ভারতের দলব্যবস্থা (Political Party of India)

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

1. ভারতে কার তত্ত্বাবধানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ?
উত্তর: ভারতে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

2. কে ভারতবর্ষে রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বীকৃতি দেয়?
উত্তর: নির্বাচন কমিশন ভারতবর্ষে রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বীকৃতি দেয়।

3. ভারতের জাতীয় কংগ্রেস কত খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ?
উত্তর: ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।

4. ভারতীয় জনতা পার্টি কত খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ?
উত্তর: ভারতীয় জনতা পার্টি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।

5. কত খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সংবিধানে দলীয় ব্যবস্থা স্বীকৃতি পায় ?
উত্তর: ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সংবিধানে দলীয় ব্যবস্থা স্বীকৃতি পায়।

6. কে ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন?
উত্তর: বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষচন্দ্র বসু ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন।

7. ফ্রান্সে কী ধরনের দলীয় ব্যবস্থা আছে?
উত্তর: ফ্রান্সে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে।

8. গ্রেট ব্রিটেনে কী ধরনের দলীয় ব্যবস্থা বর্তমান?
উত্তর: গ্রেট ব্রিটেনে সুস্পষ্ট দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বর্তমান।

9. সর্বপ্রথম কোথায় দলপ্রথার উদ্ভব ঘটে?
উত্তর: ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম দলপ্রথার উদ্ভব ঘটে।

10. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী ধরনের শাসনব্যবস্থা বর্তমান ?
উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থা বর্তমান।

11. এখন পর্যন্ত ভারতে কটি লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ?
উত্তর: এখন পর্যন্ত ভারতে ১৭টি লোকসভা  নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

12. কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কী নামে পরিচিত ?
উত্তর: কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় কমিটি AICC নামে পরিচিত।

13. ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় কী ধরনের দলীয় ব্যবথা আছে?
উত্তর: ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বর্তমান।

14. সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণত কয়টি দল থাকে ?
উত্তর: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণত একটি দল থাকে।

15. কত খ্রিস্টাব্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয় ?
উত্তর: ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়।

16. বহু দল সমর্থিত সরকারকে কী ধরনের সরকার বলা হয়?
উত্তর: বহুদল সমর্থিত সরকারকে কোয়ালিশন সরকার বলা হয়।

17. কী ধরনের দলীয় ব্যবস্থায় রাজনীতি পরিচ্ছন্ন হয় ?
উত্তর: দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় রাজনীতি পরিচ্ছন্ন হয়।

18. দ্বিদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে এমন দুটি দেশের নাম উল্লেখ করো।
উত্তর: দ্বিদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে এমন দুটি দেশের নাম হল ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

19. ভারতের তেলেগুদেশম পার্টি কী ধরনের দল ?
উত্তর: ভারতের তেলেগুদেশম পার্টি একটি আঞ্চলিক দল।

20. ভারতের জাতীয় কংগ্রেস কী ধরনের দল ?
উত্তর: ভারতের জাতীয় কংগ্রেস একটি জাতীয় দল

21. ভারতে কী ধরনের দলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে?
উত্তর: ভারতে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে।

22. দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বলতে কী বোঝ?
উত্তর: দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বলতে এমন একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বোঝায় যেখানে দুটি রাজনৈতিক দল দেশের শাসনব্যবস্থায় প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে।

23. জনমত বলতে কী বোঝ ?
উত্তর: জনমত বলতে বোঝায় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে সমস্যা সম্পর্কে সুদৃঢ় অভিমত।

24. ইংল্যান্ডের প্রাচীন দুটি রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করো।
উত্তর: ইংল্যান্ডের প্রাচীন দুটি রাজনৈতিক দলের নাম হল হুইগ (Whig) এবং (Tory)

25. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীন দুটি রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করো।
উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীন দুটি রাজনৈতিক দলের নাম হল রিপাবলিকান (Republican) এবং ডেমোক্র্যাট (Democrat)

26. কয়েকটি স্থানীয় দলের নাম উল্লেখ করো।
উত্তর: কয়েকটি স্থানীয় দলের নাম হল—ত্রিপুরা উপজাতি সমিতি, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট, দার্জিলিং-এ জি.এন.এল.এফ

27. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কত খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ?
উত্তর: ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।

28. কত খ্রিস্টাব্দে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠিত হয়।

29. কোন দেশে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে

30. কত তম সংবিধান সংশোধনীতে রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থা সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে ?
উত্তর: ৫২তম সংবিধান সংশোধনীতে রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থা সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ
করে।

31. ‘কাস্ট ইন ইন্ডিয়ান পলিটিকস’ গ্রন্থটির লেখক কে ?
উত্তর: ‘কাস্ট ইন ইন্ডিয়ান পলিটিকস’ গ্রন্থটির লেখক হলেন অধ্যাপক রজনি কোঠারি

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১। ভারতের প্রধান প্রধান জাতীয় দলগুলির নাম উল্লেখ করাে।
উত্তর : ভারতের প্রধান জাতীয় দলগুলি হল : (i) ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP), (ii) ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (NCP), (ii) ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPM), (iv) বহুজন সমাজ পার্টি (BSP), (v) ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (NCP), (vi) অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) এবং (v) সমাজবাদী পার্টি (SP)।

প্রশ্ন ২। ভারতের কয়েকটি আঞ্চলিক দলের নাম লেখাে।
উত্তর : (i) অকালি দল, (ii) তেলেগুদেশম, (iii) ডি. এম. কে, (iv) এ. আই. এ. ডি. এম. কে., (v) ফরওয়ার্ড ব্লক এবং (vi) অসম গণপরিষদ প্রভৃতি।

প্রশ্ন ৩। ভারতে কী ধরনের দলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে?
উত্তর : ভারতে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। তবে এখানে দুটি দলের প্রাধান্য সুস্পষ্ট।

প্রশ্ন ৪। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের মূল কর্মসূচির যে-কোনাে চারটির উল্লেখ করাে।
উত্তর : জাতীয় কংগ্রেস দলের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত চারটি বিষয় হল—(i) ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণ, (ii) অজ্ঞতা, দারিদ্র্য, ব্যধি ও বৈষম্য দূর করে সমাজতন্ত্র গড়ে তােলা, (iii) গণতন্ত্রকে সংহত ও সংরক্ষণ করা এবং (iv) কৃষির উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ এবং গ্রাম্যজীবনের উন্নয়ন।

প্রশ্ন ৫। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মূল কর্মসূচির যে-কোনাে চারটির উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) সাম্রাজ্যবাদ বিরােধিতা, (ii) সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সহিত মৈত্রী, (iii) একচেটিয়া দেশি ও বিদেশি কোম্পানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের জাতীয়করণ এবং (iv) কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রদান।

প্রশ্ন ৬। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)র মূল কর্মসূচির যে-কোনাে চারটির উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) ভূমিসংস্কার ও জমি বণ্টন রূপায়ণ, (ii) রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতা ন্যস্ত করে কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কের পুনঃবিন্যাস, (ii) পাট ও সূতি বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ এবং (iv) জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বিভেদকামী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম।

প্রশ্ন ৭। ভারতের জনতা পার্টির মূল কর্মসূচির যে-কোনাে চারটির উল্লেখ করাে।
উত্তর : (6) খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, (ii) রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলিকে উৎপাদনমুখী ও লাভজনক করা, (iii) ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কর রেহাইদান এবং (iv) দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে বৃহৎ শক্তির আধিপত্য খর্ব করা।

