নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য

নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য (Citizenship)

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

১। মানবিক অধিকারগুলি কয়টি ধারায় স্থান পেয়েছে ?
উত্তর : মানবিক অধিকারগুলি ৩০টি ধারায় স্থান পেয়েছে।

২। কবে পশ্চিমবঙ্গ ‘মানবাধিকার কমিশন’ গঠিত হয়?
উত্তর : ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়।

৩। কবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’গঠিত হয়?
উত্তর : ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়।

৪। কবে ভারত সরকারের মানবাধিকার রক্ষা আইন পাস হয় ?
উত্তর : ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের ‘মানবাধিকার রক্ষা আইন পাস হয়।

৫। কবে মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্বজনীন ঘােষণাপত্র গৃহীত হয় ?
উত্তর : ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্বজনীন ঘােষণাপত্র গৃহীত হয়।

৬। ভারতের সংবিধানে বর্ণিত সাম্যের অধিকার কী ধরনের অধিকার ?
উত্তর : ভারতের সংবিধানে বর্ণিত সাম্যের অধিকার মূলত একটি রাজনৈতিক অধিকার।

৭। কবে ভারতীয় নাগরিকদের কর্তব্যগুলি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?
উত্তর : ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় নাগরিকদের কর্তব্যগুলি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

৮। পঞ্চায়েত গঠনের অধিকার কার সঙ্গে যুক্ত ?
উত্তর : পঞ্চায়েত গঠনের অধিকার রাষ্ট্রীয় নির্দেশমূলক নীতির সঙ্গে যুক্ত।

৯। ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক কর্তব্যসমূহ কার সঙ্গে যুক্ত ?
উত্তর : ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক কর্তব্যসমূহ রাষ্ট্রীয় নির্দেশমূলক নীতির সঙ্গে যুক্ত।

১০। ভারতে কে মৌলিক অধিকারগুলি রক্ষা করতে সক্ষম ?
উত্তর : ভারতে সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট উভয়েই মৌলিক অধিকারগুলি রক্ষা করতে সক্ষম।

১১। ভােটদান করা কাদের পবিত্র কর্তব্য ?
উত্তর : ভােটদান করা নাগরিকদের পবিত্র কর্তব্য।

১২। রাজনৈতিক অধিকার কারা ভােগ করেন ?
উত্তর : রাজনৈতিক অধিকার কে বলমাত্র নাগরিকরাই ভােগ করেন।

১৩। কবে ভারতীয় নাগরিক আইন প্রণীত হয়?
উত্তর : ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় নাগরিকতা আইন প্রণীত হয়।

১৪। ভারতে কত বছর বয়সে পূর্ণ নাগরিকতা লাভ করা যায় ?
উত্তর : ভারতে ১৮ বছর বয়সে পূর্ণ নাগরিকতা লাভ করা যায়।

১৫। ধর্মের অধিকার কী ধরনের অধিকার ?
উত্তর : ধর্মের অধিকার হল একটি সামাজিক অধিকার।

১৬। জীবনের অধিকার কী ধরনের অধিকার ?
উত্তর : জীবনের অধিকার হল একটি অন্যতম সামাজিক অধিকার।

১৭। ভােটদানের অধিকার কী ধরনের অধিকার ?
উত্তর ভোটদানের অধিকার হল একটি রাজনৈতিক অধিকার।

১৮। বাকস্বাধীনতার অধিকার কী ধরনের অধিকার ?
উত্তর : বাকস্বাধীনতার অধিকার হল একটি সামাজিক অধিকার।

১৯। কর্মের অধিকার কী ধরনের অধিকার ?
উত্তর : কর্মের অধিকার হল একটি অর্থনৈতিক অধিকার।

২০। সম্পত্তির অধিকার কী ধরনের অধিকার?
উত্তর সম্পত্তির অধিকার হল একটি অর্থনৈতিক অধিকার।

২১। রাষ্ট্র অসদাচরণের জন্য কাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারে ?
উত্তর : রাষ্ট্র অসদাচরণের জন্য বিদেশিদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারে।

২২। নাগরিকতা কীভাবে অর্জন করা যায় ?
উত্তর নাগরিকতা জন্মসূত্রে ও দেশীয়করণের মাধ্যমে অর্জন করা যায়।

২৩। নাগরিক বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : নাগরিক হল সেই ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার ও রাজনৈতিক অধিকার ভােগ করেন।

২৪। “নাগরিকতা হল জনগণের কল্যাণের জন্য নিজ সুচিন্তিত বিচারবুদ্ধি প্রয়ােগ”— উক্তিটি কার?
উত্তর : “নাগরিকতা হল জনগণের কল্যাণের জন্য নিজ সুচিন্তিত বিচারবুদ্ধি প্রয়ােগ”- বলেছেন অধ্যাপক ল্যাস্কি।

২৫। কোন্ দেশে নাগরিক শব্দটির উৎপত্তি হয় ?
উত্তর : নাগরিক শব্দটির উৎপত্তি হয় গ্রিস দেশে।

২৬। কোন্ দেশের সংবিধানে বিদেশিদের আশ্রয়দানের বিশেষ সুবিধার কথা উল্লেখ আছে?
উত্তর : চিনের সংবিধানে বিদেশিদের আশ্রয়দানের বিশেষ সুবিধার কথা উল্লেখ আছে।

২৭। সুনাগরিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা কীসের জন্য সৃষ্টি হয় ?
উত্তর : স্বার্থপরতা হল সুনাগরিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা।

২৮। গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত কী ?
উত্তর : সুনাগরিকতা হল গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত।

২৯। নাগরিকতার ধারণাটি সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেন কে?
উত্তর : বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল নাগরিকতার ধারনাটি সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেন।

৩০। ভােটদানের অধিকার কাদের থাকে ?
উত্তর : ভােট দানের অধিকার কেবলমাত্র নাগরিকদেরকেই প্রদান করা হয়।

৩১। অধিকার বলতে কী বােঝায় ?
উত্তর : ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য নাগরিক জীবনে যে সমস্ত সুযােগসুবিধাগুলি একান্ত প্রয়ােজন তাকে অধিকার বলে।

৩২। সিকিমের জনগণ কীভাবে ভারতের নাগরিক হয় ?
উত্তর : সিকিমের জনগণ সমষ্টিগত নাগরিকতা লাভের ফলে ভারতের নাগরিক।

৩৩। ‘ধাক্কা না খেয়ে পথ চলার অধিকার যদি আমার থাকে, তাহলে তােমার কর্তব্য হল আমাকে প্রয়ােজনমতাে পথ ছেড়ে দেওয়া’,—উক্তিটি কার?
উত্তর : ‘ধাক্কা না খেয়ে পথ চলার অধিকার যদি আমার থাকে, তাহলে তােমার কর্তব্য হল আমাকে প্রয়োজনমতো পথ ছেড়ে দেওয়া’, বলেছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবস হাউস।

৩৪। সনদের কত নং ধারায় জাতি, ধর্ম, ভাষা ও নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র একে অপরকে সহযােগিতা করবে?
উত্তর : সনদের ১ (৩) নং ধারায় জাতি, ধর্ম, ভাষা ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র একে অপরকে সহযােগিতা করবে।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। নাগরিকের একটি গ্রহণযােগ্য সংজ্ঞা দাও।
উত্তর : নাগরিক হল রাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকারী । ব্যক্তি, যে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সকল অধিকার ভােগ করে এবং সমাজের সার্বিক মঙ্গলের জন্য তার সুচিন্তিত বিচারবুদ্ধি প্রয়ােগ করে তাকে নাগরিক বলে।

প্রশ্ন ২। অ্যারিস্টটল প্রদত্ত নাগরিকের সংজ্ঞা লেখাে।
উত্তর : নাগরিকতার প্রথম সংজ্ঞা দিয়েছেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। তাঁর মতে, “যিনি ন্যায় প্রশাসনে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রশাসনিক পদের অধিকারী তিনিই নাগরিক।”

প্রশ্ন ৩। বিদেশি কাকে বলে ?
উত্তর : ‘বিদেশি’ বলতে সাধারণভাবে অন্য রাষ্ট্রের নাগরিককে বােঝায়। কোনাে-না-কোনাে কারণে নিজের রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে কেউ সাময়িকভাবে অন্য কোনাে রাষ্ট্রের মধ্যে বাস করলে তাকে বিদেশি বলা হয়।

প্রশ্ন ৪। নাগরিক ও বিদেশির মধ্যে সাদৃশ্য কোথায়?
উত্তর : (ক) নাগরিক ও বিদেশি উভয়েই বসবাসকারী রাষ্ট্রের আইন মেনে চলতে বাধ্য। (খ) নাগরিক ও বিদেশি উভয়েই বসবাসকারী রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভােগ করে এবং তাদের কর দিতে হয়।

প্রশ্ন ৫। নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতিগুলি কী কী?
উত্তর : নাগরিকতা অর্জনের দুটি প্রধান পদ্ধতি হল—(ক) জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জন এবং (খ) অনুমােদনের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন। জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের দুটি মূলনীতি হল— রক্তের সম্পর্ক নীতি ও জন্মস্থান নীতি।

প্রশ্ন ৬। রক্তের সম্পর্ক নীতিতে নাগরিকতা অর্জন’ বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে শিশু যেখানেই ভূমিষ্ঠ হােক না কেন তার পিতা-মাতা যে রাষ্ট্রের নাগরিক সে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করে। যেমন, ভারতীয় দম্পতির কোনাে সন্তান যদি সুইজারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে সেই সন্তান ভারতীয় নাগরিক হবে।

প্রশ্ন ৭। জন্মস্থান নীতিতে কীভাবে নাগরিকতা লাভ করা যায়?
উত্তর জন্মস্থান নীতি অনুসারে মাতাপিতা যে রাষ্ট্রেরই নাগরিক হােক না কেন শিশু যে রাষ্ট্রে ভূমিষ্ঠ হয় সে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক বলে গণ্য হবে। যেমন, ভারতীয় দম্পতির কোনাে সন্তান যদি ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করে তাহলে সে ব্রিটেনের নাগরিকত্ব লাভ করবে। এই নীতি অনুসারে কোনাে দেশের পতাকাবাহী জাহাজে বা বিমানে জন্মগ্রহণকারী শিশুও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিক বলে গণ্য হবে। তবে রাষ্ট্রদূতদের ক্ষেত্রে জন্মস্থান নীতি প্রযােজ্য হয় না।

প্রশ্ন ৮। নাগরিকত্ব বিলুপ্তির প্রধান কারণগুলি কী কী?
উত্তর : (ক) স্বেচ্ছায় অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে। (খ) কোনাে মহিলা অন্য রাষ্ট্রের নাগরিককে বিবাহ করলে। (গ) নিজ রাষ্ট্রের অনুমতি ব্যতীত অন্য রাষ্ট্রে সরকারি চাকরি গ্রহণ করলে। (ঘ) দেশদ্রোহিতার কারণে অভিযুক্ত হলে নাগরিকতা বিলুপ্ত হয়।

প্রশ্ন ৯। সুনাগরিক কাকে বলে?
উত্তর : সাধারণভাবে বলা যায়, গণতন্ত্রের সাফল্যের পক্ষে অপরিহার্য গুণাবলির অধিকারী নাগরিকই হল সুনাগরিক। লর্ড ব্রাইসকে অনুসরণ করে বলা যায় যে নাগরিকের বিচারবুদ্ধি, আত্মসংযম ও বিবেকবুদ্ধি রয়েছে তিনিই সুনাগরিক।

প্রশ্ন ১০। সুনাগরিকের কী কী গুণাবলি থাকা প্রয়ােজন?
উত্তর : লর্ড ব্রাইসের মতে, সুনাগরিকের তিনটি অপরিহার্য গুণ হল—(ক) বিচারবুদ্ধি, (খ) আত্মসংযম, (গ) বিবেকবুদ্ধি ও (ঘ) স্বাধীনচেতা মনােবৃত্তিকেও সুনাগরিকের গুণ বলে বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন ১১। সুনাগরিকতার পথে প্রধান অন্তরায়গুলি কী কী?
উত্তর : সুনাগরিকতার পথে প্রধান অন্তরায়গুলি হল—(ক) নির্লিপ্ততা, (খ) ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা, (গ) সংকীর্ণ দলীয় মনােবৃত্তি, (ঘ) অজ্ঞতা ও অশিক্ষা, (ঙ) অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদি।

প্রশ্ন ১২। নাগরিক ও বিদেশির মধ্যে দুটি পার্থক্য উল্লেখ করাে।
উত্তর : (ক) নাগরিকরা স্বদেশেই থাকুন আর বিদেশেই থাকুন, তারা যে রাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা তাদের সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে হয়। বিদেশিদের এইরূপ আনুগত্য প্রদর্শন করতে হয় না।
   (খ) নাগরিকরা পৌর ও রাজনৈতিক অধিকার ভােগ করে। বিদেশিরা এই অধিকার ভােগ করলেও, রাজনৈতিক অধিকার ভােগ করে না। বিদেশিরা ভােট দিতে পারে না। ভােটপ্রার্থী হতে পারে না।

