ভারতে সাংবিধানিক বিকাশ (Constitutional development in India)

ভারতে সাংবিধানিক বিকাশ (Constitutional development in India)

১৭৭৩ খ্রীষ্টাব্দে রেগুলেটিং আইন :(a) মাদ্রাজ ও বােম্বাই প্রেসিডেন্সির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির গভর্নর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পায়।(b) ডাইরেক্টর পদের সংখ্যা ২৪ নির্দিষ্ট করা হয়।(c) ৪ সদস্যের কাউন্সিলার সহ বাংলার গভর্নর জেনারেল নিয়ােগ হয়।(d) ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন এবং বারওয়েল, ক্লাভারিন, ফিলিপ ফ্রান্সিস ও মনসন কাউন্সিলার নির্বাচিত হন।(e) ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়। এলিজা ইম্পের সঙ্গে চেম্বার, লেমিস্টার ও হাইড নামে আরাে তিন বিচারপতি নিয়ােগ করা হয়।(f) এই আইন বলে কোম্পানীর সকল কর্মচারীর উপহার ও ঘুষ নেওয়া নিষিদ্ধ হয়।(g) বাের্ড অফ ডাইরেক্টরসদের যােগ্যতা, ভােট দেওয়ার অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলি আনা হয় ব্রিটিশ সরকারের অধীনে। 

১৭৮৪ খ্রীষ্টাব্দের পিটের ভারত শাসন আইন :(a) বাের্ড অফ কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠা করা হয় ৬ সদস্য নিয়ে। বাের্ড অফ কন্ট্রোল ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করত। এই ৬ সদস্যকে বলা হত কমিশনার। এর প্রথম সভাপতি হেনরি ডানডাস। (b) বাের্ড অফ ডাইরেক্টরকে অধিকার দেওয়া হয় সমস্ত কর্মচারী নিয়ােগ ও তাদের ডেকে পাঠানাের জন্য। (c) গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল সদস্য সংখ্যা কমিয়ে ৪ থেকে ৩ করা হয়।(d) বােম্বাই এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি নির্ভরশীল ছিল বাংলার গভর্নর ইন কাউন্সিলের সমস্ত রকম দূত, যুদ্ধ ও রাজস্বের ব্যাপারে।(e) এই আইনে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কেম্পানীর উপর সমস্ত রকমনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দে চার্টার আইন :(a) কোম্পানীর বাণিজ্যিক সুবিধা ২০ বছর বাড়ানাে হয়।(b) গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলে কমান্ডার-ইন-চিফ এর সদস্যপদ খারিজ হয়।(c) বাের্ড অফ কন্ট্রোলের সকল সদস্যের ভবিষ্যৎ-বেতন ভারতের রাজস্ব থেকে নিশ্চিত করা হয়। 

১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দে চার্টার আইন :(a) ভারতে একচেটিয়া ব্রিটিশ বাণিজ্যের অবসান হয়।(b) বাৎসরিক একলক্ষ টাকা অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ভারতে শিক্ষা বিস্তারে।(c) কোম্পানীর কর্মচারীদের ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় তাদের চাকরিতে যােগদানের পূর্বে।(d) ভারতে বাণিজ্য সকল ইংরেজদের জন্য উন্মুক্ত হয়।(e) ভারতের গির্জার বিশপদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ভারতীয় রাজস্ব থেকে খরচের নির্দেশ দেওয়া হয়।(f) ভারতের সকল অঞ্চল ও রাজস্বের ওপর ব্রিটিশ রাজের সার্বভৌমতা দাবী করা হয়।

