ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃতি (Indian Federalism)

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

1. কত খ্রিস্টাব্দে সারকারিয়া কমিশন গঠিত হয়?
উত্তর: ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে সারকারিয়া কমিশন গঠিত হয়।

2. যুক্তরাষ্ট্রে কটি কক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভা থাকে?
উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রে ২টি কক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভা থাকে।

3. যুক্তরাষ্ট্রে কয় শ্রেণির সরকার থাকে?
উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রে দুই শ্রেণির সরকার থাকে।

4. এককেন্দ্রিক শাসনব্যবথায় কোন সরকারের প্রাধান্য থাকে?
উত্তর: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য থাকে।

5. এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ হল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি।

6. ভারতে মন্ত্রীসভার কার্যকলাপ কার উপর নির্ভর করে?
উত্তর: ভারতে মন্ত্রীসভার কার্যকলাপ আইনসভার উপর নির্ভর করে।

7. যুগ্ম-তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করার অধিকারী কে?
উত্তর: যুগ্ম-তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করার অধিকারী কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই।

8. ভারতের সংবিধানে রাজ্য ও যুগ্ম-তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কার হাতে দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: ভারতের সংবিধানে রাজ্য ও যুগ্নতালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাজ্যের হাতে দেওয়া হয়েছে।

9. ভারতের সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইনগত বিষয় বণ্টনের ক্ষেত্রে কটি তালিকা আছে?
উত্তর: ভারতের সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইনগত বিষয় বন্টনের ক্ষেত্রে তিনটি তালিকা আছে।

10. ভারতের সংবিধানে ‘শিক্ষা’ বিষয়টি কোন তালিকার অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: ভারতের সংবিধানে ‘শিক্ষা’ বিষয়টি যুগ্নতালিকার অন্তর্ভুক্ত।

11. মন্ত্রীসভা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় মন্ত্ৰীসভাকে কার নিকট দায়ী থাকতে হয়?
উত্তর: মন্ত্রীসভা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় মন্ত্ৰীসভাকে আইনসভার কাছে দায়ী থাকতে হয়।

12. কবে ভারত প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়?
উত্তর: ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ভারত প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়

13. সাধারণতন্ত্রে প্রধান শাসক কীভাবে ক্ষমতা লাভ করেন?
উত্তর: সাধারণতন্ত্রে প্রধান শাসক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভ করেন।

14. ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা তার কাজের জন্য কার কাছে দায়ী থাকেন ?
উত্তর: ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীসভা তার কাজের জন্য লোকসভার কাছে দায়ী থাকেন।

15. ভারতে কে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন।

16. ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে কোন কোন তালিকার মাধ্যমে ক্ষমতা বণ্টন করা হয়েছে?
উত্তর: ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় তালিকা, রাজ্য তালিকা এবং যুগ্নতালিকার মাধ্যমে ক্ষমতা বণ্টন করা হয়েছে।

17. ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অবশিষ্ট ক্ষমতা কার হাতে অর্পণ করা হয়েছে?
উত্তর: ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অর্পণ করা হয়েছে ।

18. বহুজাতিক রাষ্ট্রে কীরূপ সরকার বেশি উপযোগী?
উত্তর: বহুজাতিক রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বেশি উপযোগী।

19. এককেন্দ্রিক সরকারের একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: এককেন্দ্রিক সরকারের একটি প্রকৃত উদাহরণ হল ব্রিটেন।

20. ভারতবর্ষে কীরূপ শাসনব্যবস্থা বর্তমান?
উত্তর: ভারতবর্ষে আধা যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা বর্তমান।

21. যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সাধারণত কীরূপ হয়?
উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সাধারণত লিখিত হয়।

22. সংসদীয় গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সংসদীয় গণতন্ত্র বলতে বোঝায় এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে নির্বাচিত একটি আইনসভার নিকট দায়ী মন্ত্রিসভা আছে।

23. সংসদীয় শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
উত্তর: বিরোধী দলের উপস্থিতি হল সংসদীয় শাসনব্যবস্থার একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

24. অ্যারিস্টটল সংখ্যাগত দিক থেকে সরকারকে কয়টি ভাগে ভাগ করেছেন?
উত্তর: অ্যারিস্টট্ল সংখ্যাগত দিক থেকে সরকারকে ৩টি ভাগে ভাগ করেছেন।

25. এককেন্দ্রিক সরকার বলতে কী বোঝ?
উত্তর: যখন কোনো শাসনব্যবস্থায় সরকারের যাবতীয় ক্ষমতা একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাকে এককেন্দ্রিক সরকার বলে।

26. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের কত নং ধারায় সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন বলা হয়?
উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ৬ নং ধারায় সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন বলা হয়।

27. ‘The Politics and Government’ গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘The Politics and Government’ গ্রন্থের রচয়িতা অ্যারিস্টট্ল।

28. ‘Modern Politics and Government’ গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘Modern Politics and Government’ গ্রন্থটির রচয়িতা অধ্যাপক অ্যালান বল।

29. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক’টি অঙ্গরাজ্য আছে?
উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫০টি অঙ্গরাজ্য আছে।

30. দেশের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব সংবিধান আছে এমন একটি রাষ্ট্রের উল্লেখ করো।
উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব সংবিধান আছে।

31. কত নং ধারায় তালিকা বহির্ভূত অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে?
উত্তর: সংবিধানের ২৪৮ নং ধারায় তালিকা বহির্ভূত অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে।

32. ভারতীয় শাসনব্যবথায় স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন?
উত্তর: ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় রাজ্যপালগণ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতাপ্রয়োগ করতে পারেন।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা কাকে বলে?
উত্তর : সংবিধান অনুসারে সমস্ত ক্ষমতা যখন একটি মাত্র সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং সেই কেন্দ্র থেকেই সমস্ত ক্ষমতা পরিচালিত হয় তখন তাকে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বলে। কেন্দ্রীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় আইনসভার সর্বতােমুখী প্রাধান্যই এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মূলকথা।

প্রশ্ন ২। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য দাও।
উত্তর : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য হল—
প্রথমত, এখানে আইনসভার প্রাধান্য থাকে।
দ্বিতীয়ত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভা ছাড়া অন্য কোনো সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা থাকে না।
তৃতীয়ত, এই ব্যবস্থায় সংবিধান লিখিত হতে হবেই এমন কোনাে কথা নেই, সংবিধান অলিখিতও হতে পারে।

প্রশ্ন ৩। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দাও।
উত্তর : (i) সমগ্র দেশে একই আইন, একই কর্মসূচি এবং একই শাসনপদ্ধতি অনুসৃত হয়।
(ii) কেন্দ্রীয় এবং অঞ্চলের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে বিরােধের সম্ভাবনা থাকে না।
(iii) শাসনব্যবস্থা নমনীয় হয়।
(iv) নাগরিকদের আনুগত্য একটিমাত্র সরকারের প্রতি থাকে।
(v) শাসনব্যবস্থায় সারল্য থাকে এবং আর্থিক ব্যয় সংক্ষেপ হয়।
(vi) আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব সহজেই পালন করা যায়।

প্রশ্ন ৪। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তি দাও।
উত্তর : (i) একটিমাত্র সরকারের হাতে সমস্ত ক্ষমতা থাকার জন্য স্বৈরতন্ত্র দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
(ii) এই শাসনব্যবস্থা আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য রক্ষার অনুকূল নয়।
(iii) দেশের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সমস্যা থাকে। এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এই শাসনব্যবস্থা অকার্যকর।
(iv) একটি মাত্র সরকারের দায়িত্বভার বৃদ্ধির ফলে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন ৫। যুক্তরাষ্ট্র কাকে বলে?
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় লিখিত সংবিধানের অস্তিত্ব থাকে এবং সেই সংবিধান অনুসারে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত হয়, সেই শাসনব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র বলে। এই ব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলির স্বাতন্ত্র বজায় থাকে। এই শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক হল সহযােগিতামূলক।

