ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা

ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা (Establishment of Mughal Empire in India)

Short Notes on Establishment of Mughal Empire in India (ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা)

  1. ভারতবর্ষে জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ “মোগল” বা “মুঘল” রাজবংশ নামে পরিচিত। “মোঙ্গ” কথা থেকে “মোঙ্গল” কথাটি এসেছে। “মোঙ্গ” কথা টির অর্থ হলো “নির্ভীক”। এই মোঙ্গল রাই পরবর্তীকালে মোগল নামে পরিচিত হয়। এদের আদি বাসস্থান ছিল মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলিয়া।
  2. তাদের এক উল্লেখযোগ্য নেতার নাম ছিল তেমুচিন। এই তেমুচিন ই বিভিন্ন মোঙ্গল উপজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তেমূচিন পরবর্তীকালে চেঙ্গিস খাঁ নামে পরিচিতি হয়। “চেঙ্গিস” কথাটির অর্থ হলো “অসীম শক্তিধর”। তিনি সমগ্র এশিয়া , ইউরোপ কে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য কয়েক টি অংশে বিভক্ত হয়ে পরে।
  3. মধ্য এশিয়ায় অধিকার নেয় তাঁর দ্বিতীয় পুত্র চাঘতাই। ফলে এই রাজ্যটির নাম হয় চাঘতাই রাজ্য এবং এই রাজ্যের তুর্কি অধিবাসীরা চাঘতাই তুর্কি নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চাঘতাই তুর্কি বংশের এক শক্তিশালী নেতা ছিলেন তৈমুর লঙ। এই তৈমুর লঙ ই ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত আক্রমণ করে সুলতানী সাম্রাজ্যের পতন কে অনিবার্য করে তুলেছিল। বাবর অবশ্য নিজেকে মোঙ্গল দের থেকে আলাদা করেই ভাবতেন। এ সত্বেও বাবর ও তাঁর উত্তরপুরুষরা মোগল বা মুঘল নামেই পরিচিতি পান।

বাবর (১৫২৬-১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ)

  1. তুর্কি ভাষায় বাবর কথার অর্থ “সিংহ”। ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ই ফেব্রয়ারি মধ্য এশিয়ার রুশ তুর্কিস্তানের অন্তর্গত ফারঘনা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।
  2. বাবরের পিতার নাম ছিল ওমর শেখ মির্জা। তিনি ছিলেন ক্ষুদ্র রাজ্য ফারঘনার অধিপতি। ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যু হলে বারো বছর বয়সে বাবর ফারঘানা রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে মুষ্টিমে়য় অনুচরের সাহায্যে তিনি কবুল দখল করেন। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি কাবুলে রাজত্ব করেন ।
  3. বাবরের ভারত আক্রমণের প্রাক্কালে দিল্লিতে ইব্রাহিম লোদির শাসন কায়েম ছিল। তিনি ছিলেন অপদার্থ এবং অত্যাচারী। এই সময় পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ লোদি এবং দিল্লির সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার সুলতানের খুল্লতাত আলম খাঁ লোদি বাবর কে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। রাজপুত বীর রানা সঙ্গও বাবরকে ভারত আক্রমণের জন্য আহ্বান জানান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইব্রাহিম লোদি র বিরুদ্ধে বাবর কে ব্যাবহার করে দিল্লির সিংহাসন দখল করা। কিন্তু তাদের অজানা ছিল বাবরের এক এবং অন্যতম লক্ষ ই ছিলো ভারতে এক স্থায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।
  4. ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে বাবর কামান, বন্দুক ও বারো হাজার সৈন্য নিয়ে ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লির সন্নিকটে পানিপথের প্রান্তরে দুই পক্ষের (বাবর ও ইব্রাহিম লোদি) যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ পানিপথের যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে এপ্রিল সংঘটিত এই যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদি প্রাণ হারান।
  5. দিল্লি ও আগ্রা অধিকার করে বাবর নিজেকে বাদশাহ বলে ঘোষণা করেন। এইভাবে ভারতের সার্বভৌমত্ব চাঘতাই তুর্কিদের হস্তগত হয়।
  6. দিল্লির উপর নিজ কর্তৃত্ব দৃঢ় করতে তাঁকে আর ও অনেক গুলি যুদ্ধ করতে হয়। যেমন ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের খানুয়ার যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন।
  7. এরপর রানা সংগ্রাম সিংহের অনুচর মেদিনী রাই এর সঙ্গে বাবরের চান্দেরির যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে। এই যুদ্ধেও বাবর জয় লাভ করেন।
  8. ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে বাবর ইব্রাহিম লোদি’র ভ্রাতা মামুদ লোদি, বিহারের শের খাঁ এবং বাংলার সুলতান নসরত শাহ এর সম্মিলিত জোট কে পরাজিত করেন এই যুদ্ধ গোগরার যুদ্ধ নামে খ্যাত। এই যুদ্ধের এক বৎসর পর ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
  9. এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য বাবর তুর্কি ভাষায় তাঁর নিজের আত্মজীবনী “তুজুক – ই – বাবরী” বা “বাবর নামা” রচনা করে গেছেন। সমকালীন ইতিহাসের প্ররিপ্রেক্ষিতে গ্রন্থটির গুরুত্ব অপরিসীম।

