গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র

গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র (Democracy and Dictatorship)

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

১। “লিবারেলিজম” (Liberalism) গ্রন্থটির রচয়িতা কে ?
উত্তর : “লিবারেলিজম” (Liberalism) গ্রন্থটির রচয়িতা হবহাউস।

২। “সমাজতন্ত্র ছাড়া গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ”- উক্তিটি কার?
উত্তর “সমাজতন্ত্র ছাড়া গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ”– উক্তিটি অধ্যাপক ল্যাস্কির।

৩। “সার্বজনীন ভােটাধিকারের আগে সার্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে”—উক্তিটি কার?
উত্তর : “সার্বজনীন ভােটাধিকারের আগে সার্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে- উক্তিটি জন স্টুয়ার্ট মিল-এর।

৪। বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে কী বােঝায় ?
উত্তর : বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে বােঝায় প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারকে।

৫। কোন্ দেশে গণভোেট, গণউদ্যোগ, পদচ্যুতি ইত্যাদি প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি দেখা যায় ?
উত্তর :সুইজারল্যান্ডে গণভােট, গণউদ্যোগ, পদচ্যুতি ইত্যাদি প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি দেখা যায়।

৬। কী ধরনের শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরােধী ?
উত্তর : একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরােধী।

৭। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোন শ্রেণির একনায়কতন্ত্র দেখতে পাওয়া যায় ?
উত্তর : সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কতন্ত্র দেখতে পাওয়া যায়।

৮। কোন দেশে প্রথম গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণার সৃষ্টি হয়?
উত্তর : প্রাচীন গ্রিসে প্রথম গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণার সৃষ্টি হয়।

৯। “গণতন্ত্র হল জনগণকে নিয়ে গঠিত, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা”—কে বলেছেন?
উত্তর : আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, “গণতন্ত্র হল জনগণকে নিয়ে গঠিত, জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য পরিচালিত শাসনব্যবস্থা”।

১০। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র সম্ভব নয় কীরূপ রাষ্ট্রে?
উত্তর : বৃহৎ রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র সম্ভব নয়।

১১। কীরূপ সরকারের জন্য অবাধ নির্বাচন অপরিহার্য?
উত্তর : গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য অবাধ নির্বাচন অপরিহার্য।

১২। গণতন্ত্রকে ‘আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা’ বলেছেন কে ?
উত্তর : অধ্যাপক বার্কার বলেছেন, “গণতন্ত্র হল আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা।

১৩। গণতন্ত্র ‘মূর্খদের জন্য মূর্খদের দ্বারা মূর্খদের শাসন’—বলেছেন কে ?
উত্তর : গণতন্ত্র ‘মূর্খদের জন্য মূর্খদের দ্বারা মূর্খদের শাসন’ বলেছেন অধ্যাপক কার্লাইল।

১৪। কোন্ শাসনব্যবস্থায় এক নেতা, এক দল, এক রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর : একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এক নেতা, এক দল, এক রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৫। কোন শাসনব্যবস্থায় স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ থাকে না?
উত্তর : একনায়কতান্তিক শাসনব্যবস্থায় স্বায়ত্তশাসনের সুযােগ থাকে না।

১৬। কোন শাসনব্যথা অধ জাতীয়তাবাদকে প্রশ্রয় দেয় ?
উত্তর : একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অন্ধ জাতীয়তাবাদকে প্রশ্রয় দেয়।

১৭। জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র লক্ষ করা যায় কোন দেশে ?
উত্তর চিনে জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র লক্ষ করা যায়।

১৮। গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত কী?
উত্তর সর্বজনীন শিক্ষা গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত।

১৯। কোন শাসনব্যবস্থায় দলীয় স্বার্থের প্রাধান্য থাকে ?
উত্তর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দলীয় স্বার্থের প্রাধান্য থাকে।

২০। যথার্থ জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় কীরূপ শাসনব্যবস্থায় ?
উত্তর : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় যথার্থ জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

২১। সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : সংসদীয় গণতন্ত্র হল এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে নির্বাচিত আইনসভার নিকট দায়িত্বশীল ক্যাবিনেট আছে।

২২। কার নেতৃত্বে জার্মানিতে নাতসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ?
উত্তর হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানিতে নাতসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

২৩। একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাম লেখাে।
উত্তর : ভারতবর্ষ হল একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

২৪। কোন্ দেশে প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রচলিত?
উত্তর : সুইজারল্যান্ডে প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রচলিত।

২৫। ‘Government of the people, by the people, for the people’, কোন ধরনের শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ?
উত্তর : ‘Government of the people, by the poeple, for the people’ হল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য।

২৬। গ্রিক শব্দ DEMOs-এর অর্থ কী?
উত্তর : গ্রিক শব্দ DEMOS-এর অর্থ হল জনগণ।

২৭। ‘KRATIA’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর : ‘KRATIA’ শব্দের অর্থ হল শাসনব্যবস্থা।

২৮। ‘Political Ideals’ শীর্ষক গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর : ‘Political Ideals’শীর্ষক গ্রন্থের রচয়িতা হলেন সি. ভি. বানর্স।

২৯। ‘Representative Government’ শীর্ষক গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর : ‘Representative Government’ শীর্ষক গ্রন্থের রচয়িতা হলেন জন স্টুয়ার্ট মিল।

৩০। ‘Modern Democracies’ 111 গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর : ‘Modern Democracies’ শীর্ষক গ্রন্থের রচয়িতা হলেন লর্ড ব্রাইস।

৩১। “অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র অর্থহীন”—উক্তিটি কার?
উত্তর :অধ্যাপক ল্যাস্কি বলেছেন, “অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র। অর্থহীন।”

৩২। “নাগরিকদের নির্লিপ্ততার জন্যই গণতন্ত্র। আজ সংকটের সম্মুখীন”—উক্তিটি কার?
উত্তর : অধ্যাপক লয়েড বলেছেন, “নাগরিকদের নির্লিপ্ততার জন্যই গণতন্ত্র আজ সংকটের সম্মুখীন।”

৩৩। “একনায়কতন্ত্রে সুশাসনের তুলনায় স্বায়ত্তশাসনের খারাপ শাসনও ভালাে”কার উক্তি ?
উত্তর : অধ্যাপক ব্যানারম্যান বলেছেন, “একনায়কতন্ত্রে সুশাসনের তুলনায় স্বায়ত্তশাসনের খারাপ শাসনও ভালাে।”

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। গণতন্ত্র কাকে বলে ?
উত্তর : গ্রিক শব্দ DEMOS-এর অর্থ জনগণ এবং KRATOS-এর অর্থ শাসনব্যবস্থা, অর্থাৎ গণতন্ত্র হল জনগণের শাসন। আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কনের বহুল প্রচলিত সংজ্ঞাটি হল “গণতন্ত্র হল জনগণের শাসন, জনগণের দ্বারা শাসন ও জনগণের জন্য শাসন।” গার্নারের মতে, গণতন্ত্র হল সেই শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে।

প্রশ্ন ২। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সুবিধা কী?
উত্তর : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সুবিধাগুলি হল—(ক) শাসিতই এখানে শাসক—তাই শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। (খ) জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষিত হয়। (গ) ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। (ঘ) ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাম্যের সমর্থন করে। (ঙ) রাজনৈতিক শিক্ষা ও চেতনার প্রসার ঘটায়। (চ) দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়। (ছ) বিপ্লবের আশঙ্কা থেকে মুক্ত। (জ) দেশপ্রেমের সহায়ক (ঝ) সামগ্রিক কল্যাণ সম্ভব হয়।

প্রশ্ন ৩। গণতন্ত্রের ত্রুটি বা অসুবিধা কী?
উত্তর (ক) গুণের বা যােগ্যতার মূল্য উপেক্ষিত হয়। (খ) মূখ ও অশিক্ষিতের শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। (গ) রক্ষণশীল ধ্যানধারণা প্রশ্রয় পায়। (ঘ) মন্থরগতি শাসনব্যবস্থা। (ঙ) দলীয় স্বার্থপরতার কুফল দেখা দেয়। (চ) ধনতন্ত্রের পৃষ্ঠপােষকতা করে। (ছ) সংকটজনক পরিস্থিতির মােকাবিলায় ব্যর্থ। (জ) কার্যত সংখ্যালঘু শ্রেণির শাসন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ উপেক্ষিত।

প্রশ্ন ৪। একনায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ?
উত্তর : (ক) সর্বাত্মক রাষ্ট্র, (খ) পাশবশক্তির ওপর ভিত্তিশীল, (গ) উগ্র জাতীয়তাবাদ, (ঘ) ব্যক্তিপূজা, (ঙ) এক নেতা, এক দল, এক রাষ্ট্র ধারণা, (চ) অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাস।

প্রশ্ন ৫। গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তগুলি কী ?
উত্তর : গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্যে নিম্নলিখিত শর্ত থাকা প্রয়ােজন : (ক) মিলের মতে, গণতন্ত্রকে গ্রহণ করার ইচ্ছা ও যােগ্যতা, গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য সংগ্রামে প্রস্তুতি এবং জনগণকে অধিকার রক্ষা ও কর্তব্যপালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। (খ) গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনা। (গ) সর্বজনীন শিক্ষা। (ঘ) উপযুক্ত নেতৃত্ব। (ঙ) দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা। (চ) সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযােগের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ।