প্রশ্ন ৬। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী কী?
উত্তর : (i) লিখিত সংবিধান অনুসারে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত হয়।
(ii) সংবিধান অনমনীয় হয় এবং সংবিধানের প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয় ।
(iii) কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরােধের নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত থাকে।
(iv) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দু-ধরনের সরকার থাকে। এক কেন্দ্রীয় সরকার অপরটি রাজ্য সরকার।
(v) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দ্বিনাগরিকতা লক্ষ করা যায়।

প্রশ্ন ৭। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যথার দুটি সুবিধা উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) রাজ্য সরকারগুলির হাতে বিভিন্ন স্থানীয় এবং আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষার সাংবিধানিক অধিকার থাকে। (ii) যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামাে নানা ভাষা, ধর্ম, মতবাদ বা গােষ্ঠীতে বিভক্ত, সমাজে ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় সহায়ক।

প্রশ্ন ৮। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যথার দুটি দোষ উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। লীকক অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকে ‘কাঠামােগত ত্রুটি’ বলে অভিহিত করেছেন। (ii) এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের আনুগত্য বিভক্ত হয় এবং প্রায়ই দেখা যায় অঞ্চলের বা রাজ্যের প্রতি আনুগত্য প্রাধান্য পায়।

প্রশ্ন ৯। রাষ্ট্রসমবায় বা কনফেডারেশন কাকে বলে?
উত্তর : স্বাধীনরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বা অন্য কোনাে লক্ষ্যে যখন দুটি বা তার বেশি রাষ্ট্র পারস্পরিক চুক্তিতে মিলিত হয় তাকে রাষ্ট্রসমবায় বা কনফেডারেশন বলে। সার্বভৌম ক্ষমতা বিকেন্দ্রীগতভাবে সমবায়ের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলির হাতে থাকে।

প্রশ্ন ১০। যুক্তরাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়ােজনীয় তিনটি শর্ত কী ?
উত্তর : (i) ঐক্যবােধের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আগ্রহের সমন্বয় প্রয়ােজন। (ii) অঙ্গরাজ্যগুলির সমান মর্যাদা থাকার বিশেষ প্রয়ােজন। (iii) রাজ্যগুলি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অজুহাতে অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

প্রশ্ন ১১। যুক্তরাষ্ট্র ও এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর : (i) এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে একটিমাত্র সরকারের অস্তিত্ব থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ও আলিক উভয় ধরনের সরকার থাকে।
(ii) যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার উৎস হল সংবিধান, কিন্তু এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে।
(iii) যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত হয়, কিন্তু এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান অলিখিত হতেও পারে।
(iv) যুক্তরাষ্ট্রে নিরপেক্ষ আদালত থাকা প্রয়ােজন, এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এই প্রয়ােজনীয়তা থাকে না।

প্রশ্ন ১২। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রপ্রবণতার কারণ কী?
উত্তর : পৃথিবীর সকল যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রপ্রবণতা দেখা দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতাে সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাতেও কেন্দ্রপ্রবণতা দেখা দিচ্ছে। কারণ, (১) যুদ্ধ, (২) অর্থনৈতিক সংকট, পরিকল্পনা ও ধনতান্ত্রিক একচেটিয়া অর্থব্যবস্থা।

প্রশ্ন ১৩। সরকারের সংজ্ঞা দাও।
উত্তর : সাধারণভাবে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব যার উপর অর্পিত হয় তাকে সরকার বলে। অন্যভাবে বলা যায় যে, রাষ্ট্রের ইচ্ছা যার মাধ্যমে রূপায়িত হয় তাকে সরকার বলে অভিহিত করা হয়।

প্রশ্ন ১৪। সরকারের শ্রেণিবিভাজন করে।
উত্তর : বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল সর্বপ্রথম সরকারের শ্রেণিবিভাগ করেন। তিনি সরকারের উদ্দেশ্য ও সংখ্যা এই দু-নীতিকে কেন্দ্র করে শ্রেণিবিভাজন করেন। উদ্দেশ্য অনুসারে তিনি সরকারকে ‘স্বাভাবিক’ আর ‘বিকৃত’ এই দু-ভাগে ভাগ করেন। তাঁর মতে, সরকার জনকল্যাণের স্বার্থে পরিচালিত হলে তাকে স্বাভাবিক বলে গণ্য করা হবে আর যদি কেবল শাসক গােষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয় তাহলে তাকে বিকৃত বলে গণ্য করা হবে।

প্রশ্ন ১৫। ভারতের সংবিধানের প্রথম ধারায় ভারতকে কীভাবে বর্ণনা করা হয়েছে?
উত্তর : ভারতের সংবিধানের ১(১) ধারায় ভারতকে ‘রাজ্যসমূহের ইউনিয়ান’ বা সংঘ (Union of States) বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও সংবিধানের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।

প্রশ্ন ১৬। সংবিধানে ভারতকে রাজ্যসমূহের ইউনিয়ান বলার তাৎপর্য কী?
উত্তর : ড. আম্বেদকারের মতে, এই বর্ণনার তাৎপর্য দুটি – প্রথমত, অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে ভারতে যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, কোনাে অঙ্গরাজ্যের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার অধিকার নেই।

প্রশ্ন ১৭। ভারত কি একটি যুক্তরাষ্ট্র?
উত্তর : ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রকৃতি নিয়ে মতবিরােধ আছে। তা সত্ত্বেও বেশকিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যগুলি ভারতে আছে। যেমন, (ক) ভারতে একটি কেন্দ্রীয় সরকার ও ২৮টি রাজ্য সরকার আছে; (খ) লিখিত সংবিধানের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা আছে; (গ) সংবিধানের প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে; এবং (ঘ) একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত

প্রশ্ন ১৮। ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র বলে অস্বীকার করার কারণ কী?
উত্তর : অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন ভারত প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্র নয়। কারণ প্রশাসনিক, আইন-সংক্রান্ত, আর্থিক প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাভাবে রাজ্যগুলির উপর কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বর্তমান। যেমন – (ক) রাজ্যপালকে নিয়ােগ ও অপসারণ করে রাষ্ট্রপতি। (খ) কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়েও আইন প্রণয়ন করতে পারে। (গ) প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে। (ঘ) জরুরি অবস্থা ঘােষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

প্রশ্ন ১৯। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুটি পার্থক্য লেখাে।
উত্তর : (ক) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতকগুলি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বেচ্ছামূলক চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ভারতে এরূপ স্বেচ্ছামূলক চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ওঠেনি। এখানে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের মধ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে। (খ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবশিষ্ট ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাতে থাকে, কিন্তু ভারতে এই ক্ষমতা কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন ২০। সহযােগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা (Co-operative federalism) বলতে কী বােঝায়?
উত্তর : মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ. এইচ, বার্চ-এর মতে, সহযােগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বলতে বােঝায় -“কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে প্রশাসনিক সহযােগিতার রীতি, অর্থপ্রাপ্তির জন্য রাজ্য সরকারগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে আংশিক নির্ভরতা এবং যে-সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ সাংবিধানিকভাবে রাজ্যগুলির উপর ন্যস্ত, কেন্দ্রীয় সরকার সহজ অনুদানের মাধ্যমে সেই সমস্ত কাজে সাহায্য করলে সেই ব্যবস্থাকে সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্র বলা যায়।

প্রশ্ন ২১। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কি সহযােগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা?
উত্তর : বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ অস্টিনা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সহযােগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় বলেছেন। কারণ এখানে যদিও এক শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার আছে, তা সত্ত্বেও প্রাদেশিক সরকারগুলি কেন্দ্রীয় নীতি রূপায়ণের প্রশাসনিক সংস্থামাত্র হয়ে দাঁড়ায়নি।