হুমায়ুন

  1. বাবরের মৃত্যুর চারদিন পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে বসেন। বাবরের অপর তিন পুত্রের নাম ছিল কামরান, আসকারী ও হিন্দাল। ভ্রাতাদের বিরোধিতা ও সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহ তাঁর রাজ্য বিস্তারের পথে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
  2. বক্সারের কাছে চৌসা নামক গ্রামে উদীয়মান আফগান নায়ক শের খাঁ র সঙ্গে তাঁর তুমুল যুদ্ধ হয়। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এই যুদ্ধ চৌসারের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে হুমায়ূন পরাজিত হন। শের খাঁ শের শাহ উপাধি ধারণ করেন।
  3. এরপরের বছর হুমায়ূন তাঁর হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য কনৌজের বিলগ্রাম নামক স্থানে শের শাহ্ কে আক্রমণ করেন। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের এই যুদ্ধ কনৌজের যুদ্ধ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ নামে পরিচিত। হুমায়ুন এই যুদ্ধেও পরাজিত হন। শক্তি সঞ্চয় এর উদ্দেশ্যে তিনি পারস্যের শাহ তাহমাস্পের সভায় তিনি আশ্রয় নেন।
  4. এদিকে ভারতে শের শাহের মৃত্যুর পর আফগান আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতার সুযোগে হুমায়ুন ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে শিরহিন্দের যুদ্ধে আফগান শাসক সিকন্দর শূর কে পরাজিত করে আগ্রা ও দিল্লি পুনরুদ্ধার করেন। এইভাবে হুমায়ুন তাঁর হৃত সাম্রাজ্যের কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করে ভারতে মোগল আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন।