প্রশ্ন ৬। গণতন্ত্র সম্পর্কে আব্রাহাম লিঙ্কনের সংজ্ঞা কী?
উত্তর : আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্রকে জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা পরিচালিত জনগণের শাসনব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রশ্ন ৭। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় দেশের জনগণ প্রত্যক্ষভাবে দৈনন্দিনের শাসন কাজে অংশগ্রহণ করে, তাকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলে। প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র প্রচলিত ছিল।

প্রশ্ন ৮। পরােক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র বলতে কী বােঝায়?
উত্তর যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ না করে তাদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তাকে পরােক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র বলে।

প্রশ্ন ৯। গণতন্ত্র সম্পর্কে মার্কসীয় মত কী?
উত্তর মার্কসবাদীদের মতে, গণতন্ত্র জনগণের শাসন নয়। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে বড়াে লােক ও পুঁজিপতি শ্রেণি ক্ষমতা দখল করে। গণতন্ত্রে নাগরিকগণ বহুবিধ স্বাধীনতা ও অধিকার ভােগ করে বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জনগণ পুঁজিবাদী শাসকদের দ্বারা শােষিত ও উৎপীড়িত হয়।

প্রশ্ন ১০। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দুটি সুবিধা লেখাে।
উত্তর : (ক) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে নাগরিকগণ প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশগ্রহণ করে বলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। তাদের মধ্যে দায়িত্ববােধ বৃদ্ধি পায়। (খ) নাগরিকদের মধ্যে স্বদেশ প্রীতির মনােভাব জাগরিত হয়।

প্রশ্ন ১১। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দুটি অসুবিধা লেখাে।
উত্তর : (ক) বৃহৎ রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র অচল। (খ) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে ধরে নেওয়া হয় যে, জনগণ রাজনীতিতে সচেতন, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে সবাই সচেতন নয়।

প্রশ্ন ১২। পরােক্ষ গণতন্ত্রের দুটি সুবিধা লেখাে।
উত্তর : (ক) বৃহৎ রাষ্ট্রের পক্ষে পরােক্ষ গণতন্ত্র সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত। (খ) এই শাসনব্যবস্থায় সমস্ত নাগরিকের পরিবর্তে শাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক কিছু ব্যক্তি নির্বাচিত হয় জনগণের দ্বারা। এর ফলে যােগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা সরকার পরিচালিত হয় বলে ধরে নেওয়া হয়।

প্রশ্ন ১৩। পরােক্ষ গণতন্ত্রের দুটি অসুবিধা লেখাে।
উত্তর : (ক) পরােক্ষ গণতন্ত্রে অনেক সময় জনপ্রতিনিধিরা জনমতকে উপেক্ষা করে। এর ফলে গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। (খ) পরােক্ষ গণতন্ত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিযােগিতা ও মতভেদ দেখা দেয়। এর ফলে রাজনৈতিক আবহাওয়া দূষিত হয়। অনেক সময় অযােগ্য ও নিম্নমানের অশিক্ষিত ব্যক্তিরা আইনসভায় প্রবেশের সুযােগ পায়।

প্রশ্ন ১৪। গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্ত সম্পর্কে জন স্টুয়ার্ট মিলের বক্তব্য কী?
উত্তর : জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর ‘Representative Government’ গ্রন্থে গণতন্ত্রের সাফল্যের তিনটি শর্তের কথা বলেছেন। (ক) জনগণকে গনতন্ত্র গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হতে হবে, (খ) গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে, (গ) দায়িত্ব ও কর্তব্যপালনের জন্য নাগরিকদের উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন হতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে হতে হবে গণতান্ত্রিক মানুষ।

প্রশ্ন ১৫। বর্তমান যুগে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র সম্ভব নয় কেন?
উত্তর : বর্তমান যুগে (ক) বৃহদায়তন রাষ্ট্র, (খ) বিপুল জনসংখ্যা, (গ) জটিল ও ব্যাপক সমস্যা, (ঘ) অর্থনৈতিক সমস্যা প্রভৃতি কারণে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র অচল হয়ে পড়েছে।

প্রশ্ন ১৬। প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ গণতন্ত্রের পার্থক্য নির্দেশ করাে।
উত্তর : প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলতে সেই শাসনব্যবস্থা বােঝায় যাতে নাগরিকগণ প্রত্যক্ষভাবে শাসনকার্য। পরিচালনা করে। প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলিতে এ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। নাগরিক নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হয়ে আইন প্রণয়ন, রাজস্ব নীতি নির্ধারণ, সরকারি কর্মচারী নিয়ােগ করত। ক্ষুদ্রায়তন, স্বল্প- জনসংখ্যাবিশিষ্ট নগররাষ্ট্রেই এটি সম্ভব ছিল। বর্তমানের বৃহদায়তন জনবহুল রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র সদ্ধ নয়। সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি অংশে (Canton) এটা প্রচলিত আছে। পরােক্ষ গণতন্ত্র হল সেই শাসনব্যবস্থা যাতে সমগ্র জনসংখ্যা বা জনসংখ্যার অধিকাংশ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করে।

প্রশ্ন ১৭। আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দুটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করাে।
উত্তর : (ক) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রথম বৈশিষ্ট্য। (খ) আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্র নাগরিকদের রাজনৈতিক ও পৌর অধিকারের নীতিতে বিশ্বাসী।

প্রশ্ন ১৮। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দুটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করাে।
উত্তর : (ক) সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রথম বৈশিষ্ট্য হল, অর্থনৈতিক সাম্যের উপস্থিতি। (খ) ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ও সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের অপর বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন ১৯। একনায়কতন্ত্র কাকে বলে ?
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় শাসনক্ষমতা একজন বা কয়েকজনের হাতে ন্যস্ত থাকে তাকে বলা হয় একনায়কতন্ত্র। একনায়কতন্ত্র গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি হল বল বা শক্তি।

প্রশ্ন ২০। একনায়কতন্ত্রকে কয় শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়? সেগুলি কী কী?
উত্তর : সাধারণভাবে একনায়কতন্ত্রকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। সেগুলি হল—(ক) ফ্যাসিবাদ, (খ) সামরিক ও (গ) সাম্যবাদী একনায়কতন্ত্র। প্রকৃতি বিচারে একনায়কতন্ত্রকে ব্যক্তিগত, দলগত ও শ্রেণিগত-এই তিনভাগে বিভক্ত করা যায়।

প্রশ্ন ২১। একনায়কতান্ত্রিক শাসনের উদ্ভবের কারণগুলির দুটি উল্লেখ করো।
উত্তর : (ক) গণতন্ত্র রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের দাবি করলেও এর সঙ্গে অর্থনৈতিক মুখ্যতন্ত্র জড়িত থাকে। মানুষের দুঃখদুর্দশা হতাশা বিকল্প ব্যবস্থা চায়। (খ) গণতন্ত্র দলীয় শাসনব্যবস্থা, কিন্তু এই দলীয় ব্যবস্থায় সংঘর্ষ, দলীয় স্বার্থ এবং সরকারের স্থায়িত্বশীলতা একনায়কত্বের জন্ম দেয়।

প্রশ্ন ২২। একনায়কতন্ত্রের পক্ষে দুটি যুক্তি দাও।
উত্তর : (ক) জরুরি অবস্থায় কার্যকর একনায়কতন্ত্রে ক্ষমতা একজন বা কয়েকজনের হাতে থাকে বলে জরুরি অবস্থায় শাসক দ্রুত সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে। (খ) স্থায়িত্ব : গণতন্ত্রে সরকার ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়। এতে সরকারের স্থায়িত্ব বিঘ্নিত হয়। অনেক সময় দলাদলির জন্য সরকার ভেঙে যায়। একনায়কতন্ত্রে সরকারের পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে না। একনায়কতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।

প্রশ্ন ২৩। একনায়কতন্ত্রের বিপক্ষে দুটি যুক্তি দাও।
উত্তর : (ক) একনায়কতন্ত্রে ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। জনগণের স্বাধীনতা পদদলিত হয়। মানুষ ভয়ে ও আতঙ্কে জীবন কাটায়। (খ) একটিমাত্র রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালায়। অন্য দলকে কাজ করতে দেওয়া হয় না। জনগণ রাজনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না।

বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : গণতন্ত্র কথাটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল,—“Democracy”। এই শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ, “Demos” ও “Kratos”শব্দ থেকে এসেছে। Demos-এর অর্থ হল জনগণ এবং Kratos- এর অর্থ হল শাসন। সুতরাং আক্ষরিক অর্থে জনগণের শাসনকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।
   তথাপি গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন এর দেওয়া সংজ্ঞা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। তিনি বলেছেন, “Democracy is a government of the people, by the people and for the people,” অর্থাৎ গণতন্ত্র হল জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।
   জনগণের দ্বারা (by the people) বলতে সমগ্র জনগণের দ্বারা বােঝালেও বর্তমানে রাষ্ট্রের বৃহৎ আয়তনের জন্য জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচন করে। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, তারাই দেশ শাসন করে। সেই কারণে বর্তমানে গণতন্ত্রকে বলা হয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র।
   জনগণের শাসন (of the people) বলতে বােঝায়, জনগণের প্রয়ােজন এবং ইচ্ছানুসারে সরকার নীতিনির্ধারণ করবে।
   জনগণের জন্য (for the people) বলতে বােঝায়, জনগণের কল্যাণের জন্য সরকার কাজ করে। গণতন্ত্র বিশ্বাস করে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা সুপ্ত শক্তি আছে। তার বিকাশসাধনের জন্য গণতান্ত্রিক সরকার সচেষ্ট হবে।
   সুতরাং বলা যায়, যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং সেই কারণে এটি জনগণের দ্বারা বা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যেখানে জনগণের ইচ্ছা অনুসারে নীতি নির্ধারিত হয় এবং যার উদ্দেশ্য হল, জনগণের কল্যাণ ও বিকাশসাধন করা, তাকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবথা।

