নির্দেশমূলক নীতিগুলির মূল বিষয়বস্তুটি কি?
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলির প্রধান বিষয়বস্তু হল ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার। সংবিধানে বলা হয়েছে এই নীতিগুলি হবে দেশশাসনের মূলতত্ত্ব এবং রাষ্ট্রের কর্তব্য হবে এই নীতিগুলিকে আইন প্রণয়নে প্রয়ােগ করা। বলা হয়, ভারতীয় রাষ্ট্র নিষ্ক্রিয় পুলিশী রাষ্ট্র নয়, ইহা কল্যাণব্রতী রাষ্ট্র (Welfare State)।

6. নির্দেশমূলক নীতিগুলির উদ্দেশ্য লেখ।
উত্তর : রাষ্ট্রনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট নয়, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত করতে না পারলে গণতন্ত্র বাস্তবে কার্যকর হতে পারে না। সুতরাং, জনকল্যাণকর কাজকর্মের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণসাধনে রাষ্ট্রকে নিয়ােজিত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যেই নির্দেশসমূহকে সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

7. আন্তর্জাতিক সম্পর্কজনিত নির্দেশমূলক নীতিগুলি উল্লেখ কর।
উত্তর : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নতিসাধন সম্পর্কিত নীতিগুলি হল সংবিধানের ৫১নং ধারা অনুসারে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি, জাতিসমূহের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত ও সম্মানজনক সম্পর্ক রক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন ও সন্ধির প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি এবং সালিশীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিবাদের মীমাংসার ব্যাপারে রাষ্ট্র চেষ্টা করবে।

৪. চারটি নতুন নির্দেশমূলক নীতির উল্লেখ কর।
উত্তর : 42তম সংবিধানের সংশােধন দ্বারা যে চারটি সংযুক্ত হয়েছে তা হল -(a) শিশুরা যাতে সুস্থ ও মর্যাদার সাথে গড়ে ওঠার সুযােগ পায় রাষ্ট্রকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
(b) রাষ্ট্রকে সাম্যভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
(c) শ্রমিকগণ যাতে শিল্প পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রকে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(d) প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

9. নির্দেশমূলক নীতিগুলির তাৎপর্য সংক্ষেপে লেখ।
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলি প্রধানত আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের উদ্দেশ্যে রচিত হলেও তা ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যেও রচিত হয়েছে। জনকল্যাণ সাধনের জন্য এগুলি কার্যকর করা প্রয়ােজন। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও নির্দেশমূলক নীতিগুলির গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। নির্দেশমূলক নীতিগুলির লক্ষ্য হল সংবিধানসম্মত উপায়ে সামাজিক বিপ্লবের উদ্দেশ্য সাধন করা।

10. নির্দেশমূলক নীতিগুলির সীমাবদ্ধতাগুলি লেখ।
উত্তর: নির্দেশমূলক নীতিগুলির সীমাবদ্ধতাগুলি হল -(a) বলা হয়েছে যে, নীতিগুলি যখন আদালতে বলবৎযােগ্য নয়, তখন সেগুলি সম্পূর্ণ মূল্যহীন।(b) নীতিগুলি সংখ্যায় অনেক বলে কার্যক্ষেত্রে তাদের মেনে চলা শাসন কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হবে না।(c) নীতিগুলি কোনাে স্বাধীন দেশের শাসনব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

11. নির্দেশমূলক নীতিগুলি সম্পর্কে অধ্যাপক হােয়ারের মত ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : অধ্যাপক হােয়ার-এর মতে নীতিগুলির মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনার ধারা অনুযায়ী ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী প্রভৃতি রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শ ঘােষিত হয়েছে। এই আদর্শগুলি নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও দায়িত্ববােধ সৃষ্টি করে।

12. নির্দেশমূলক নীতিগুলি কি ?
উত্তর : নির্দেশমূলক নীতিগুলি হল সরকারের প্রতি সংবিধানের নির্দেশ। এই নীতিগুলি ভারতীয় সংবিধানের ৩৬–৫১নং ধারার মধ্যে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে।

13. মূল সংবিধানে কটি নির্দেশমূলক নীতি ছিল? এবং কোন্ সংশােধনী আইনের মাধ্যমে আরাে ৪টি নীতি সংযুক্ত হয়েছে?
উত্তর : মূল সংবিধানে ১৩টি নির্দেশমূলক নীতি ছিল। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের 42তম সংবিধান সংশােধনী আইনের মাধ্যমে আরাে ৪টি নীতি যুক্ত হয়েছে।

14. গণপরিষদে ড. আম্বেদকর নির্দেশমূলক নীতিগুলির ভূমিকা সম্পর্কে কি বলেছেন?
উত্তর : ড. আম্বেদকর গণপরিষদে বলেছেন, নীতিগুলি ক্ষমতাসীন দলের পরীক্ষাকেন্দ্র হিসাবে ভূমিকা পালন করবে।