আকবর

  1. হুমায়ূন-এর পুত্রই ছিলেন জালালউদ্দিন মহম্মদ আকবর। যিনি ভারতীয় ইতিহাসে অন্যতম,জনপ্রিয় মুঘল সম্রাট হিসাবে খ্যাত হয়ে আছেন।
  2. শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে যখন হুমায়ুন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন সিন্ধুপ্রদেশে অমর কোটের রাজা রানা বীর সালের প্রাসাদে আশ্রয় লাভ করেন। সিন্ধু প্রদেশে অমর কোটের রাজা রানা বীর শালের প্রাসাদে হুমায়ূন পত্নী হামিদাবানুর গর্ভে আকবর ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। দিল্লি পুনঃ দখলের পর হুমায়ূন তাকে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।
  3. আকবরের বয়স যখন ১৩ বছর ৪ মাস তখন হুমায়ূনের আকস্মিক পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হওয়ায় বৈরাম খাঁ তাঁকে “দিল্লির সম্রাট” বলে ঘোষণা করেন। পিতৃসম বৈরাম খাঁ হন তাঁর উজির বা প্রধান মন্ত্রী।
  4. আকবরের সিংহাসনে আরোহণের পরই শের শাহ এর ভ্রাতুষ্পুত্র মহম্মদ আদিল শাহের হিন্দু সেনাপতি হিমুর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হন। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই নভেম্বর পানিপথের প্রান্তরে দুই পক্ষের যুদ্ধ হয়, যা পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।
  5. এই যুদ্ধে প্রথম দিকে হিমু জয়লাভ করলেও পরে বন্দী হন এবং তাঁর শিরোচ্ছেদ করা হয়। ভারতে প্রকৃত অর্থে মোগল সাম্রাজ্যর প্রকৃত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই। হিমুর হিন্দু রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং আকবর ভারতের সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি পান।
  6. ঐতিহাসিক স্মিথ এর মতে, আকবর ১৫৬০ থেকে ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ এই চার বছর অন্তঃপুরে একটি চক্রের অধীনে ছিলেন। তাঁর এই কালপর্বকে বলা হয় “অন্ত:পুরিকার শাসন”। এই চক্রে ছিলেন আকবরের ধাত্রিমাতা মহাম আনগা,তাঁর পুত্র আদম খান, রাজমাতা হামুদাবানু, মুনিম খাঁ এবং দরবারের কিছু মন্ত্রী। প্রতিভাবান আকবর কুড়ি বছর বয়সেই এই শাসনের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করেন এবং সকল ক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নেন।
  7. পানিপথের যুদ্ধের জয় লাভের মাধ্যমে তাঁর যে রাজ্য বিস্তারের পথ শুরু হয় তা তিনি প্রায় একটানা ৪৫ বছর ধরে বজায় রেখেছিলেন। যার ফলস্বরূপ আকবর এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।
  8. দূরদৃষ্টি সম্পন্ন আকবর উপলব্ধি করেন যে,ভারতে মোগল সাম্রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজপুত জাতির সহযোগিতার বিশেষ প্রয়োজন। তিনি তাদের বশ্যতা স্বীকার এর বিনিময়ে স্বায়ত্য শাসন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দান করেন। ফলে একমাত্র মেবার রাজ্য ছাড়া বাকি সমস্ত রাজপুত রাজ্য ই আকবরের বশ্যতা মেনে নেন।
  9. ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ই জুন এই মেবারের রানা প্রতাপ সিংহের সঙ্গে আকবরের হলদিঘাটের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রতাপ সিংহ পরাজিত হন। আকবর মেবারের বেশ কিছু ভূখণ্ড দখল করেন।
  10. ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে খান্দেশ এর অসিরগর দুর্গ অভিযান ই ছিল তাঁর জীবনের শেষ অভিযান। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
  11. ভারত ইতিহাসে আকবর তাঁর উল্লেখযোগ্য কতগুলি সংস্কার ও মুসলিম হয়েও ব্যতিক্রমী কতগুলি সিদ্বান্ত গ্রহণের জন্য অমর হয়ে আছেন। যেমন…১- আকবরের রাজসভায় অনেক রাজপুত উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত ছিলেন। বিহারীমল, তাঁর পুত্র ভগবান দাস, ভগবান দাস এর পুত্র মানসিংহ উচ্চ মনসবদার পদে নিযুক্ত ছিলেন। রাজা টোডোরমল ছিলেন আকবরের সেনাপতি ও রাজস্ব সচিব। রাজা বীরবল ছিলেন আকবরের সর্বক্ষণের সঙ্গী।২- তিনি ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধবন্দীদের ক্রীতদাস এ পরিণত করা এবং তাদের বলপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার নীতি রহিত করেন।৩- তিনি মুসলিম দের উপর থেকে ” জাকাৎ” বা ধর্মকর বিলোপ করেন।৪- হিন্দুদের উপর থেকে ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে ” তীর্থ কর ” এবং ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ” জিজিয়া ” কর প্রত্যাহার করেন। তিনি ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রি প্রতিষ্ঠা করেন এবং গুজরাট জয়ের স্মারক হিসাবে ফতেপুর সিক্রি তে বিশ্ববিখ্যাত ” বুলন্দ দরওয়াজা “বা ” প্রবেশ দ্বার” নির্মাণ করেন।৫- ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে এক নির্দেশ দ্বারা তিনি চৌদ্দ বছরের কম বয়সী কোনো বালিকা বা ষোলো বছর কম বয়সী কোনো বালকের বিবাহ নিষিদ্ধ করেন।৬ – ধর্মের প্রকৃত সত্য ও উৎস নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে আকবর ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রি তে ” ইবাদৎখানা ” নামে একটি ধর্মীয় উপাসনা গৃহ নির্মাণ করেন।৭ – ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে আকবর শেখ মোবারক রচিত “মাহজারনামা” বা “ঘোষণাপত্র” জারি করে নিজেকে সাম্রাজ্যের সকল জাগতিক ও ধর্মীয় বিষয়ের প্রধান বলে ঘোষণা করেন।৮ – ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ( মতান্তরে ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে) আকবর “দিন – ই – ইলাহী” নামে এক একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রবর্তন করেন। “সুল ই কুল” বা সকল ধর্মের সার নিয়ে এই ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন আকবর।৯ – আকবর মনসবপ্রথার প্রবর্তক ছিলেন।এই প্রথায় পরবর্তীকালে মোগল শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।১০ – আকবর মনসবদারি প্রথায় দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য ” জাট ” ও ” সওয়ার ” পদ্ধতি চালু করেন।১১ – তিনি জনকল্যাণ মুখী ও দুর্নীতি মুক্ত ভূমি রাজস্ব ব্যাবস্থা গড়ে তোলার জন্য ” টোডোর মলের ব্যাবস্থা ‘ প্রচলন করেন।