প্রশ্ন ২) গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কী সুবিধা আছে ?
উত্তর : বর্তমানে গণতন্ত্র সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে এখন এর কোনাে বিকল্প নেই। মিল, বার্কার, ল্যাস্কি প্রভৃতি চিন্তাবিদরা গণতন্ত্রকে সমর্থন করেছেন। এর সুবিধাগুলি হল নিম্নরূপ-
• (ক) সাম্যনীতি
গণতন্ত্র সাম্যনীতিতে বিশ্বাসী। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে আইনের চোখে সকলে সমান। প্রত্যেকে সমান মর্যাদা ও সমান সুযােগসুবিধার অধিকারী। ভারত গণতান্ত্রিক দেশ বলে সংবিধানের ১৪নং থেকে ১৮নং ধারায় এই নীতি স্বীকৃত হয়েছে।
• (খ) বিপ্লবের আশঙ্কা কম
মানুষ পরিবর্তন চায়। বিশেষ করে স্বৈরাচারী সরকারের পরিবর্তন কাম্য। যখন সহজে তা হয় না, তখন রক্তাক্ত বিপ্লবের পথ নেয়। কিন্তু তাতে জনগণকে অনেক মূল্য দিতে হয়। গণতন্ত্রে বুলেটের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন সম্ভব বলে এখানে বিপ্লবের সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।
• (গ) মৌলিক অধিকার ভােগ
ব্যক্তির বিকাশের জন্য অধিকার ভােগের সুযােগ থাকা দরকার। গণতন্ত্রে জনগণ এই অধিকার ভােগ করতে পারে। শুধু তাই নয়, অধিকার ভঙ্গের ক্ষেত্রে প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে। যেমন, সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে প্রতিকারের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
• (ঘ) স্বৈরাচারীতা রােধ
গণতন্ত্রে সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না। কারণ, এখানে শাসকগােষ্ঠী তাদের কাজের জন্য আইনসভা ও জনগণের কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকে। জনগণ সরকারের সমালােচনা করে তাকে সংযত করে রাখে।
• (ঙ) দেশপ্রেম বৃদ্ধি
গণতন্ত্রে জনগণ নিজেরা সরকার গড়ে এবং তার পরিবর্তন ঘটায়। তাই সরকারকে নিজেদের সরকার বলে মনে করে। এতে সরকারের ও দেশের প্রতি ভালােবাসা জন্মায়।
• (চ) রাজনৈতিক চেতনার প্রসার
গণতন্ত্রে জনগণ শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করার সুযােগ পায়। বিশেষ করে গণতন্ত্রে স্বীকৃত স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থায় অনেক বেশি মানুষ শাসনকার্যে অংশ নেয়। এতে রাজনৈতিক চেতনার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
• (ছ) আইনের অনুশাসন
গণতন্ত্রে আইনের অনুশাসন থাকে। অর্থাৎ আইনকে সকলের উপরে স্থান দেওয়া হয়। আইনের চোখে দোষী প্রমাণিত হলে, তবে মানুষ শাস্তি পাবে। খেয়াল-খুশিমতাে কেউ শাস্তি দিতে পারবে না। পদমর্যাদার সুযােগ নিয়ে কেউ শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে না।

প্রশ্ন ৩) গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ত্রুটিগুলি ব্যাখ্যা করাে।
উত্তর গণতন্ত্র শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা হলেও অ্যারিস্টটল, কার্লাইল, হেনরি মেইন প্রমুখরা এর সমালােচনা করেছেন। তাদের যুক্তিগুলি হল—
• (ক) অশিক্ষিতের শাসন
গণতন্ত্রে বেশিরভাগ মানুষই অশিক্ষিত ও অজ্ঞ। তাদের দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা ভালাে হতে পারে না। কার্লাইল তাই বলেছেন, “Democracy is a government of the fools, for the fools and by the fools.” অর্থাৎ গণতন্ত্র হল মূখদের দ্বারা, মূখদের জন্য, মূর্খদের শাসন।
• (খ) অস্থায়ী শাসন
হেনরি মেইন গণতন্ত্রকে অস্থায়ী শাসনব্যবস্থা বলে বর্ণনা করেছেন। কারণ, স্বার্থের দ্বন্দ্বে যে-কোনাে সময় সরকার ভেঙে যেতে পারে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। বারবার নির্বাচনে অর্থের অপচয় হয়।
• (গ) দলব্যবস্থার কুফল
দলব্যবস্থার কুফল আছে। গণতন্ত্রে সেগুলি প্রকট হয়। যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে, দলের স্বার্থকে বড়াে করে দেখে। দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়ােগ হয়। তাতে প্রশাসনের মান নেমে যায়।
• (ঘ) ব্যয়বহুল
গণতন্ত্রে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন হয়। তা ছাড়া, মধ্যবর্তী নির্বাচনও হয়। এতে অনেক অর্থের অপচয় হয়। তাই অনেকেই দরিদ্র দেশে গণতন্ত্রকে বিলাসিতা বলে মনে করে।
• (ঙ) রক্ষণশীলতা
জনগণের অধিকাংশ অশিক্ষিত ও অজ্ঞ। গণতন্ত্রে তারাই প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হয়। তারা সাধারণত রক্ষণশীল হয়। তাই তারা কোনাে প্রগতিশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
• (চ) সংখ্যালঘুদের স্বার্থহানি
গণতন্ত্র হল জনগণের শাসনব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে গণতুন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠেরা সরকার গঠন করে নিজেদের স্বার্থপূরণের চেষ্টা করে। ফলে সংখ্যালুঘদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।
• (ছ) আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য
গণতন্ত্রে সাধারণত মন্ত্রীদের যােগ্যতার অভাব থাকে। এই সুযােগে আমলারা শাসনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। জনসাধারণের সুখ-দুঃখের সঙ্গে তাদের কোনাে সম্পর্ক থাকে না। অনুভূতিও থাকে না।
• (জ) যােগ্যতার কদর নেই
গণতন্ত্রে যােগ্যতার বিশেষ স্থান নেই। কারণ, গুণের বিচারে নয়, সংখ্যার বিচারে এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাই নিৎসে বলেছিলেন, গণতন্ত্র হল জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের প্রতি অবজ্ঞা।

প্রশ্ন ৪) উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করাে।
উত্তর : অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাসে ইউরােপে সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে পুঁজিপতি শ্রেণির ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য গণতন্ত্রের মতাদর্শ প্রচার করা হয়। এর ফলে ব্রিটেনে গৌরবময় বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত হয়। জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, যে শাসনব্যবস্থায় জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে তাকেই গণতন্ত্র বলে। বার্কার, ডাইসি প্রমুখ উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসাবে পরিচিত। টমাস পেইন, মন্তেস্কু, মিল প্রমুখের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে মার্কিন সংবিধান রচিত হয়। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
   রাজনৈতিক সাম্যের উপর গুরুত্ব আরােপ করা হয়। রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন সংবিধানে নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, সভাসমিতির অধিকার ইত্যাদির উপর গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে।
   উদারনৈতিক গণতন্ত্র জনগণের উন্মুক্ত দল ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক দল ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়।
   উদারনৈতিক গণতন্ত্র সার্বজনীন ভােটাধিকারকে গণতন্ত্রের সাফল্যের প্রধান শর্ত মনে করে। ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক ভােটদানের অধিকারী।
   ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার হল উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তি। মার্কিন সংবিধানে গণতন্ত্রের ভাবমুর্তি রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি হিসাবে কাজ করে। মার্কিন সংবিধানে গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি হিসাবে কাজ করে। মার্কিন সংবিধানে সুপ্রিমকোর্টকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ৫) সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের অর্থ কী ?
উত্তর : সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র শব্দটি রাষ্ট্রদর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৭ সালে সােভিয়েত দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। উদারনৈতিকগণতন্ত্র গণতন্ত্রের আদর্শকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করার পক্ষপাতী। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র হল এরূপ এক ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র অর্থহীন। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের ভিত্তি হল মার্কসবাদ ও লেনিনবাদ। এরূপ গণতন্ত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যায়—(ক) অর্থনৈতিক সাম্য, (খ) একদলীয় ব্যবস্থা, (গ) অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি, (ঘ) ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলােপ, (ঙ) রাষ্ট্রকর্তৃক শ্রম ও ভােগের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ।
   সুতরাং, সমাজতান্ত্রিকগণতন্ত্র সমস্ত ক্ষেত্রেই সাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্যেই আদর্শ গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই দিক থেকে গণতন্ত্রের তুলনায় সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে শ্রেষ্ঠ বলা যায়। (Socialist Democracy is a better form of democracy based on the rule of majority over minority.)