প্রশ্ন ৮। পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করাে।
উত্তর : পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি রাজনৈতিক দল হল—(i) তৃণমূল কংগ্রেস, (ii) ভারতীয় জনতা পার্টি, (iii) সি.পি.আই (এম), (iv) কংগ্রেস, (v) সি.পি.আই., (vi) আর.এস.পি. এবং (vii) ফরওয়ার্ড ব্লক প্রভৃতি।

প্রশ্ন ৯। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদ)-র মতে ভারতীয় রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্র কী?
উত্তর : ভারত হল বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বুর্জোয়া ও জমিদারদের শ্রেণি-শাসনের যন্ত্র মাত্র। বৃহৎ বুর্জোয়ারা ধনতন্ত্রের প্রসারের লক্ষ্যে বিদেশি বুর্জোয়াদের সঙ্গে অধিকতর সহযােগিতায় আগ্রহী।

প্রশ্ন ১০। ভারতের কমিউনিস্ট দলগুলি সম্পর্কে আলােচনা করাে।
উত্তর : ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শের অনুগামী হলেও স্বাধীনতা লাভের পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রধানত বৈদেশিক নীতির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ১৯৬৫ সালে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী এই দু-ভাগে বিভক্ত হয়। তারপর আবার মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি থেকে মার্কসবাদী- লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সৃষ্টি হয়েছে। কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ভারতের অন্যান্য দলগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল : আর. এস. পি., এস, ইউ. সি. প্রভৃতি।

প্রশ্ন ১১। পরাধীন ভারতের স্বরাজ দলের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর : স্বরাজ দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল আইনসভার ভিতর থেকে ইংরেজদের শাসনকার্যে বাধাবিপত্তির সৃষ্টি করা।

প্রশ্ন ১২। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত দলগুলির নাম করাে।
উত্তর ৭৭-এর নির্বাচনে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট দল, ফরওয়ার্ড ব্লক, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক, বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল, বিপ্লবী সাম্যবাদী দল, বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেস বামফ্রন্ট গঠন করে। ৮২ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও সােস্যালিস্ট পার্টি বামফ্রন্টে যােগ দেয়।

প্রশ্ন ১৩। কে এবং কবে ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন?
উত্তর : নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন।

প্রশ্ন ১৪। দুটি এমন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করাে যারা রাজ্যস্তরে সরকার গঠন করেছে।
উত্তর : অপ্রদেশে শ্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর নেতৃত্বে তেলেগুদেশম পার্টি এবং অসমে শ্রী প্রফুল্ল কুমার মহন্ত-এর নেতৃত্বে অসম গণপরিষদ (অগপ) এই দুটি আঞ্চলিক দল রাজ্যস্তরে সরকার গঠন করেছে।

প্রশ্ন ১৫। রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা দাও।
উত্তর : এডমন্ড বার্কের মতে, রাজনৈতিক দল হল একটা সংগঠিত জনসমষ্টি যারা নির্দিষ্ট নীতির দ্বারা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং যৌথ প্রচেষ্টার দ্বারা স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করে। জোসেফ সুমপিটারের অভিমত অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক এবং প্রধান লক্ষ্য হল, ক্ষমতা লাভের জন্য বা ক্ষমতায় থাকার জন্য অন্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা। প্রশ্ন

১৬। রাজনৈতিক দলের দুটি কাজ উল্লেখ করাে।
উত্তর : (i) সরকারি ক্ষমতা অর্জন ও সরকার গঠন : প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রধান উদ্দেশ্য হল সরকারি ক্ষমতা দখল করা ও সরকার গঠন করা। (ii) রাজনৈতিক নিয়ােগ : রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক নিয়ােগের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

প্রশ্ন ১৭। রাজনৈতিক দলের শ্রেণিবিভাজন করাে।
উত্তর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাজনৈতিক দলকে সংখ্যার ভিত্তিতে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলি যথাক্রমে-(i) একদলীয় ব্যবস্থা, (ii) দ্বিদলীয় ব্যবস্থা, (iii) বহুদলীয় ব্যবস্থা।

প্রশ্ন ১৮। একদলীয় ব্যবস্থা কাকে বলে?
উত্তর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কেবলমাত্র একটি দলের অস্তিত্ব বা কর্তৃত্ব পরিলক্ষিত হয় সেই দলীয় ব্যবস্থাকে একদলীয় ব্যবস্থা বলা হয়। এই দল একটি আদর্শ, কর্মসূচি ও লক্ষ্য অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকে। অধ্যাপক অ্যালমন্ড একদলীয় ব্যবস্থাকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। (i) সাধারণ একদলীয় ব্যবস্থা, (ii) সর্বাত্মক একদলীয় ব্যবস্থা।

প্রশ্ন ১৯। দ্বিদলীয় ব্যবস্থা কাকে বলে?
উত্তর : যে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনেকগুলি রাজনৈতিক দল পরিলক্ষিত হলেও প্রধানত দুটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব ও প্রাধান্য দেখা যায় এবং শাসনক্ষমতা দুটি দলের মধ্যেই আবর্তিত হয় তাকে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বলা হয়। গ্রেট ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হল দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অন্তর্গত।

প্রশ্ন ২০। বহুদলীয় ব্যবস্থা কাকে বলে?
উত্তর : যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনেক রাজনৈতিক দল পরিলক্ষিত হয় তাকে বহুদলীয় ব্যবস্থা বলে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কর্মসূচি, লক্ষ্য, আদর্শ থাকে। এরা সরকারি ক্ষমতা লাভের জন্য নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়। ফ্রান্স, ভারত, নরওয়ে, সুইডেন, জাপান, ইটালি হল এই ব্যবস্থার অন্তর্গত।

প্রশ্ন ২১। রাজনৈতিক দলের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখাে।
উত্তর : (i) রাজনৈতিক দলের সদস্যরা একই মতাদর্শে অনুপ্রাণিত, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কর্মসূচি নিয়ে দলীয় সদস্যদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মতাদর্শগত মিল থাকে তাদের মধ্যে। (ii) প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কর্মসূচি থাকে। সেই কর্মসূচি রূপায়িত করাই তাদের লক্ষ্য।

প্রশ্ন ২২। রাজনৈতিক দলের মার্কসীয় সংজ্ঞা লেখাে।
উত্তর : মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনৈতিক দল বলতে কোনাে শ্রেণির সচেতন অংশের রাজনৈতিক সংগঠনকে বােঝায়। ওই অংশ সংশ্লিষ্ট শ্রেণি বা তার একাংশের স্বার্থ সম্পর্কে সজাগ থাকে এবং ওই স্বার্থ প্রকাশ করে। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে বলা হয় যে, রাজনৈতিক দল মূলত শ্রেণিচেতনা প্রণােদিত এবং শ্রেণিস্বার্থ পরিপূরণের জন্য গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন।

প্রশ্ন ২৩। কে এবং কবে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) দল গঠন করেন?
উত্তর : শ্রীমতি মমতা ব্যানার্জী ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের পয়লা জানুয়ারি কংগ্রেস ত্যাগ করে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) দল গঠন করেন।

বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) সংবিধানে মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ করার প্রয়ােজনীয়তা কী?
উত্তর : রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ : রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা যায়।
(i) রাজনৈতিক দলের সদস্যরা একই মতাদর্শে অনুপ্রাণিত, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কর্মসূচি নিয়ে দলীয় সদস্যদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মতাদর্শগত মিল থাকে তাদের মধ্যে।
(ii) প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কর্মসূচি থাকে সেই কর্মসূচি রূপায়িত করা তাদের লক্ষ্য।
(iii) প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতা লাভ করা। এই কারণে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল তাদের আদর্শ ও কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করে।
(iv) প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব দলীয় প্রতীক থাকে। এই দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
(v) প্রতিটি রাজনৈতিক দল সভা সমাবেশ, মিছিল, প্রচার ইত্যাদির মাধ্যমে জনমতকে নিজেদের অনুকূলে গঠন করার চেষ্টা করে।
(vi) রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকার শুধু নাগরিকদের আছে, বিদেশিদের নয়।