জাহাঙ্গীর

  1. ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে অক্টোবর মহামতি আকবরের মৃত্যু হয়।
  2. অম্বরের রাজকন্যা যার মুসলিম নাম ছিল মরিয়ম, তাঁর গর্ভে আকবরের পুত্র সেলিমের জন্ম হয়। সেলিম সিংহাসনে বসার পর জাহাঙ্গীর উপাধি নেন।
  3. সেলিমের সিংহাসন লাভের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সেলিমের গর্ভজাত পুত্র এবং মানসিংহের ভাগ্নে খসরু শাহ। পাঞ্জাবের তরন তারনে শিখগুরু অর্জুন খসরু কে আশীর্বাদ করেন ও পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। জাহাঙ্গীর ক্ষুব্ধ হয়ে শিখগুরু অর্জুন কে আড়াই লক্ষ টাকা জরিমানা করেন। জাহাঙ্গীরের নির্দেশে তাঁকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয় এবং কারারক্ষীর অত্যাচারে তাঁর মৃত্যু হয়।
  4. গুরু অর্জুনের পর হর গোবিন্দ শিখ পন্থের গুরুর পদে বসেন। জাহাঙ্গীর তাঁকে তাঁর পিতার প্রদেয় জরিমানা দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু হরগোবিন্দ তা দিতে অস্বীকার করেন। জাহাঙ্গীর তাঁকে ১২ বছর গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দী করে রাখেন।
  5. এদিকে খসরু শাহ কেও জাহাঙ্গীর কারাগারে নিক্ষেপ করেন ও তাঁর দুই চোখ অন্ধ করে দেন।
  6. মদ্যপান ও অলসতা ছিল জাহাঙ্গীরের চরিত্রের অন্যতম দুর্বলতা। এইজন্যেই তিনি তাঁর প্রিয়তম পত্নী নূরজাহানের হাতের পুতুল এ পরিণত হন।
  7. এই নূরজাহানের পূর্ব নাম ছিল মেহেরউন্নিসা । তাঁর পিতা ছিলেন মির্জা গিয়াস বেগ নামে এক ইরানী। গিয়াসবেগের ভারতে আসার পথে কান্দাহারে মেহেরউন্নিসার জন্ম হয়। সতেরো বছর বয়সে আলিকুলি বেগ নামে এক ইরানী যুবকের সঙ্গে মেহের উন্নি সার বিবাহ হয়।
  8. আলি কুলি বেগ বাংলাদেশে জায়গির পান এবং শের আফগান উপাধি পান। কিছু দিনের মধ্যে শের আফগান উদ্ধত হয়ে উঠলে বাংলার শাসন কর্তা কুতুব উদ্দিন কোকার সাথে তাঁর সংঘর্ষ হয়। এবং শের আফগান নিহত হন।
  9. ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর মেহেরুন্নেসা কে বিবাহ করেন। তাঁর নাম দেন নূরজাহান বা জগতের আলো। স্মিথ নূরজাহান কে “সিংহাসনের পশ্চাতের শক্তি” বলে অভিহিত করেছেন। নূরজাহান কে “বাদশা বেগম” বা সাম্রাজ্যের প্রথম নারীর সম্মান দেওয়া হয়েছিল।