প্রশ্ন ১৩। ভারতের সংবিধানের কত নং ধারায় নাগরিকত্ব সম্পর্কে আলােচনা করা হয়েছে?
উত্তর : ভারতের সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নং ধারায় নাগরিকতা সম্পর্কে আলােচনা করা হয়েছে। ১১নং ধারায় পার্লামেন্টকে নাগরিকতা বিষয়ে যাবতীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ১৪। ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন কত খ্রিস্টাব্দে পাস হয়?
উত্তর : ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পার্লামেন্ট ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করে। ১৯৮৫ এবং ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তা সামান্য সংশােধিত হয়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে।

প্রশ্ন ১৫। অধিকার কাকে বলে ?
উত্তর : সাধারণ অর্থে ‘অধিকার’ বলতে কোনাে স্বত্ব বা দাবিকে বােঝায়। ব্যাপক অর্থে অধিকার হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযােগী সেই সকল সুযােগসুবিধা, যা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত।

প্রশ্ন ১৬। অধিকারের বৈশিষ্ট্য কী কী ?
উত্তর : (ক) অধিকার একটি সামাজিক ধারণা, (খ) অধিকার একটি আইনগত ধারণা, (গ) ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অধিকার অপরিহার্য, (ঘ) অধিকার পরিবর্তনশীল এবং (ঙ) অধিকার কর্তব্যের আপেক্ষিক।

প্রশ্ন ১৭। অধিকারের মার্কসীয় সংজ্ঞা দাও।
উত্তর : মার্কসীয় তত্ত্বে অধিকারকে শ্রেণিস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেখার কথা বলা হয়। অধিকার সমাজ নিরপেক্ষ নয়। রাষ্ট্র সাধারণত শাসকশ্রেণির স্বার্থে আইন প্রণয়ন করে এবং অধিকারের স্বীকৃতি দেয়।

প্রশ্ন ১৮। কত খ্রিস্টাব্দে মানবাধিকার ঘােষণাটি প্রকাশিত হয় ? এই ঘােষণাটির গুরুত্ব কী ?
উত্তর : ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় মানব অধিকার সম্পর্কিত ঘােষণায় (Universal Declaration of Human Rights) সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরােপ করা হয়। এই অধিকারগুলি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের সহায়ক।

প্রশ্ন ১৯। কর্তব্য বলতে কী বােঝ?
উত্তর : নাগরিকগণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে অধিকারগুলি ভােগ করে তার বিনিময়ে রাষ্ট্রের প্রতি তাকে কিছু দায়দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই দায়িত্ব পালনই হল কর্তব্য।

প্রশ্ন ২০। সব অধিকার কি কর্তব্যের উপর নির্ভরশীল?
উত্তর : সব অধিকার কর্তব্যের উপর নির্ভরশীল নয়। যেসব অধিকার দাবি বােঝায় সেগুলি কর্তব্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু যেগুলি দাবি বােঝায় না সেগুলি কর্তব্যের উপর নির্ভরশীল নয়। যেমন— মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এই অধিকারকে রূপায়িত করতে কারুর কর্তব্যের প্রয়ােজন হয় না।

প্রশ্ন ২১। সামাজিক বা পৌর অধিকার কাকে বলে? কয়েকটি সামাজিক বা পৌর অধিকারের উল্লেখ করাে।
উত্তর : যে সমস্ত সুযােগসুবিধা না থাকলে সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের ব্যক্তিসত্তার পূর্ণবিকাশ ঘটতে পারে না সেগুলিকে পৌর বা সামাজিক অধিকার বলা হয়। সামাজিক তথা পৌর অধিকারের মধ্যে উল্লেখযােগ্য কয়েকটি হল—জীবনের অধিকার, স্বাধীন গতিবিধির অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার, সমানাধিকার, ধর্মের অধিকার ইত্যাদি।

প্রশ্ন ২২। রাজনৈতিক অধিকার কাকে বলে? কয়েকটি রাজনৈতিক অধিকারের উল্লেখ করাে।
উত্তর : রাজনৈতিক অধিকার’ বলতে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে অংশগ্রহণ করাকে বােঝায়। রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে উল্লেখযােগ্য কয়েকটি হল—ভােটদানের অধিকার, নির্বাচিত হবার অধিকার, সরকারি চাকুরি পাবার অধিকার, আবেদন করার অধিকার, বিদ্রোহ করার অধিকার ইত্যাদি।

প্রশ্ন ২৩। ভারতীয় নাগরিকদের যে-কোনাে দুটি মৌলিক কর্তব্যের উল্লেখ করাে।
উত্তর : ভারতের সংবিধানে নাগরিকদের যেসব মৌলিক কর্তব্য পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম দুটি কর্তব্য হল—(ক) সংবিধান মান্য করা এবং সাংবিধানিক আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। (খ) ভারতের সার্বভৌমত্ব ঐক্য ও সংহতিকে সমর্থন ও সংরক্ষণ করা।

প্রশ্ন ২৪। নির্দেশমূলক নীতি বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে কতকগুলি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মৌলিক নীতির উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলিকে নির্দেশ হিসেবে মেনে চলবে বা অনুসরণ করবে। এই নীতিগুলিকে বলা হয় নির্দেশমূলক নীতি।

প্রশ্ন ২৫। কয়েকটি নির্দেশমূলক নীতির উল্লেখ করাে।
উত্তর : (ক) রাষ্ট্র সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি সমাজব্যবস্থা গঠন করে জনকল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হবে।
(খ) রাষ্ট্র সমগ্র ভারতের সকল নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের চেষ্টা করবে।
(গ) সংবিধান চালু হওয়ার ১০ বছরের মধ্যে ১৪ বছর বয়স্ক বালক-বালিকার জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে।

প্রশ্ন ২৬। নির্দেশমূলক নীতির দুটি তাৎপর্য লেখাে।
উত্তর : (ক) রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলি শাসকশ্রেণিকে তাদের করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়। (খ) মৌলিক অধিকারের অংশে যে সমস্ত অপূর্ণতা রয়েছে, নির্দেশমূলক নীতিগুলি তা দূর করে। যেমন, অর্থনৈতিক অধিকার মৌলিক অধিকারের স্থান না পেলেও নির্দেশমূলক নীতিতে স্থান পেয়েছে।

প্রশ্ন ২৭। অধিকার সম্পর্কে প্রচলিত মতবাদগুলি কী কী?
উত্তর : অধিকার সম্পর্কে প্রচলিত মতবাদগুলি হল—(ক) স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্ব, (খ) আইনগত তত্ত্ব, (গ) ঐতিহাসিক তত্ত্ব, (ঘ) আদর্শবাদী তত্ত্ব এবং (ঙ) মার্কসবাদী তত্ত্ব।

প্রশ্ন২৮। প্রতিরােধের অধিকার প্রয়ােগের সপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উল্লেখ করাে।
উত্তর : রাষ্ট্র নাগরিকের নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় আইন সাধারণ কল্যাণের অনুপন্থী হলে তা মান্য করা নাগরিকের কর্তব্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইন সাধারণের স্বার্থের পরিপন্থী হলে তা প্রতিরােধ করা নাগরিকের কর্তব্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিরােধের প্রয়ােগ করা পবিত্র কর্তব্য বলে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন।

প্রশ্ন ২৯। অর্থনৈতিক অধিকার বলতে কী বােঝ ?
উত্তর : অর্থনৈতিক অধিকার বলতে দৈনন্দিনের অন্নসংস্থানের বিষয়ে যুক্তিসংগত অর্থ খুঁজে পাবার সুযােগ—মানুষ যদি ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ে, বেকারত্বের জ্বালায় জ্বলতে থাকে, দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না পারে তাহলে তার কাছে রাজনৈতিক ও পৌর অধিকারের ঘোষণার কোনাে মূল্য থাকে না। অর্থনৈতিক অধিকার স্বীকৃত না হলে সমাজে ধনিকশ্রেণিই সকল অধিকারের নিয়ামক হয়ে পড়বে। দারিদ্রক্লিষ্ট বুভুক্ষ বেকার মানুষের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ কোনাে অবস্থায় সম্ভব হতে পারে না। সুতরাং রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারকে সার্থক করতে হলে অর্থনৈতিক অধিকার একান্ত অপরিহার্য।

প্রশ্ন ৩০। পরিবারের প্রতি নাগরিকের কী কী কর্তব্য রয়েছে?
উত্তর : আধুনিক সমাজজীবনে নাগরিকের বিভিন্ন কর্তব্য রয়েছে। তার প্রাথমিক কর্তব্য পরিবারের প্রতি। সমাজ সংগঠনের মূলভিত্তি হল পরিবার। পরিবারের মধ্যেই শিশুর আত্মবিকাশের সুযােগ ঘটে। বিকাশ ও বৃদ্ধির পর্যায়ে পরিবারই শিশুকে লালনপালন করে, নিরাপত্তা বিধান করে। পারিবারিক জীবনেই সমাজ বন্ধনের মূলনীতি স্নেহ, মমতা, ভালােবাসা, সহযােগিতা, বন্ধুত্ব প্রভৃতির বিকাশ হয়। সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবার বৃহত্তর সমাজজীবনের সমৃদ্ধির পরিচায়ক। সুস্থ পরিবার জীবন পরিবারের সকল সদস্যের পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের দ্বারা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। সুতরাং নাগরিককে পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিথিল পারিবারিক বন্ধন সুস্থ সমাজজীবন গড়ে তোলার সহায়ক হতে পারে না।

প্রশ্ন ৩১। দ্বৈত নাগরিকতা কাকে বলে ?
উত্তর : ভারত, ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে রক্তের সম্পর্ক ও জন্মস্থান নীতি দুটিকেই অনুসরণ করা হয়। এর ফলেই দ্বৈত নাগরিকতার জন্ম হয়। যদি একটি ব্রিটিশ দম্পতির সন্তান ভারতে জন্মগ্রহণ করে, তবে জন্মস্থান নীতি অনুসারে সে ভারতের নাগরিক, কিন্তু রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে সে ব্রিটেনের নাগরিক। যেহেতু ভারত ও ব্রিটেনে উভয়নীতি অনুসারে নাগরিকতা নির্ধারিত হয়, সেহেতু উভয় রাষ্ট্রই সেই শিশুটিকে নিজ নাগরিক বলে দাবি করতে পারে। একেই দ্বৈতনাগরিকতা বলে।

প্রশ্ন ৩২। অনুমােদনসিদ্ধ নাগরিক বলতে কী বােঝ?
উত্তর : যখন কোনাে ব্যক্তি বা জনসমাজ অন্য রাষ্ট্রের অনুমােদন সাপেক্ষে নাগরিকতা লাভ করে, তখন সেই ব্যক্তি বা জনসমাজকে অনুমােদনসিদ্ধ নাগরিক বলে।

প্রশ্ন ৩৩। যে-কোনাে চারটি পৌর অধিকার উল্লেখ করাে।
উত্তর : চারটি পৌর অধিকার হল—(ক) জীবনের অধিকার, (খ) চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার, (গ) সম্পত্তির অধিকার এবং (ঘ) কার্যের অধিকার।

প্রশ্ন ৩৪। যে-কোনাে চারটি রাজনৈতিক অধিকার উল্লেখ করাে।
উত্তর : চারটি রাজনৈতিক অধিকার হল—(ক) ভােট দানের অধিকার, (খ) সরকারি চাকুরির অধিকার, (গ) আবেদন করার অধিকার এবং (ঘ) সরকারের সমালােচনা করার অধিকার।

প্রশ্ন ৩৫। যে-কোনাে চারটি অর্থনৈতিক অধিকার উল্লেখ করাে।
উত্তর : চারটি অর্থনৈতিক অধিকার হল—(ক) কর্মের অধিকার, (খ) অবকাশের অধিকার, (গ) উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার এবং (ঘ) প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার।

প্রশ্ন ৩৬। অধিকার কত প্রকারের?
উত্তর : অধিকার দুই প্রকারের যথা—(ক) নৈতিক অধিকার এবং (খ) আইনগত অধিকার। আইনগত অধিকার আবার তিনভাগে বিভক্ত যথা—(ক) সামাজিক, (খ) রাজনৈতিক এবং (গ) অর্থনৈতিক অধিকার।

বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) নাগরিকতার সংজ্ঞা দাও।

উত্তর : রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিকতার প্রশ্ন বিশেষভাবে জড়িত। কারণ ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে, রাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যক্তি কী অধিকার দাবি করতে পারে বা রাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তির কর্তব্য কী হবে—এইসব প্রশ্নের উত্তর নাগরিকতা সম্পর্কে ধারণার মধ্যে নিহিত আছে।