প্রশ্ন ৬) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলতে কী বােঝ? প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের গুণাগুণ আলােচনা করাে।
উত্তর : গণতন্ত্র দুই প্রকারের, প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ গণতন্ত্র। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে জনগণ সরাসরি শাসন কাজে অংশগ্রহণ করে। প্রাচীন গ্রিস দেশের নগর রাষ্ট্রগুলিতে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র চালু ছিল। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি ক্যান্টনে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র চালু আছে। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের কয়েকটি সুবিধা আছে। তা হল-

সুবিধা
(ক) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে নাগরিকগণ প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশগ্রহণ করে বলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। তাদের মধ্যে দায়িত্ববােধ বৃদ্ধি পায়।
(খ) নাগরিকদের মধ্যে স্বদেশপ্রীতির মনােভাব জাগরিত হয়।
(গ) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র অত্যন্ত সহজ সরল। কারণ শাসনব্যবস্থার সব কাজ জনগণ নিজেরাই সম্পাদন করে।
(ঘ) এইরূপ শাসনব্যবস্থা ব্যয়বহুল নয়।
(ঙ) পরােক্ষ গণতন্ত্রের কুফলগুলি প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে দেখা যায় না।
(চ) দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। কারণ জনগণ সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।

অসুবিধা
(ক) বৃহৎ রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র অচল।
(খ) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে ধরে নেওয়া হয় যে, জনগণ রাজনীতিতে সচেতন, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে সবাই সচেতন নয়।
(গ) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র অনেক সময় সমাজে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে।

প্রশ্ন ৭) পরােক্ষ গণতন্ত্রের গুণাগুণ আলােচনা করাে।
উত্তর : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে পরােক্ষ গণতন্ত্রকে বােঝায়। পরােক্ষ গণতন্ত্রে জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভায় বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি প্রেরণ করে ও জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা শাসন কার্য পরিচালিত হয় বলে এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র বলা হয়। এইরূপ গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়িত্বশীল থাকেন। আজকের দিনে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই পরােক্ষ গণতন্ত্র দেখতে পাওয়া যায়।

পরােক্ষ গণতন্ত্রের সুবিধা
(ক) বৃহৎ রাষ্ট্রের পক্ষে পরােক্ষ গণতন্ত্র সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।
(খ) এই শাসনব্যবস্থায় সমস্ত নাগরিকের পরিবর্তে শাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক কিছু ব্যক্তি নির্বাচিত হয় জনগণের দ্বারা। এর ফলে যােগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা সরকার পরিচালিত হয় বলে ধরে নেওয়া হয়।
(গ) এইরূপ শাসনব্যবস্থায় শাসকশ্রেণি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয় এবং জনগণের কাছে দায়িত্বশীল থাকে।
(ঘ) জনগণ নির্দিষ্ট সময়ের পর সরকার পরিবর্তনের সুযােগ পায়।

পরােক্ষ গণতন্ত্রের অসুবিধা
(ক) পরােক্ষ গণতন্ত্রে অনেক সময় জনপ্রতিনিধিরা জনমতকে উপেক্ষা করে। এর ফলে গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়।
(খ) পরােক্ষ গণতন্ত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিযােগিতা ও মতভেদ দেখা দেয়। এর ফলে রাজনৈতিক আবহাওয়া দূষিত হয়। অনেক সময় অযােগ্য ও নিম্নমানের অশিক্ষিত ব্যক্তিরা আইনসভায় প্রবেশের সুযােগ পায়।
(গ) এইরূপ শাসনব্যবস্থায় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি বাসা বাঁধে। অর্থের বিনিময়ে দলত্যাগ ঘটে। নির্বাচনব্যবস্থা প্রহসনে পরিণত হয়।
(ঘ) পরােক্ষ গণতন্ত্র ব্যয়বহুল।
(ঙ) জনপ্রতিনিধিরা জনস্বার্থ বিরােধী কাজ করলে নির্বাচনের আগে অথবা নির্বাচিত হবার পর তাদের অপসারণ করা যায় না। জনমতে সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটা অনীহা দেখা দেয়। তবে এই অসুবিধাগুলি দূর করার জন্য কয়েকটি উপায় আছে। এগুলিকে বলা হয় প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিগুলি হল গণভােট, গণউদ্যোগ ও প্রতিনিধি প্রত্যাহার। সুইজারল্যান্ডের শাসনব্যবস্থায় গণভােট এবং গণউদ্যোগের ব্যবস্থা আছে।

প্রশ্ন ৮। ভারতে গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে গণতান্ত্রিক দেশ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গণতন্ত্রকে সফল করার জন্যে সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তথাপি ভারতে গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তগুলি কতটুকু আছে, তা নিয়ে বির্তকের অবকাশ আছে।

অধিকাংশ শর্ত নেই
প্রথমত, অর্থনৈতিক সাম্য গণতথ্যের ভিত্তি। কিন্তু ভারতে তা নেই। এখন প্রায় 8৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে। ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। বেকারত্ব গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।
দ্বিতীয়ত, গণতখের সাফল্যের একটি শর্ত হল শিক্ষা। কিন্তু ভারতে ৩৫ প্রায় অর্ধেক মানুষ অক্ষরজ্ঞানহীন। এই কারণে তারা কুসংস্কারের শিকার হয়েছে। অধিকার সম্পর্কে সত। হতে পারেনি।
তৃতীয়ত, গণতন্ত্রকে সফল করতে বলিষ্ঠ জনমতো প্রয়োজন। এর জন্যে সঠিক সংবাদ পরিবেশন দরকার। কিন্তু ভারতে সংবাদের মাধ্যমগুলি যেমন- রেঙিয়ে এবং টেলিভিশন সরকারি নিয়ন্ত্রিত। আবার সংবাদপত্রগুলি ধনিকশ্রেণির কুক্ষিগত। তাই সত্য সংবাদ পরিবেশিত হয় না।
চতুর্থত, ভারতে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দক্ষতা এবং কর্মনিষ্ঠার একান্ত অভাব আছে। দুনীতিপরায়ণ কর্মচারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে গণতন্ত্র কখনোই সফল হতে পারে না।
পঞ্চমত, ভারতে বিরােধীদের মধ্যে ঐক্য না থাকায় শক্তিশালী বিরােধী দল গড়ে ওঠেনি। ত্য ছাড়া, দলগুলির মধ্যে সহনশীলতারও অভাব আছে।

সাফল্যের শর্ত আছে
প্রথমত, ভারতে সার্বজনীন ভােটাধিকার স্বীকৃত। ১৮ বছর বয়সের নাগরিকদের ভােটাধিকার দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের মধ্যে ভােটদানের উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, এখানে লিখিত সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকার ও তার প্রতিবিধানের অধিকার সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা হয়েছে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে অনুন্নত জাতিদের জন্য বিশেষ সুযােগসুবিধা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশমূলক নীতিতে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থত, ভারতে নিরপেক্ষ আদালত হিসাবে সুপ্রিমকোর্ট আছে। এই আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যা ও জনগণের অধিকার রক্ষা করে। পঞ্চমত, পঞ্চায়েতিব্যবস্থা চালু করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন ৯) একনায়কতন্ত্রের সংজ্ঞা নির্দেশ করে।
উত্তর : পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা জন্ম নিয়েছে। যেমন, রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র প্রভৃতি। এদের মধ্যে নিন্দিত শাসনব্যবস্থা হল একনায়কতন্ত্র। প্রাচীনকালে একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। তবে আধুনিক একনায়কতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি এবং কর্মপরিধি প্রাচীনকালের একনায়কতন্ত্রের সীমারেখাকে ছাড়িয়ে গেছে।
   একনায়কতন্ত্র বলতে বােঝায়—একজন নায়কের শাসন। এটি গণতন্ত্রের বিপরীতধর্মী। গণতন্ত্রে বহুজনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। একনায়কতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় একজনের শাসন। একনায়ক রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে সব বিরােধী শক্তিকে নস্যাৎ করে অবাধ ও চুড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়ােগ করে দেশ চালায়। একজনের এই অবাধ এবং অপ্রতিহত শাসনকে বলে একনায়কতন্ত্র। নিউম্যানের ভাষায় বলা যায়, “একনায়কতন্ত্র বলতে বােঝায় এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে কোনাে ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষমতা দখল করে অবাধে স্বৈরী ক্ষমতা প্রয়ােগ করে।”
   একনায়কতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল—একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব। সংবাদপত্র ; বেতার ও টেলিভিশনের উপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রের জন্য ব্যক্তি—এই নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা। একনায়কতন্ত্রের আধুনিক উদাহরণ হল—জার্মানির হিটলার ও ইটালিতে মুসােলিনির শাসন।