15. ভারতীয় সংবিধানের উদ্দেশ্য কি ?
উত্তর : রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্র ছাড়াও সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রসারিত করে এক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা।16. স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামাের মূল ভিত্তি কি?
উত্তর : স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামাের মূল ভিত্তি হল চতুর্থ অধ্যায়ের নির্দেশমূলক নীতিগুলি।

17. রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহ’—বলতে কি বােঝ ?
উত্তর : ভারতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে কতকগুলি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মৌলিক নীতি উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলিকে নির্দেশ হিসাবে মেনে চলবে। তাই এই নীতিগুলির নাম দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহ।

18. নির্দেশমূলক নীতিগুলি সম্পর্কে অধ্যাপক অস্টিনের মতটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : সাংবিধানিক উপায়ে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে নীতিগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। নীতিগুলির মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ভারত গঠনের উদ্দেশ্য এবং সেই সমস্ত উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নের উপায় পদ্ধতির উল্লেখ আছে। তাই অস্টিন মন্তব্য করেছেন যে, নির্দেশমূলক নীতিগুলি হল সামাজিক বিপ্লবের উদ্দেশ্য সাধনের পরিপূরক।

19. ভারতীয় সংবিধানের ৪১নং ধারায় কি বলা হয়েছে ?
উত্তর : ভারতীয় সংবিধানের ৪১নং ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র জনগণকে বেকার, বার্ধক্য ও পীড়িত অবস্থায় সাহায্য করবে। বিভিন্ন সরকার এসব ক্ষেত্রে নানারকম খয়রাতি সাহায্যের ব্যবস্থা করে। এছাড়া কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফাণ্ড পরিকল্পনা, বীমা ব্যবস্থা, মজুরী বাের্ডের ব্যবস্থা প্রভৃতি উল্লেখযােগ্য। ৪১নং ধারা অনুসারে কোনাে কোনাে রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গ) বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

20. ভারতীয় সংবিধানের ৪৩নং ধারায় কি বলা হয়েছে ?
উত্তর : সংবিধানের ৪৩নং ধারায় বলা হয়েছে, কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য সর্বভারতীয় খাদি ও গ্রামীণ শিল্প বাের্ড, সর্বভারতীয় হস্তচালিত তাঁত বাের্ড, সর্বভারতীয় হস্তশিল্প বাের্ড, ক্ষুদ্রশিল্প বাের্ড, সিল্ক বাের্ড প্রভৃতি স্থাপনের কথা ঘােষণা করা হয়েছে।

21. ভারতীয় সংবিধানের ৪৫নং ধারাটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : সংবিধানের ৪৫নং ধারায় প্রায় সকল রাজ্যে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সকল শিশুর বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সব রাজ্যে তা সম্ভব হয়নি। কোনাে কোনাে রাজ্যে সপ্তম শ্রেণী বা তারও উর্দ্ধে অবৈতনিক শিক্ষার সুযােগ বর্তমান। কোনাে কোনাে রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গ) উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

22. ভারতীয় সংবিধানের ৪৭নং ধারাটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : সংবিধানের ৪৭নং ধারার নির্দেশমতাে কোনাে কোনাে রাজ্যে মদ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া দরিদ্রদের জন্য আইনের সাহায্য এবং শিল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

23. ভারতীয় সংবিধানের ৪৮নং ধারায় কী নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে?
উত্তর : সংবিধানের ৪৮নং ধারায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশুপালন ও কৃষিকার্যের জন্য প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ঘােষণা করাহয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার কথা বলা হয়। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্য ব্যুরাে প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

24. ভারতীয় সংবিধানের ৪০নং ধারায় কী বলা হয়েছে ?
উত্তর : সংবিধানের ৪০নং ধারা অনুসারে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে। এছাড়া পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে প্রয়ােজনীয় ক্ষমতাপ্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

25. রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলি সম্পর্কে ড. আম্বেদকরের মতামতটি লেখ।
উত্তর : ড. আম্বেদকর এর মতানুসারে রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলি হল ভারতীয় সংবিধানের এক অভিনব বৈশিষ্ট্য। তাঁর অভিমত অনুসারে এই নীতিগুলি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচীকে প্রকাশ করে।

26. নির্দেশমূলক নীতিগুলির প্রকৃতি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ের নির্দেশমূলক নীতিগুলি নাগরিক অধিকার হিসাবে বিবেচিত হতে পারে কিনা এ বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। অনেকের মতে বিষয়বস্তুর দিক থেকে নীতিগুলিকে কতকগুলি আর্থ-সামাজিক অধিকার হিসাবে অভিহিত করা যায়। সাধারণভাবে নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হিসাবে প্রতিপন্ন করার প্রবণতা দেখা যায়। আর এক দলের মতে নির্দেশমূলক নীতিগুলি হল সরকারের প্রতি সংবিধানের নির্দেশ। এগুলিকে অধিকার হিসাবে গণ্য করা যায় না।