নাগরিকতার সংজ্ঞা
আক্ষরিক অর্থে নগরের অধিবাসীকে নাগরিক বলা যায়। প্রাচীনকালে নগরকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র গড়ে উঠত—তাকে বলা হত city state বা নগর রাষ্ট্র। সেই নগরে যারা বাস করত এবং যারা প্রশাসনে অংশগ্রহণ করত, তাদের বলা হত নাগরিক। সেখানে স্ত্রীলােক এবং ক্রীতদাসদের নাগরিক বলা হত । কারণ, তারা শাসনকার্যে অংশ নিতে পারত না।
   বর্তমানে রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর ছাড়া এতে গ্রামও আছে। সকলে শাসনের কাজে অংশ নিতে পারে না। পারা সম্ভবও নয়। তাই তখন নাগরিকতার সংজ্ঞার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে তাকেই নাগরিক বলা হয়,—যে রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাস করে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখায় এবং রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রেরই দেওয়া সব সুযােগসুবিধা ভােগ করে।
   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি মিলার (Miller) বলেছেন রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে মানুষ যখন রাষ্ট্র গঠন করে এবং যারা নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য সরকার প্রতিষ্ঠা করে ও সেই সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখায়, তখন তারাই নাগরিক বলে বিবেচিত হয়।” তবে অধ্যাপক ল্যাস্কি (Laski)-এর সঙ্গে আরও বলেছেন যে,—“আদর্শ নাগরিক হতে গেলে তার সমাজের কল্যাণসাধনের জন্য নিজের বুদ্ধি প্রয়ােগের ক্ষমতা থাকা দরকার।”

প্রশ্ন ২) নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করাে।
উত্তর : নাগরিকতা অর্জনের জন্য প্রধানত দুটি পদ্ধতি আছে—(ক) জন্মসূত্রে অর্জন এবং (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমােদনের দ্বারা অঙনি। জন্মসূত্রে যে নাগরিকতা পাওয়া যায়, সেটি হল স্বাভাবিক পদ্ধতি। অন্যদিকে অনুমােদনের দ্বারা কৃত্রিম উপায়ে নাগরিকতা অর্জন করা যায়।

জন্মসূত্রে অর্জন
জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের দুটি মূল নীতি আছে—(ক) রক্তের সম্পর্ক নীতি এবং (খ) জন্মস্থান নীতি।
• (ক) রক্তের সম্পর্ক নীতি
রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে শিশু যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, সে তার পিতা-মাতার নাগরিকতা পাবে। অর্থাৎ পিতা-মাতা যে রাষ্ট্রের নাগরিক শিশুও সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে। যেমন, কোনাে ভারতীয় পিতা-মাতার সন্তান যদি জাপানে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে সেই শিশু ভারতের নাগরিক হবে।
• (খ) জন্মস্থান নীতি
এই নীতি অনুসারে সন্তানের পিতা-মাতা যে দেশের নাগরিক হােক না কেন, শিশু যে রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করবে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে। যেমন, ভারতের কোনাে পিতা-মাতার সন্তান যদি জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করে, তবে সে জার্মানির নাগরিক হবে। জাহাজে বা বিমানে যদি কেউ জন্মগ্রহণ করে তাহলে এইনীতি অনুসারে সেই জাহাজ বা বিমান যে রাষ্ট্রের, শিশুটি সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে।

অনুমােদনসিদ্ধ নাগরিক
অনুমােদনের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন করা যায়। অনুমােদন আবার দুটি অর্থে হতে পারে— ব্যাপক অর্থে এবং সংকীর্ণ অর্থে। ব্যাপক অর্থে অনুমােদনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করতে হয় না। বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়, সরকারি চাকুরি গ্রহণ, বিবাহ, সেনাবাহিনীতে যােগদান প্রভৃতি যে- কোনাে উপায়ের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন করা যায়।
   ব্রিটেন, ভারত প্রভৃতি দেশে অনুমােদন শব্দটি সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহূত হয়। এখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তপূরণ করে সরকারের কাছে আবেদনের মাধ্যমে নাগরিকতা পাওয়া যায়। এইসব শর্তের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের শর্ত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
   এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন—অধিকাংশ রাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকতা ও অনুমােদনসিদ্ধ নাগরিকতার মধ্যে কোনাে পার্থক্য করা হয় না। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এদের মধ্যে পার্থক্য টানা হয়। যেমন, কোনাে অনুমােদনসিদ্ধ নাগরিক সেখানে রাষ্ট্রপতিপদে প্রার্থী হতে পারবে না।

প্রশ্ন ৩) ব্যক্তির নাগরিকতা কীভাবে বিলুপ্ত হয় ?
উত্তর : নাগরিকতা হল একটি বিশেষ মর্যাদা। কোনাে ব্যক্তি নাগরিকতা অর্জন করলে সে রাষ্ট্রের কাছ থেকে রাষ্ট্রস্বীকৃত সব অধিকার ভােগ করতে পারে। তবে এই নাগরিকতা বজায় রাখার জন্য কতকগুলি শর্ত মেনে চলতে হয়। না মানলে নাগরিকতার বিলােপ ঘটে। নিম্নে নাগরিকতা বিলােপের কারণ উল্লেখ করা হল—
(ক) কোনাে ব্যক্তি অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে, তার নিজের রাষ্ট্রের নাগরিকতা লােপ পায়। কারণ, একই সঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া যায় না।
(খ) কোনাে স্ত্রীলােক বিদেশিকে বিয়ে করলে, সে নিজের নাগরিকত্ব হারিয়ে স্বামীর নাগরিকত্ব পায়।
(গ) নিজের রাষ্ট্রের অনুমতি না নিয়ে অন্য রাষ্ট্রের অধীনে সরকারি চাকুরি নিলে অনেক ক্ষেত্রে নিজের রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব চলে যায়।
(ঘ) নিজের দেশে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকলে নাগরিকতার বিলােপ ঘটতে পারে।
(ঙ) যুদ্ধের সময় সৈন্যদল থেকে পালিয়ে গেলে বা বিদেশি সেনাবাহিনীতে যােগ দিলে নিজের দেশের নাগরিকত্ব হারাতে হয়।
(চ) দেশদ্রোহিতার অপরাধে কোনাে ব্যক্তির নাগরিকতার বিলােপ হতে পারে।
(ছ) অন্য রাষ্ট্রের উপাধি গ্রহণ করলে কোনাে কোনাে রাষ্ট্রের নাগরিকের নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হতে পারে।
(জ) কোনাে কোনাে রাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
   নাগরিকত্ব বিলােপের ব্যাপারে সব দেশের নিয়ম এক নয়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের আইন চালু আছে। তবে কিছুকিছু নিয়ম সব দেশে স্বীকৃত। যেমন, অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকতা গ্রহণ করলে নিজ রাষ্ট্রের নাগরিকতা হারাতে হয়।

প্রশ্ন ৪) সুনাগরিক বলতে কী বােঝ?
উত্তর : রাষ্ট্রের প্রগতি নির্ভর করে তার নাগরিকরা কতটা গুণসম্পন্ন ও সচেতন তার উপর। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে একথা আরও বিশেষভাবে প্রযােজ্য। কারণ গণতন্ত্র হল জনগণের শাসনব্যবস্থা। গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে সুনাগরিকতার উপর।
   যে ব্যক্তিরা বিবেকবান, সংযমী এবং বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন তাদের এককথায় সুনাগরিক বলা হয়। লর্ড ব্রাইসের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিককে যােগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। গণতন্ত্রে নাগরিকদের ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়। তাই নাগরিকদের যােগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। ব্রাইসের মতে, নাগরিক হবে কর্তব্যপরায়ণ ও পরিশ্রমী। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে, জনকল্যাণের স্বার্থে নাগরিক তার অবদান রাখবে।
   ল্যাস্কির মতে সুনাগরিকের গুণাবলি হল—(ক) সুনাগরিককে জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে, (খ) সে হবে বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন, (গ) নিজের কাজে তাকে সক্রিয় হতে হবে। অন্যান্য গুণাবলি হল বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক সচেতনতা, নাগরিককে বিবেকবান হতে হবে। আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকতে হবে। তাকে কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। এইসব গুণের বিকাশ তখনই সম্ভব হবে যখন একজন নাগরিক দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হবে।

প্রশ্ন ৫) নাগরিক ও বিদেশির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করাে।
উত্তর : উভয়ের মধ্যে কিছু বিষয়ে মিল থাকলেও পার্থক্য অনেক বেশি।
(i) আনুগত্যের ক্ষেত্রে : নাগরিক যে রাষ্ট্রে বাস করে সেই রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য দেখায়। কিন্তু বিদেশি তার নিজের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখায়।
(ii) অধিকার ভােগের ক্ষেত্রে : নাগরিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সব ধরনের অধিকার ভােগ করে। কিন্তু বিদেশি রাজনৈতিক অধিকার ভােগ করতে পারে না। যেমন, সে ভােটে অংশ নিতে পারে না।
(iii) স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে : নাগরিকরা সারাজীবন নিজের রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে। বিদেশিরা স্থায়ীভাবে অন্য রাষ্ট্রের বাসিন্দা হতে পারে না।
(iv) সেনাবাহিনীতে যােগদানের ক্ষেত্রে : রাষ্ট্র প্রয়ােজনে নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে যােগ দিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু বিদেশির ক্ষেত্রে তা পারে না।
(v) শাস্তিদানের ক্ষেত্রে : রাষ্ট্র নাগরিকদের চরম শাস্তি দিতে পারে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারে। কিন্তু বিদেশিকে দিতে পারে না। তাকে বড়াে জোর রাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে পারে।
(vi) নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে : নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা রাষ্ট্রের কর্তব্য। কোনাে নাগরিক যদি বিদেশে থাকে, তাহলেও রাষ্ট্র তার সম্পত্তি রক্ষা করার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু বিদেশি যতক্ষণ কোনাে দেশে থাকে, ততক্ষণ রাষ্ট্র তার জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করে। কিন্তু সে চলে গেলে রাষ্ট্রের আর কোনাে দায়িত্ব থাকে না। |

প্রশ্ন ৬) সুনাগরিকতার পথে অন্তরায়গুলি কী কী?
উত্তর : রাষ্ট্রের উৎকর্যের জন্য সুনাগরিক আবশ্যক। কিন্তু সুনাগরিকতার পথে বহু বাধা তথা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। লর্ড ব্রাইস সুনাগরিকতার পথে তিনটি অন্তরায়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
   ব্রাইসের মতে- (ক) নির্লিপ্ততা, (খ) ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা এবং (গ) সংকীর্ণ দলীয় মনােবৃত্তি সুনাগরিকতার পথে প্রধান অন্তরায়।
   এছাড়া অজ্ঞতা সংবাদপত্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাস, নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি ইত্যাদি বিষয়ও সুনাগরিকতার পথে বাধা হিসেবে কাজ করে। উদ্যমহীনতা ও নির্লিপ্ততা সুনাগরিকতার পথে প্রধান বাধা। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাজকর্মের বিষয়ে উদাসীনতা নাগরিকদের নির্লিপ্ত করে তােলে। ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা সুনাগরিকের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। অর্থের লালসা, মানসম্মানের লােভ, প্রভাব প্রতিপত্তির আকাক্ষা ইত্যাদি কারণে মানুষের মনে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা দেখা দেয়। এই মনােভাব ব্যক্তিকে সমাজের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থসম্পন্ন করে তােলে। সংকীর্ণ দলীয় মনােভাব সুনাগরিকতার পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়। সংকীর্ণ দলীয় মনােবৃত্তির কারণে ব্যক্তির মনে যদি সংকীর্ণ মনােভাবের সৃষ্টি হয় তাতে সমষ্টিগত স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। গণমাধ্যমসমূহের বিকৃত তথ্য, অজ্ঞতা, নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি ইত্যাদি সুনাগরিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

প্রশ্ন ৭) অধিকারের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী?
উত্তর : ব্যাপক অর্থে অধিকার শুধু দাবিই বােঝায় না। বিভিন্ন অধিকারের মধ্য দিয়ে নাগরিক তার পূর্ণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়। অধিকারের মৌল বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নরূপ-
(i) অধিকারের উৎস সমাজজীবন। সমাজজীবন ব্যতীত অধিকার থাকতে পারে না। নির্জন দ্বীপে রবিনসন ক্রুশাের কোনাে অধিকার ছিল না।
(ii) অধিকার সমাজে ভােগ করে ব্যক্তি। অধিকারের অর্থ সমাজে ব্যক্তির অধিকার। এই অধিকারই ব্যাক্তির সঙ্গে সমাজের এবং সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্দেশ করে।
(iii) গ্রিনের মতে, অধিকারের বৈশিষ্ট্য হল স্বাধীনভাবে চলার দাবি। অধিকার ব্যক্তির অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে বিকশিত করে। ব্যক্তির স্বাধীনতার দাবি সমাজের মঙ্গলের জন্য।
(iv) ল্যাস্কির মতে, অধিকারের উৎস সমাজজীবন ও পরিবেশ যেগুলি না থাকলে ব্যক্তি নিজেকে বিকশিত করতে পারে না। তাঁর মতে, অধিকারের উৎস ব্যক্তি ও সমাজজীবন। ল্যাস্কি অধিকারকে দেখেছেন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রয়ােজনের দিক থেকে।
(v) বার্কারের মতে, অধিকারের উৎস ন্যায় (justice)। তার মতে, প্রতিটি রাষ্ট্রই আইনের মাধ্যমে ন্যায় ব্যবস্থাকে রূপায়িত করে। বার্কারের মতে, আদর্শ অধিকারের উৎস দুটি— (ক) ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, (খ) রাষ্ট্র ও তার আইন। অধিকার এই দুই উৎস থেকে উদ্ভূত হয়। আদর্শ অধিকারের বৈশিষ্ট্য দুটি—(ক) অধিকার ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের শর্ত, (খ) আইনের দ্বারা অধিকার স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়।
(vi) অধিকারের অপর বৈশিষ্ট্য হল, কোনাে অধিকারই সমাজ নিরপেক্ষ নয়।
(vii) কোনাে অধিকারই সীমাহীন নয়।
(viii) অধিকার বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারে না। প্রতিটি অধিকারই অন্যান্য অধিকারের সঙ্গে যুক্ত।
(ix) মার্কসীয় তত্ত্বে অধিকারকে শ্রেণিস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেখা হয়। কারণ কোনাে অধিকারই সমাজে নিরপেক্ষ নয়। সব অধিকারের দাবি সমাজের কোনাে-না-কোনাে শ্রেণির দাবি।