শাহজাহান (১৬২৭ – ১৬৫৮)

  1. শাহজাহান ছিলেন জাহাঙ্গীরের তৃতীয় পুত্র এবং তাঁর পূর্ব নাম ছিল খুরম। তিনি ছিলেন জগৎ গোসাই এর গর্ভজাত সন্তান। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান এর সঙ্গে আসফ খাঁর কন্যা মমতাজের বিবাহ হয়। পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনের কোনো দাবিদার না রেখেই তিনি দিল্লির সিংহাসন দখল করেন।
  2. শাহ জাহান ছিলেন একাধারে বুদ্ধিমান ও স্নেহপ্রবন।
  3. “বাদশাহ নামা” গ্রন্থের রচয়িতা আব্দুল হামিদ লাহোরী , ইনায়েৎ খাঁ প্রমুখ শাহ জাহান এর রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন।
  4. শিক্ষা প্রসারের জন্য তিনি বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলির মধ্যে “দার উল বাকা” নামে মাদ্রাসাটির উল্লেখ করা যায়।
  5. তাঁর আমলের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি বিদেশি পর্যটকদের ও প্রভাবিত করেছিল।
  6. তাঁর আমলের “দেওয়ান ই আম”, “দেওয়ান ই খাস” , জামা মসজিদ স্থাপত্য সৌন্দর্যের এক অপূর্ব নিদর্শন।
  7. মনি মুক্তা খচিত ময়ূর সিংহাসনটি শাহজাহান এর আড়ম্বরপ্রিয়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিল্পী বেবাদল খাঁর তত্ত্বাবধানে ও এক কোটি টাকা স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে এই সিংহাসনটি তৈরি হয়েছিল।
  8. তাঁর স্থাপত্য কীর্তির সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো আগ্রায় যমুনার তীরে তাজমহল। শিল্পী ঈশাকে তাজমহলের প্রধান পরিকল্পক বলে মনে করা হয়। মমতাজের এই স্মৃতি সৌধ তৈরি করতে ২২ বছর সময় লেগেছিল।
  9. দিল্লি নগরীকে নতুন করে গড়ে শাহজাহান নাম রেখেছিলেন শাহজাহানাবাদ।
  10. মোগল চিত্রশিল্পের ও উন্নতি হয়েছিলো। সব দিক থেকে শাহ জাহান এর রাজত্বকাল এ মোগল সাম্রাজ্য গৌরবের চরম শিখরে উঠেছিল বলা যায়।
  11. কিন্তু এত সমৃদ্ধি ও আড়ম্বর সত্বেও শাহজাহান এর রাজত্বকাল থেকেই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা দেখা যায়। তাঁর আরম্বর প্রিয়তার ফলে রাজকোষের প্রভূত ক্ষতি হয়। যা পরবর্তীকালে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
  12. শাহজাহান এর শেষ জীবন ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর জীবিত কালেই দারা, সুজা, মুরাদ, ঔরঙ্গজেব এর মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদ শুরু হয়ে যায়। বৃদ্ধ সম্রাট দারা কেই তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনয়ন করেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সিংহাসন নিষ্কণ্টক করে ঔরঙ্গজেব ই “আলমগীর পাদ শাহ গাজী” অভিধা গ্রহণ করে রাজত্ব শুরু করেন।

ঔরঙ্গজেব (১৬৫৮ – ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ)