প্রশ্ন ২২। রাজতন্ত্র কাকে বলে ?
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় শাসকের হাতে সমস্ত ক্ষমতা থাকে অথবা বংশানুক্রমিকভাবে একের পর এক শাসকের কর্তৃত্ব যে দেশে থাকে, সেই শাসনব্যবস্থাকে রাজতন্ত্র বলে। এই ধরনের শাসনব্যবস্থায় রাজাই আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের প্রধান।

প্রশ্ন ২৩। ম্যারিয়ট কীভাবে সরকারের শ্রেণিবিভাগ করেছে ?
উত্তর : ম্যারিয়ট অ্যারিস্টটলের শ্রেণিবিভাগকে গ্রহণ করে তাকে আধুনিক করার জন্য দুটি নীতি অনুসরণ করেছেন—(ক) শাসনক্ষমতার আঞ্চলিক বণ্টননীতি (Territorical distribution); (খ) শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের সম্পর্ক নীতি। প্রথম নীতি অনুসারে সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ও এককেন্দ্রিক এই দু-ভাগে ভাগ করা হয়। আর দ্বিতীয় নীতি অনুসারে সরকারকে পার্লামেন্টীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত এই দু-ভাগে ভাগ করা হয়।

প্রশ্ন ২৪। সরকারের আধুনিক শ্রেণিবিভাগ কটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ?
উত্তর : সরকারের আধুনিক শ্রেণিবিভাগ প্রধানত তিনটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যথা- (ক) সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়ােগকারীর সংখ্যানীতি, (খ) রাষ্ট্রক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি এবং (গ) শাসনক্ষমতার আঞ্চলিক বণ্টন নীতি।

প্রশ্ন ২৫। অধ্যাপক কে. সি. হােয়ার কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন?
উত্তর : কে. সি. হােয়ার বলেছেন, যে শাসনব্যবস্থায় দুটি ধরনের সরকার থাকে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার, যেখানে একটি লিখিত সংবিধান উভয় সরকারের মধ্যে এমনভাবে ক্ষমতা ভাগ করে দেয় যাতে প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব সম্পাদন করে, তাকে যুক্তরাষ্ট্র বলে।

প্রশ্ন ২৬। অধ্যাপক ডাইসির মতে যুক্তরাষ্ট্র কাকে বলে?
উত্তর : অধ্যাপক ডাইসি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র হল এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য হল জাতীয় ঐক্য ও শক্তির সঙ্গে অঙ্গ রাজ্যের অধিকারের সমন্বয়সাধন। (Federalism is a political contrivance intendes to reconcile national unity with the maintenance of state rights).

প্রশ্ন ২৭। বার্চ (Birch) প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞা কী ?
উত্তর : বার্চ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বােঝায়—যেখানে একটি সাধারণ সরকার ও কতকগুলি আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে এমনভাবে ক্ষমতা বন্টিত হয় যে, তারা প্রত্যেকে স্ব-স্ব এলাকায় একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে এবং তাদের প্রত্যেকে শাসন বিভাগীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে জনগণকে শাসন করে।

বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর>>

প্রশ্ন ১) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে কী বােঝ?
উত্তর : সরকারের শাসনব্যবস্থার শ্রেণিবিভাগ করার কাজ প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। যেমন, অ্যারিস্টট্ল শাসকের সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারের শ্রেণিবিভাগ করেছেন। অন্যদিকে ক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে লর্ড ব্রাইস (Bryce) শাসনব্যবস্থাকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন। (ক) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা ও (খ) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা।
এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সংজ্ঞা –
অধ্যাপক গার্নার (Garner) বলেছেন, যে শাসনব্যবস্থায় একটিমাত্র সরকারের হাতে দেশের সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তাকে বলে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। এখানে একটি মাত্র সরকার থাকে। সেটি হল কেন্দ্রীয় সরকার। এই সরকার সারা দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করে। অবশ্য কাজের সুবিধার জন্যে এই সরকার এক বা একাধিক আঞ্চলিক সরকার তৈরি করতে পারে। তবে আঞ্চলিক সরকারগুলি থাকবে, কি থাকবে না, তারা কতটুকু ক্ষমতা ভােগ করবে, তা কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
     এককেন্দ্রিক সরকারের উদাহরণ হল,—ব্রিটেনের সরকার। এখানে কেন্দ্রীয় সরকার সর্বেসর্বা। এখানে আঞ্চলিক সরকার থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কাজ করে। ব্রিটেন ছাড়া বাংলাদেশ, গণপ্রজাতন্ত্রী চিন, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা আছে।

প্রশ্ন ২) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য আলােচনা করাে।
উত্তর : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায়। যেমন—
প্রথমত, এখানে একটিমাত্র সরকার অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার হল সর্বেসর্বা। তার নির্দেশে সারা দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। অবশ্য কাজের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকটি আঞ্চলিক সরকার তৈরি করতে পারে। তবে তাদের কোনাে স্বাধীনতা থাকে না।
দ্বিতীয়ত, এখানে সংবিধান দুস্পরিবর্তনীয় নয়। কেন্দ্রীয় আইনসভা একাই সহজ পদ্ধতিতে সংবিধান সংশােধন করতে পারে। যেহেতু এখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতাে অঙ্গরাজ্য নেই, সেহেতু তাদের সম্মতি নিতে হয় না বা অন্য কোনাে জটিল পদ্ধতির প্রয়ােজন হয় না।।
তৃতীয়ত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্য থাকে না। তার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত হতেই হবে। কিন্তু এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধান লিখিত হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। যেমন, গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের সংবিধান লিখিত। কিন্ত ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত। অথচ দুটি দেশেই এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা চালু আছে।
পঞ্চমত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য থাকে বলে বিচার বিভাগ দুর্বল হয়। কেন্দ্রীয় আইনসভার তৈরি কোনাে আইনকে বিচার বিভাগ অবৈধ বলে ঘােষণা করতে পারে না। যেমন, ব্রিটেনের আদালতের এই ক্ষমতা নেই।

প্রশ্ন ৩) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সুবিধাগুলি আলােচনা করাে। 
উত্তর : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি সুবিধা আছে। সেগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হল-
প্রথমত, এই শাসনব্যবস্থায় একটি সরকার থাকায় সারা দেশে একই আইন ও নীতি চালু হয়। ফলে সরকারের তৈরি আইনের মধ্যে কোনাে বিরােধের সম্ভাবনা থাকে না।
দ্বিতীয়ত, সারা দেশে একই আইন ও শাসন চালু হওয়ায় এই শাসনব্যবস্থায় ঐক্য এবং সংহতি গড়ে ওঠে। কারণ, কোনাে অংশ বঞ্চিত বলে মনে করে না। ফলে বিচ্ছিন্নতা বােধ নিতে পারে না।
তৃতীয়ত, দেশে সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে, এই শাসনব্যবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কারণ, একটি মাত্র সরকার থাকায় তার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে কোনাে বাধা থাকে।
চতুর্থত, এখানে একটি কেন্দ্রীয় সরকার থাকায় বলিষ্ঠ বিদেশ নীতি গ্রহণ করতে পারে। তার পক্ষে আন্তর্জাতিক সন্ধি ও চুক্তি কার্যকর করা সহজ হয় বলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারের ও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
পঞ্চমত, এই শাসনব্যবস্থায় সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয় বলে, সংবিধান সময়ের সঙ্গে তাল রেখে যুগের চাহিদা মেটাতে পারে। তাতে বিক্ষোভের সম্ভাবনা থাকে না।
ষষ্ঠত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভাগ হয় না। ফলে সরকার শক্তিশালী হয়। কারণ, ক্ষমতা ভাগ হলে সরকার দুর্বল হবে। ক্ষমতা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়বে।
সপ্তমত, একটিমাত্র সরকার থাকায় এই শাসনব্যবস্থায় ব্যয়ভার অনেক কম। সেই কারণে দরিদ্র দেশের পক্ষে এই ব্যবস্থা কাম্য বলে মনে করা হয়। 