27. ‘আর্থ-সামাজিক’ মূলক দুটি নির্দেশমূলক নীতি উল্লেখ করে।
উত্তর : সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ সম্পর্কিত দুটি নির্দেশমূলক নীতি হল :(a) রাষ্ট্র সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি সমাজব্যবস্থা গঠন করে জনকল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হবে (৩৮নং ধারা)।(b) রাষ্ট্র এমনভাবে তার নীতি পরিচালনা করবে যাতে (i) স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিক পর্যাপ্ত উপজীবিকার অধিকার ভােগ করতে পারে। (ii) জনগণের কল্যাণে সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বণ্টিত

28. শাসন কাঠামাের উন্নয়ন সম্পর্কিত দুটি নির্দেশমূলক নীতি লেখ।
উত্তর : শাসন কাঠামাের উন্নয়ন সম্পর্কিত নির্দেশমূলক নীতিগুলি হল :(a) স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন করবে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে প্রয়ােজনীয় ক্ষমতা ন্যস্ত করবে (৪০নং ধারা)।(b) সরকারের বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে পৃথক করতে রাষ্ট্র চেষ্টা করবে (৫০নং ধারা)।(c) রাষ্ট্র সমগ্র ভারতের সকল নাগরিকদের জন্য একই দেওয়ানী বিধি প্রবর্তনের চেষ্টা করবে (৪৪নং ধারা)।

29. মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতিগুলির মধ্যে দুটি পার্থক্য উল্লেখ কর।
উত্তর : মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতিগুলির মধ্যে দুটি পার্থক্য হল :(a) মৌলিক অধিকারগুলিকে বলবৎ করার জন্য কোনাে পৃথক আইন প্রণয়নের প্রয়ােজন হয় না। অপরদিকে, নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে কার্যকর করার জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়ােজন হয়।
(b) মৌলিক অধিকারের লক্ষ্য হল গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন। কিন্তু নির্দেশমূলক নীতির উদ্দেশ্য হল সমাজকল্যাণের আদর্শকে সম্প্রসারিত ও সার্থক করে জনকল্যাণকামী সমাজব্যবস্থা গঠন করা।

30. মৌলিক অধিকারগুলি সংবিধানে লিপিবদ্ধ করার প্রয়ােজনীয়তা কী ?
উত্তর : সংবিধানে মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ করার প্রয়ােজনীয়তা কোথায় তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। সংবিধানে মৌলিক অধিকার। লিপিবদ্ধ করার প্রয়ােজনীয়তার পশ্চাতে কতগুলি কারণ আছে। এই কারণগুলি হল নিম্নরূপ-
(a) সংবিধানে নাগরিকদের অধিকারসমূহ লিপিবদ্ধ থাকলে ব্যক্তি তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়।
(b) মৌলিক অধিকারগুলি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সেগুলি সংবিধানিক এবং আইনগত মর্যাদা ও স্বীকৃতি লাভ করে। এর ফলে কোনাে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা শাসনবিভাগীয় কর্তৃপক্ষ এই অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করার সাহস পায় না। ফলে নাগরিক অধিকারের প্রক্রিয়া বজায় থাকে।
(c) মৌলিক অধিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলে নাগরিকগণ তাদের অধিকার সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে।
(d) মৌলিক অধিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলে ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণী ইচ্ছামতাে তা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারে না।
(e) মৌলিক অধিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলে আদালত কর্তৃক তার যথার্থ সংরক্ষণ সম্ভব হয়।
(f) উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম একটি মাপকাঠি হল সংবিধানে মৌলিক অধিকারের লিপিবদ্ধকরণ।(g) গণতন্ত্র যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন সেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের জাঁতাকলে পড়ে যাতে সংখ্যালঘুর স্বার্থ ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে লক্ষ রেখে সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবিধানে মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ করা প্রয়ােজন।
   পরিশেষে বলা যায় কেবলমাত্র সংবিধানে মৌলিক অধিকারের লিপিবদ্ধকরণই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়ােজন সরকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সদিচ্ছা এবং নাগরিকের সদাসচেতন মানসিকতার।

31. ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের ৭টি বৈশিষ্ট্য লেখ।
উত্তর : ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের ৭টি বৈশিষ্ট্য হল নিম্নরূপ-(a) ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলির প্রকৃতি হল রাজনৈতিক।(b) মৌলিক অধিকারগুলি হল নমনীয়।(c) মৌলিক অধিকারগুলি ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয়ই হতে পারে।(d) মৌলিক অধিকার আদালত কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে বলবৎযােগ্য।(e) এখানে মৌলিক অধিকারগুলিকে বাস্তবে কার্যকর করার জন্যকোনাে ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।(f) মৌলিক অধিকারগুলি জরুরি অবস্থায় আদালত কর্তৃক বলবৎযােগ্য নয়।(g) ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলি এককভাবে কার্যকরী হতে পারে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − six =