  1. ঔরঙ্গজেব এর রাজত্বকাল কে দু ভাগে ভাগ করা যায়।
  2. ১৬৫৮ – ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দ : এই সময় তিনি উত্তর ও উত্তর পশ্চিম ভারত নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত সম্প্রসারণ , রাজপুতদের সঙ্গে যুদ্ধ প্রভৃতি নিয়েই তিনি এই সময় ব্যস্ত ছিলেন।
  3. ১৬৮২ – ১৭০৭ : এই সময় তিনি দক্ষিণ ভারতের সিয়া রাজ্য গুলি ও মারাঠাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন।
  4. আকবরের উদার নীতির ফলে রাজপুত রা মোগল সাম্রাজ্যের স্তম্ভ রূপে পরিণত হয়ে ছিল। কিন্তু ঔরঙ্গজেব এর অদূরদর্শী সাম্রাজ্য লিপ্সা ও ধর্মনীতি রাজপুতদের শত্রুতা অর্জন করে।
  5. তিনি উচ্চ রাজপদে রাজপুতদের নিয়োগ বন্ধ করে দেন এবং হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর চাপিয়ে দেন। যা মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পথ ক্রমশ প্রশস্ত করে।
  6. বিজাপুর ও গোলকুন্ডা দখলের পর ঔরঙ্গজেব শিবাজিকে দমন করার চেষ্টা শুরু করেন। সিংহাসন দখল করার পর তিনি ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে নিজ মাতুল শায়েস্তা খাঁ কে শিবাজীর বিরুদ্ধে পাঠান। শায়েস্তা খাঁ প্রথম দিকে সাফল্য লাভ করলেও শিবাজীর অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যায়। এরপর ঔরঙ্গজেব তাঁর দুই সুযোগ্য সেনাপতি জয় সিংহ ও দিলীর খাঁ কে শিবাজীর বিরুদ্ধে পাঠান। প্রতিকূল অবস্থার চাপে শিবাজী মোগলদের সঙ্গে পুরন্দরের সন্ধি করতে বাধ্য হন। সন্ধির শর্ত অনুসারে শিবাজীর পুত্র শম্ভুজীকে পাঁচ হাজারী মনসবদার পদে নিযুক্ত করা হয়।
  7. মোগল দরবারে উপস্থিত হলে ঔরঙ্গজেব শিবাজী কে নজরবন্দি করার চেষ্টা করেন। শেষপর্যন্ত শিবাজী পালিয়ে আসেন এবং রায়গড় দুর্গে শিবাজীর রাজ্য অভিষেক সম্পন্ন হয়। তিনি ছত্রপতি ও গো ব্রাহ্মণ পালক অভিধা গ্রহণ করেন। এই উপলক্ষে ঔরঙ্গজেব শিবাজী কে “রাজা” অভিধায় সম্মানিত করেন। অবশ্য কিছুদিন শান্তি বজায় রাখার পর আবার মোগল মারাঠা সংঘর্ষ শুরু হয়।
  8. দাক্ষিনাত্যেই ঔরঙ্গজেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ প্রসঙ্গে স্মিথ যথার্থ ই বলেছেন যে “দাক্ষিণাত্যেই সম্রাট ও মোগল সাম্রাজ্য কে কবর দেওয়া হয়।” দাক্ষিনাত্যেই ঔরঙ্গজেব শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে।

শিবাজী (১৬২৭ – ১৬৮০)

  1. ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে শিবনের পার্বত্য দুর্গে শিবাজীর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন শাহজী ভোঁসলে এবং মাতা ছিলেন জিজাবাঈ।
  2. মায়ের কাছে রামায়ণ ও মহাভারতের কথা শুনে শিশু কালেই তাঁর মনে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের সঞ্চার হোয়েছিল। মায়ের মত কোণ্ডদেবও তাঁর চরিত্র গ্রহণে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।
  3. রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হলেও “অস্ট প্রধান ” নামে আট জন মন্ত্রীর সাহায্যে তিনি রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা করতেন।
  4. সামরিক সংগঠনে শিবাজীর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। শিবাজীর সেনাবাহিনী “পদাতিক” ও “অশ্বারোহী” এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল।
  5. অশ্বারোহী বাহিনী দুইভাগে বিভক্ত ছিল। যথা বর্গী ও শিলাদার। বর্গী রা সরকার থেকে বেতন ও অস্ত্রশস্ত্র পেত। শিলাদাররা যুদ্ধের সময় সরকার থেকে বেতন পেত বটে, কিন্তু ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র নিজেদের নিয়ে আসতে হতো।
  6. তিনি পাশাপাশি রাজ্য গুলি থেকে চৌথ ও সরদেশমুখী কর আদায় করতেন। যা পরবর্তীকালে মারাঠাদের জনপ্রিয় তা ক্ষুন্ন করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 2 =