প্রশ্ন ২) দলীয় ব্যবস্থার গুণাবলি আলােচনা করাে।
উত্তর : গুণ (i) রাজনৈতিক দল দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জাতির স্বার্থরক্ষা করে রাজনৈতিক দল।
(ii) দলগুলি জনগণের মধ্যে শৃঙ্খলা, ঐক্য ও সংহতি আনে। জনগণের মধ্যে কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস দূর করতে সাহায্য করে।
(iii) সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। জনগণের দাবি আদায়ের জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
(iv) ভােটার তালিকা সংশােধনের ব্যাপারে নতুন ভােটার নথিভুক্ত করার ব্যাপারে রাজনৈতিক দল নাগরিককে সাহায্য করে।
(v) রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের চাবিকাঠি। গণতন্ত্র সফল হয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দ্বারা। এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করে রাজনৈতিক দলগুলি। রাজনৈতিক দল জনগণকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে।
(vi) রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন মত ও চিন্তা থাকে। আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে বিরােধ মিটিয়ে মতৈক্য গড়ে তােলে। যেমন-কাশ্মীর প্রশ্নে সমস্ত দলগুলির মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে।
(vii) জনগণের অস্পষ্ট ধারণার পরিবর্তন করে জনগণকে সুগঠিত ও সুস্পষ্ট করে তােলে দল।
(viii) দলব্যবস্থা সরকারের স্বৈরাচারিতা রােধ করে। বিরােধী দলের সমালোচনায় সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না। এইজন্য দলব্যবস্থাকে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ বলা হয়।

প্রশ্ন ৩) দলীয় ব্যবস্থার দোষ কী কী?
উত্তর : দোষ
(i) বহুদল ব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী। ভারতের দিকে তাকালে আমরা বহু দলব্যবস্থার ত্রুটি দেখতে পাই। অর্থের বিনিময়ে দলগুলি ঘােড়া কেনাবেচা করে ভারতীয় রাজনীতিকে কলুষিত করছে।
(ii) দলগুলি অনেক সময় মিথ্যাচার এবং অসৎ উপায়ের আশ্রয় নেয়। এর ফলে যােগ্য ব্যক্তিরা রাজনীতিতে আসতে পারে না।
(iii) নির্বাচনী প্রচারে অনেক সময় দলগুলি মিথ্যা প্রচারের আশ্রয় নেয়। অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা প্রলােভন দেখায়। জনগণ এতে বিভ্রান্ত হয়। সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
(iv) সরকারি দল অনেক সময় নির্বাচনে জয়লাভের আশায় নির্বাচনের আগে আইন পাস করে। এর উদ্দেশ্য জনস্বার্থ নয়, চমক সৃষ্টি করা।
(v) আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন যে, দলীয় মনােভাব গণতান্ত্রিক সরকারের বড়াে শত্রু। এর অর্থ এই যে, দলীয় স্বার্থ অনেক সময় জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেয়। সমাজবিরােধী, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। সমগ্র সমাজ পরস্পর গােষ্ঠীতে বিভক্ত হয়।
(vi) পরিচালনার জন্য ধনিক শ্রেণি অনেক দলকে মােটা অঙ্কের চাঁদা দেয়। অধ্যাপক উৎপল রায় একটি সুন্দর উপমার উল্লেখ করেছেন। ‘বাঁশীওয়ালাকে যে টাকা দেয়, সেই বাঁশীর সুর নির্ধারণ করে।’ এই ধনিক শ্রেণিরাই তাদের স্বার্থে দলের নীতিকে প্রভাবিত করে।

প্রশ্ন ৪) দলীয় ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি কীভাবে দূর করা যায়?
উত্তর : ত্রুটিগুলি দূর করার উপায় (i) জনগণের মত নেবার জন্য গণভােট গ্রহণের পদ্ধতি (Referendum) প্রবর্তন করতে হবে।
(ii) সরকার উদ্যোগ গ্রহণ না করলে জনগণ আইন প্রনয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করবে একে বলে গণউদ্যোগ (Initiative)। গণউদ্যোগ অনুযায়ী আইন তৈরি হলে জনগণের আধিপত্য বজায় থাকে।
(iii) জনপ্রতিনিধিরা যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করে, তবে তাকে ফিরিয়ে আনার অধিকার (Recall) জনগণের থাকবে। এইসব ব্যবস্থা অবলম্বন করলে জনগণ সক্রিয় হবে। দলীয় ব্যবস্থার ত্রুটি দূর হবে।
(iv) দলত্যাগ (Defection) ভারতের রাজনীতিকে কলুষিত করছে। জনপ্রতিনিধির জনগনের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এই অবস্থায় দলত্যাগীদের সদস্যপদ বাতিল করার জন্য আইন থাকা প্রয়ােজন। দুর্নীতি দূর করার জন্য প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
(v) সংবিধান অনমনীয় হলে ভালাে হয়। কারণ শাসকশ্রেণি ইচ্ছামতাে শাসনব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারবে না।
(vi) জনগণের মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত করতে হবে, যাতে দলীয় স্বার্থে শাসক শ্রেণী মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে না পারে।
(vii) নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা দলগুলিকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দেবে। বিচারপতিকে নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের নিরপেক্ষভাবে তাদের কাজ করতে হবে।
(viii) সংখ্যালঘুদের স্বার্থ যাতে ক্ষুন্ন না হয় তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। জনস্বার্থে সংবিধান সংশােধন করতে হবে।

প্রশ্ন ৫) একদল ব্যবস্থা কাকে বলে? এই দলীয় ব্যবস্থার গুণগুলি আলােচনা করাে।
উত্তর : একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকলে অথবা সঙ্গে একটি মাত্র দলের কথা থাকলে সেই দলব্যবস্থাকে একদল ব্যবস্থা বলে। সবচেয়ে ভালাে উদাহরণ হল তানজানিয়ার দলব্যবস্থা। কেনিয়ার একমাত্র রাজনৈতিক দলের নাম হল কেনিয়া আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন (Kanu)।
গুণ
(i) ঐক্য ও সংহতি : এই ব্যবস্থায় সহজেই জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করা যায়। একাধিক দল থাকলে দলাদলি দেখা দেয়। দলীয় স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের উপর প্রাধান্য পায়। একদলীয় ব্যবস্থার এই ত্রুটি থাকে না।
(ii) অনুন্নত দেশে উপযােগী : পশ্চাদপদ দেশে একদলীয় ব্যবস্থা ভালাে। কারণ এইসব দেশের প্রধান লক্ষ্য হল সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তর ঘটানাে। একদল ব্যবস্থা থাকলে এই লক্ষ্য পূর্ণ হয়।
(iii) জরুরি অবস্থার উপযােগী : জরুরি অবস্থায় দেশের প্রয়ােজনে একদল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একটি দল দলীয় কর্মসূচি সহজেই রূপায়িত করতে পারে।
(iv) ব্যয়সংক্ষেপ : এখানে ব্যয়বাহুল্য এড়ানাে যায়। একাধিক রাজনৈতিক দল থাকলে দলগুলি তাদের সাংগঠনিক প্রয়ােজনে অনেক অর্থব্যয় করে।
(v) প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা হল গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। ধন বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা যেখানে আছে সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
(vi) স্থায়িত্ব : এই ব্যবস্থায় সরকারের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। বহুদল ব্যবস্থায় কোনাে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে একাধিক দল মিলে সরকার গঠন করে। এই ধরনের সরকার অনেক সময় স্থায়ী হয় না।