প্রশ্ন ৮) অর্থনৈতিক অধিকার বলতে কী বােঝ?
উত্তর : শুধু ভােট দিয়ে পেট ভরে না। খাওয়া পরার সুযােগ থাকা চাই। এইসব অর্থনৈতিক সুযােগের নাম অর্থনৈতিক অধিকার। তাই অধ্যাপক ল্যাস্কি (Laski) বলেছেন—“দৈনন্দিন অন্ন সংস্থানের সুযােগের নাম অর্থনৈতিক অধিকার” এই অধিকার বিভিন্ন ধরনের
• (ক) কর্মের অধিকার
এটি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অধিকার। এর অর্থ হল—প্রত্যেকে তার যােগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাবে। সমাজতান্ত্রিক দেশে এই অধিকার স্বীকৃত হয়। যেমন, চিনে এই অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
• (খ) বিশ্রামের অধিকার
মানুষ যন্ত্র নয়। কাজের মাঝে বিশ্রামের প্রয়ােজন। না হলে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়বে। কর্মদক্ষতা কমে যাবে। তাই মানুষ বিশ্রামের অধিকার ভােগ করে। যেমন, সপ্তাহের শেযে সবেতন ছুটি পায়।
• (গ)পর্যাপ্ত মজুরির অধিকার
শ্রমিক তার কাজ অনুযায়ী পর্যাপ্ত বেতন পাবার অধিকারী। এমন বেতন দেওয়া উচিত যাতে ভদ্রভাবে বেঁচে থাকতে পারে। তা না হলে অসৎ পথ অবলম্বন করবে।
• (ঘ) বৃদ্ধ বয়সে ভরণ-পােষণের অধিকার
বৃদ্ধ বয়সে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে মানুষ অন্ন সংস্থান করতে পারে না, তখন রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব নিতে হয়। কল্যাণকর রাষ্ট্রে এ অধিকার মানুষ দাবি করতে পারে।
• (ঙ) সমান কাজের সমান বেতন পাবার অধিকার
একই কাজের বেতন একই হওয়া উচিত। দুর্বল শ্রেণির মানুষ বা নারীরা অসহায় বলে তাদের কম বেতন দিলে ন্যায় ও সাম্যনীতির বিরােধী হবে।
• (চ) অন্যান্য অধিকার
এছাড়া, অন্যান্য অর্থনৈতিক অধিকার আছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল—বেকারভাতা পাবার অধিকার, শ্রমিক সংঘ গঠনের অধিকার প্রভৃতি।

প্রশ্ন ৯) অধিকারের মধ্যেই কর্তব্য নিহিত আছে’—এই উক্তিটি ব্যাখ্যা করাে।
উত্তর : ইংরেজিতে একটি কথা আছে,—Rights imply duties. অর্থাৎ অধিকারের মধ্যে কর্তব্য নিহিত আছে। প্রকৃতপক্ষে অধিকার ও কর্তব্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে আশা করা যায় না” অধ্যাপক ল্যাস্কি (Laski) যথার্থই বলেছেন,—“যে কর্তব্য পালন করবে , সে অধিকার ভােগ করতে পারবে না। যেমন, যে কাজ করবে না, সে খেতেও পাবে না। অধিকার কর্তব্যের মধ্যে এই সম্পর্ক বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
• (ক) সমাজের দিক থেকে সম্পর্ক
অধিকার হল,—কতকগুলি সুযােগসুবিধা, যেগুলির মাধ্যমে ব্যক্তির বিকাশ সম্ভব। কোনাে ব্যক্তি যদি এই সুযােগসুবিধার অধিকার পেতে চায়, তাহলে অন্যদের কর্তব্য হল সেই সুযােগসুবিধা পাবার পথে বাধা সৃষ্টি না করা। হবসহাউস (Hobhouse) একটি উদাহরণের সাহায্যে সহজভাবে এই সম্পর্কটি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আমার যদি ধাক্কা না খেয়ে পথ চলার অধিকার থাকে, তাহলে অপরের কর্তব্য হল আমাকে প্রয়ােজনমতাে পথ ছেড়ে দেওয়া। অপরে যদি এই কর্তব্য পালন না করে, তাহলে আমার অধিকার ভােগ করা হবে না। আবার, আমি যদি এই কর্তব্য পালন না করি, তাহলে অপরে এই অধিকার ভােগ করতে পারবে না।
• (খ) রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সম্পর্ক
রাষ্ট্রের কাজ হল—নাগরিকদের আত্মবিকাশের সুযােগ করে দেওয়া। এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য কিছু সুযােগসুবিধা বা অধিকার দেয় এবং সংরক্ষণ করে। কিন্তু এই অধিকার সংরক্ষণ করতে গেলে জনগণের কর্তব্য হল রাষ্ট্রকে সাহায্য করা। যেমন, কর দেওয়া, আইন মেনে চলা, মাতৃভূমি রক্ষা করা প্রভৃতি।
• (গ) নীতিগত ক্ষেত্রে সম্পর্ক
শুধু আইনগত ক্ষেত্রে নয়, নৈতিক ক্ষেত্রেও উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে। যেমন, পিতা-মাতার কর্তব্য হল—শিশুদের লালনপালন করা। এই কর্তব্য পালন করলে তারা বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের সাহায্য পাবার নৈতিক অধিকার ভােগ করতে পারবে।
• (ঘ) অধিকার কর্তব্যের দ্বারা সীমাবদ্ধ
অধিকার অবাধ হতে পারে না। কারণ, অধিকার অবাধ হলে শক্তিমানরাই অধিকার ভােগ করবে। দুর্বলের কোনাে অধিকার থাকবে না। তাই দুর্বলরা যাতে অধিকার ভােগ করতে পারে তার জন্য সবলদের কিছু কর্তব্যবােধের দ্বারা গণ্ডিবদ্ধ করা দরকার। সুতরাং দেখা যাচ্ছে—অধিকার ও কর্তব্য উভয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। একটিকে বাদ দিলে অপরটির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

প্রশ্ন ১০) মানবাধিকারের সংজ্ঞা দাও। মানবাধিকারের প্রকৃতি আলােচনা করাে।
উত্তর : মানবাধিকারের ঘােষণার পর ৫৮টি বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু আজও সাম্রাজ্যবাদ,  সন্ত্রাসবাদ ও ক্ষুধা আমাদের সম্মুখে বিপদের তমসা রাত্রিরূপে দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে আফগানিস্তানে, ইরাকে, ইরানে, চিনে, উত্তর কোরিয়াসহ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একনায়কতন্ত্রী দেশগুলিতে। তাই বর্তমান বিশ্ব মানবাধিকারের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়। মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, সমান অধিকারের স্পষ্ট ও লিপিবদ্ধ রূপকেই মানবাধিকার বলে। মনুষ্যত্বের অধিকার মানুষের আসল অধিকার। জন্মসূত্রে মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার সমন্বয় রূপই হল মানবাধিকার
   মানবিক অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে, ১০ ডিসেম্বর মানবিক অধিকারের বিশ্ব ঘােষণাপত্র গৃহীত হয়। এই ঘােষণাপত্রে ৩০টি ধারায় সমস্ত প্রকার অধিকার স্থান পেয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকারের যে সংজ্ঞা দিয়েছে তার মর্মার্থ হল ‘সব মানুষের মর্যাদা। সকলের সমান অধিকারের স্বীকৃতির উপরই কেবল এই পৃথিবীতে স্বাধীনতা, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কমিশনের সভানেত্রী শ্রীমতী ফ্রাঙ্কলিন ভি, রুজভেল্ট-এর ভাষায়—“এ হল মানবজাতির কাছে এক মহাসনদ।
   রাষ্ট্রসংঘের ঘােষণাপত্রে যে অধিকারগুলির কথা বলা হয়েছে তাকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়। (ক) রাজনৈতিক ও পৌর অধিকার, (খ) আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। রাজনৈতিক ও পৌর অধিকারগুলির মধ্যে আছে জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তার অধিকার। অন্যায় আটক ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে অব্যাহতি পাবার অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার। ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, ভােটাধিকার, সরকার গঠনের অধিকার। আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক অধিকারগুলির মধ্যে কাজকর্মের অধিকার। এই অধিকারগুলির যােগফলই হল ‘মানবাধিকার’
   প্রকৃতপক্ষে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদে মানবাধিকার বা মৌলিক স্বাধীনতার কোনাে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেননি সনদ প্রণেতারা। এর কারণ সনদ প্রণেতাদের মধ্যে সংজ্ঞা ও বিষয়বস্তু নিয়ে মতবিরােধ।

প্রশ্ন ১১) ভারতে মানবাধিকারের উপর কতটুকু গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে?
উত্তর : ভারতসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ তাদের অধিবাসীদের জন্য মানবাধিকারগুলিকে নিজেদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর থেকেই এই অধিকারগুলির গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলদ্ধি করা যায়। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায়, তৃতীয়, চতুর্থ এবং অন্যান্য অনুচ্ছেদে এবিষয়ে বিধি ব্যবস্থার উল্লেখ আছে। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ‘মানবাধিকার রক্ষা আইন’ এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরেই ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে ‘মানবাধিকার কমিশন’ গঠন করা হয় ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে। পৃথিবীতে রাষ্ট্রসংঘ মানবিক অধিকার রক্ষার এক অতন্দ্র প্রহরী। একইভাবে রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকারগুলির অতন্দ্র প্রহরী হল সেই দেশের সরকার ও সংবিধান।

প্রশ্ন ১২) মার্কসের দৃষ্টিতে অধিকার ও কর্তব্যের সম্পর্ক আলােচনা করাে।
উত্তর : মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতেও অধিকার ও কর্তব্যের অঙ্গাঙ্গি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্বীকার করা হয়। মাকর্স বলেছেন, “কর্তব্য ব্যতীত অধিকার চিন্তা করা যায় না এবং অধিকার ব্যতীত কর্তব্য পালন সম্ভব হয় না।” সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনেই অধিকার ও কর্তব্যের প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, সমাজের বাইরে নয়, সমস্যাটি কোনাে ব্যক্তি মানুষের জীবনের সমস্যা নয়, সামাজিক মানুষের সঙ্গে এর সম্পর্ক। সামাজিক মানুষই অধিকার ভােগ করে থাকে এবং মানুষ সামাজিক বলেই তার কর্তব্য পালনের প্রশ্নটিও অধিকার ভােগের সঙ্গে ওতপ্রােতভাবে জড়িত। কর্মের অধিকার শ্রম করার কর্তব্যও বটে। যে কাজ করবে না, সে খেতেও পাবে না। সুতরাং কর্তব্য পালন মানুষের সামাজিক দায়িত্ব। মার্কসবাদ অধিকার ও কর্তব্যকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় বলে মনে করে না, উভয়ের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক স্বীকার করে। 

প্রশ্ন ১৩) মানবাধিকার ঘােষণাপত্রে ৩০ নং ধারায় নাগরিকদের যেসব মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা যুক্ত করা হয়েছে তা বর্ণনা করাে।
উত্তর : (i) জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার, (ii) দাসত্ব থেকে মুক্তি, (i) স্বৈরাচারীর আটক ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ আদালত কর্তৃক যুদ্ধ বিচারের অধিকার, (iv) দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নিরপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার অধিকার, (v) আইনের দ্বারা সমানভাবে সংরক্ষিত হওয়ার অধিকার, (vi) চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, (vii) তথ্য ও চিন্তার আদানপ্রদান, (vi) সমবেত হওয়ার স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, (ix) অন্য রাষ্ট্রে আশ্রয়লাভের অধিকার, (x) চলাফেরার স্বাধীনতা এবং (xi) ভােটদান ও সরকারের অংশগ্রহণের অধিকার প্রভৃতি।