প্রশ্ন ৪) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে। 
উত্তর : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কিছু অসুবিধা বর্তমান। নিম্নে সেই অসুবিধাগুলি আলােচনা করা হল –
প্রথমত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি মাত্র সরকার থাকে বলে বেশি মানুষ শাসনকার্যে অংশ নিতে পারে না। ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক চেতনার প্রসার ঘটে না।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ্যাক্টন (Acton) বলেছেন, “ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিপরায়ণ করে এবং বেশি ক্ষমতা মানুষকে বেশি দুর্নীতিপরায়ণ করে তােলে।” এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী হতে পারে।
তৃতীয়ত, এখানে সুশাসন সম্ভব নয়। বিশেষ করে বৃহৎ রাষ্ট্রে একটি মাত্র সরকারের পক্ষে আঞ্চলিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব নয়। তাতে স্থানীয় স্বার্থ অবহেলিত হয়।
চতুর্থত, প্রত্যেকের ক্ষমতার একটা সীমা আছে। এককেন্দ্রিক শাসনে একটি সরকারের উপর সব সমস্যার সমাধানের ফলে আমলাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
পঞ্চমত, এই শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্র এক জায়গায় থাকে, ফলে বিদেশি আক্রমণে সহজে ভেঙে পড়ে। ক্ষমতার কেন্দ্র একাধিক হলে আক্রমণকারী সহজে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।
ষষ্ঠত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় স্বায়ত্তশাসনের সুযােগ থাকে না বলে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ হতে পারে না।

প্রশ্ন ৫) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা কাকে বলে?
উত্তর : প্রাচীনকাল থেকে সরকারের শ্রেণিবিভাগের প্রচেষ্টা চলছে। যেমন অ্যারিস্টট্ল (Aristotle) শাসকের সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারের শ্রেণিবিভাগ করেছেন। আবার লর্ড ব্রাইস (Lord Bryce) শাসনব্যবস্থাকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন,—এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা।
     বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন। অধ্যাপক কে সি হোয়ার (K. C. Wheare) বলেছেন,—“যে শাসনব্যবস্থায় দু-ধরনের সরকার থাকে -কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার যেখানে একটি লিখিত সংবিধানের মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে এমনভাবে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয় যাতে, প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে অথচ পরস্পরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে, তখন তাকে বলে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা।”
     অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দুটি জিনিস একসঙ্গে কাজ করে। একদিকে রাজ্যগুলি নিজেদের অধিকার ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে, অন্যদিকে সবাই মিলে জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়। সেই কারণে অধ্যাপক ডাইসি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হল এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য হল জাতীয় ঐক্য ও শক্তির সঙ্গে অঙ্গরাজ্যের সমন্বয় করা। যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ হল -মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, ভারত প্রভৃতি দেশের শাসনব্যবস্থা।

প্রশ্ন ৬) যুক্তরাষ্ট্রের বৈশিষ্টগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : অধ্যাপক হােয়ার ও ডাইসির দেওয়া সংজ্ঞা আলােচনা করলে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই-
(ক) দুই ধরনের সরকার : এখানে দু-ধরনের সরকার থাকে—কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার। রাজ্য সরকারকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন রাজ্য, ক্যান্টন, প্রদেশ প্রভৃতি।
(খ) ক্ষমতার বণ্টন : এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়। জাতীয় স্বার্থ জড়িয়ে আছে এমন বিষয়গুলি কেন্দ্রের হাতে থাকে। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে এমন বিষয়গুলি রাজ্যের হাতে থাকে।
(গ) লিখিত সংবিধান : যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত হয়। লিখিত বলতে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সভা দ্বারা দলিল আকারে ইহা গৃহীত হয়।
(ঘ) দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান : যুক্তরাষ্ট্রের আর একটি বৈশিষ্ট্য সংবিধানকে সহজে পরিবর্তন করা যায় না। বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। কেন্দ্রীয় সরকার যাতে নিজের খুশিমতাে সংবিধান পরিবর্তন করতে না পারে, তার জন্য এই ব্যবস্থা।
(ঙ) সংবিধানের প্রাধান্য : যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রাধান্য স্বীকৃত। এই সংবিধান হল দেশের মৌলিক আইন। এর স্থান সবার উপরে। সকলকে এই আইন মেনে চলতে হয়।
(চ) নিরপেক্ষ আদালত : যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল- সেখানে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ আদালত অভিভাবক হিসাবে কাজ করবে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে তার মীমাংসা করবে। যদি কোনাে আইন সংবিধান বিরােধী হয়, তাহলে তাকে বাতিল করতে পারবে। একে বলে বিচার বিভাগীয় পর্যালােচনার ক্ষমতা (Judicial Review)
(ছ) অন্যান্য বৈশিষ্ট্য : উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, কেন্দ্রীয় আইনসভার দুটি কক্ষ থাকবে। দ্বিনাগরিকতার ব্যবস্থা।

প্রশ্ন ৭) যুক্তরাষ্ট্রের গুণ বা অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : অধ্যাপক কে. সি. হােয়ার, সিজউইক প্রভৃতি বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। তাদের যুক্তি হল –
(ক) শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠন : বর্তমানে বিশ্বের রাজনীতির যা অবস্থা, তাতে ছােটো ছােটো রাষ্ট্রগুলির পক্ষে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে এইসব ছােটো ছােটো দুর্বল রাষ্ট্র একজোট হয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠন করতে পারে। অথচ তাদের স্বাতন্ত্রকে বিসর্জন দিতে হয় না।
(খ) আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষা : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়। তাতে রাজ্যগুলি নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে তারা নিজেদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা ও বিকাশ করতে পারে।
(গ) সুশাসন সম্ভব : একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র উপযােগী। বৃহৎ রাষ্ট্রে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তরাষ্ট্র গঠন করলে ছােটো ছােটো অঙ্গরাজ্য গড়ে উঠবে। তার ফলে প্রত্যেকটি অঞ্চলে সুশাসন সম্ভব হবে।
(ঘ) রাজনৈতিক চেতনার প্রসার : যুক্তরাষ্ট্রে একটি কেন্দ্রীয় সরকার ও অনেকগুলি রাজ্য সরকার থাকায়, অনেক লােক শাসনকার্যে অংশ নিতে পারে। ফলে নাগরিকদের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। এই চেতনা বৃদ্ধি গণতন্ত্রের সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে।
(ঙ) আইন ও শাসনের পরীক্ষা : বর্তমান যুগে নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এর সমাধানের জন্যে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করা উচিত। কিন্তু সারা দেশের উপর পরীক্ষানিরীক্ষা হলে তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। তা না করে কোনাে অঙ্গ রাজ্যে তা নিয়ে পরীক্ষা করলে তাতে যদি ভালাে ফল হয়। তাহলে সেটা সারা দেশে চালু করা যেতে পারে।
(চ) নাগরিকদের মর্যাদা বৃদ্ধি : ছােটো রাষ্ট্রের নাগরিকদের মর্যাদা বড়াে রাষ্ট্রের তুলনায় কম। ছােটো ছােটো রাষ্ট্রগুলি মিলে যুক্তরাষ্ট্র গঠন করলে নাগরিকরা বড়াে রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারবে।