প্রশ্ন 6) একদল ব্যবস্থার দোষ কি কি? 
উত্তর : দোষ
(i) অগণতান্ত্রিক : একদলীয় ব্যবস্থায় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার স্বৈরাচারী হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হয়। অধ্যাপক ডি. এন. বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের প্রাণ একদলীয় শাসন-ব্যবস্থায় থাকতে পারে না।
(ii) ব্যক্তিত্বের বিনাশ : একদলীয় ব্যবস্থায় ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তার অবকাশ থাকে না। একটি নির্দিষ্ট ধাচে বা পথে ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা নিয়ন্ত্রিত হয়। ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।
(iii) নিষ্ক্রিয় নাগরিক : একদলীয় ব্যবস্থায় জনগণকে শাসকদলের নির্দেশ মানা ছাড়া অন্য কিছু করার থাকে না। জনগণের মনে উদাসীনতা দেখা দেয়।
(iv) সংখ্যালঘু স্বার্থ অবহেলিত : একদলীয় ব্যবস্থায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ অবহেলিত হয়। বহুদলীয় ব্যবস্থায় বহু রাজনৈতিক দল থাকে। এই দলগুলি সকলের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে বিরােধী দল নেই, সেখানে সরকার স্বৈরাচারী হতে বাধ্য।
(v) জনমত মূল্যহীন : একদল ব্যবস্থায় জনমতের কোনাে মূল্য থাকে না। জনগণ উপেক্ষিত হয়। এই উপেক্ষা যে-কোনাে সময় বিদ্রোহ, বিপ্লবের আকারে ফেটে পড়তে পারে।
     বিভিন্ন ধরনের একদল ব্যবস্থা যে একই ধরণের ক্ষতিকর তা নয়। ফ্যাসিবাদী একদল ব্যবস্থা আর সমাজতান্ত্রিক একদল ব্যবস্থা সমান বিপজ্জনক নয়। আসলে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রকৃতির উপর অনেকটা নির্ভর করে একদল ব্যবস্থার চরিত্র। 

প্রশ্ন ৭) দ্বিদলীয় ব্যবস্থা কাকে বলে? দ্বিদলীয় ব্যবস্থার গুণগুলি কী কী? 
উত্তর : দুটি রাজনৈতিক দলের দ্বারা ক্ষমতা পরিচালিত হলে তাকে দ্বিদলব্যবস্থা বলে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিদলব্যবস্থা দেখা যায়। এই ব্যবস্থায় দুটি দলের মধ্যে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অপর দল বিরােধী দলের ভূমিকায় থাকে।
গুণ
(i) অধ্যাপক বার্কার দু-দিক থেকে দ্বিদলব্যবস্থার গুণাগুণ পর্যালােচনা করেছেন। (ক) নীতিগত দিক থেকে, (খ) কার্যকারিতার দিক থেকে। তাঁর মতে, নীতিগত দিক থেকে একদল ব্যবস্থার থেকে দ্বিদলব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকর। বাস্তব কার্যকারিতার দিক থেকে দ্বিদলব্যবস্থাই আদর্শ।
(ii) দুটি দল থাকায় জনগণের মনে কোনাে বিভ্রান্তি দেখা দেয় না। জনগণ দুটি দলের আদর্শ ও কর্মসূচি বিচার করে একটিকে সমর্থনের জন্য বেছে নিতে পারে। বার্কার বলেছেন, সংখ্যা বাড়লেই নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয় এবং এর ফলে বিভ্রান্তি বাড়ে।
(iii) দুটি দল, একটি সরকারি এবং অপরটি বিরােধী, দলব্যবস্থায় সংকীর্ণতা দেখা দেয় না। দু-দলকেই জনগণের কাছে দায়িত্বশীল থাকতে হয়।।
(iv) নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পথে সরকারের পরিবর্তন ঘটে। বিদ্রোহ-বিপ্লবের আশঙ্কা থাকে না।
(v) দ্বিদলব্যবস্থা স্বৈরাচার বিরােধী। সরকারি দল সর্বদাই বিরােধী দলকে মর্যাদা দেয় ও সমালােচনাকে ভয় করে। অধ্যাপক ল্যাস্কির মতে, দুটি দলের মধ্য দিয়ে সহজেই জনমত প্রকাশিত হতে পারে।
(vi) দ্বিদল ব্যবস্থায় মাের্চা সরকার গঠনের প্রয়ােজন হয় না। জোড়াতালি দিয়ে মাের্চা সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারে না।

প্রশ্ন ৮) বহুদলীয় ব্যবস্থা বলতে কী বােঝায় ? এই ব্যবস্থার গুণ কী কী?
উত্তর : দুটি দলের বেশি রাজনৈতিক দল থাকলে সেই দলব্যবস্থাকে বহুদল ব্যবস্থা বলে। এর বৈশিষ্ট্য হল : (i) এই ব্যবস্থায় দুই-এর বেশি রাজনৈতিক দল আইনগতভাবে স্বীকৃত, (ii) সব নির্বাচকমণ্ডলী এই দলগুলির সমর্থকদের মধ্যে বিভক্ত হয়। (iii) কোনাে একটি দল আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না, বৃহত্তম দল অন্য দলের সঙ্গে সরকার গঠন করে।

গুণ
(i) এই দলব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রের মূল কথা হল অনেক মতামত থেকে একটি মতামতকে পছন্দ করার স্বাধীনতা।
(ii) আধুনিক জীবন ও জগৎ অনেক জটিল। আছে বিভিন্ন ধরনের মতামত ও মতাদর্শ। এই মতামতগুলিই সংগঠিতভাবে রূপ পায় বহুল ব্যবস্থায়।
(iii) বহুদল ব্যবস্থা অনেক বেশি নমনীয় ও স্থিতিস্থাপক (elastic)। এই ব্যবস্থার সুবিধা হল প্রয়ােজনে দলগুলি একত্রিত হতে পারে, আবার পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
(iv) আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নানা ধরনের স্বার্থগােষ্ঠী দেখতে পাওয়া যায়। এই স্বার্থগােষ্ঠী আধুনিক সমাজের বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, প্রয়ােজনীয় অংশও। বহুদল ব্যবস্থায় এইসব স্বার্থগােষ্ঠী অনেক বেশি সক্রিয় হয়।
(v) বহুদল ব্যবস্থা জনগণকে রাজনৈতিক বিষয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত ও সচেতন করে তােলে। রাজনৈতিক দলগুলি নানা সমস্যা নিয়ে বিচারবিশ্লেষণ করে।
(vi) সরকার কখনই স্বৈরাচারী হতে পারে না। কারণ কোনাে দলই নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।
(vii) বহুদল ব্যবস্থায় নিজ নিজ শক্তি অনুযায়ী প্রতিটি দল আইনসভায় প্রতিনিধি পাঠাতে পারে। ফলে, আইনসভার প্রতিটি দলের প্রতিনিধিত্ব থাকে।