প্রশ্ন ১৪) অধিকার ও মানবাধিকারের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর : প্রকৃতিগতভাবে মানবাধিকার (Human Rights) এবং অধিকারের (Rights) মধ্যে পার্থক্য আছে। নিম্নে সেগুলি উল্লেখ করা হল—
(i) মানবাধিকার আন্তর্জাতিক সংস্থার ঘােষণাপত্র, অধিকার রাষ্ট্রের সীমানায় ব্যক্তি ভােগ করে।
(ii) অধিকার ব্যক্তি বা গােষ্ঠীর রাষ্ট্রের কাছে দাবি, কিন্তু মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একথা বলা যায় না।
(iii) মানবাধিকারকে নীতি সম্বলিত নিয়ম বলে উল্লেখ করা যায়, কিন্তু অধিকার রাষ্ট্রের আইনের দ্বারা স্বীকৃত।
(iv) মানবাধিকার প্রয়ােগের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার অভাব আছে, কিন্তু অধিকার রাষ্ট্রের আইন বলবৎ করে।
(v) মানবাধিকার বলবকরণের ক্ষেত্রে জাতিপুঞ্জকে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনে নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট।
(vi) রাষ্ট্রে লিখিত সংবিধানে অধিকার সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মানবাধিকারের ঘােষণাপত্রকে রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধানের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
(vii) অধিকার বলবৎযােগ্য, মানবাধিকার সেই অর্থে বলবৎযােগ্য নয়।
   অধিকার লঙ্ঘিত হলে সদস্যের আদালতে তার বিরুদ্ধে নাগরিক, ব্যক্তি বা গােষ্ঠী এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযােগ আনতে পারে। অধিকার লঙ্ঘনের অভিযােগ প্রমাণিত হলে অধিকার ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। যেমন, ভারতের লিখিত সংবিধানে নাগরিকের জন্যে প্রদত্ত অধিকার বলবৎকরণের জন্যে রাজ্যের হাইকোর্ট এবং ভারতের সুপ্রিমকোর্টের সংবিধান সম্মত ক্ষমতা রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযােগের তদন্ত করে মানবাধিকার কমিশন এবং প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকেই নির্দেশ দেয়। সর্বোপরি নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি নিয়ে আলােচনা হতে পারে। সুতরাং মানবাধিকার ও অধিকারের মধ্যে উপরােক্ত বিষয়ে উল্লেখযােগ্য পার্থক্য রয়েছে বলা যায়।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) নাগরিকতার সংজ্ঞা দাও। নাগরিকতা অর্জনের বিভিন্ন পদ্ধতি কী কী ?

উত্তর : রাষ্ট্রব্যবস্থার সংজ্ঞা নাগরিকতার প্রশ্নে বিশেষভাবে জড়িত। কারণ ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে, রাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যক্তি কী অধিকার দাবি করতে পারে বা রাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তির কর্তব্য কী হবে—এইসব প্রশ্নের উত্তর নাগরিকতা সম্পর্কে ধারণার মধ্যে নিহিত ।

নাগরিকতার সংজ্ঞা
নাগরিক কথাটির শব্দগত অর্থ হল নগরের অধিবাসী। প্রাচীন গ্রিস, রােম এবং সামন্ত যুগ পর্যন্ত নাগরিক কথাটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হত। প্রাচীন গ্রিক মনীষী অ্যারিস্টটল (Aristotle) বলেছিলেন, ন্যায় প্রশাসনে (বিচারকার্যে) যিনি অংশগ্রহণ করেন এবং যিনি প্রশাসনিক পদের অধিকারী তিনিই নাগরিক। এই সংজ্ঞা থেকে বােঝা যায় নাগরিক একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অধিকারী, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় আইন ও শাসনের প্রতি অনুগত। প্রাচীন গ্রিস ও রােমে অভিজাত সম্পত্তিবান লােকেরাই নাগরিক অধিকার ভােগ করত। দাস, শ্রমিক ও মহিলাদের অধিকার ছিল না। বর্তমানে রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর ছাড়া এতে গ্রামও আছে। সকলে প্রশাসনের কাজে অংশ নিতে পারে না, পারা সম্ভবও নয়। তাই এখন নাগরিকতার সংজ্ঞার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে তাকেই নাগরিক বলা হয়,—যে রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাস করে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখায় এবং রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রের দেওয়া সব সুযােগসুবিধা ভােগ করে। মার্কিন বিচারপতি মিলার (Miller) বলেছেন, “রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে মানুষ যখন রাষ্ট্র গঠন করে এবং যারা নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য সরকার প্রতিষ্ঠা করে ও সেই সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখায়, তখন তারাই নাগরিক বলে বিবেচিত হয়।” অধ্যাপক ল্যাস্কি নাগরিকতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—“আদর্শ নাগরিক হতে গেলে তার সমাজে কল্যাণসাধনের জন্য নিজের বুদ্ধি প্রয়ােগের ক্ষমতা থাকা দরকার।”

নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতি
নাগরিকতা অর্জনের সুপ্রচলিত পদ্ধতি দু-প্রকার (ক) জন্মের দ্বারা (by birth) এবং (খ) আইনগতভাবে অর্জন বা অনুমােদনের দ্বারা (by Naturalisation)। জন্মের দ্বারা নাগরিকতা লাভ করলে তাকে স্বাভাবিক জন্মসূত্রে নাগরিক এবং অনুমােদনের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন করলে তাকে অনুমােদন সিদ্ধ নাগরিক বলা হয়।

জন্মসূত্রে নাগরিকতা
জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জনের দুটি মূলনীতি আছে,(ক) রক্তের সম্পর্ক নীতি এবং (খ) জন্মস্থান নীতি।
• (ক) রক্তের সম্পর্ক নীতি
রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে শিশু যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, সে তার পিতা-মাতার নাগরিকতা পাবে। অর্থাৎ পিতা-মাতা যে রাষ্ট্রের নাগরিক, শিশুও সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে। যেমন, কোনাে ভারতীয় পিতা-মাতার সন্তান যদি ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুসারে সেই শিশু ভারতের নাগরিক হবে।
• (খ) জন্মস্থান নীতি
এই নীতি অনুসারে সন্তানের পিতা-মাতা যে দেশের নাগরিক হােক না কেন, শিশু যে রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করবে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে। যেমন, ভারতের কোনাে পিতা-মাতার সন্তান যদি ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন, তবে সে ফ্রান্সের নাগরিক হবে। জাহাজে বা বিমানে যদি কেউ জন্মগ্রহণ করে, তাহলে এই নীতি অনুসারে সেই জাহাজ বা বিমান যে রাষ্ট্রের, শিশুটি সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হবে।

সমালােচনা

রক্তের সম্পর্ক নীতি ও জন্মস্থান নীতির মধ্যে ত্রুটি আছে। রক্তের সম্পর্ক নীতির অসুবিধা হল, পিতা-মাতার নাগরিকতা যদি ঠিক না হয়, তাহলে সন্তানের নাগরিকতা নির্ধারণ করা যাবে না।
   আবার জন্মস্থান নীতিরও ত্রুটি আছে। কোনাে পিতা-মাতা বিশ্বপরিক্রমায় বেরিয়ে তাদের প্রথম সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, দ্বিতীয়টি চিনে, তৃতীয়টি রাশিয়ার জাহাজে এবং চতুর্থটি ইরাকে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে চারটি সন্তান চারটি দেশের নাগরিক হবে। এটি গ্রহণযােগ্য নয়।
• দ্বিনাগরিকতার সমস্যা
কোনাে কোনাে রাষ্ট্র রক্তের সম্পর্ক নীতি ও জন্মস্থান নীতি—এই দুটি নীতি মেনে চলে। গ্রেট ব্রিটেন, ভারত এদের মধ্যে পড়ে, এতে দ্বিনাগরিকতার সমস্যা দেখা দেয়। যেমন, ভারতের কোনাে দম্পতির সন্তান ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করলে রক্তের সম্পর্ক অনুসারে সে ভারতীয় নাগরিক। আবার জন্মস্থান নীতি অনুসারে সে ব্রিটেনের নাগরিক। এইক্ষেত্রে শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে যে-কোনাে একটি দেশের নাগরিকতা গ্রহণের সুযােগ দেওয়া হয়।
• অনুমােদনসিদ্ধ নাগরিক
অনুমােদনের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন করা যায়। অনুমােদন আবার দুটি অর্থে হতে পারে—ব্যাপক অর্থে এবং সংকীর্ণ অর্থে, ব্যাপক অর্থে অনুমােদনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করতে হয় না। বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়, সরকারি চাকরি গ্রহণ, বিবাহ, সেনাবাহিনিতে যােগদান প্রভৃতি যে-কোনাে উপায়ের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন করা যায়।
   ব্রিটেন, ভারত প্রভৃতি দেশে অনুমােদন শব্দটি সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত হয়। এখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তপূরণ করে সরকারের কাছে আবেদনের মাধ্যমে নাগরিকতা পাওয়া যায়। এইসব শর্তের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের শর্ত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া আরও শর্ত আছে, যেমন, ব্রিটেনে নাগরিকতা পেতে গেলে ইংরেজি ভাষা অবশ্যই জানতে হবে।

মূল্যায়ন
বর্তমানে যােগাযােগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি এবং বিশ্বায়নের ফলে রাষ্ট্রগুলি পরস্পরের ল্যায়ন কাছাকাছি এসেছে। নাগরিকদের বিদেশে যাতায়াত সহজ হয়ে গেছে। এক দেশের নাগরিক অন্যদেশের নাগরিকত্ব নিচ্ছে। তার ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেবার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বিধি তৈরি করা হচ্ছে।

প্রশ্ন ২) ভারতীয় নাগরিকতা আইন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
উত্তর : ভারত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য অনেক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় ভারতে দি-নাগরিকতার নীতি স্বীকার করা হয়নি। ভারতে যে-কোনাে অংশের মানুষ, অর্থাৎ বাংলা, বিহার, মহারাষ্ট্র, অসম যে-কোনাে রাজ্যে বসবাসকারী ব্যক্তি ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হন, কোনাে রাজ্যের নয়।

সংবিধানে বিস্তৃত ব্যবস্থা ছিল না
ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকতা সম্পর্কে বিস্তৃত নিয়মাবলির উল্লেখ করা হয়নি। তার দায়িত্ব দেওয়া হয় পার্লামেন্টের ওপর। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সংবিধান প্রবর্তনের সময়ে কারা ভারতের নাগরিক সেটুকুই শুধু বলা হয়েছে। সংবিধানের ৫নং ধারা অনুযায়ী (ক) ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি। ভারতে বসবাসকারী সকল ব্যক্তি, (খ) যিনি ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন, (গ) পিতা-মাতার মধ্যে কেউ ভারতে জন্মগ্রহণ করে থাকলে তিনি ভারতের নাগরিক। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ৬ বছর যারা ভারতে বসবাস করেছেন এবং স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তারাও নাগরিক।

ভারতীয় নাগরিকতা আইন, ১৯৫৫
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ভারতীয় নাগরিকতা আইনে নাগরিকতা অর্জন ও বিলােপের নিয়মগুলি লিপিবদ্ধ হয়েছে।
• নাগরিক হবার পদ্ধতি
নাগরিকতা অর্জনের নিয়মগুলি হল—
(i) ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারির পর যারা ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন তারা জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক।
(ii) ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি বা তারপর যারা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছে তাদের পিতা- মাতা ভারতীয় নাগরিক হলে রক্তের সম্পর্ক নীতি অনুযায়ী তারাও ভারতের নাগরিক।
(iii) রেজিস্ট্রিকরণ বা নথিভুক্তকরণের মাধ্যমে নাগরিকতা লাভ করা যায়। রেজিস্ট্রিকরণের পূর্বে অন্তত ৬ মাস ভারতে বসবাসের প্রয়ােজন।
(iv) যে-সকল মহিলা ভারতের নাগরিককে বিবাহ করেছেন।
(v) ব্রিটেন, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের নাগরিকগণও আবেদনের ভিত্তিতে শর্তপূরণ করে নাগরিক হতে পারেন। বিদেশিদের দেশীয়করণ বা অনুমােদনের মাধ্যমে নাগরিকতা প্রদান করা যায়। বিদেশিদের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত পূরণ করার প্রয়ােজন হয়।
(vi) কোনাে অঞল ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে ওই অঞ্চলের সকল নাগরিক ভারতের নাগরিক হবেন। গােয়া, দমন, দিউ, সিকিম প্রভৃতি ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ায় ওই সকল অঙ্কুলের অধিবাসীগণ ভারতের নাগরিক হয়েছেন।