প্রশ্ন ৮) যুক্তরাষ্ট্রের দোষ বা অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : লীকক, ফাইনার প্রভৃতি তাত্ত্বিকেরা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের কতকগুলি অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল –
(ক) দুর্বল শাসনব্যবস্থা : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়। কারণ, এখানে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া থাকে। ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া মানে দুর্বল করে দেওয়া। তা ছাড়া, এখানে ক্ষমতার এক্তিয়ার নিয়ে উভয় সরকারের মধ্যে প্রায় বিরােধ দেখা দেয়। ফলে উভয় সরকারই দুর্বল হয়ে পড়ে।
(খ) বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম : যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিনাগরিকতা স্বীকৃত। নাগরিকরা কেন্দ্র ও রাজ্যের নাগারিক হয়। রাজ্যের প্রতি আনুগত্য খুব বেশি হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদ জন্ম নেয়। তাতে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়।
(গ) ব্যয়বহুল : অধ্যাপক ফাইনার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কারণ, এখানে কেন্দ্র ও অনেকগুলি রাজ্য সরকার থাকে। এগুলি চালাতে প্রচুর অর্থের দরকার। একে জাতীয় অর্থের অপচয় হয় বলে মনে করা হয়।
(ঘ) পরস্পর বিরােধী আইন : যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন রাজ্য সরকার অনেক সময় একই বিষয়ের উপর পরস্পর বিরােধী আইন প্রণয়ন করে।
(ঙ) দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান : যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান দুষ্পপরিবর্তনীয় হয়। সংবিধান সহজে পরিবর্তন করা যায় না। তাতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে বাধার সৃষ্টি হয়। সংবিধানকে সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়।
(চ) জরুরি অবস্থায় দুর্বল : জরুরি অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কারণ, এখানে কেন্দ্র ও অনেক অঙ্গরাজ্য থাকে। তাদের মতামত নিতে গিয়ে দেরি হয়। তাতে রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষতি হতে পারে।

প্রশ্ন ৯) এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য।
উত্তর : অধ্যাপক ডাইসির মতে, যে দেশের শাসনব্যবস্থায় সরকারের যাবতীয় ক্ষমতা একটিমাত্র কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত থাকে তাকে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বলে। যথা -ব্রিটেন ও ফ্রান্স। অন্যদিকে যে রাষ্ট্রে সরকার পরিচালনার যাবতীয় ক্ষমতা দু-সরকারের মধ্যে বন্টিত হয় তাকে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বলে। যথা— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপরিচালনায় সকল ক্ষমতা একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত। ব্রিটেনের এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নিহিত আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য— এই দুই স্বতন্ত্র সরকার থাকে। দেশের যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে বণ্টিত হয়। অধ্যাপক হােয়ারের মতে, “Federalism is a method of division of power.”
দ্বিতীয়ত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধান লিখিত অথবা অলিখিত হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংবিধান অবশ্যই লিখিত হবে।
তৃতীয়ত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্যের পরিবর্তে আইনসভার প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আদালত সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকর্তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিমকোর্ট এই ভূমিকা পালন করে। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে আদালতের এরূপ ভূমিকা থাকে না।
     এছাড়া এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে এক নাগরিকত্ব স্বীকৃত, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দ্বৈত নাগরিকত্ব বজায় থাকে।

প্রশ্ন ১০) আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্র প্রবণতার কারণ উল্লেখ করাে।
উত্তর : অধ্যাপক কে. সি. হােয়ারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হল এরূপ এক শাসনব্যবস্থা যেখানে দুপ্রকার সরকার ক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে স্বাতন্ত্র বজায় রেখে শাসনকার্য পরিচালনা করে —Federalism is a system of independent Governments, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতবর্ষ এবং সুইজারল্যান্ড হল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উদাহরণ।
     যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সূচনার পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের যে রূপ বজায় ছিল সাম্প্রতিককালে তার পরিবর্তন ঘটেছে। প্রতিটি রাষ্টে আঞ্চলিক সরকারগুলির ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রবণতাকে কেন্দ্র প্রবণতা বলা হয়। যুক্তরাষ্টীয় ব্যবস্থার কেন্দ্র প্রবণতার পশ্চাতে কয়েকটি কারণ উল্লেখযােগ্য। যেমন—
প্রথমত, আধুনিক পৃথিবীতে পরমাণু যুদ্ধের ভীতি প্রতিটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজ্য সরকারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, সমাজে অর্থনীতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাপক দারিদ্র্য প্রতিটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে এসে পড়েছে।
তৃতীয়ত, বর্তমান জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণের জন্য সমস্ত দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভরশীল।
চতুর্থত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পের ব্যাপক উন্নতির ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
উত্তর : সরকারের বা শাসনব্যবস্থার শ্রেণিবিভাগ করার কাজ বহুকাল থেকে চলে আসছে। অ্যারিস্টটল (Aristotle) শাসকের সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারের শ্রেণিবিভাগ করেছেন। আবার লর্ড ব্রাইস (Bryce) ক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থাকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন। (ক) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা এবং (খ) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা।

এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা সংজ্ঞা
যে শাসনব্যবস্থায় সরকারের যাবতীয় ক্ষমতা একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে, তাকে বলা হয় এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। এই শাসনব্যবস্থায় একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়া অন্য কোনাে সরকারের প্রাধান্য বা স্বাতন্ত্র্য থাকে না। কিন্তু শাসনকার্যের সুবিধার জন্য এই সরকার এক বা একাধিক আঞ্চলিক সরকার গঠন করতে পারে। তবে আঞ্চলিক সরকারগুলি থাকবে, কি থাকবে না, তারা কতটুকু ক্ষমতা ভােগ করবে, তা কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। অধ্যাপক গার্নার বলেছেন, যেখানে সকল ক্ষমতা সংবিধানের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় সরকারের উপর অর্পিত হয় এবং স্থানীয় সরকারগুলির ক্ষমতা, স্বাতন্ত্র এমনকি অস্তিত্বও সেই কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভর করে তাকে বলা হয় এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা
   এই সরকারের উল্লেখযােগ্য উদাহরণ হল, ব্রিটেনের সরকার। ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারের অস্তিত্ব থাকলেও তারা কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত ক্ষমতা ভােগ করে। ব্রিটেন ছাড়া ফ্রান্স, ইটালি, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, গণপ্রজাতন্ত্রী চিন প্রভৃতি দেশে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা আছে।
বৈশিষ্ট্য
অধ্যাপক গার্নারের দেওয়া উপরিউক্ত সংজ্ঞা আলােচনা করলে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায়—
প্রথমত, এখানে একটিমাত্র সরকার অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার হল সর্বেসর্বা। তার নির্দেশে সারা দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। অবশ্য কাজের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকটি আঞ্চলিক সরকার তৈরি করতে পারে। তবে তাদের কোনাে স্বাধীনতা থাকে না।
দ্বিতীয়ত, এখানে সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয়। কেন্দ্রীয় আইনসভা একাই সহজ পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করতে পারে। যেহেতু এখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতাে অঙ্গরাজ্য নেই, সেহেতু তাদের সম্মতি নিতে হয় না বা অন্য কোনাে জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না।
তৃতীয়ত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্য থাকে না। তার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা খুশিমতাে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তার বড়াে প্রমাণ।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত হতেই হবে। কিন্তু এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধান লিখিত হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। যেমন, গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের সংবিধান লিখিত। কিন্তু ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত। অথচ দুটি দেশেই এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। চালু আছে।
পঞ্চমত, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য থাকে বলে বিচার বিভাগ দুর্বল হয়। কেন্দ্রীয় আইনসভার তৈরি কোনাে আইনকে বিচার বিভাগ অবৈধ বলে ঘােষণা করতে পারে না। যেমন, ব্রিটেনের আদালতের এই ক্ষমতা নেই।