প্রশ্ন ৯) বহুদলীয় ব্যবস্থার বিপক্ষে যুক্তিগুলি কী কী?
উত্তর : বিপক্ষে যুক্তি
(i) সরকারের স্থায়িত্ব অনিশ্চিত : বহুদল ব্যবস্থায় অনেক সময় নির্বাচনে একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। ফলে শক্তিশালী ও স্থায়ী সরকার গঠন করা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মাের্চা সরকার গঠিত হয়। একটি বা দুটি দল মাের্চা ত্যাগ করলে সরকারের পতন ঘটে।
(ii) দ্রুত সিদ্ধান্ত সম্ভব নয় : বহুদল ব্যবস্থায় মাের্চা বা কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে বহু শরিকের সঙ্গে কথা বলতে অযথা সময় নষ্ট হয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
(iii) ভােটাররা বিভ্রান্ত হয় : বহুদলীয় ব্যাবস্থায় ভােটাররা কোন দল ও মতকে সমর্থন করবে তা বুঝে উঠতে পারেনা। নির্বাচনের সময় প্রার্থী বাছাই করার ক্ষেত্রে ভােটাররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
(iv) দলত্যাগ ঘটে : বহুদল, ব্যবস্থায় কোনাে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে দলত্যাগ ঘটে। স্বার্থান্বেষী জনপ্রতিনিধিরা অন্যতম ব্যাধি। বহু দল ব্যবস্থায় দলগুলির মধ্যে অসহিষ্মতা দেখা দেয়।
(v) আইনসভার প্রাধান্য : বহুদল ব্যবস্থায় আইনসভা শাসনবিভাগের উপর কর্তৃত্ব করে। ফলে শাসনবিভাগ কোনাে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে না। ব্যস্ত থাকতে হয় আইনসভাকে খুশি করতে।
(vi) স্থায়িত্ব : বহুদল ব্যবস্থায় সরকারের স্থায়িত্ব থাকে না। রাজনৈতিক জীবনে অস্থিরতা দেখা দেয়। দলগুলির মধ্যে স্বার্থের হানাহানি লেগে যায়।
(vi) দুর্নীতি : এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক স্তরে দুর্নীতি প্রশ্রয় পায়। আইন সভার সদস্য কেনাবেচা হয়। একে বলা হয় ঘােড়া কেনাবেচা (Horse-trading)

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১) রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা দাও। দলব্যবস্থার গুরুত্ব আলােচনা করাে।
উত্তর : রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের জন্যে যখন কিছু সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে মিলিত হয়, তখন তাকে বলে রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বলতে বােঝায়, নির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে দেশের কল্যাণ সাধন করা। তাই বার্ক (Burke) বলেছেন,—যখন কোনাে জনসমষ্টি সুনির্দিষ্ট স্বীকৃত নীতির ভিত্তিতে সমবেত প্রচেষ্টায় দেশের স্বার্থরক্ষা করতে এগিয়ে আসে, তখন তাদের বলে রাজনৈতিক দল। তবে এই সংজ্ঞা অসম্পূর্ণ। রাজনীতির মূলকথা হল ক্ষমতা দখল করা। রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হল সরকারি ক্ষমতা দখল করা। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)-এর ভাষায় বলা যায়, “Parties live in a house of power”, অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতার দুর্গে বাস করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ম্যাকাইভার বলেছেন,—“নীতি বা আদর্শের ভিত্তিতে কোনাে সংগঠিত জনসমষ্টি যখন বৈধ উপায়ে শাসনক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে, তখন তাকে আমরা রাজনৈতিক দল বলতে পারি।”

রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব : প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা একান্ত প্রয়ােজন। অধ্যাপক বার্কার (Burker) বলেছেন,—“গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে হলে দলীয় ব্যবস্থাকে স্বীকার করতেই হবে।” এ্যালান বল (Alan Bal) বলেছেন,—“রাজনৈতিক দল ছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কল্পনা করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই ভূমিকা নিম্নে আলােচিত হল –

গুণ
(i) সমস্যা সমাধানের পথ দেখায় : দেশে নানা ধরনের সমস্যা থাকে। একই সঙ্গে সব সমস্যা। সমাধান করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে এবং কীভাবে সেগুলি সমাধান করা যায়, সে সম্পর্কে জনগণকে পথ দেখায়।
(ii) প্রতিনিধি নির্বাচনে সাহায্য করে : গণতন্ত্রে প্রতিনিধি নির্বাচন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রত্যেকে তার রাজনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী প্রতিনিধি নির্বাচন করে।
(iii) বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তােলে : অধ্যাপক গার্নার বলেছেন,-সুশাসনের জন্যে শাসন বিভাগের সঙ্গে আইন বিভাগের ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ থাকা দরকার। দলব্যবস্থা এই সেতুবন্ধনের কাজ করে।
(iv) শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকারের পরিবর্তন ঘটায় : রাজনৈতিক দল শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকারের পরিবর্তন ঘটায়। দলীয় ব্যবস্থা বুলেটের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন সম্ভব।
(v) বিরােধী দল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে : দলীয় ব্যবস্থায় বিরােধী দল থাকে। এই দলের কাজ হল সরকারের কাজের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং জনস্বার্থ বিরােধী কাজের সমালােচনা করা, সরকারের ভুলভ্রান্তিকে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা। এতে সরকার সংযত থাকে।
(vi) রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটায় : প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সভাসমিতিতে, পত্রপত্রিকায় ও আলােপ-আলােচনার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন সমস্যা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে। এতে জনসাধারণ রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার সুযােগ পায়।
(vii) জনমত গঠন করে : গণতন্ত্রের প্রাণ হল জনমত। বলিষ্ঠ জনমত গণতন্ত্রকে সঠিক পথে চালিত করে। রাজনৈতিক দল সভাসমিতি, পুস্তক-পুস্তিকা, দেওয়াল লিখন প্রভৃতির মাধ্যমে জনমত গঠনে সাহায্য করে।

প্রশ্ন ২) দ্বিদলীয় ও বহুদলীয় ব্যবস্থার তুলনামূলক আলােচনা করাে।
উত্তর : যে শাসনব্যবস্থায় দুটি দলের প্রাধান্য থাকে এবং বহুকাল ধরে পর্যায়ক্রমে দুটি দল সরকার পরিচালনা করে, সেই শাসনব্যবস্থাকে বলা হয় দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থা। আবার যে শাসনব্যবস্থায় দুই এর বেশি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকে সেই শাসনব্যবস্থাকে বলা হয় বহুদলীয় শাসনব্যবস্থা। নিম্নে দ্বিদলীয় ও বহুদলীয় শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলােচনা করা হল।
পার্থক্য
(i) দায়িত্ব পালনে : বহুদলীয় ব্যবস্থা অপেক্ষা দ্বিদলীয় ব্যবস্থার রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা সহজতর হয়। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে আর অপর দলটি প্রকারের কাজের সমালােচনা করে। মানুষকে সচেতন করে। ইংল্যান্ডে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সাফল্যের মূল কারণ হল দ্বিদলীয় ব্যবস্থা।
(ii) নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই : দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় ভােটদাতাদের পক্ষে নির্বাচনের সময় প্রার্থী বাছাই করতে সুবিধা হয়। বহুদলীয় ব্যবস্থায় এই প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মনস্থির করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
(iii) স্থায়িত্ব : দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় সরকার স্থায়িত্ব লাভ করে। কারণ অনেক সময় নির্বাচনে একটি দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বহুদলীয় ব্যবস্থায় অনেক সময় কোনাে দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। ফলে বহুদল সমর্থিত সরকার গঠিত হয়।
(iv) সুশাসন : দুটি দলের মধ্যে প্রতিযােগিতা থাকলে সুশাসন সম্ভব। যেখানে দুটি দল সেখানে আলােচনা দুটি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিভিন্ন বিরােধী দল থাকলে সরকারকে কাজ করতে অসুবিধায় পড়তে হয়। সময়ের অপচয় হয়।
(v) সচেতনতা : বহুদলীয় ব্যবস্থা অপেক্ষা দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় বিরােধী দল অধিকতর দায়িত্বশীল ও সচেতন হয়। দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় দলত্যাগ কম হয়। বহুদলীয় ব্যবস্থায় দলত্যাগের প্রবণতা অনেক বেশি।
(vi) প্রকল্প গ্রহণ : দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় সরকার স্থায়ী হয় বলে শাসন কাজে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ। করতে পারে। বহুদলীয় ব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। কারণ শরিক দলগুলিকে নানাভাবে সন্তুষ্ট। রাখা হয়।
(vii) পরিচ্ছন্নতা : দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় রাজনীতি অনেক পরিচ্ছন্ন হয়। বহুদল ব্যবস্থায় এই রাজনীতি ততটাই অপরিচ্ছন্ন। বহুদল ব্যবস্থায় রাজনীতি কলুষিত হয়।