১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে চার্টার আইন :
(a) ভারতের চা-এর বাণিজ্য এবং চীনে কোম্পানীর একচেটিয়া বাণিজ্য নিষিদ্ধ হয়।
(b) ফোর্ট উইলিয়াম-এর গভর্নর জেনারেলকে ভারতের গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়।(c) গভর্নর জেনারেল-এর কাউন্সিলে একজন আইন সদস্য যুক্ত হয়। মেকলে ছিলেন প্রথম আইন সদস্য।(d) গভর্নর জেনারেল-এর কাউন্সিলের ক্ষমতা হয় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে আইন প্রণয়ন করার এবং সাংবিধানিক বিকেন্দ্রীকরণ বিলােপ করা হয়।(e) ভারতীয় সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হয়।(f) কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়।g) পঞ্চম আইন (Act V) দ্বারা ভারতে দাস প্রথার বিলােপ ঘটানাে হয়।

১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দে চার্টার আইন :(a) বাংলার জন্য আলাদা লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পদ সৃষ্টি করা হয়।(b) ভারতে প্রতিযােগিতা মূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস নিয়ােগের ব্যবস্থা করা হয় এবং কোর্ট অফ ডাইরেকটরস-এর কোম্পানীর কর্মচারী নিয়ােগ ও ডেকে পাঠানাের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।(c) বাের্ড অফ ডাইরেক্টর্সদের সদস্য সংখ্যা কমিয়ে ২৪ থেকে ১৮ করা হয়, যার মধ্যে ৬ জন মনােনীত প্রার্থী।(d) কোম্পানীর বাণিজ্যিক অধিকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য বাড়ানাে হয়।(e) প্রতিযােগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস নিয়ােগ কমিটিতে চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন মেকলে।(f) আইন পরিষদের কাজ দেখাশুনাের জন্য গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলে অতিরিক্ত সদস্য নিয়ােগ করা হয়।

১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া আইন :(a) কোম্পানীর শাসন বিলুপ্ত করে ব্রিটিশ রাজ শুরু হয়।(b) বাের্ড অফ কন্ট্রোল ও কোর্ট অফ ডাইরেক্টরস বিলুপ্ত হয়।(c) ভারতে শাসনের জন্য একজন ভারত সচিব নিযুক্ত হয়। তিনি ব্রিটিশ ক্যাবিনেট এর একজন সদস্য হবেন এবং তার পদের নাম হয় Secretary of State for India। তার কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা হবে ১৫ জন।(d) ভারতের গভর্নর জেনারেলকে ‘ভাইসরয়’ পদে নামাঙ্কিত করা হয়। ভাইসরয় কথার অর্থ রাজপ্রতিনিধি। ভাইসরয় তার রিপাের্ট Secretary of State for India নির্মিত টেলিগ্রাফ লাইনের মাধ্যমে ভারতসচিবের কাছে পাঠাবেন।(e) সেক্রেটারি অফ স্টেট কাউন্সিলের ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ৪ জন সদস্য ব্রিটিশ রাজের দ্বারা মনােনীত হবেন এবং ৭ জন সদস্য বাের্ড অফ ডাইরেক্টর্স এর মধ্যে থেকে নির্বাচিত হবেন।

১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল আইন :(a) বিভিন্ন প্রদেশে বিধান পরিষদ বা আইন পরিষদ প্রতিষ্ঠা হয়।(b) পাের্টফোলিও ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ভাইসরয়ের এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।(c) ভাইসরয়ের কাউন্সিলের নাম হয় ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল।(d) ভাইসরয়ের এগজিকিউটিভ কাউন্সিলে একজন পঞ্চম সদস্য যােগ করা হয়। তিনি হলেন একজন জুরিস্ট।

১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল আইন :
(a) কাউন্সিল-এর হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয় উভয়স্তরের বাজেট নিয়ে আলােচনার কিন্তু তাদের ভােটদানের অধিকার ছিল না।
(b) নন-অফিশিয়াল সদস্যদের এবং প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের পরােক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়।(c) পরিষদে সদস্যদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসার অনুমতি দেওয়া হয়।(d) গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয় ১০ থেকে ১৬ এর মধ্যে।