প্রশ্ন ১০) একনায়কতন্ত্রের সুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : একনায়কতন্ত্র হল গণতন্ত্রবিরােধী। তাই এটি জনগণের কাছে স্থায়ীভাবে গ্রহণযােগ্য নয়। তথাপি এর কতকগুলি গুণ আছে যা অস্বীকার করা যাবে না।
• (ক) দক্ষ ব্যক্তির শাসন
কার্লাইল বলেছেন গণতন্ত্র হল নির্বোধের শাসন। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে দক্ষ ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষ ব্যক্তির নেতৃত্বে দেশ সহজে এগিয়ে যেতে পারে।
• (খ) দলীয় কোন্দল থাকে না
গণতন্ত্রে অনেক দল থাকে। এদের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে আইনসভা যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ ধরে। দলত্যাগ এবং আইনসভার সদস্যদের বেচাকেনা গণতন্ত্রকে কলুষিত করে। তাই কাজের কাজ কিছু হয় না। একনায়কতন্ত্রে দলীয় কোন্দল শাসনব্যবস্থাকে কলুষিত করে না।
• (গ)জরুরি অবস্থার উপযােগী
দেশের সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তা না হলে দেশ সংকটের মধ্যে পড়ে। একনায়ক এককভাবে অবাধ ক্ষমতাভােগ করে বলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
• (ঘ)স্বদেশপ্রেম জাগায়
সাধারণত জাতির জীবনে যখন হতাশা আসে, তখন একনায়কের আবির্ভাব হয়। সে জাতীয় জীবনে নতুন আশা জাগিয়ে জনগণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
(ঙ)আর্থিক উন্নতি সম্ভব
দেশের আর্থিক কাঠামােকে শক্তিশালী করতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হয় বলে দ্রুত উন্নতির পথ প্রশস্ত হয়।
• (চ)সমাজে শান্তি আসে
গণতন্ত্রে জননেতাদের আশ্রয়পুষ্ট হয়ে দুষ্কৃতকারীরা অবাধে দৌরাত্ম্য করে। সমাজজীবনে শান্তি বিঘ্নিত হয়। একনায়কতন্ত্রে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয় বলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রশ্ন ১১ একনায়কতন্ত্রের ত্রুটি বা কী কী অসুবিধা আছে ?
উত্তর : • (ক) পশুশক্তির প্রভাব
একনায়কতন্ত্র পশুশক্তিকে আশ্রয় করে টিকে থাকে। জোর করে মানুষের আনুগত্য আদায় করে। আইনের অনুশাসন থাকে না। জনগণ ভয়ে তাকে মান্য করে। তাই তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযােগিতা পাওয়া যায় না।
• (খ) স্বাধীনতা ও সাম্য নেই
ব্যক্তির বিকাশের জন্য স্বাধীনতা প্রয়ােজন। একনায়কতন্ত্রে স্বাধীনতা থাকে না। সাম্যনীতি এখানে স্বীকৃত হয় না। কারণ, একনায়কতন্ত্র বিশ্বাস করে, কিছু লােক শাসন করার জন্য জন্মায়, কিছু লােক জন্মায় শাসিত হবার জন্যে।
• (গ) জাতীয়তাবাদের জন্ম
উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রতিটি জাতি নিজের বংশ, সাহিত্য সংস্কৃতি প্রভৃতিকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। অপরের ধর্ম, সংস্কৃতি, প্রভৃতিকে হেয় করার চেষ্টা করে, এমনকি ঘৃণা করে। একনায়কতন্ত্র উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়ে জাতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। জাতির ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে। যেমন, হিটলার বংশগত ঐক্যের ভিত্তিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করে বিশ্ব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিলেন।
(ঘ) বিপ্লবের সম্ভাবনা
একনায়কতন্ত্রে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সম্ভাবনা থাকে। কারণ, এখানে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ফলে দমন পীড়ন চলে। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিকারের কোনাে উপায় থাকে না। তাই ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ক্ষোভ থেকে দেখা দেয় বিপ্লব।
• (ঙ) স্বেচ্ছাচারী শাসন
অ্যাক্টন (Acton) বলেছেন,—“ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। বেশি ক্ষমতা বেশি কলুষিত করে।” একনায়ক বেশি ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে অভ্রান্ত মনে করে। আকাক্ষা সীমাহীন হয়ে যায়। অথচ কোনাে বাধা থাকে না। তখন সে স্বেচ্ছাচারী শাসকে পরিণত হয়।
• (চ) অর্থের অপচয়
একনায়ক ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিরাট গুপ্তচর বাহিনী নিয়ােগ করে। সদাসর্বদা যুদ্ধের উন্মাদনা সৃষ্টি করতে বিরাট সেনাবাহিনী তৈরি করে। সামরিক খাতে বিরাট খরচ, অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রশ্ন ১২) একনায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য আলােচনা করাে।
উত্তর : একনায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ
প্রথমত, একনায়কতন্ত্রে একজন নায়কের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তার হাতে সমস্ত ক্ষমতা থাকে। এই ক্ষমতা সে অবাধভাবে প্রয়ােগ করে। জনগণের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয় না।
দ্বিতীয়ত, একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্র হল সর্বশক্তিমান। রাষ্ট্র ব্যক্তিকে সব দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যক্তি এখানে রাষ্ট্রের জন্য। ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র নয়।
তৃতীয়ত, একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য করা হয় না। তাই ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই বলতেন—“I am the State” অর্থাৎ আমিই রাষ্ট্র।
চতুর্থত, একনায়কতন্ত্রে একটিমাত্র রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকে। যেমন, হিটলারের সময় জার্মানিতে শুধুমাত্র জাতীয় সমাজতন্ত্রী দলের অস্তিত্ব ছিল।
পঞ্চমত, একনায়কতন্ত্র সাম্যনীতিতে বিশ্বাসী নয়। একনায়কতন্ত্র বিশ্বাস করে, কিছু লােক শাসন করার জন্য জন্মায়। কিছু লােক জন্মায় কেবলমাত্র শাসিত হবার জন্যে।
ষষ্ঠত, একনায়কতন্ত্রে সরকারের স্থায়িত্বের জন্য একনায়কতন্ত্র বিরাট গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তােলে। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বা বিরােধিতা দেখা দিলে, একনায়ক গুপ্তচর মারফত সংবাদ সংগ্রহ করে তা দমন করার চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসাবে হিটলারের গোপো। এবং মুসােলিনির কালাে কোর্তা গুপ্তচর বাহিনীর উল্লেখ করা যায়।
সপ্তমত, মিথ্যা প্রচার একনায়কতন্ত্রের আর একটি বৈশিষ্ট্য। একনায়ক মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতা দখল করে রাখতে চায়।
অষ্টমত, একনায়কতন্ত্র যুদ্ধবাদকে সমর্থন করে। মুসােলিনি বলেছিলেন,—“মহিলাদের কাছে মাতৃত্ব যেমন, পুরুষদের কাছে যুদ্ধ তেমনি অপরিহার্য।” একনায়কতন্ত্র মনে করেন যুদ্ধের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ হয়, সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়।
নবমত, একনায়কতন্ত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়। একনায়কের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে বলে। এর স্লোগান হল—“বিশ্বাস করাে, মান্য করাে, যুদ্ধ করাে।”

প্রশ্ন ১৩) একনায়কতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ করাে।
উত্তর : একনায়কতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ নিম্নরূপ
• (ক) ব্যক্তিগত ও সামরিক একনায়কতন্ত্র
যখন কোনাে ব্যক্তি রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা দখল করে অবাধে তা প্রয়ােগ করে, তখন তাকে বলা হয় ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র। সেনাবাহিনীর কোনাে অধিনায়ক যখন সৈন্যদের সাহায্য নিয়ে রাষ্ট্রের শাসন। ক্ষমতা দখল করে অবাধে স্বৈরী ক্ষমতা প্রয়ােগ করে, তখন তাকে বলে সামরিক একনায়কতন্ত্র। সংবিধান বহির্ভূত উপায়ে ক্ষমতা দখল করে ব্যক্তিগত বা সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। যেমন, পাকিস্তানের আয়ুব খাঁ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইনসম্মত সরকারকে উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করেছিলেন। আবার অনেক সময় আইন অনুমােদিত পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। জার্মানিতে হিটলার এরূপ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে ব্যক্তিগত হােক বা সামরিক একনায়কতন্ত্র হােক, প্রত্যেকের পিছনে রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনীর সমর্থন থাকে।
• (খ) দলগত একনায়কতন্ত্র
একটি দল রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা দখল করে যখন অবাধ ক্ষমতা প্রয়ােগ করে এবং অন্য সব দলের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তখন তাকে বলে দলগত একনায়কতন্ত্র। ইটালিতে ফ্যাসিস্ট দলের একনায়কতন্ত্র এর উদাহরণ। অবশ্য দলগত একনায়কতন্ত্র শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। যেমন, ইটালিতে মুসােলিনি দলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
• (গ) শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র
শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র বলতে বােঝায়—কোনাে এক বিশেষ শ্রেণির অবাধ শাসন। মার্কসবাদীদের মতে রাষ্ট্র শ্রেণি-শােষণের যন্ত্র। শােষণের অবসান ঘটাতে সর্বহারা শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। একে বলা হয় শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র। যেমন ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনে এই ধরনের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই একনায়কতন্ত্র গণতন্ত্রের বিরােধী নয় বলে অনেক মনে করেন। কারণ, এই শাসন শােষণের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।