প্রশ্ন ৩) ভারতের যে-কোনাে একটি জাতীয় রাজনীতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামাে ও কর্মসূচির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
উত্তর : গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা অপরিহার্য। অধ্যাপক বার্কার (Barker) বলেছেন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে হলে দলীয় ব্যবস্থাকে স্বীকার করতেই হবে।”তবে উদারনৈতিক গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকে। ভারত একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দেশ। তাই এখানে একাধিক রাজনৈতিক দল আছে। এদের মধ্যে কিছু জাতীয় দল, কিছু আছে আঞ্চলিক দল। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে জাতীয় দলের গুরুত্ব বেশি। জাতীয় দলের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য হল—ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (ই) দল।
• ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (ই)
ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সব থেকে পুরাতন দল। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে এর জন্ম। স্বাধীনতা আন্দোলনে এই দল অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। গান্ধিজির নেতৃত্ব ছিল এই দলের প্রাথমিক শক্তির উৎস। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই দল একটানা কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিতে সরকার চালিয়েছে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস দল দু-ভাগ হয়। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে আবার ভাগ হয়ে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেস (ই) দলের উৎপত্তি হয়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে অষ্টম লােকসভা নির্বাচনে রাজীব গান্ধির নেতৃত্বে এই দল লােকসভার ৫০৮টি আসনের মধ্যে ৪০১টি আসন দখল করে এক নজির সৃষ্টি করে। তবে বর্তমানে এই দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে।
• সাংগঠনিক কাঠামাে
কংগ্রেস (ই) দল একটি সর্বভারতীয় জাতীয় দল বলে এর সংগঠন সারা ভারত জুড়ে আছে। এই সংগঠনের সর্ব নিম্নস্তরে আছে ব্লক কংগ্রেস কমিটি। তার উপরে আছে জেলা কংগ্রেস কমিটি। রাজ্যস্তরে সবার উপরে আছে প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি। সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস সর্বোচ্চ সংস্থা হল,—সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি যার সংক্ষিপ্ত নাম হল AICC। তবে এর আয়তন বিরাট বলে এর দৈনন্দিন কার্য পরিচালনার জন্যে আছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি। এই কমিটি হল দলের সর্বোচ্চ কার্যনির্বাহী সংস্থা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এই কমিটির হাতে আছে।
   কংগ্রেস দলের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হলেন কংগ্রেস সভাপতি। তাঁকে সাহায্য করার জন্য সভাপতি কয়েকজন সাধারণ সম্পাদক ও সম্পাদককে নিযুক্ত করেন। তবে সামগ্রিকভাবে কংগ্রেস দলের ক্ষমতা কংগ্রেস সভাপতির হাতে থাকে।
• কর্মসূচি
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (ই) গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে বিশ্বাসী। তবে এই দল মনে করে ভারতে শান্তিপূর্ণ উপায়েই সমাজবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কংগ্রেস সহযােগিতা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। অর্থনীতির ক্ষেত্রে মিশ্র অর্থনীতি-ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষপাতী। এর কর্মসূচির মধ্যে আছে দারিদ্র্য দূরীকরণ, ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েতিরাজ প্রতিষ্ঠা, কুটিরশিল্পের অগ্রগতি, দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তােলা প্রভৃতি। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রীমতী গান্ধি দুর্বল শ্রেণির মানুষদের উন্নতির জন্যে বিশদফা কর্মসূচি ঘােষণা করে তাঁর “গরিবী হঠাও” শ্লোগানকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করেন। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে চতুর্দশ লােকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের যেসব কর্মসূচি ঘােষিত হয়েছে তাদের মধ্যে আছে ছাঁটাই নীতির বিলােপ, শ্রমনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থানের সুযােগ বৃদ্ধি, বাছাইয়ের ভিত্তিতে বিলগ্নিকরণ, কৃষিতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়ােগ বৃদ্ধি প্রভৃতি।
মূল্যায়ন
ভারতের কংগ্রেস সবথেকে প্রাচীন এবং প্রকৃত অর্থে সর্বভারতীয় দল। তবে এই দলের কার্য পরিচালনার পদ্ধতির মধ্যে বিকেন্দ্রীকরণের অভাব আছে। সব ক্ষমতা কংগ্রেস সভাপতির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে সভাপতি যদি দুর্বল হন, স্বাভাবিক ভাবে দল দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্রীমতী গান্ধির বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দলকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। মাঝে মাঝে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাবে দল দুর্বল হয়ে পড়েছে। সােনিয়া গান্ধির নেতৃত্বে দল প্রথম দিকে দুর্বল হয়ে পড়লেও বর্তমানে দলীয় শৃঙ্খলা ফিরে আসায় দলের মধ্যে শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের লােকসভা নির্বাচনে এই দল ১৪৫টি আসন দখল করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ড. মনমােহন সিংহের নেতৃত্বে জোট সরকার গড়েছে।