প্রশ্ন ২) এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সুবিধা-অসুবিধাগুলি উল্লেখ করাে।
উত্তর : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি আলােচনা করলে আমরা দেখতে পাবাে যে এর বেশ কয়েকটি সুবিধা ও অসুবিধা আছে। নিম্নে এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলি উল্লেখ করা হল।
সুবিধা
(i) জটিলতামুক্ত শাসনব্যবস্থা : এই শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে, ফলে তার পক্ষে সহজ ও সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হয়। অধ্যাপক গার্নার এই শাসনব্যবস্থাকে সরল বা সাদাসিধে (Simple) বলে অভিহিত করেছেন।
(ii) জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি রক্ষা : এই শাসনব্যবস্থায় সারা দেশে একই আইন ও শাসন রীতি বলবৎ করা হয়। তাই প্রশাসনিক ঐক্যের বন্ধনে সমগ্র দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকে, ফলে দেশের মধ্যে প্রাদেশিকতাবাদী কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনাে শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না।
(iii) শক্তিশালী সরকারের প্রতিষ্ঠা : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বিরােধের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সাংবিধানিক প্রতিপক্ষ না থাকায় সরকার শক্তিশালী হয়। বলাবাহুল্য, সরকার শক্তিশালী হলে সংকটের সময় দ্রুত ও কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়।
(iv) দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি : এই ব্যবস্থায় দেশের সকল দায়দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের উপর অর্পিত থাকে। কেন্দ্রীয় সরকার এইসব দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়।
(v) অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন : এই ব্যবস্থায় একটিমাত্র সরকারের উপর রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষমতা অর্পিত থাকায় সরকার নিজের ইচ্ছানুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্তিশালী হয়।
(vi) পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্চস্যবিধান : এরুপ শাসনব্যবস্থায় সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয়। কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার অতি সহজেই সংবিধান সংশােধন করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করে চলতে পারে।
(vii) আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন : এরূপ শাসনব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তি, সন্ধি প্রভৃতি করা সম্ভব হয়। বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে এরূপ শাসনব্যবস্থা বিশেষভাবে উপযােগী।
(viii) ব্যয়সংকোচ : কোনাে কোনাে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্যয়সংকোচের দিক থেকে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। কাম্য বলে বিবেচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দ্বিবিধ সরকার থাকায় প্রশাসন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভূত ব্যয় হয়। কিন্তু এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এই ব্যয়বাহুল্য কমানাে সম্ভব হয়।
অসুবিধা
(i) রাজনৈতিক চেতনার অভাব : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় একটিমাত্র সরকার থাকে বলে বেশি মানুষ শাসনকার্যে অংশ নিতে পারে না। ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক চেতনার প্রসার ঘটে না।
(ii) দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের আশঙ্কা : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ্যাক্টন (Acton) বলেছেন, “ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিপরায়ণ করে এবং বেশি ক্ষমতা মানুষকে বেশি দুর্নীতিপরায়ণ করে তােলে।” এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী হতে পারে।
(iii) সুশাসনের অন্তরায় : এখানে সুশাসন সম্ভব নয়। বিশেষ করে বৃহৎ রাষ্ট্রে একটি মাত্র সরকারের পক্ষে আঞ্চলিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব নয়। তাতে স্থানীয় স্বার্থ অবহেলিত হয়।
(iv) আমলাতান্ত্রিক : প্রত্যেকের ক্ষমতার একটা সীমা আছে। এককেন্দ্রিক শাসনে একটি সরকারের উপর সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব থাকায়, তার পক্ষে সবটাই বহন করা সম্ভব নয়। ফলে আমলাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
(v) অগণতান্ত্রিক : এই শাসনব্যবস্থায় সর্বত্রই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। ফলে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সুযােগ থাকে না, যা অগণতান্ত্রিক।
(vi) সংখ্যালঘুদের স্বার্থ উপেক্ষিত : এরূপ শাসন ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন ৩) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিকক ক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে সরকারকে দু-ভাগে বিভক্ত করেন—এককেন্দ্রিক সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার। Federation শব্দটি লাতিন শব্দ Foedm হতে উদ্ভূত। এর অর্থ হল চুক্তিবদ্ধ। অধ্যাপক কে. সি. হােয়ারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হল এরূপ এক শাসনব্যবস্থা যেখানে দেশের শাসন ক্ষমতা সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় ও আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বন্টিত হয়। অধ্যাপক কে. সি. হােয়ারের মতে, Federalisnt is a patet/aod of diuid trg powers so that the general and regional Govt. within a sphere co-ordinete and independent. অধ্যাপক ডাইসির মতে, জাতীয় ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের রাজনৈতিক পদ্ধতিকে যুক্তরাষ্ট্র বলে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র হল এরূপ এক শাসনব্যবস্থা যেখানে সরকারের যাবতীয় ক্ষমতা সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় ও আলিক সরকারের মধ্যে বণ্টিত হয় এবং সেই বণ্টন রক্ষার জন্য এক চূড়ান্ত আদালত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মূলকথা হল জাতীয় ও আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য
(ক) দু-ধরনের সরকার : এখানে দু-ধরনের সরকার থাকে, কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার। রাজ্য সরকারকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন রাজ্য, ক্যান্টন, প্রদেশ প্রভৃতি।
(খ) ক্ষমতা বটন : এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়। জাতীয় স্বার্থ জড়িয়ে আছে এমন বিষয়গুলি কেন্দ্রের হাতে থাকে। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে এমন বিষয়গুলি রাজ্যের হাতে থাকে।
(গ) লিখিত সংবিধানঃ যুবাধের সংবিধান লিখিত হয়। লিখিত বলতে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সভা দ্বারা দলিল আকারে ইহা গৃহীত হয়।
(ঘ) দুম্পরিবর্তনী সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল, এ সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয় অর্থাৎ সংবিধানকে সহতের পরিবর্তন করা যায় না। বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। কেন্দ্রীয় সরকার যাতে নিজের খুশিমতো সংবিধান পরিবর্তন করতে না পারে, তার জন্য এই ব্যবস্থা।
(ঙ) সংবিধানের প্রাধান্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রধান স্বীকৃত। এই সংবিধান হয়, দেশের মৌলিক আইন। এর স্থান সবার উপরে। সকলকে এই আইন মেনে চলতে হয়।
(চ) নিরপেক্ষ আদালত ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্প নিরপেক্ষ আদালত থাকবে। এই আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যা-কর্তা ও অভিভাবক হিসাবে কাজ করবে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে তার মীমাংসা করবে। যদি কোনো আইন সংবিধান বিরোধী হয়, তাহলে তাকে বাতি করতে পারবে। একে বলে বিচার বিভাগীয় পর্যালােচনার ক্ষমতা (Judicial Review)।
(ছ) অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ও উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, কেদীয় আইনসভার দুটি কক্ষ থাকবে। দ্বিনাগরিকতার ব্যবস্থা থাকবে। |

প্রশ্ন ৪) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার সুবিধা ও অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় কয়েকটি সুবিধা ও অসুবিধা আছে। নিম্নে যুবরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সুবিধা ও অসুবিধাগুলি উল্লেখ করা হল।