ভারতীয় নাগরিকতার বিলােপ
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের নাগরিকতা আইনে ভারতীয় নাগরিকতা কীভাবে বিলুপ্ত হতে পারে তাও বলা হয়েছে। নাগরিকতা বিলুপ্তির কারণগুলি হল নিম্নরূপঃ
(i) স্বেচ্ছায় ভারতের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে।
(ii) দেশীয়করণ বা অনুমােদনের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিক অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে নাগরিকতা লােপ পাবে।
(iii) বিদেশি বা রেজিস্ট্রিকরণের মাধ্যমে যারা ভারতের নাগরিক হয়েছেন, ভারত সরকার নিম্নলিখিত কারণে নির্দেশের মাধ্যমে তাদের নাগরিকতার অবসান ঘটাতে পারেনঃ (ক) অসৎ উপায়ে নাগরিকতা অর্জন, (খ) সংবিধানের প্রতি অত্যাধ, (গ) ভারতের সঙ্গে যুদ্ধরত কোনো দেশে ২ বছর বা অধিককাল কারাদণ্ড ভােগ করা এবং (ঘ) একাদিক্রমে ৭ বছর ভারতের বাইরে বাস করা।
• সংশােধন
   ১৯৫৫ এবং ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের সংশোধিত ভারতীয় নাগরিকতা আইনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশনে নাগরিকতা সংশােধন বিল লােকসভা এবং রাজ্যসভার দ্বারা গৃহীত হয়েছে। এই সংশােধন অনুযায়ী ভারতের মাটিতে (জন্মস্থান নীতি) জন্মগ্রহণ করলেই ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে জন্মগ্রহণ নীতির সূত্রে যারা ভারতের নাগরিকতা লাভের সুযােগ পেয়েছেন, এই নতুন নিয়মে সেই সুযােগ বিলুপ্ত হবে। পার্লামেন্টে আলােচনাকালে মার্কবাদী কমিউনিস্ট দলের সদস্যগণ নতুন বিলটিকে ‘বৈষম্যমূলক, মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরােধী, বলে সমালােচনা করেন। অসম চুক্তি এবং ভারতীয় নাগরিকতা আইনের সংশােধনের ফলে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের আইনে যে বিশ্বজনীন নাগরিকতার নীতি স্বীকৃত হয়েছিল, সম্পূর্ণ ক্ষুন্ন হয়েছে। ভারতে দু-শ্রেণির নাগরিক সৃষ্টি হয়েছে—(ক) ভােটাধিকার সমন্বিত এবং (খ) ভােটাধিকারবিহীন। নাগরিক ভােটাধিকার ভােগ করে না—এই ধারণা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনায় অভিনব বলা যায়। ভারতে এটি সম্ভব হয়েছে। |

প্রশ্ন ৩) আধুনিক রাষ্ট্রে কোনাে ব্যক্তির নাগরিকতা কীভাবে বিলুপ্ত হয় ?
উত্তর : নাগরিকতা হল একটি বিশেষ মর্যাদা, কোনাে ব্যক্তি নাগরিকতা অর্জন করলে, সে রাষ্ট্রের কাছ থেকে রাষ্ট্র-স্বীকৃত সব অধিকার ভােগ করতে পারে। তবে এই নাগরিকতা বজায় রাখার জন্য কতকগুলি শর্ত মেনে চলতে হয়। না মানলে নাগরিকতার বিলােপ ঘটে। বিলােপের কারণগুলি হল :
(ক) যদি কোনাে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অন্য একটি রাষ্ট্রের নাগরিকতা গ্রহণ করে তাহলে তার পূর্বের রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হয়।
(খ) যদি স্ত্রীলােক বিদেশের কোনাে পুরুষকে বিবাহ করে তাহলে সে তার দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে। ফলে তার পূর্ব রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হয়। আবার জাপানের ন্যায় কোনাে কোনাে দেশে বিদেশি পুরুষ কোনাে দেশের মহিলাকে বিবাহ করলে সে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে।
(গ) যদি কোনাে ব্যক্তি নিজের রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের সরকারি পদ গ্রহণ করে তাহলে তার পূর্ব-রাষ্ট্রের নাগরিকতার অবসান ঘটে।
(ঘ) কোনাে ব্যক্তি নিজ রাষ্ট্রে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকলে তার নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হয়।
(ঙ) যুদ্ধের সময় সৈন্যবাহিনী থেকে পলায়ন করলে বা বিদেশি সৈন্যবাহিনীতে যােগ দিলে স্বভাবতই তার পক্ষে আর তার নিজের দেশের নাগরিকত্ব বজায় রাখা সম্ভবপর হয় না।
(চ) কোনাে ব্যক্তি দেশদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হলে তার নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হয়। একদা সােভিয়েত ইউনিয়নে নােবেল পুরস্কার বিজয়ী আলেকজান্ডার সলঝেনি সিন- এর নাগরিকত্ব এই কারণে বিলুপ্ত হয়েছিল।
(ছ) অন্য কোনাে রাষ্ট্রের উপাধি গ্রহণ করলেও একজন তার নাগরিকত্ব হারাতে পারে। ভারতে এই নীতির কারণে এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং নােরগে, ব্রিটেনের স্যার উপাধি গ্রহণ করতে পারেননি।
(জ) বিদেশে স্থায়ী সম্পত্তি ক্রয় করলে অনেকসময় সেই ব্যক্তি তার নাগরিকতা হারায়। পরিশেষে কোনাে কোনাে রাষ্ট্র গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি নাগরিকতার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
   নাগরিকত্ব বিলােপের ব্যাপারে সব দেশের নিয়ম এক নয়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের আইন চালু আছে। তবে কিছুকিছু নিয়ম সব দেশে স্বীকৃত। যেমন, অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকতা গ্রহণ করলে নিজ দেশের নাগরিকতা হারাতে হয়।

প্রশ্ন ৪) নাগরিক ও বিদেশির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে।
উত্তর : নাগরিক ও বিদেশির মধ্যে পার্থক্য দেখাতে গেলে প্রথমে উভয়ের সংজ্ঞা সংক্ষেপে দেওয়া প্রয়ােজন। রাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং রাষ্ট্রের স্বীকৃত সব অধিকার ভােগ করে, তাকে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক বলে। অন্যদিকে যদি কোনাে ব্যক্তি এক রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে সাময়িকভাবে আর একদেশে বাস করে, তবে তাকে বলা হবে বিদেশি। এই সংজ্ঞার আলােকে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখানাে যেতে পারে।
• (ক) বসবাসগত পার্থক্য
নাগরিকরা হলেন রাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা। কিন্তু বিদেশিরা রাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা নন। নানা কারণে সাময়িকভাবে কোনাে রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রে বসবাস করলে তাকে বিদেশি বলা হয়। কাজেই বিদেশিরা হলেন অস্থায়ী বাসিন্দা। অনুমতিপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট সময় অবধি বিদেশিরা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রে থাকতে পারেন।
• (খ) আনুগত্যের পার্থক্য
নাগরিকদের নিজ-রাষ্ট্রের প্রতি স্থায়ীও স্বাভাবিক আনুগত্য থাকে। কিন্তু বিদেশিদের এই স্থায়ী ও স্বাভাবিক আনুগত্য থাকে না। যদিও একথা ঠিক যে বিদেশিদেরও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের আইন মেনে চলতে হয়। কিন্তু স্থায়ী বা স্বাভাবিক আনুগত্য তাদের থাকে না। তাঁরা তাদের নিজ রাষ্ট্রের প্রতিই স্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শন করেন।
• (গ) অধিকার ভােগের ক্ষেত্রে পার্থক্য
বর্তমানে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিদেশিরাও নাগরিকদের মতাে বেশ কিছু অধিকার ভােগ করতে পারে। তবুও অধিকার ভােগের ক্ষেত্রে নাগরিক ও বিদেশিদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিদেশিরা রাজনৈতিক অধিকার পান না। বিশেষ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সরকারি চাকুরি সংক্রান্ত অধিকার প্রভৃতি বিদেশিদের বেলায় স্বীকৃত নয়।
• (ঘ) বহিষ্কার সংক্রান্ত স্বীকৃত পার্থক্য
দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক, অসদাচারণ বা অন্য কোনাে কারণে একটি রাষ্ট্র তার সীমানায় বসবাসকারী যে-কোনাে বিদেশিকে বহিষ্কার করতে পারে। কিন্তু কোনাে কারণেই একজন নাগরিককে দেশ থেকে বিতাড়িত করা যায় না। অন্য কোনাে কঠোর শাস্তি দেওয়া গেলেও বর্তমানে নাগরিকদের বহিষ্কার করার কোনাে সুযােগ নেই।
• (ঙ) কর্তব্যপালনের পার্থক্য
কর্তব্যপালনের দিক থেকেও নাগরিক ও বিদেশিদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নাগরিকদের কাছে কর্তব্যপালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অনেক বেশি দাবি করতে পারে। যেমন—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক শিক্ষা দিতে পারে বা সৈন্য বাহিনীতে যােগ দিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু বিদেশিদের কাছ থেকে রাষ্ট্র এই ধরনের কর্তব্য পালন দাবি করতে পারে না।
• (চ) রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্নে পার্থক্য
একজন নাগরিক তার নিজ রাষ্ট্র বা বিদেশে যেখানেই বসবাস করুক না কেন তার জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতেই হয়। কিন্তু বিদেশিরা সাময়িকভাবে যে রাষ্ট্রে বসবাস করছে, বসবাস করাকালীন অবস্থায় তার জীবনের দায়িত্ব, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র নিলেও সেই রাষ্ট্র ত্যাগ করার পর ওই বিদেশিদের দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের থাকে না। 

প্রশ্ন ৫) অধিকার এবং কর্তব্য কীভাবে পরস্পর সংযুক্ত তা দেখাও।
               অথবা, “অধিকারের মধ্যেই কর্তব্য নিহিত আছে”—এই উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর : সমাজে কোনাে ব্যক্তির পক্ষে একাকী বসবাস করা সম্ভব না। জীবনের বহুবিধ প্রয়ােজন ও কার্য সম্পাদনের জন্যই মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এই ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপনের মাধ্যমেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের প্রকাশ পায়। সমাজে বিভিন্ন অধিকার ও কর্তব্যের ধারণা সৃষ্টিকে ব্যক্তির এই সমাজচেতনাই সাহায্যে করে থাকে। অধিকার একটি সামাজিক ধারণা। এই অধিকার কখনই সমাজের বাইরে সৃষ্টি করতে পারে না। এই অধিকারগুলি সমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রই স্বীকার করে ও রাষ্ট্রের দ্বারা সংরক্ষিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে সমাজে বসবাস করার জন্য ব্যক্তিকে কিছু কর্তব্য পালন করতে হবে। কর্তব্য ছাড়া কখনই অধিকার পূর্ণ হয় না। কারণ একই মুদ্রার দুটি দিক হল অধিকার ও কর্তব্য এবং সমাজের প্রত্যেকের অধিকার ভােগ নির্ভর করে প্রত্যেকের কর্তব্যপালনের উপর। অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে এই সম্পর্ক বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
• (ক) সমাজের দিক থেকে সম্পর্ক
অধিকার হল,কতকগুলি সুযােগ সুবিধা, যেগুলির মাধ্যমে ব্যক্তির বিকাশ সম্ভব। কোনাে ব্যক্তি যদি এই সুযােগসুবিধার অধিকার পেতে চায়, তাহলে অন্যদের কর্তব্য হল সেই সুযােগসুবিধা পাবার পথে বাধা সৃষ্টি না করা। অধ্যাপক হবহাউস (Hobhouse) একটি সুন্দর উদাহরণের সাহায্যে, সহজভাবে এই সম্পর্কটি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,—আমার যদি ধাক্কা না খেয়ে পথ চলার অধিকার থাকে, তাহলে অপরের কর্তব্য হল আমাকে প্রয়ােজন মতাে পথ ছেড়ে দেওয়া। অপরে যদি এই কর্তব্যপালন না করে, তাহলে আমার অধিকার ভােগ করা হত না। আবার, আমি যদি এই কর্তব্যপালন না করি, তাহলে অপরে এই অধিকার ভােগ করতে পারবে না। তাই উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
• (খ) রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সম্পর্ক
রাষ্ট্রের কাজ হল,—নাগরিকদের আত্মবিকাশের সুযােগ করে দেওয়া। এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য কিছু সুযােগসুবিধা বা অধিকার দেয় এবং সংরক্ষণ করে। কিন্তু এই অধিকার সংরক্ষণ করতে গেলে জনগণের কর্তব্য হল, রাষ্ট্রকে সাহায্য করা। যেমন— কর দেওয়া, আইন মেনে চলা, মাতৃভূমি রক্ষা করা প্রভৃতি। এই কর্তব্যপালন না করলে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তখন রাষ্ট্র অধিকার রক্ষা করতে পারবে না। আবার রাষ্ট্রের কর্তব্য হল ব্যক্তির বিকাশসাধন করা। রাষ্ট্র এই কর্তব্যপালন করলে নাগরিকদের উপর অধিকার দাবি করতে পারবে না। তাই দেখা যাচ্ছে,—অধিকার ভােগের সঙ্গে কর্তব্যপালনের গভীর যােগ আছে।
• (গ) নীতগত ক্ষেত্রে সম্পর্ক
শুধু আইনগত ক্ষেত্রে নয়, নৈতিক ক্ষেত্রেও উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে। যেমন, পিতামাতার কর্তব্য হল,—শিশুদের লালনপালন করা। এই কর্তব্য পালন করলে তারা বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের সাহায্য পাবার নৈতিক অধিকার ভােগ করতে পারবে।
• (ঘ) অধিকার কর্তব্যের দ্বারা সীমাবদ্ধ
অধিকার অবাধ হতে পারে না। কারণ, অধিকার অবাধ হলে শক্তিমানরাই অধিকার ভােগ করবে। দুর্বলের কোনাে অধিকার থাকবে না। তাই দুর্বলরা যাতে অধিকার ভােগ করতে পারে, তার জন্য সবলদের কিছু কর্তব্যবােধের দ্বারা গণ্ডিবদ্ধ করা দরকার। মূল্যায়ন দেখা অপরটির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাই চিন, রাশিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রে লিখিত সংবিধানে অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্যের উল্লেখ আছে। ভারতের মূল সংবিধানে কর্তব্যের উল্লেখ না থাকলেও ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দশটি কর্তব্য সংযােজিত হয়েছে।