প্রশ্ন ৪) ভারতের দলব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
উত্তর : গণতন্ত্রে দলীয়ব্যবস্থা অপরিহার্য। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে একাধিক দল থাকে। ভারত উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দেশ। তাই এখানে একাধিক রাজনৈতিক দল আছে। তবে এখানে জাতীয়, আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক, জাতিভিত্তিক, দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী প্রভৃতি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পটভূমিতে বহুদলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আমরা এই দলীয় ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নলিখিত ভাগে আলােচনা করতে পারি :
(i) উৎপত্তিগত বৈশিষ্ট্য : ভারতে লিখিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দলীয় ব্যবস্থার উদ্ভব হয়নি। রাজনীতির প্রয়ােজনে দলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পরাধীনতার গ্লানি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে জন্ম নিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস। এই দলের মধ্যে থেকে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দলের উৎপত্তি হয়েছে।
(ii) একটি দলের আধিপত্য : ভারতে বহুদলীয় ব্যবস্থা থাকলেও কেন্দ্রে ১৯৭৭-৭৯ ও ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ ছাড়া কংগ্রেসের একক প্রাধান্য দেখা যায়। কংগ্রেস(ই), ছাড়া কোনাে দলের সাংগঠনিক শক্তি সারা ভারতে নেই। প্রথম নির্বাচনে লােকসভার ৪৮৯ আসনের মধ্যে কংগ্রেস (ই) পায় ৩৫৭টি আসন। অষ্টম লােকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস (ই) পায় ৪০১টি আসন।
(iii) শক্তিশালী বিরােধী দলের অভাব : ভারতে দলীয় ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শক্তিশালী বিরােধী দলের অভাব। সংখ্যায় তারা অনেক বেশি। অনৈক্য তেমনি বেশি। তারা ঐক্যবদ্ধ হলে সরকার গঠন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। ১৯৭৭ এবং ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বিরােধীদের এই ঐক্য স্থায়ী হয়নি।
(iv) ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল : ভারতের দলীয় ব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল— ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বে জাতীয় কংগ্রেস গান্ধিজিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। শুধু কংগ্রেস নয়, অন্য দলেও এ জিনিস আছে। যেমন ভারতীয় জনতা পার্টিতে নরেন্দ্র মোদী, তৃণমূল কংগ্রেসে শ্রীমতি মমতা ব্যানার্জী, এ. আই. ডি. এম. কে.-তে শ্রীমতি জয়ললিতা, তেলেগু দেশমে এন. টি. রামারাও প্রভৃতি।
(v) আঞ্চলিক দল : ভারতের দলীয়ব্যবস্থায় জাতীয় দলের পাশাপাশি আঞ্চলিক দল দেখা যায়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে ৭টি দল জাতীয় দল ও ৩১টি আঞ্চলিক দল হিসাবে স্বীকৃতি পায়।
(vi) সাম্প্রদায়িক দলের অবস্থিতি : ভারতে দলীয় ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িক দলের উপস্থিতি দেখা যায়। ধর্মের ভিত্তিতে কিছু দল গড়ে উঠেছে। যেমন মুসলিম লিগ, অকালি দল প্রভৃতি। কেউ কেউ বি.জে.পি.কে সাম্প্রদায়িক দল বলে। কারণ, এই দলের শক্তির উৎস হল R.S.S.-যাকে একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান বলে মনে করা হয়।
(vii) দলত্যাগের প্রবণতা : দলত্যাগ ভারতের দলীয় ব্যবস্থার একটি কলঙ্কিত বৈশিষ্ট্য। অর্থ। ও ক্ষমতার প্রতি লােভ দলত্যাগের প্রধান কারণ। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাজীব গান্ধির উদ্যোগে দলত্যাগ বিরােধী আইন তৈরি হয়েছে।
(vii) কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রবণতা : ভারতে বহুদল থাকায় কোয়ালিশন সরকার গড়ার প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের পর কেরালায়, পাঞ্জাবে, পশ্চিমবঙ্গে ও উত্তরপ্রদেশে কোয়ালিশন সরকার গড়ে ওঠে। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রে জনতা দলের সরকার কার্যত কোয়ালিশন সরকার ছিল। চতুর্দশ লােকসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেসের ড. মনমােহন সিং-এর নেতৃত্বে জোট সরকার গঠিত হয়েছে।
(ix) দলীয় সংহতির অভাব : ভারতের দলীয় ব্যবস্থায় দলীয় সংহতির অভাব দেখা যায়। কংগ্রেস(ই) দলের এই সমস্যা সবথেকে বেশি। অন্য দলের মধ্যে অন্তর্বিরােধ দলকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। শুধুমাত্র জাতীয় দলে নয়, আঞ্চলিক দলগুলিতেও দলীয় সংহতির অভাব দেখা যায়।
(x) ভাষাভিত্তিক দল : ভারতে ভাষার ভিত্তিতে কিছু দল গড়ে উঠেছে। অন্ত্রে তেলেগুদেশম, তামিলনাড়ুতে ডি. এম. কে, আসামে অ.গ.প. প্রভৃতি দল এইভাবে সৃষ্টি হয়েছে।
মূল্যায়ন
ভারতের দলীয় ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক জোহারি বলেছেন, আমাদের দলীয় ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতাে শিথিল নয়, আবার ইংল্যান্ডের মতাে সুসংবদ্ধ নয়। এখানে দলীয় শৃঙ্খলার অভাব আছে বলে ছােটো দল বড়াে দলে মিশে যায়। বড়াে দল ছােটো দলকে কুক্ষিগত করে নেয়। বিভিন্ন দলের মিলেমিশে যাওয়া আবার ভাঙন ধরানাে আমাদের বহুদলীয় ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন ৫) গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলব্যবস্থার গুরুত্ব আলােচনা করাে।
উত্তর : রাজনৈতিক দল আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অলংকার। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালান বল বলেছেন,—“দলহীন গণতন্ত্র অচল”। আধুনিক আর এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্লন্ডেল বলেছেন, “রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক কাঠামাের একটি অনন্য আধুনিক রূপ।” নিম্নে ইহার গুরুত্ব উল্লেখ করা হল :
(i) দল ও গণতন্ত্র : গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল এক অপরিহার্য অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভিত্তির প্রধান মাধ্যম হল জনগণের সম্মতি। এই সম্মতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়।
(ii) জনমত গঠনে সহায়ক : সক্রিয়, প্রখর জনমতের মাধ্যমে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। রাজনৈতিক দল জনসাধারণের সামনে তার কর্মসূচি ও মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গণতন্ত্রে সরকার ও জনগণের মধ্যে যােগাযােগ পরিলক্ষিত হয়। রাজনৈতিক দল সেই যােগাযােগের বাহন হিসাবে কাজ করে।
(iii) উন্নত চেতনার সহায়ক : নাগরিকের উন্নতমানের চেতনা ও চিন্তার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সাফল্য সম্ভব। রাজনৈতিক দল আইনসভার ভিতরে ও বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে যে প্রচার সংগঠিত করে তা নাগরিকদের উন্নতমানের চেতনা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। অজ্ঞ জনসাধারণ গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তি নয়।
(iv) সংসদীয় শাসনব্যবস্থার প্রাণ : সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল ও গণতন্ত্র ওতপ্রােতভাবে জড়িত। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে সমস্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আবর্তিত হয়।
(v) সরকারের স্থায়িত্ব ও পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার গঠন ও পরিবর্তনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। নির্দিষ্ট বছর অন্তর দেশে নির্বাচন সংঘটিত হয়। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয়। যে রাজনৈতিক দল একবার সরকার গঠন করল তার শাসন যে চিরস্থায়ী হবে তা নয়। জনগণ সরকারের কাজের মূল্যায়নের নিরিখে পরবর্তী নির্বাচনে সেই সরকারকে পরিবর্তন করতে পারে।
(vi) গণতন্ত্রের আদর্শ রূপায়ণ ও দল : গণতন্ত্রের আদর্শ রূপায়ণ রাজনৈতিক দল ছাড়া সম্ভব নয়। গণতন্ত্র মানেই জনমতের শাসন। রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই ব্যক্তি তার আশা- আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করতে পারে।
(vii) দল ও নিয়ন্ত্রণ : গণতন্ত্রের মূল্যবান নীতি হল রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
(viii) আইন ও শাসন বিভাগের সমন্বয়সাধন : সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযােগ দেখা যায়। রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সেই যােগাযােগ গড়ে ওঠে।
(ix) বিরােধী দলের দায়িত্ব : দলব্যবস্থা হল গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। গণতন্ত্রে বিরােধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিরােধী দল ছাড়া গণতন্ত্রের অস্তিত্ব অসম্ভব।
(x) কর্মসূচি তৈরি করা : রাজনৈতিক দলের কাজ জনগণের কল্যাণে কর্মসূচি প্রণয়ন করা। বিভিন্ন দলের এই কর্মসূচির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। কর্মসূচি তৈরি করে পুস্তক আকারে প্রকাশ করা রাজনৈতিক দলের প্রধান কাজ।
(xi) বিভিন্ন চিন্তার প্রকাশ : রাজনৈতিক দল তাদের মতাদর্শের দ্বারা মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে সমৃদ্ধি করে। রাজনৈতিক দলগুলিকে বলা হয় মতাদর্শের দালাল (Brokers of ideas) রাজনৈতিক দল জনগণ ও সরকারের মধ্যে সংযােগ রক্ষা করে।
(xii) কর্তব্য ও দায়িত্ববােধে অনুপ্রাণিত করে : পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্যে অধিকার, কর্তব্য ও দায়িত্ববােধ সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে যা গণতন্ত্রে অন্যতম প্রয়ােজন। রাজনৈতিক দলের কাজের মধ্য দিয়ে জনগণের অধিকার যেমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় অনুরূপভাবে জনগণকে কর্তব্যবােধ ও দায়িত্ববােধে অনুপ্রাণিত করতেও রাজনৈতিক দল বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।