সুবিধা
(i) বিপরীতমুখী প্রবণতার সার্থক সমন্বয় : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার প্রধান গুণ হল যে-কোনো জনসমাজের মধ্যে ঐক্য ও স্বাতন্ত্র্যের আগ্রহ একইসঙ্গে বিরাজ করলে উভয় প্রবণতাকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
(ii) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র মিলে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার অপর একটি উল্লেখযোগ্য গুণ হল এই যে, কতকগুলি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র আপন অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিসর্জন না দিয়ে সম্মিলিতভাবে একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠন করতে পারে। নতুন বাষ্ট্রের মাধ্যমে খুদ্র ক্ষুদ্র রা? আৰক্ষা সমর্থ হয়। এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাথের প্রসার হয়।
(iil) শাসনের সুবিধা : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় সমগ্র দেশের জন্য একই শান- নীতি ও আইন প্রণয়ন করা যায় এবং আঞ্চলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে শাসন নীতি ও আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধ্যানধারণার পরীক্ষা চালানােও সব হয়।
(iv) স্বায়ত্তশাসনের সুযােগ : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় আঞ্চলিক সরকারের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের সুযােগ ঘটে। এতে জনগণের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার হয়, শাসনকার্যে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। তা ছাড়া আঞ্চলিক ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধিত হয়।
(v) স্থানীয় সমস্যার সার্থক সমাধান : যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আঞ্চলিক সমস্যা ও অভাব অভিযােগের উপযুক্ত প্রতিকার সম্ভব করতে পারে। আঞ্চলিক সমস্যাগুলির সমাধানের দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যের ওপর ন্যস্ত থাকায় সেগুলির প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব। হয়।
(vi) রাজনৈতিক শিক্ষার সুযােগ : যুক্তরাষ্ট্রে আঞ্চলিক সরকার ও স্বায়ত্বশাসনের সুযােগ থাকায় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণেরও সম্ভাবনা থাকে। আঞ্চলিক সমস্যা ও তার সমাধানে জনগণের উদ্যোগ লক্ষ করা যায়।
(vii) স্বৈরাচারিতার সম্ভাবনা কম : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের ক্ষমতা সংবিধানের দ্বারা নির্দিষ্ট থাকে। সংবিধানের প্রাধান্যের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অকাম্যভাবে ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহার করা বিশেষ অসুবিধাজনক। বিচার বিভাগের ভূমিকাও কেন্দ্রীয় সরকারকে সংযত রাখে। যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত ও কেন্দ্রীয় সরকারের সংবিধান বিরােধী কাজকে অবৈধ বলে নির্দেশ দিতে পারে।
(viii) বিপ্লবের আশঙ্কা কম থাকে : অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে বিপ্লব বা বিদ্রোহের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের সুযােগ কম থাকে।

অসুবিধা
(i) দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসুবিধা : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের মাধ্যমে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন হওয়ায় এককেন্দ্রিক সরকারের ন্যায় বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিক সন্ধি, চুক্তির শর্ত পালনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দুর্বলতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায়।
(ii) জটিল ও ব্যয়বহুল : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। বহু শাসনতন্ত্রের জন্য অযথা সময় ও অর্থব্যয় হয়ে থাকে। অঙ্গরাজ্যগুলির সহযােগিতা ছাড়া সুষ্ঠু শাসন পরিচালনাও সম্ভব হয় না।
(iii) দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে স্বার্থের বিরােধ : যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে আইন প্রণয়ন ক্ষমতার বণ্টন হওয়ায় বিভিন্ন রাজ্য নিজ নিজ স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে আইন রচনা করতে পারে। ফলে একটি বিষয়ের ওপর দেশের বিভিন্ন অংশে পরস্পরবিরােধী আইনের প্রবর্তন হবার সম্ভাবনা থাকে। অঙ্গরাজ্যগুলি ভিন্ন আইন প্রণয়ন করতে পারে। ফলে জাতীয় ঐক্য ক্ষুগ্ন হবার আশঙ্কা থাকে, জাতীয়স্বার্থও বিনষ্ট হতে পারে।
(iv) সংবিধান প্রগতির পথে বাধা হতে পারে : যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান সাধারণত দুস্পরিবর্তনীয় হয়ে থাকে। সুতরাং সংবিধানের সংশােধন সহজসাধ্য নয়। দেশ যখন অগ্রসর হতে চায়, সংবিধান তখন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
(v) বিচ্ছিন্নতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার হতে পারে : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় নাগরিকের আনুগত্য কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি থাকে না, রাজ্য সরকারের প্রতিও থাকে। জনগণের আশা-আকাক্ষা, অভাব পূরণ ও অভিযােগ সমাধান করতে রাজ্য সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা লক্ষ করা যায়।

প্রশ্ন ৫) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার সাফল্যের শর্তাবলি আলােচনা করাে।
উত্তর : অধ্যাপক ডাইসির (Diecy)মতে যখন পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সাধারণ স্বার্থের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে চায়, কিন্তু নিজেদের বিশেষ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে চায় তখনই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। বর্তমান পৃথিবীতে অধিকাংশ রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে একে সফল করে তুলতে গেলে কতকগুলি শর্ত থাকা প্রয়ােজন। এই শর্তগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল :-
(i) মিলনের ইচ্ছা ও স্বাতন্ত্র্যবােধের সমন্বয় : অধ্যাপক ডাইসি (Diecy) যুক্তরাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে দুটি শর্তের কথা বলেছে। প্রথম শর্ত হল মিলনের ইচ্ছ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র গঠনে ইচ্ছুক রাষ্ট্রগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্তরিকভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করবে। তবে ঐক্যবদ্ধ হলেও সম্পূর্ণভাবে মিলে যাবে না। কারণ, মিলে গেলে এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হবে। তাই ডাইসি বলেছেন, “Must desire union, and must not desire unity” দ্বিতীয় শর্ত হল, প্রতিটি রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুক্ত হতে চাইলেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেবে না। নিজেদের সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকবে। এই মিলনের ইচ্ছা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার মানসিকতার সমন্বয় থেকে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং সমন্বয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য আনে।
(ii) ভৌগােলিক সান্নিধ্য : জাতীয় ঐক্যের ভাব সরের জন্য প্রাথমিকভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির ভৌগােলিক সান্নিধ্যের প্রয়ােজন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে জাতীয় ঐক্য সঞ্চারিত হয়। তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকলে এ ব্যাপারে অসুবিধা দেখা দেবে।
(iii) শক্তি ও সম্পদের সমতা : বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে যদি শক্তি ও সম্পদের খুব পার্থক্য থাকে, তাহলে স্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র গঠন করতে পারবে না। যে বেশি শক্তিশালী সে অপরের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চেষ্টা করবে অথবা বেরিয়ে যাবে।
(iv) নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা : যুক্তরাষ্ট্রকে সফল করে তুলতে গেলে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকা দরকার। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে আদালত যদি কেন্দ্রের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, তখন রাজ্যের মনে হতাশা ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হবে। তাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে পড়বে।
(v) একই ধরনের শাসনব্যবস্থা : যারা যুক্তরাষ্ট্র গঠন করবে তাদের শাসনব্যবস্থা একই ধরনের হওয়া প্রয়ােজন। তাহলে তাদের ঐক্য দৃঢ় হবে। তা না হয়ে যদি কোনাে রাজ্যে স্বৈরতন্ত্র, কোথাও গণতন্ত্র, কোথাও বা রাজতন্ত্র থাকে, তাহলে বিরােধের সম্ভাবনা থাকবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র বিপন্ন হবে।
(vi) সুযােগ্য নেতৃত্ব : সুযােগ্য নেতৃত্বের উপর যুক্তরাষ্ট্রে সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে। অধ্যাপক কে. সি. হােয়ার বলেছেন, বিচক্ষণ, সৎ ও সাহসী নেতৃত্ব জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিত শক্ত করতে পারে।
(vii) সুস্পষ্ট ক্ষমতা বণ্টন : যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে এই ভাগ যেন লিখিত আকারে স্পষ্টভাবে থাকে। তাহলে প্রত্যেকে তার নির্দিষ্ট ক্ষমতার মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। যদি কেউ তার সীমা অতিক্রম করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
(viii) জাতীয়তাবােধ : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজ্যগুলি যদি জাতীয়তাবােধে উদ্বুদ্ধ হয়, তবেই যুক্তরাষ্ট্রের বাধন শক্ত হবে। কিন্তু তাদের মধ্যে “এক জাতি এক রাষ্ট্র” এই মনােভাব যদি গড়ে , তাহলে পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ দেখা দেবে। তাতে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হবে।
(ix) পারস্পরিক সহযােগিতা : যুক্তরাষ্ট্রকে সফল করতে হলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পারস্পরিক সহযােগিতা থাকা প্রয়ােজন। কেন্দ্র অকারণে রাজ্যের স্বাধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করবে । রাজ্যও অহেতুক কেন্দ্রের বিরােধিতা করবে না। অর্থাৎ পরস্পরের মধ্যে ভুল বােঝাবুঝির অবকাশ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হবে।