প্রশ্ন ১৪) গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের পার্থক্য দেখাও।
উত্তর : গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে প্রকৃতি ও আদর্শগত পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যগুলি হল –
(ক) গণতন্ত্রে শাসকগণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে। জনগণের স্বার্থে কাজ করেন। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে শাসকগণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন না। তাই জনগণের নিকট দায়ী থাকেন না।
(খ) গণতন্ত্র ব্যক্তিজীবনের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে। একনায়কতন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যসাধনের যন্ত্রমাত্র বলে মনে করে। রাষ্ট্রের জন্য ব্যক্তি হবে উৎসর্গীকৃত প্রাণ।
(গ) গণতন্ত্র সাম্য ও স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমানাধিকার গণতন্ত্র স্বীকার করে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাম্য নীতিতে একনায়কতন্ত্র বিশ্বাসী নয়।
(ঘ) গণতন্ত্র একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বীকার করে। কিন্তু একনা , তন্ত্র সকল বিরােধিতা বলপূর্বক দমন করে একদলীয় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে।
(ঙ) জনমত গণতন্ত্রের প্রাণবস্তু ; জনমতের দ্বারাই সরকারের স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। একনায়কতন্ত্র আলাপ-আলােচনা বা মতবিনিময়ের পদ্ধতিতে বিশ্বাস করে না। যান্ত্রিক নিয়মানুবর্তিতা এবং পুলিশ মিলিটারির সাহায্যে সমগ্র জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করাই একনায়কতন্ত্রের লক্ষ্য।
(চ) স্বায়ত্তশাসনের নীতি গণতন্ত্র স্বীকার করে। নাগরিকের সহযােগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ সফলতা-ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে। একনায়কতন্ত্র স্বায়ত্তশাসনের নীতিতে বিশ্বাস করে । ব্যক্তিগত যােগ্যতা, দক্ষতা, নেতৃপূজা একনায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য।
(ছ) গণতন্ত্রে বিভিন্ন দলের অস্তিত্ব, সাংগঠনিক দুর্বলতা, দলত্যাগ প্রভৃতি কারণে সরকারের ঘন ঘন পরিবর্তন হতে পারে। স্থায়ী শাসননীতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। একনায়কতন্ত্রে রাজনৈতিক দলাদলির ওপরে উঠে বলিষ্ঠ দক্ষ নেতৃত্বে স্থায়ী শাসননীতি প্রবর্তন করতে পারে।
(জ) যুদ্ধ, বহিরাক্রমণ, অর্থনৈতিক সংকটজনিত জরুরি অবস্থায় গণতন্ত্র সার্থকভাবে কাজ করতে পারে না। কিন্তু একনায়কের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে যে-কোনাে পরিস্থিতিতে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
(ঝ) গণতন্ত্রে জনগণ সরকারের সমালােচনা করতে পারে, এবং প্রয়ােজন হলে বিপ্লবের পথ ছাড়াই ব্যালটের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন করতে পারে। একনায়কতন্ত্র ব্যালট অপেক্ষা বুলেট এর ওপর বেশি আস্থাশীল। রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যম ছাড়া স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানাে সম্ভব নয়।
(ঞ) গণতন্ত্র আন্তর্জাতিক সহযােগিতা, মৈত্রী ও শান্তির আদর্শে বিশ্বাস করে। একনায়কতন্ত্র। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে আস্থাশীল বলে উগ্র জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করে। উগ্র জাতীয়তাবাদ | যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে কী বােঝায় ? এই শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দাও।
উত্তর : গণতন্ত্র কথাটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল,—“Democracy”। এই শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ, “Demos” ও “Kratos” শব্দ থেকে এসেছে। Demos-এর অর্থ হল জনগণ এবং Kratos- এর অর্থ হল শাসন। সুতরাং আক্ষরিক অর্থে জনগণের শাসনকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।
   তথাপি গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন-এর দেওয়া সংজ্ঞা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। তিনি বলেছেন, “Democracy is a government of the people, by the people and for the people.” অর্থাৎ গণতন্ত্র হল জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন।
   জনগণের দ্বারা (by the people) বলতে সমগ্র জনগণের দ্বারা বােঝালেও বর্তমানে রাষ্ট্রের বৃহৎ আয়তনের জন্য জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচন করে। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, তারাই দেশ শাসন করে। সেই কারণে বর্তমানে গণতন্ত্রকে বলা হয় প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্র।
   জনগণের শাসন (of the people) বলতে বােঝায়,—জনগণের প্রয়ােজন এবং ইচ্ছানুসারে সরকার নীতি নির্ধারণ করবে।
   জনগণের জন্য (for the people) বলতে বােঝায়, জনগণের কল্যাণের জন্য সরকার কাজ বে। গণতন্ত্র বিশ্বাস করে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা সুপ্ত শক্তি আছে। তার বিকাশ সাধনের জন্য গণতান্ত্রিক সরকার সচেষ্ট হবে।
   সুতরাং বলা যায়, যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং সেই যে শাসন ব্যবঘায় জনগণের দ্বারা বা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যেখানে জনগণের ইচ্ছা অনুসারে নীতি নির্ধারিত হয় এবং যার উদ্দেশ্য হল,জনগণের কল্যাণ ও বিকাশসাধন করা, তাকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।
পক্ষে যুক্তি
বর্তমানে গণতন্ত্র সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে এখন এর কোনাে বিকল্প নেই। মিল, বার্কার, ল্যাস্কি প্রভৃতি বহু চিন্তাবিদরা একে সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের যুক্তিগুলি হল :
• (ক) সাম্যনীতি
গণতন্ত্র সাম্যনীতিতে বিশ্বাসী। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে আইনের চোখে সকলে সমান। প্রত্যেকে সমান মর্যাদা ও সমান সুযােগসুবিধার অধিকারী। ভারত গণতান্ত্রিক দেশ বলে সংবিধানের ১৪নং থেকে ১৮নং ধারায় এই নীতি স্বীকৃত হয়েছে।
• (খ) বিপ্লবের আশঙ্কা কম
মানুষ পরিবর্তন চায়। বিশেষ করে স্বৈরাচারী সরকারের পরিবর্তন কাম্য। যখন সহজে তা হয় না, তখন রক্তাক্ত বিপ্লবের পথ ধরে। কিন্তু তাতে জনগণকে অনেক মূল্য দিতে হয়। গণতন্ত্রে বুলেটের পরিবর্তে ই.ভি.এম.-এর (Electronic Voting Machine) মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন সম্ভব বলে এখানে বিপ্লবের সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।
• (গ) মৌলিক অধিকার ভােগ
ব্যক্তির বিকাশের জন্য অধিকার ভােগের সুযােগ থাকা দরকার। গণতন্ত্রে জনগণ এই অধিকার ভােগ করতে পারে। শুধু তাই নয়, অধিকারভগের ক্ষেত্রে প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে। যেমন, ভারতের। সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রতিকারের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
• (ঘ) স্বৈরাচারিতা রােধ
গণতন্ত্রে সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না। কারণ, এখানে শাসকগােষ্ঠী তাদের কাজের জন্য আইনসভা ও জনগণের কাছে কৈফিয়ৎ দিতে বাধ্য থাকে। জনগণ সরকারের সমালােচনা করে তাকে সংযত করে রাখে।
• (ঙ) দেশপ্রেম বৃদ্ধি
গণতন্ত্রে জনগণ নিজেরা সরকার গড়ে এবং তার পরিবর্তন ঘটায়। তাই সরকারকে নিজেদের সরকার বলে মনে করে। এতে সরকারের ও দেশের প্রতি ভালােবাসা জন্মায়।
• (চ) রাজনৈতিক চেতনার প্রসার
গণতন্ত্রে জনগণ শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করার সুযােগ পায়। বিশেষ করে গণতন্ত্রে স্বীকৃত স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থায় অনেক বেশি মানুষ শাসনকার্যে অংশ নেয়। এতে রাজনৈতিক চেতনার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
• (ছ) আইনের অনুশাসন
গণতন্ত্রে আইনের অনুশাসন থাকে। অর্থাৎ আইন সকলের উপরে স্থান দেওয়া হয়। আইনের চোখে দোষী প্রমাণিত হলে, তবে মানুষ শাস্তি পাবে। খেয়াল-খুশিমতাে কেউ শাস্তি দিতে পারবে না। পদমর্যাদার সুযােগ নিয়ে কেউ শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে না।

মুল্যায়ন
গণতন্ত্র হল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। কারণ, একমাত্র গণতন্ত্রে মানুষ পূর্ণমর্যাদা খুঁজে পায়। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এর কোনাে বিকল্প নেই।