১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল আইন বা মলে-মিন্টো সংস্কার :(a) আইন পরিষদের সদস্যদের সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।(b) মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়।(c) প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়ানাে হয় ১৬ থেকে ৬০ এ।(d) ৬০ জন সদস্যের মধ্যে ২৮ জন সরকারের মনােনীত আধিকারিক ও ৩২ জন নন্-অফিশিয়াল। ৩২ জনের মধ্যে ৫ জন মনােনীত ও ২৭ জন নির্বাচিত।(e) উভয়স্তরে পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।(f) নন-অফিশিয়াল সদস্যদের পরােক্ষ নির্বাচনের দ্বারা নির্ধারণ করা

১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া আইন বা মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন :(a) ডায়ার্কি (Dyarchy) বা দ্বৈত ব্যবস্থা প্রদেশে চালু হয়। প্রশাসনিক বিষয়কে ট্রান্সফার ও রিজার্ভ এই দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।(b) ট্রান্সফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল শিক্ষা, লাইব্রেরি, জাদুঘর, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, মেডিক্যাল ত্রাণ, নাগরিক স্বাস্থ্য, কৃষি, সমবায় সমিতি, পাবলিক ওয়ার্কস, ভেটেরিনারি, ফিশারি, শুল্ক, শিল্প, ওয়েটস অ্যান্ড মেজারমেন্টস, পাবলিক এন্টারটেনমেন্ট, ধর্মীয় ও দাতব্য বিষয়। রিজার্ভ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল ভূমিরাজস্ব, দূর্ভিক্ষ ত্রাণ, বিচার, পুলিশ, পেনসন, প্রিন্টং প্রেস, জলসেচ, খনি, ফ্যাক্টরি, বিদ্যুত, শ্রমমন্ত্রক, মােটরভেহিকল, ক্ষুদ্র বন্দর ইত্যাদি।(c) প্রদেশগুলির উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমানাে হয়।(d) কেন্দ্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা বাইক্যামেরাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয় যথা, কাউন্সিল অফ স্টেটস বা উচ্চকক্ষ এবং লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি বা নিম্নকক্ষ।(e) ভারতসচিব ও তাকে সাহায্যকারীদের বেতন দেওয়া হবে ব্রিটিশ রেভিনিউয়ের ভেতর থেকে।(f) লন্ডনে একজন হাইকমিশনার নিয়ােগ করা হয় ভারতের জন্য যিনি ভারতের কাজের দায়িত্ব থাকবেন।

১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে ভারতশাসন আইন :(a) এই আইনে সারাভারত ফেডারেশন বা সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন করার ব্যবস্থা ছিল।(b) ক্ষমতাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল যথা, ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় তালিকা, প্রাদেশিক তালিকা এবং যুগ্ম তালিকা। অবশিষ্ট ক্ষমতা গভর্নর জেনারেলের হাতে ছিল।(c) প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ডায়ার্কি বা দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটে।(d) আইনসভাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা হয় ৬টি প্রদেশে। যথা বাংলা, মাদ্রাজ, বােম্বাই, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, আসাম। (e) শিখ, ইউরােপীয়, ভারতীয় খ্রিশ্চান ও অ্যাংলাে ইন্ডিয়ানদের স্বতন্ত্র নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। (f) গভর্নর জেনারেল এবং গভর্নরদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা দেওয়া হয়।(g) ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীতে ফেডারেল কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয় একজন প্রধান বিচারপতি সহ ৬ জন বিচারপতি নিয়ে।(h) ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যা রাজ্যের সৃষ্টি হয়।(i) ভারত শাসন আইনে ৩২১টি অধ্যায় এবং ১০টি তালিকা বা Schedule ছিল।।(j) প্রাদেশিক কাউন্সিলের ২৭৬টি আসনের মধ্যে ১০৪টি আসন এবং লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির ৩৭৫টি আসনের ১২৫টি আসন রাজন্যবগের মনােনীত সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকে।

ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল ও ভাইসরয়গণ


ব্রিটিশ শাসনের প্রশাসনিক ভিত্তি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × four =