প্রশ্ন ৬) অধিকার বলতে কী বােঝায়? আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকারগুলি বর্ণনা করাে।
উত্তর : অধিকারের সংজ্ঞা
অ্যারিস্টটল বলেছেন, “মানুষ সমাজবদ্ধ জীব।” সমাজে বসবাস করলে সে কতকগুলি সুযােগসুবিধা পায়, এগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য প্রয়ােজন। এই সুযােগসুবিধার নাম হল অধিকার, | অধ্যাপক ল্যাস্কির ভাষায় বলা যায়, “অধিকার হল সমাজ জীবনের সেইসব শর্তাবলি, যেগুলি ছাড়া কোনাে মানুষ সাধারণভাবে তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না।” যেমন—শিক্ষার সুযােগ। এই সুযােগ না থাকলে ব্যক্তির বিকাশ হবে না। তাই এটি হল অধিকার। তবে অধিকার হল একটি আইনগত ধারণা। সুযােগসুবিধাগুলি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়া চাই। নতুবা যে যার খুশিমতাে সুযােগসুবিধা দাবি করলে তাকে অধিকার বলা যাবে না। সুযােগসুবিধাগুলির সমাজের কাছে কল্যাণকর হওয়া চাই। তাই অধ্যাপক গিলক্রাইস্ট (Gilchrist) বলেছেন,—“অধিকার হল রাষ্ট্রকর্তৃক স্বীকৃত এবং সংরক্ষিত সেইসব সুযােগসুবিধা, যার সাহায্যে ব্যক্তির বিকাশ ও সমাজের কল্যাণ সাধিত হয়।”

রাজনৈতিক অধিকার
অ্যারিস্টটল বলেছেন,—মানুষ রাজনৈতিক জীব—Man is Political Animal, তাই সে রাষ্ট্রে বসবাস করে। এই রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে মানুষ কতকগুলি অধিকার ভােগ করে। এগুলিকে বলা হয় রাজনৈতিক অধিকার। এগুলি হল :
• (ক) ভােটদানের অধিকার
এই অধিকার গণতন্ত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হল,—জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা বংশ নির্বিশেষে সব মানুষ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তবে নাবালক,বিকৃত মস্তিষ্ক, দেউলিয়া ও বিদেশিদের এই অধিকার দেওয়া হয় না। তা ছাড়া স্বৈরতন্ত্রে এই অধিকার দেখা যায় না।
• (খ) নির্বাচিত হবার অধিকার
প্রত্যেক নাগরিকের ৰ্বিাচিত হ্বার অধিকার থাকবে। তবে বিভিন্ন দেশে নির্বাচিত হতে গেলে কিছুকিছু শর্ত থাকে। যেমন, ভারতে লােকসভার সদস্য হতে গেলে একটি শর্ত হল—পঁচিশ বছর বয়স হতে হবে।
• (গ) সরকারি চাকুরি পাবার অধিকার
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের যােগ্যতা অনুসারে সরকারি চাকরি পাবার অধিকার আছে। যেমন, ভারতের সংবিধানের ১৬নং ধারায় এই অধিকার দেওয়া। .
(ঘ) সমালােচনার অধিকার
অভাব-অভিযােগের প্রতিকার দাবি করা নাগরিকের অন্যতম অধিকার বলে গণ্য হয়। এই দাবি পূরণের জন্য সরকারের সমালােচনাও যুক্তিসংগত বলে বিবেচিত হয়। সরকারের কর্তব্য হল নাগরিকের অধিকার ভােগের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা। সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে নাগরিক সরকারের সমালােচনা করতে পারে।
• (ঙ) আবেদন করার অধিকার
নাগরিকদের বিভিন্ন ধরনের অভিযােগ থাকতে পারে। সেগুলি পূরণের জন্য তারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারে। যেমন, মৌলিক অধিকার খর্ব করা হলে ভারতের নাগরিক তার প্রতিবিধানের জন্য আদালতে আবেদন করার অধিকার ভােগ করে।
• (চ) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করার অধিকার
রাষ্ট্রের কাজ হল—মানুষের কল্যাণ সাধন করা। তা যদি না করতে পারে তাহলে তার বিরুদ্ধে নাগরিকদের বিদ্রোহ করার অধিকার আছে। তবে এ ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। গ্রীন (Green) বলেছেন,— “সরকার দুর্নীতি-পরায়ন হলে, তাকে সরান শুধু অধিকার নয়, কর্তব্যও বটে।” অবশ্য এই অধিকারের আইনগত স্বীকৃতি নেই। কারণ, তাতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

মূল্যায়ন
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অধিকার স্থিতিশীল নয়। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে অধিকারের পরিধির পরিবর্তন ঘটে। যেমন, অতীতে ভােটাধিকার ছিল না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভােটাধিকার স্বীকৃতি লাভ করেছে। আবার ভারতের মূল সংবিধানে সম্পত্তির অধিকার মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজবাদ গড়ার জন্য সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। |

প্রশ্ন ৭) আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের পৌর বা সামাজিক অধিকারগুলি বর্ণনা করাে।
উত্তর : নাগরিকের ব্যক্তিত্বের বিকাশে কয়েকটি পৌর বা সামাজিক অধিকার থাকা একান্ত প্রয়ােজন। এই অধিকারগুলি না থাকলে ব্যক্তি হিসাবে নাগরিক সভ্য সমাজজীবনে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এই অধিকারগুলি হল—
• (ক) জীবনের অধিকার
গুরুত্বপূর্ণ পৌর অধিকারের মধ্যে জীবনের অধিকার প্রধানতম বলে উল্লেখ করা যায়। জীবনের অধিকার হল বেঁচে থাকার অধিকার। ব্যক্তিজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অপর সব অধিকারই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য হল ব্যক্তি জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। জীবনের অধিকার বলতে আত্মরক্ষার অধিকার এবং আত্মরক্ষার জন্য বলপ্রয়ােগের অধিকারও বােঝায়। প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনই মূল্যবান। সেই কারণে আত্মহত্যা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়।
• (খ) সম্পত্তির অধিকার
সম্পত্তির অধিকার বলতে সম্পত্তি অর্জন, ভােগ এবং হস্তান্তর করার অধিকার বােঝায়। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে এই অধিকারকে গুরুত্ব দেয় না। কারণ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। তবে বর্তমানে সমাজের বৃহত্তম স্বার্থে এই অধিকারের উপর কিছু বাধানিষেধ আরােপ করা হয়।
• (গ) স্বাধীনতার অধিকার
স্বাধীনতার অধিকার বলতে স্বাধীনভাবে চলা ফেরা এবং জীবিকা অর্জনের সুযােগকে বােঝায়। প্রত্যেক নাগরিকের এই অধিকার থাকা উচিত। বিনা বিচারে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হলে এই অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। অবশ্য বর্তমানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে এই অধিকারকে কিছুটা সংকুচিত করা হয়।
• (ঘ) পরিবার গঠনের অধিকার
সমাজে প্রাথমিক সংগঠন হল পরিবার। পরিবারকে ভিত্তি করে সমাজজীবন গড়ে উঠেছে। পরিবারের ভূমিকার উপর সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা অনেকটা নির্ভর করে। তাই পরিবার গঠনের অধিকার সর্বত্র স্বীকৃত হয়েছে।
• (ঙ) ধর্মের অধিকার
ধর্মের অধিকার বলতে বােঝায় প্রত্যেকে নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম পালন করবে এবং নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী আচার অনুষ্ঠান করবে। সরকার কোনাে ব্যক্তির উপর জোর করে কোনাে বিশেষ ধর্ম চাপিয়ে দেবে না। এর নাম হল ধর্মনিরপক্ষে। তবে এই অধিকার অবাধ নয়। ধর্মের নামে ব্যাভিচার বা অমানবিক কাজ—যেমন নরবলি, সতীদাহ প্রথা প্রভৃতির উপর রাষ্ট্র বাধানিষেধ আরােপ করে।
• (চ) মতপ্রকাশের অধিকার
মতপ্রকাশের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত। এই অধিকারের বলে নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে সভাসমিতিতে, সংবাদপত্রে বা রেডিয়াে এবং টেলিভিশনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। ভারতীয় সংবিধানের ১৯নং ধারায় এই অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে এই অধিকার অবাধ নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থে এই অধিকারের উপর কিছু বাধানিষেধ আরােপ করা হয়ে থাকে।
• (ছ) শিক্ষার অধিকার
শিক্ষার অধিকার বলতে বােঝায়,—লেখাপড়ার সুযােগসুবিধা। এই অধিকার সকলের থাকা উচিত। কারণ, শিক্ষাকে বাদ দিয়ে ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। ভারতে এটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।
• (জ) সংঘবদ্ধ হবার অধিকার
মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে বাস করতে চায়। এটি তার সহজাত প্রবৃত্তি। এই কারণে সে বিভিন্ন ধরনের সংঘ ও সমিতি গঠন করে। এই সংঘগুলি মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিক আলােচিত করে তাকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই অধিকার স্বীকৃত হয়।
• (ঝ) আইনের দৃষ্টিতে সমানাধিকার
আইনের চোখে সকলে সমান। আইনের উপরে নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ ইত্যাদি কারণে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। পৃথিবীর বহুদেশ এই অধিকারকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১৪নং ধারায় এই অধিকারের উল্লেখ আছে।
• (ঞ) চুক্তির অধিকার
চুক্তির অধিকার বলতে বােঝায়, যে-কোনাে ব্যক্তি অপর কোনাে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইন অনুসারে চুক্তিবদ্ধ হতে পারে। তবে দুর্নীতিমুলক বা বেআইনি চুক্তিকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ বা বাতিল করতে পারে।
• (ট) শােষণের বিরুদ্ধে অধিকার
সভ্যতার অগ্রগতি হলেও এখনও শােষনের অবসান হয়নি। অসহায় অবস্থার সুযােগ নিয়ে মানুষ মানুষকে শােষণ করছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল এর অবসান ঘটানাে। তাই এটি এখন নাগরিকদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।
• (ঠ) বাসস্থানের অধিকার
মানুষের কর্মজীবনের ক্লান্তি দূর করতে এবং তার ও তার পরিবারের মানুষদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ঘটাতে সুবাসস্থান দরকার। তাই এটি এখন অন্যতম সামাজিক অধিকার বলে মনে ব্রা হয়। মূল্যায়ন বিচ্ছিন্ন নয়। যেমন—মতামত প্রকাশের অধিকার একটি সামাজিক অধিকার, আবার ভােটদানের অধিকার অর্থাৎ রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা যায় না।