প্রশ্ন ২) গণতন্ত্রের সাফল্যের শর্তগুলি বিশদভাবে আলােচনা করাে।
উত্তর : গণতন্ত্রের অর্থ হল,—জনগণের শাসন। আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষায় বলা যায়,—“জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসনকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।” এই উক্তিকে বিশ্লেষণ করে বলা যায়,-যে শাসনব্যবস্থা জনগণের দ্বারা বা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যেখানে জনগণের ইচ্ছা অনুসারে নীতি নির্ধারিত হয় এবং যার উদ্দেশ্য হল, জনগণের কল্যাণ ও বিকাশ সাধন করা, তাকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কল্যাণকামী শাসনব্যবস্থা বলে এটি শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা রুপে বিবেচিত।
   তবে এর সাফল্য কয়েকটি শর্তের উপর নির্ভর করে। মিল, বানর্স, ব্রাইস প্রভৃতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন শর্তের উল্লেখ করেছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল :
• (ক) গণতান্ত্রিক জনগণ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিল গণতন্ত্রকে সফল করার জন্যে তিনটি শর্তের কথা বলেছেন,—(ক) গণতন্ত্রকে গ্রহণ করার জন্যে জনগণের ইচ্ছা ও ক্ষমতা থাকা দরকার, (খ) গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যে সমর্থ হতে হবে এবং (গ) জনগণকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সততার সঙ্গে পালন করতে হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বার্নস এই তিনটি গুণের অধিকারী ব্যক্তিদের ‘গণতান্ত্রিক জনগণ” বলেছেন যা গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
• (খ) সার্বজনীন শিক্ষা
গণতন্ত্রকে সফল করতে গেলে শিক্ষার প্রয়ােজন। শিক্ষা মানুষকে শুধু অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে না, সমাজের প্রতি প্রকৃত দায়িত্বশীল করে তােলে। তাই মিল বলেছেন,-সকলকে ভােটের অধিকার দেবার আগে সকলের শিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার।
• (গ) অর্থনৈতিক সাম্য
গণতন্ত্রের শুধু রাজনৈতিক সাম্য থাকলে চলবে না, অর্থনৈতিক সাম্য থাকাও দরকার। তাই অধ্যাপক ল্যাস্কি বলেছেন,—“Political right is meaningless unless there is economic equality।” অর্থাৎ অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া রাজনৈতিক অধিকার আর্থহীন।
• (ঘ) স্বায়ত্তশাসন
লর্ড ব্রাইস বলেছেন,—গণতন্ত্রকে সফল করতে হলে স্বায়ত্ত শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। অঞ্চলের শাসনভার অঞ্চলের মানুষদের হাতে দিতে হবে। তাতে জনগণ বেশি সংখ্যায় শাসনের কাজে অংশ নিতে পারবে এবং তার ফলে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়বে। এই সচেতনতা গণতন্ত্রকে সফল করে তুলতে পারে।
• (ঙ) লিখিত সংবিধান
গণতন্ত্রে মানুষের অধিকার রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লিখিত সংবিধান হলে তাতে অধিকারের উল্লেখ থাকে। তাতে জনগণ অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে। শুধু তাই নয়, তার প্রতিবিধানের ব্যবস্থাও জানতে পারবে।
• (চ) নিরপেক্ষ আদালত
গণতন্ত্রে শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে জনগণের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে। নিরপেক্ষ এবং নির্ভীক আদালত থাকলে, সেই হস্তক্ষেপ বন্ধ হতে পারে।
• (ছ) বিরােধী দলের অস্তিত্ব
গণতন্ত্রে বিরােধী দলকে জনগণের স্বাধীনতার প্রতীক বলে মনে করা হয়। কারণ, বিরােধী দল সমালােচনার মাধ্যমে সরকারকে সংযত রাখে। সরকারের ত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরে সরকারের স্বৈরাচারিতার পথে বাধার সৃষ্টি করে।
• (জ) সহনশীলতা
গণতন্ত্রে সরকার বিরােধী দলের সমালােচনার অধিকার স্বীকার করে নেবে। বিরােধী দলও অহেতুক সরকারি কাজে বাধা দেবে না। বরং গঠনমূলক গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
• (ঝ) উপযুক্ত নেতৃত্ব
যােগ্য নেতৃত্ব গণতন্ত্রকে সফল করতে পারে। রাষ্ট্রনায়করা যদি ন্যায়পরায়ণ, সৎ এবং বিবেকসম্পন্ন হয়, তাহলে জনগণকে গণতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে।
• (ঞ) সুদক্ষ ও সৎ কর্মচারী
সুদক্ষ ও সৎ কর্মচারিদের উপর গণতন্ত্রের সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে। এখানে মন্ত্রীরা অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসে। তাই তাদের অভিজ্ঞতা কম হয়। তাদের মধ্যে দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাব আছে। দক্ষ, সৎ, কর্তব্যপরায়ণ ও নিরপেক্ষ কর্মচারী সেই অভাব পূরণ করতে পারে। তাই গণপরিষদে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সফল করতে হলে সুদক্ষ সরকারি কর্মচারীর একান্ত প্রয়ােজন।

মূল্যায়ন
উপরিউক্ত শর্তগুলি যথেষ্ট নয়। সবথেকে বড়াে কথা হল,—গণতন্ত্রকে সফল করতে হলে জনগণকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। তারা অধিকার সম্বন্ধে উদাসীন হলে বা সজাগ না থাকলে সরকার তাদের বঞ্চিত করবে। তাই পেরিক্লিস বলেছেন,—“সদা জাগ্রত জনমতই স্বাধীনতার মূল্য।” শুধু সতর্ক থাকলে চলবে না, গণতন্ত্রকে সফল করে তুলতে হলে জনগণকে কর্মঠ হতে হবে। তাদের অলস হলে চলবে না। অধ্যাপক লয়েড সেই কারণে বলেছেন,—“নাগরিকদের অলসতার জন্য গণতন্ত্র সংকটের মুখে পড়তে পারে।”

প্রশ্ন ৩) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলতে কী বােঝায় ? প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দাও। 
উত্তর : প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গেলে প্রথমে গণতন্ত্র কাকে বলে তা সংক্ষেপে বলা প্রয়োজন। আক্ষরিক অর্থে জনগণের শাসনকে বলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। আব্রাহাম লিঙ্কন-এর ভাষায় বলা যায়, গণতন্ত্র হল জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন। অধ্যাপক গণার গণতন্ত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন,—প্রত্যক্ষ বা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র ও পরােক্ষ বা প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্র।
   প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলতে সেই শাসন ব্যবস্থাকে বােঝায়, যেখানে নাগরিকরা প্রত্যক্ষভাবে শাসনকাণে অংশগ্রহণ করে। এই শাসনব্যবস্থায় জনগণ নির্দিষ্ট সময়ে একটি জায়গায় মিলিত হয়ে আইন তৈরি, সরকারি কর্মচারীদের নিয়ােগ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
   ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে এই ধরনের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র দেখা যায়। প্রাচীন গ্রিস ও রােমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রে এই গণতন্ত্র চালু ছিল। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের চারটি ছােটো রাজ্যে এই ব্যবস্থা চালু আছে।

পক্ষে যুক্তি
প্রথমত, এখানে জনগণ সরাসরি শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করে বলে, তাদের মনে কোনাে ক্ষোভ থাকে না। ফলে এখানে বিপ্লবের সম্ভাবনা থাকে না।
দ্বিতীয়ত, এখানে জনগণ সরাসরি শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করার সুযােগ পায় বলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত, এখানে সরকারের প্রতিটি কাজে জনগণের অনুমােদন লাগে। তাই সরকার এখানে স্বৈরাচারী হতে পারে না।
চতুর্থত, প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে গণউদ্যোগ, গণভােট, পদচ্যুতি, গণসমাবেশ প্রভৃতি গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে। এর ফলে প্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালনে সবসময় তৎপর থাকে।
পঞ্চমত, এখানে জনগণ সরাসরি সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য থাকে না। ষষ্ঠত, প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্রে দলাদলির সংকীর্ণতা শাসনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে তা পারে না।

মূল্যায়ন
প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের কিছু ভালাে দিক থাকলেও বৃহৎ রাষ্ট্রের পক্ষে এই শাসনব্যবস্থা আদৌ গ্রহণযােগ্য নয়। এর সবথেকে বড়াে অসুবিধা হল,—এখানে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় লাগে। এটি কাম্য নয়। তাই বর্তমানে এই শাসনব্যবস্থা বিলুপ্তির পথে।

প্রশ্ন ৪) একনায়কতন্ত্র কাকে বলে? একনায়কতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ করে।
উত্তর : রাজনৈতিক তত্ত্ব ও আলােচনার মধ্যে যেসব ধারণা দীর্ঘ বিতর্ক ও আলােড়ন সৃষ্টি করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হল গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র। এই দুটি ধারণা একদিকে যেমন রাজনৈতিক আদর্শ ও অন্যদিকে তেমনি একধরনের শাসনব্যবস্থা।

একনায়কতন্ত্রের সংজ্ঞা
সাধারণভাবে একনায়কতন্ত্রকে গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শ বা শাসনব্যবস্থা বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মার্কসবাদীগণ এই ধারণা সম্বন্ধে একমত হতে পারেননি। একনায়কতন্ত্র বলতে | বােঝায় এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা এক বা একাধিক ব্যক্তি দখল করে এবং অবাধে সেই ক্ষমতা প্রয়ােগ করে। নিউম্যান উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রের মধ্যে একজন বা কয়েকজন ব্যক্তি যদি দেশের যাবতীয় শাসনক্ষমতা করায়ত্ত করে এবং তা নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে প্রয়ােগ করে, তাহলে সেই শাসনক্ষমতাকে একনায়কতন্ত্র বলা হয়। একনায়ক নিজের ইচ্ছা ও ক্ষমতাকে বলপূর্বক অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। একনায়কই সকল ক্ষমতার উৎস। তিনিই সার্বভৌম। পাশবিক বলই এই শাসনের ভিত্তি।