মূল্যায়ন
যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের বিভিন্ন শর্ত আছে। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল জাতীয়তাবোধ বা দেশপ্রেম। এই দেশপ্রেম সহয় জীবনকে একসূত্রে বাঁধতে পারে। বিভিন্ন অঙ্গুল ও গােষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সফল করে তুলতে পারে। ভারতের কাঠামাে যুক্তরাষ্ট্রীয়। এখানে বহু ভাষা ও বহু ধর্মের মানুষ আছে। স্বতন্ত্র আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য আছে। তবুও জাতীয়তাবােধ সবাইকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র সংকটের সম্মুখীন হয়নি।

প্রশ্ন ৬) আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রপ্রবণতার কারণ নির্দেশ করে।
উত্তর : পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কারণ, এখানে দুটি জিনিস একইসঙ্গে পাওয়া যায়, শক্তিশালী জাতীয় সরকার ও রাজ্যগুলির অধিকার রক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হল, দু-ধরনের সরকারের অস্তিত্ব এবং সংবিধান তাদের মধ্যে এমনভাবে ক্ষমতা ভাগ করে দেবে যাতে উভয়ে নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে অথচ পরস্পরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে এবং রাজ্য সরকারের ক্ষমতা কমছে। এই প্রবণতাকে বলে “কেন্দ্রীয়প্রবণতা”। এই প্রবণতা এতই বেড়েছে যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রিফিথ (Griffith) বলেছেন, “We no longer five under a genuine Federation” অর্থাৎ আমরা আর খাঁটি যুক্তরাষ্ট্রে বাস করি না। অধ্যাপক কে. সি. হােয়ার (K. c. Wheare) কেন্দ্রপ্রবণতার নিম্নলিখিত কারণগুলি উল্লেখ করেছেন :-
(i) যুদ্ধ : বর্তমানে পারমাণবিক যুদ্ধের ভীতি কেন্দ্রের ক্ষমতাকে প্রসারিত করেছে। এখনকার যুদ্ধ অল্প সময়ের মধ্যে ভয়ংকর রূপ নেয়। যুদ্ধের মােকাবিলা করতে গেলে যে পরিমাণ শক্তি ও সম্পদের প্রয়ােজন, কোনাে অঙ্গরাজ্যের পক্ষে তা থাকা সম্ভব নয়। তাই তারা কেন্দ্রের প্রতি নির্ভরশীল হচ্ছে। এতে কেন্দ্রের ক্ষমতা বাড়ছে।
(ii) আর্থিক সংকট : বর্তমানে সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি কারণে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষে এই সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই তারা কেন্দ্রের উপর নির্ভর করছে। কেন্দ্র আর্থিক সাহায্য দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।
(iii) জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র : বর্তমানে রাষ্ট্র পুলিশি রাষ্ট্র নয়। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ ছাড়া তার কাজের পরিধি অনেক বেড়েছে। শিক্ষার ব্যবস্থা করা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রভৃতি রাষ্ট্রের কর্তব্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। এইসব কাজ করার জন্যে প্রচুর টাকার প্রয়ােজন। অঙ্গরাজ্যের পক্ষে এই টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য নিতে হচ্ছে। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(iv) যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি : যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় বর্তমানে সরকার যে- কোনাে সময় রাজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বলবৎ করতে পারে। তা ছাড়া, যােগাযােগের উন্নতির জন্য বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে প্রশাসনিক বিরােধ দেখা দিচ্ছে। এই বিরােধের মীমাংসার ভার কেন্দ্রের উপর পড়ছে। ফলে কেন্দ্র নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করছে। (v) অর্থনৈতিক পরিকল্পনা : বর্তমান যুগ হল পরিকল্পনার যুগ। রাজ্যগুলি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। পরিকল্পনার দায়দায়িত্ব অনেক। কেন্দ্রীয় সরকারই এই দায়িত্ব বহন করতে পারে। এই দায়িত্ব কেঞ্জীভূত হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(vi) আদালতো ভূমিকা : যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত কেদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। আদালত সংবিধানেরও ব্যাখ্যা করে। বিচারপতিরা যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়, সেহেতু তারা কেন্দ্রের সপক্ষে রায় দেয়। এই রায়-এর ফলে কেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির এটি বড় কারণ।

মূল্যায়ন
সার্বভৌমিকতা রক্ষা করতে এই ক্ষমতা বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। কে.সি হােয়ার (K, C. Wheare) মনে করেন, এই ক্ষমতা বৃদ্ধি এককেন্দ্রিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। কারণ, রাজ্যগুলি নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলেও উভয় সরকারের মধ্যে সহযােগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

প্রশ্ন ৭) এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় মধ্যে পার্থক্য দেখাও।
উত্তর : এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে হলে প্রথমে উভয়ের সংজ্ঞা দেওয়া প্রয়ােজন। যে শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব থাকে সেই শাসনব্যবস্থাকে বলে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা হল এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে দু-ধরনের সরকার থাকে- (i) কেন্দ্রীয় সরকার এবং (ii) একাধিক রাজ্য সরকার।

উভয়ের মধ্যে পার্থক্য : সংজ্ঞা দুটির পরিপ্রেক্ষিতে এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে নিম্নলিখিত পার্থক্যগুলি দেখা যায়।
(i) সরকারের প্রকৃতি : এককেন্দ্রিক সরকারে একটিমাত্র সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার থাকে। আঞ্চলিক সরকার থাকতে পারে, কিন্তু তাদের কোনাে স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতা থাকে না। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দু-ধরনের সরকার থাকে। উভয় সরকারই নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
(ii) ক্ষমতা বন্টন : যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত হয়। উভয় সরকারকে সংবিধান মেনে কাজ করতে হয়। কিন্তু এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা বণ্টনের কোনাে প্রশ্নই ওঠে না।
(iii) আঞ্চলিক সরকারগুলির ক্ষমতাগত পার্থক্য : যুক্তরাষ্ট্রে আঞ্চলিক সরকারগুলি এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার আঞ্চলিক সরকারগুলির তুলনায় বেশি ক্ষমতা ভােগ করে। যেমন— ভারতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় কোনাে একটি রাজ্য সেই ক্ষমতা ভােগ করতে পারে না।
(iv) শাসনতন্ত্রের পার্থক্য : যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সংবিধান লিখিত ও সাধারণত দুম্পরিবর্তনীয় হয়। কিন্তু এককেন্দ্রিক সরকারের সংবিধান লিখিত, অলিখিত, সুপরিবর্তনীয় ও অনমনীয় হতে পারে।
(v) যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত : যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত। সংবিধান ব্যাখ্যা ও রক্ষার দায়িত্ব এবং রাজ্য ও কেন্দ্রের বিরােধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালতের। কিন্তু এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় এই আদালত থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
(vi) ক্ষমতার উৎস : এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার উৎস হল কেন্দ্রীয় সরকার। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় উভয় সরকারের ক্ষমতার উৎস হল সংবিধান।
(vii) দ্বিনাগরিকত্ব : কোনাে কোনাে যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিনাগরিকত্ব লক্ষ করা যায়। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় দ্বিনাগরিকত্ব থাকে না।
(vii) ব্যয়বহুল : যুক্তরাষ্ট্রে দু-ধরনের সরকার থাকে। তাই এটি ব্যয়বহুল। এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ব্যয়বহুল নয়। দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে এককেন্দ্রিক সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
(ix) স্বৈরাচারী মনােভাব : যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার কখনই স্বৈরাচারী হতে পারে না। কিন্তু এককেন্দ্রিক সরকার যে-কোনাে সময়ে স্বৈরাচারী হতে পারে। জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে।

মূল্যায়ন

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কাঠামােগত ও প্রকৃতিগত পার্থক্য আছে। তবে যতদিন যাচ্ছে এই পার্থক্যের ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটছে। আলিক সরকারের হাতে কিছু কিছু ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ, যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি কারণে কেন্দ্রের ক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রিকতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 + eight =