প্রশ্ন ৮) নাগরিকের বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক অধিকারগুলির বিবরণ দাও।
উত্তর : বর্তমানকালে অর্থনৈতিক অধিকার বিশেষ গুরুত্ব লাভ করছে। অর্থনেতিক অধিকার ব্যতীত রাজনৈতিক বা পৌর অধিকার মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মানুষ যদি ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হয়ে পড়ে, বেকারত্বের জ্বালায় জ্বলতে থাকে, দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না পারে, তাহলে তার কাছে রাজনৈতিক বা সামাজিক অধিকারের মূল্য কী? অর্থনৈতিক অধিকার ছাড়া ব্যক্তিত্বের পূর্ণাধিকার সম্ভব হতে পারে না। নিম্নলিখিত অর্থনৈতিক অধিকারগুলি গুরত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃত হয়।
• (ক) কর্মের অধিকার
প্রত্যেক নাগরিকের জীবিকা অর্জনের যথাযােগ্য সুযােগ থাকা উচিত। পরিশ্রমের দ্বারা, কর্মের দ্বারা মানুষ অন্নসংস্থানের সুযােগ লাভ করে। সুতরাং রাষ্ট্রের কর্তব্য হবে নাগরিকের জীবিকা অর্জনের যথােপযুক্ত সুযােগের ব্যবস্থা করা। সােভিয়েত ইউনিয়নে সংবিধানের মধ্যেই নাগরিকের কর্মের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে।
• (খ) পর্যাপ্ত মজুরির অধিকার
শুধু কর্মের অধিকারই যথেষ্ট নয়। শ্রমের জন্য উপযুক্ত মজুরির ব্যবস্থাও থাকা প্রয়ােজন। প্রত্যেক নাগরিককে তার পরিশ্রমের জন্য পর্যাপ্ত এবং ন্যায় সংগত পারিশ্রমিক দিতে হবে। শ্রমিকের মজুরি যাতে তার জীবনযাত্রার উপযুক্ত মান সংরক্ষণে সহায়তা করে সেই বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে।
• (গ) অবকাশের অধিকার
সুখী ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য অবকাশের বিশেষ প্রয়ােজন রয়েছে। মানুষের কর্মশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ােজিত করতে হলে বিশ্রাম ও অবকাশের প্রয়ােজনও রয়েছে। একটানা কাজের মধ্যে যে ক্লান্তি আসে তাকে দূর করার জন্যেই অবকাশের প্রয়ােজন হয়। কর্মের সময় নির্দিষ্ট ও যথােচিত হওয়া উচিত।
• (ঘ) সমান কাজের জন্য সমান মজুরির অধিকার
কর্মের গুণগত পার্থক্যের জন্য মজুরির পার্থক্য হতে পারে, কিন্তু অন্যায়ভাবে কোনাে শ্রমিককে তার ন্যায্য মজুরি হতে বঞ্চিত করা যাবে না। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজে সমান কাজের জন্য সমান মজুরির ব্যবস্থা করা উচিত। দীর্ঘদিন সমাজে নারী শ্রমিকদের তাদের প্রাপ্য ন্যায়সংগত মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু এই অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি বর্তমানে স্বীকার করা হয় না।
• (ঙ) শ্রমিক সংঘ গঠনের অধিকার
বর্তমানে পৃথিবীতে সর্বত্র শ্রমিকশ্রেণির এক আদর্শ মন্ত্র হল ‘দুনিয়ার শ্রমিক এক হও।’ এই ঐক্যের জন্য শ্রমজীবী মানুষ এক শতাব্দী ধরে সংগ্রাম করেছে। শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রত্যেক শ্রমিকের সংঘ গঠন এবং সংঘের সভ্য হবার অধিকার বর্তমানে পৃথিবীর সকল দেশে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে।

প্রশ্ন ৯) রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের কর্তব্যসমূহ আলােচনা করাে।
উত্তর : কর্তব্য মানে কিছু করার দায়িত্ব, নাগরিকদের কিছু দায়িত্ব আছে। কারণ, নাগরিত্বে ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্যে রাষ্ট্র কতকগুলি অধিকার দেয়। নাগরিক তার পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রতি কতকগুলি কর্তব্যপালন করে। কর্তব্যপালন না করলে অধিকার ভােগের সুযােগ থাকে না। কর্তব্যগুলিকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়—(i) নৈতিক কর্তব্য এবং (ii) আইনগত কর্তব্য।

নৈতিক কর্তব্য
যে কাজগুলি করা মানুষের নীতিবােধের উপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলিকে বলা হয় নৈতিক কর্তব্য। এগুলি হল :
• (ক) পরিবারের প্রতি কর্তব্য
পরিবার সমাজের সবথেকে প্রাচীন সংগঠন। শিশু পরিবারে জন্ম নেয় এবং পরিবারে লালিতপালিত হয়। এখানে ব্যক্তিত্বের প্রথম প্রকাশ ঘটে। আর পরিবারের প্রতি মানুষের কর্তব্য আছে। পিতা-মাতার সেবাযত্ন, ছােটোদের লালন পালন, শিক্ষার ব্যবস্থা প্রভৃতি এই কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
• (খ) সমাজের প্রতি কর্তব্য
সমাজের মধ্যে বসবাস করে আমরা কতকগুলি সুযােগসুবিধা পাই, যার মাধ্যমে আমাদের বিকাশ ঘটে। তাই সমাজের প্রতি আমাদের কর্তব্য আছে। এই কর্তব্যের মধ্যে পড়ে সমাজের সেবা করা, পরিবেশদূষণ প্রতিরােধ করা, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, সাক্ষরতার অভিযানে যােগ দেওয়া প্রভৃতি।
• (গ) মানবজাতির প্রতি কর্তব্য
বর্তমানে যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে দূরত্ব অনেক কমে গেছে। একটি দেশে কোনাে ঘটনা ঘটলে অন্য দেশে তার প্রভাব পড়ে। ইরাকে যুদ্ধ বাধলে ভারতকে ভাবিয়ে তােলে। এই অবস্থায় বিশ্বের প্রতি আমাদের কর্তব্য আছে।

আইনগত কর্তব্য
যে কতৰ্যের পিছনে রাষ্ট্রের অনুমােদন থাকে এবং যেগুলি পালন করা বাধ্যতামূলক সেগুলিকে বলা হয় আইনগত কর্তব্য। এগুলি হল :
• (ক) আইন মান্য করা
নাগরিকদের কর্তব্য হল, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা। না হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। নাগরিক শুধু নিজে আইন মেনে চলবে না, অপরে যাতে মেনে চলে সেদিকেও নজর দেবে। তবে ল্যাস্কি (Laski) বার্কার (Barker) প্রভৃতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেছেন, আইন যদি জনস্বার্থবিরােধী হয়, তাহলে তার বিরােধিতা করা নাগরিকের কর্তব্য।
• (খ) আনুগত্য দেখানাে
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখানাে নাগরিকদের অন্যতম কর্তব্য। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সাহায্য করা, সরকারি কাজ কর্মে যথাসাধ্য সহযােগিতা করা, দেশ আক্রান্ত হলে সেনাবাহিনীতে যােগ দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে আনুগত্য প্রকাশ পায়।
• (গ) কর দেওয়া
রাষ্ট্রের কাজের পরিধি দিন দিন বাড়ছে। দেশরক্ষা ছাড়া শিক্ষার প্রসার, শিল্পায়ন, যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি, জনস্বাস্থ্য রক্ষা প্রভৃতিক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে কাজ করতে হচ্ছে। এর জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়ােজন। নাগরিকদের দেওয়া কর এই প্রয়ােজন মেটায়। তাই নাগরিকদের কর্তব্য হল নিয়মিত কর দেওয়া। তা না হলে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে।
• (ঘ) ভােট দেওয়া
বর্তমানে গণতন্ত্রে জনগণ ভােট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করে। প্রতিনিধিরা শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে। যােগ্য প্রার্থী নির্বাচন না হলে শাসনব্যবস্থা অচল হবে। তাই নাগরিকদের কর্তব্য হল সৎভাবে ভােট দিয়ে যােগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা।
• (ঙ) অন্যান্য কর্তব্য
উপরােক্ত কর্তব্যগুলি ছাড়া নাগরিকের আরও কিছু কর্তব্য আছে। এগুলি হল,—(ক) নিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্রের দেওয়া কাজ সম্পাদন করা, (খ) সমাজবিরােধী কাজকর্ম বন্ধ করতে রাষ্ট্রকে সাহায্য করা, (গ) জাতীয় সংহতি রক্ষা করা এবং (ঘ) জাতীয় পরিকল্পনাকে বাস্তব রুপ দিতে সাহায্য করা প্রভৃতি।

মূল্যায়ন
কর্তব্যগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে,—নৈতিক কর্তব্য ও আইনগত কর্তব্য। কিন্তু এই ভাগ সঠিক নয়, কোনাে দেশে একটি কর্তব্য নৈতিক বলে বিবেচিত হয়। আবার অন্য দেশে সেটি আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে। যেমন, বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে দেখাশােনা করা সন্তানের নৈতিক কর্তব্য হিসাবে বিভিন্ন দেশে স্বীকৃত। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী চিনে এটি আইন অনুমােদিত কর্তব্য। আমাদের দেশে ভােট দেওয়া নৈতিক কর্তব্য। আবার সুইজারল্যান্ডে এটি আইনগত কর্তব্য।

প্রশ্ন ১০) মানবাধিকার (Human Right) সম্পর্কে ধারণা বিবৃত করাে। মানবাধিকারের সঙ্গে অধিকারের পার্থক্য দেখাও।
উত্তর : বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার সম্পর্কে আলােচনা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। কারণ রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হল, ব্যক্তির বিকাশ ঘটানাে। এই বিকাশের জন্যে কতকগুলি সুযােগসুবিধা থাকা প্রয়ােজন। এই সব সুযােগসুবিধার নাম হল অধিকার। রাষ্ট্র এই অধিকার সংরক্ষণ করে। রাষ্ট্রের নৈতিক অস্তিত্ব ও বৈধতা এই অধিকার রক্ষার উপর নির্ভর করে। তাই সংবিধানে মানবাধিকারে সংরক্ষণের শপথ নেওয়া হয়। এমন কী মানবজাতি মহাসম্মেলনে গৃহীত জাতিপুঞ্জের সনদেও মানবাধিকারের উপর গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে।

মানবাধিকারের ধারণা
মানবাধিকারের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। আক্ষরিক অর্থে বলা যায়, মানুষের জীবনের বিকাশের জন্যে প্রয়ােজনীয় সুযােগসুবিধাকে বলে মানবাধিকার। অধ্যাপক ল্যাস্কির ভাষায় বলা যায়,—অধিকার হল সমাজজীবনের সেইসব শর্তাবলি, যেগুলি ছাড়া কোনাে মানুষ সাধারণভাবে তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণবিকাশ ঘটাতে পারে না।
   ভারতে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে লােকসভায় মানবাধিকার সম্পর্কে একটি আইন পাস হয়েছে। আইনটির নাম Protection of Human Right Act অর্থাৎ মানবাধিকার সংরক্ষণ আইন। এই আইনে মানবাধিকার বলতে সেই সমস্ত অধিকার বােঝায় যেগুলি ব্যক্তির জীবনের, স্বাধীনতার, সাম্যের এবং মর্যাদার সঙ্গে জড়িত এবং যেগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযােগ্য।
   সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বরের ১০ তারিখে মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্বজনীন ঘােষণা (Universal Declaration of human Rights) সাধারণ সভায় গৃহীত হয়েছে।

মানবাধিকারের বৈশিষ্ট্য
প্রথমত, বিভিন্ন চিন্তাবিদ মানবাধিকারগুলিকে স্বাভাবিকঅধিকার (Natural Rights) রূপে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে মানুষ কতকগুলি সার্বজনীন অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই অধিকারগুলি প্রকৃতিপ্রদত্ত। মানুষের দেশের সঙ্গে তার গায়ের রঙের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তেমনি মানুষের জীবনের সঙ্গে এইসব অধিকারের নিবিড় সম্পর্ক।
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকারের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা জড়িত। এই অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করলে মানুষের মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। তাই ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনায় মানবাধিকার সম্পর্কেই বিশ্ব সম্মেলনে ঘােষণা করা হয়,—মানুষের মর্যাদা ও যােগ্যতার উপর ভিত্তি করে মানবাধিকার গড়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, মানবাধিকার হল, রাষ্ট্রর স্বৈরাচারিতার বিরুদ্ধে রক্ষা পাবার অধিকার। অনেক সময় রাষ্ট্র ব্যক্তির উপর অন্যায়-অবিচার করে। সেই অবিচার থেকে রক্ষার জন্য মানবাধিকারের প্রয়ােজন।

মানবাধিকার ও সাধারণ অধিকারের মধ্যে পার্থক্য
প্রথমত, মৌলিক বা মানবাধিকারগুলি সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়। কিন্তু সাধারণ অধিকারগুলি দেশের সাধারণ আইন দ্বারা সংরক্ষিত হয়।
দ্বিতীয়ত, মৌলিক বা মানবাধিকারগুলি আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত। কিন্তু সাধারণ অধিকারগুলি তা নয়।
তৃতীয়ত, মানবাধিকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংবিধান সংশােধন করতে হয়। কিন্তু সাধারণ অধিকার সাধারণ আইনের দ্বারা সংশােধন করা যায়।

মানবাধিকার রক্ষার উদ্যোগ
মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের। তাই এইসব প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার রক্ষায় উদ্যোগী হয়েছে। জাতিপুঞ্জের সনদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে,—জাতিপুঞ্জের জনগণ মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবােধের উপরে এবং নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের উপর আস্থা জানাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ১০ ডিসেম্বর তারিখে জাতিপুঞ্জের সাধারণসভা মানবাধিকার সম্পর্কে বিশ্বজনীন ঘােষণা করেছে। বিভিন্ন রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত করতে মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছে। যেমন, ভারতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও রাজ্য মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছে।

মূল্যায়ন
মানবাধিকার সংরক্ষণ মানবজাতির পক্ষে একটি শুভ পদক্ষেপ। জাতিপুঞ্জের ঘােষণাপত্রের আদর্শ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবিধানে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে শুধু সংবিধানে উল্লেখ করলে হবে না, এর জন্য সার্বিক প্রয়াস চালাতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচির মধ্যে মানবাধিকার সম্পর্কে আলােচনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মানবাধিকার কমিশনের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দিতে হবে। এইভাবে ব্যাপক প্রচেষ্টা না নিলে মানবাধিকার রক্ষার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − 9 =