একনায়কতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
• (ক) ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র
যখন একজন ব্যক্তি বা একজন সামরিক নেতার হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন তাকে ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র বলা হয়। সংবিধান বহির্ভূত পদ্ধতিতে এই ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনাে ব্যক্তির একনায়কতন্ত্রকে অব্যাহত রাখার জন্য সামরিক বাহিনীর বা কোনাে রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও সাহায্য প্রয়ােজন। এই কারণেই একনায়ক রাজনৈতিক দল গঠন করেন অথবা প্রতিষ্ঠিত কোনাে রাজনৈতিক দলের সাহায্য গ্রহণ করে। সাংবিধানিক পদ্ধতিতে সরকার গঠিত হবার পর হিটলার ও মুসােলিনি ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেন।
• (খ) দলগত একনায়কতন্ত্র
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দলগত একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। এখানে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতা দখল করে নিয়ে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর উচ্ছেদ, ভীতি প্রদর্শন ও অত্যাচারের মাধ্যমে দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
• (গ) শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র
একনায়কতন্ত্রের অপর একটি রুপ হল শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্র। শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্রের উদাহরণ হিসাবে পূর্বতন সােভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা যায়। সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

মূল্যায়ন
একনায়কতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ করা হলেও তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য হল, নিয়মশৃঙ্খলার কঠোরতা ও বিপরীত মতের কণ্ঠরােধ। ব্যক্তিগত, দলগত এমনকি শ্রেণিগত একনায়কতন্ত্রের ক্ষেত্রে একথা প্রযােজ্য।

প্রশ্ন ৫) একনায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
উত্তর : একনায়কতন্ত্র বলতে বােঝায়,—একজনের শাসন। নিউম্যানের (Newman) ভাষায় বলা যায়,—“একনায়কতন্ত্র বলতে বােঝায়, এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে কোনাে ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষমতা দখল করে অবাধে স্বৈরী ক্ষমতা প্রয়ােগ করে।”
   এই সংজ্ঞার আলােকে একনায়কতন্ত্রের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায়।
প্রথমত, একনায়কতন্ত্রে একজন নায়কের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তার হাতে সমস্ত ক্ষমতা থাকে। এই ক্ষমতাকে অবাধভাবে প্রয়ােগ করে। জনগণের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয় না।
দ্বিতীয়ত, একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্র হল সর্বশক্তিমান। রাষ্ট্র ব্যক্তিকে সব দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যক্তি এখানে রাষ্ট্রের জন্য। ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র নয়।
তৃতীয়ত, একনায়কতন্ত্রে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য করা হয় না। তাই ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই বলতেন,—“I am the state” অর্থাৎ আমিই রাষ্ট্র।
চতুর্থত, একনায়কতন্ত্রে একটিমাত্র রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকে। যেমন, হিটলারের সময় জার্মানিতে শুধুমাত্র জাতীয় সমাজতন্ত্রী দলের অস্তিত্ব ছিল।
পঞ্চমত, একনায়কতন্ত্র সাম্যনীতিতে বিশ্বাসী নয়। একনায়কতন্ত্র বিশ্বাস করে, কিছুলােক শাসন করার জন্য জন্মায়, কিছুলোেক জন্মায় কেবলমাত্র শাসিত হওয়ার জন্যে।
যষ্ঠত, একনায়কতন্ত্রে সরকারের স্থায়িত্বের জন্য একনায়ক বিরাট গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তােলে। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বা বিরােধিতা দেখা দিলে একনায়ক গুপ্তচর বাহিনীর মারফত সংবাদ সংগ্রহ করে তা দমন করে ফেলে। উদাহরণ হিসাবে হিটলারের গেস্টাপাে এবং মুসােলিনির কালাে কোর্তা (Black Shirt) গুপ্তচর বাহিনীর উল্লেখ করা যায়।
সপ্তমত, মিথ্যা প্রচার একনায়কতন্ত্রের আর একটি বৈশিষ্ট্য। একনায়ক মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতা দখল করে রাখতে চায়।
অষ্টমত, একনায়কতন্ত্র যুদ্ধকে সমর্থন করে। মুসােলিনি বলেছিলেন, “মহিলাদের কাছে মাতৃত্ব যেমন, পুরুষদের কাছে যুদ্ধ তেমনি অপরিহার্য।” একনায়কতন্ত্র মনে করে যুদ্ধের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ হয়, সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়।
নবমত, একনায়কতন্ত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়। একনায়কের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে হয়। এর স্লোগান হল,—“বিশ্বাস করাে, মান্য করাে, যুদ্ধ করাে।”

প্রশ্ন ৬) গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করাে।
উত্তর : গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য দেখাতে গেল প্রথমে উভয়ের সংজ্ঞা সংক্ষেপে উত্তর আলােচনা করা প্রয়ােজন। গণতন্ত্র হল জনগণের শাসন। আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষায়, –
জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসনের নাম গণতন্ত্র। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশ শাসন করে এবং জনগণের কাছে তারা তাদের কাজের জন্যে দায়ী থাকে।
   একনায়কতন্ত্র হল একজনের শাসন। নিউম্যান (Newman)-এর ভাষায়,-“একনায়কতন্ত্র বলতে বােঝায় এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে কোনাে ব্যক্তি ব্য ব্যক্তিসমষ্টি ক্ষমতা দখল করে অবাধে স্বৈরী ক্ষমতা প্রয়ােগ করে।”
   এই সংজ্ঞা দুটির আলােকে উভয়ের মধ্যে নিম্নলিখিত পাথক্যগুলি দেখতে পাওয়া যায়।
প্রথমত, গণতন্ত্র সাম্য নীতিতে বিশ্বাসী, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলে সমান সুযােগ সুবিধা পায়। আইনের চোখে সকলে সমান। কিন্তু একনায়কতন্ত্র সাম্যনীতিকে সমর্থন করে । একনায়কতন্ত্র বিশ্বাস করে, কিছু লােক শাসন করার জন্য জন্মায়, কিছু লােক জন্মায় শাসিত হবার জন্যে।
দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার স্বীকৃত হয়। কারণ, গণতন্ত্র ব্যক্তির বিকাশ চায়। স্বাধীনতা ছাড়া তা সম্ভব নয়। এমনকি এখানে অধিকার সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু একনায়কতন্ত্র জনগণকে স্বাধীনতা দিতে নারাজ। কারণ, তাদের মতে ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র নয়, রাষ্ট্রের জন্যই ব্যক্তি।
তৃতীয়ত, গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দল স্বীকৃত, এখানে বিরােধী দলকে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ বলে মনে করা হয়। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকে। যেমন, হিটলারের সময় জার্মানিতে শুধুমাত্র জাতীয় সমাজতন্ত্রী দলের অস্তিত্ব ছিল।
চতুর্থত, গণতন্ত্র শান্তির পূজারি, হিংসায় বিশ্বাসী নয়। এর নীতি হল যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। তাই বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য হলে আলাপ আলােচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে চায়। কিন্তু একনায়কতন্ত্র যুদ্ধের জয়গান করে। এদের স্লোগান হল—শান্তি নয়, যুদ্ধ চাই। মুসােলিনি বলেছেন,—“মহিলাদের কাছে মাতৃত্ব যেমন, পুরুষদের কাছে যুদ্ধও তেমন অপরিহার্য।”
পঞ্চমত, গণতন্ত্র প্রকৃত জাতীয়তাবাদের সমর্থক। অর্থাৎ নিজে বাঁচ ও অপরকে বাঁচতে দাও এই নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু একনায়কতন্ত্র উগ্রজাতীয়তাবাদকে জন্ম দেয়। যার অর্থ হল নিজের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে এবং অপরকে হেয় বা ধ্বংস করার চেষ্টা করে।
ষষ্ঠত, গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন করা যায় বলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জমে না। ফলে বিপ্লবের সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে দমনপীড়ন চলে। শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকে না। তাই ক্ষোভ জমে, তার থেকে বিপ্লব ঘটে।
সপ্তমত, কার্লাইল বলেছেন,—গণতন্ত্র হল নির্বোধের শাসন। কারণ, এখানে অনভিজ্ঞ লােকেরা ক্ষমতায় যায়। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে দক্ষ ব্যক্তি শাসনক্ষমতা দখল করে এবং দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ােগ করে।
অষ্টমত, গণতন্ত্র স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাসী। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে তৃণমূল পর্যন্ত ক্ষমতাকে প্রসারিত করে। এতে বেশি মানুষ শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করার সুযােগ পায়। ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বাড়ে। কিন্তু একনায়কতন্ত্র এই স্বায়ত্তশাসন ও চেতনা প্রসারে পক্ষপাতী হয়।

মূল্যায়ন
উভয়ের মধ্যে গুণগত বিচারে একনায়কতন্ত্রের সমর্থনে কিছু যুক্তি আছে। এখানে যােগ্য নেতৃত্বে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার মাধ্যমে দুর্নীতি ও শৈথিল্যের অবসান ঘটানাে হয়। অল্প সময়ে এখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ব হয়। হতাশার অনধিকার কেটে যায়। দিগন্তে দেখা দেয় নতুন আশার আলাে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় হয়। তথাপি একনায়কতন্ত্র স্থায়ীভাবে কাম্য নয় কারণ, ইহা সাম্য ও স্বাধীনতার বিরােধী। স্বাধীনতা হীনতায় আমরা বাঁচতে চাই না। অথচ একনায়কতন্ত্রে স্বাধীনতা বিসর্জিত হয়। একনায়কের স্বৈরাচারী শাসনে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। গণতন্ত্র মানুষের কাছে কাম্য। কারণ, এখানে ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযােগ থাকে। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়। গণতন্ত্র শান্তির ললিত বাণী শােনায়, তাই শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে গণতন্ত্রই কাম্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + 6 =