প্রশ্ন ৬) গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের কার্যাবলি আলোচনা করো।
উত্তর : আক্ষরিক অর্থে গণতন্ত্র বলতে বােঝায়,—জনগণের শাসন। কিন্তু বাস্তবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ চালান। তাই একে বলা হয়, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র।। প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। মুনরাে (Muniro) যথার্থই বলেছেন,— “গণতান্ত্রিক সরকারের অপর নাম রাজনৈতিক দল পরিচালিত সরকার।”
   প্রকৃতপক্ষে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। অধ্যাপক লাওয়েল এদের কাজগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। অন্যদিকে অধ্যাপক অ্যালান বল (Alan Ball) পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। আমরা সেগুলিকে নিম্নলিখিতভাবে আলোচনা করতে পারি।
(i) সমস্যা নির্বাচন : আধুনিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা আছে। সব সমস্যার একইসঙ্গে সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলি গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাগুলিকে বেছে নিয়ে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে।
(ii) নীতি নির্ধারণ : রাজনৈতিক দলগুলি তাদের তুলে ধরা সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য দলের নীতি এবং কর্মসূচি তৈরি করে জনগণের সামনে তুলে ধরে। সেই কর্মসূচির সমর্থনে সভাসমিতিতে, পত্রপত্রিকায় প্রচার চালিয়ে দলের পক্ষে জনমত গঠন করতে চেষ্টা করে।
(iii) প্রার্থী নির্বাচন : দলের আসল লক্ষ্য হল,—সরকারি ক্ষমতা দখল করা। এর জন্যে তারা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন কেন্দ্রে দলের প্রার্থী মনােনীত করে। দলীয় প্রার্থীর জয়লাভের জন্য প্রচারকার্য চালায়।
(iv) সরকার গঠন : নির্বাচনের পর যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তারা সরকার গঠন করে এবং নির্বাচনের সময় জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করতে চেষ্টা করে।
(v) বিরােধী দলের কাজ : যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তারা বিরােধী দলের ভূমিকা নেয়। তাদের কাজ হল সরকারের সমালােচনা করা। সরকারের ত্রুটিগুলিকে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে তারা সরকারকে সংযত রাখে এবং স্বৈরাচারিতাকে রােধ করতে চেষ্টা করে। এতে গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়।
(vi) সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়সাধন : অধ্যাপক গার্নার বলেছেন, সুশাসনের জন্যে আইন বিভাগের সঙ্গে শাসন বিভাগের যােগাযােগ থাকা দরকার। রাজনৈতিক দল এই সমন্বয়ের কাজ করে। মন্ত্রীপরিষদ চালিত শাসনব্যবস্থায় আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মন্ত্রীসভায় যান তাই সহজে যােগাযােগ গড়ে ওঠে।
(vii) জনমত গঠন : গণতন্ত্রের প্রাণ হল জনমত। বলিষ্ঠ জনমত গণতন্ত্রকে সঠিক পথে চালিত করে। রাজনৈতিক দলের কাজ হল, জনমত গঠন করা। সংবাদপত্র, সভাসমিতি, পত্রপত্রিকা প্রভৃতির মাধ্যমে তারা এই কাজ করে।
(viii) স্বাধীনতাকে রক্ষা করে : রাজনৈতিক দল জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকারের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। তারা জনগণকে সজাগ ও সচেতন করে স্বাধীনতা রক্ষার পথ প্রশস্ত করে।
মূল্যায়ন
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালান বল (Ball) তাই বলেছেন, “রাজনৈতিক দল ছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কল্পনা করা যায় না। তবে সব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল একই ভুমিকা পালন করে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তারা বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে।

প্রশ্ন ৭) একদলীয় ব্যবস্থা কাকে বলে? এই ব্যবস্থার গুণ ও দোষগুলি উল্লেখ করো।
উত্তর : যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কেবলমাত্র একটি দলের অস্তিত্ব বা কর্তৃত্ব পরিলক্ষিত হয়। সেই দলীয় ব্যবস্থাকে একদলীয় ব্যবস্থা বলা হয়। এই দল একটি আদর্শ, কর্মসূচি ও লক্ষ্য অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকে। একদল ব্যবস্থার সবচেয়ে ভালাে উদাহরণ হল তানজানিয়ার দলব্যবস্থা। কেনিয়ার একমাত্র রাজনৈতিক দলের নাম হল কেনিয়া আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন (KANU)। নিম্নে একদলীয় ব্যবস্থার গুণ ও দোষগুলি উল্লেখ করা হল।

গুণ
(i) ঐক্য ও সংহতি : এই ব্যবস্থায় সহজেই জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করা যায়। একাধিক দল থাকলে দলাদলি দেখা দেয়। দলীয় স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের উপর প্রাধান্য পায়। একদলীয় বাবস্থায় এই ত্রুটি থাকে না।
(ii) অনুন্নত দেশে উপযােগী : পশ্চাদপদ দেশে একদলীয় ব্যবস্থা ভালাে। কারণ এইসব দেশের প্রধান লক্ষ্য হল সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তর ঘটানাে। একদল ব্যবস্থা থাকলে এই লক্ষ্য পূর্ণ হয়।
(iii) জরুরি অবস্থার উপযােগী : জরুরি অবস্থায় দেশের প্রয়ােজনে একদল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একটি দল দলীয় কর্মসুচি সহজেই রূপায়িত করতে পারে।
(iv) ব্যয়সংক্ষেপ : এখানে প্রশাসন পরিচালনার জন্য ব্যয়ভার কম হয়। একাধিক রাজনৈতিক দল থাকলে দলগুলি তাদের সাংগঠনিক প্রয়ােজনে অনেক অর্থব্যয় করে।
(v) প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা হল গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। ধনবৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায় যেখানে একাধিক দল আছে সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
(vi) স্থায়িত্ব : এই ব্যবস্থায় সরকারের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। বহুল ব্যবস্থায় কোনাে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে একাধিক দল মিলে সরকার গঠন করে। এই ধরনের সরকার অনেক সময় সহায়ক হয়।

দোষ
(i) অগণতান্ত্রিক : একদলীয় ব্যবস্থায় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে। ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডি. এন. বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বলেছেন, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের প্রাণ একদলীয় ব্যবস্থায় থাকতে পারে না।
(ii) ব্যক্তিত্বের বিনাশ : একদলীয় ব্যবস্থায় ব্যক্তিরস্বাধীন চিন্তার অবকাশ থাকে না। একটি নির্দিষ্ট ধাঁচে বা পথে ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা নিয়ন্ত্রিত হয়। ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।
(iii) নিষ্ক্রিয় নাগরিক : একদলীয় ব্যবস্থায় জনগণকে শাসক দলের নির্দেশ মানা ছাড়া অন্য কিছু করার থাকে না। জনগণের মনে উদাসীনতা দেখা দেয়।
(iv) সংখ্যালঘু স্বার্থ অবহেলিত : একদলীয় ব্যবস্থায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ অবহেলিত হয়। বহুদলীয় ব্যবস্থা বৃহু রাজনৈতিক দল থাকে। এই দলগুলি সকলের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে বিরােধী দল নেই, সেখানে সরকার স্বৈরাচারী হতে বাধ্য।
(v) জনমত মূল্যহীন : একদল ব্যবস্থায় জনমতের কোনাে মূল্য থাকে না। জনগণ উপেক্ষিত হয়। এই উপেক্ষা যে-কোনো সময় বিদ্রোহ-বিপ্লবের আকারে ফেটে পড়তে পারে।
   বিভিন্ন ধরনের একদলব্যবস্থা যে একই ধরনের ক্ষতিকর, তা নয়। ফ্যাসিবাদী একদলব্যবস্থা আর সমাজতান্ত্রিক একদল ব্যবস্থা সমান বিপজ্জনক নয়। আসলে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃতির উপর অনেকটা নির্ভর করে একদল ব্যবস্থার চরিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 2 =