❝ আজকের প্রশ্নোত্তর ❞

প্রশ্ন ৪) ভারতের দলব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
উত্তর : গণতন্ত্রে দলীয়ব্যবস্থা অপরিহার্য। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে একাধিক দল থাকে। ভারত উদারনৈতিক গণতন্ত্রের দেশ। তাই এখানে একাধিক রাজনৈতিক দল আছে। তবে এখানে জাতীয়, আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক, জাতিভিত্তিক, দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী প্রভৃতি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পটভূমিতে বহুদলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আমরা এই দলীয় ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নলিখিত ভাগে আলােচনা করতে পারি :
(i) উৎপত্তিগত বৈশিষ্ট্য : ভারতে লিখিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দলীয় ব্যবস্থার উদ্ভব হয়নি। রাজনীতির প্রয়ােজনে দলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পরাধীনতার গ্লানি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে জন্ম নিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস। এই দলের মধ্যে থেকে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দলের উৎপত্তি হয়েছে।
(ii) একটি দলের আধিপত্য : ভারতে বহুদলীয় ব্যবস্থা থাকলেও কেন্দ্রে ১৯৭৭-৭৯ ও ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ ছাড়া কংগ্রেসের একক প্রাধান্য দেখা যায়। কংগ্রেস(ই), ছাড়া কোনাে দলের সাংগঠনিক শক্তি সারা ভারতে নেই। প্রথম নির্বাচনে লােকসভার ৪৮৯ আসনের মধ্যে কংগ্রেস (ই) পায় ৩৫৭টি আসন। অষ্টম লােকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস (ই) পায় ৪০১টি আসন।
(iii) শক্তিশালী বিরােধী দলের অভাব : ভারতে দলীয় ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শক্তিশালী বিরােধী দলের অভাব। সংখ্যায় তারা অনেক বেশি। অনৈক্য তেমনি বেশি। তারা ঐক্যবদ্ধ হলে সরকার গঠন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। ১৯৭৭ এবং ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বিরােধীদের এই ঐক্য স্থায়ী হয়নি।
(iv) ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল : ভারতের দলীয় ব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল— ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বে জাতীয় কংগ্রেস গান্ধিজিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। শুধু কংগ্রেস নয়, অন্য দলেও এ জিনিস আছে। যেমন ভারতীয় জনতা পার্টিতে নরেন্দ্র মোদী, তৃণমূল কংগ্রেসে শ্রীমতি মমতা ব্যানার্জী, এ. আই. ডি. এম. কে.-তে শ্রীমতি জয়ললিতা, তেলেগু দেশমে এন. টি. রামারাও প্রভৃতি।
(v) আঞ্চলিক দল : ভারতের দলীয়ব্যবস্থায় জাতীয় দলের পাশাপাশি আঞ্চলিক দল দেখা যায়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে ৭টি দল জাতীয় দল ও ৩১টি আঞ্চলিক দল হিসাবে স্বীকৃতি পায়।
(vi) সাম্প্রদায়িক দলের অবস্থিতি : ভারতে দলীয় ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িক দলের উপস্থিতি দেখা যায়। ধর্মের ভিত্তিতে কিছু দল গড়ে উঠেছে। যেমন মুসলিম লিগ, অকালি দল প্রভৃতি। কেউ কেউ বি.জে.পি.কে সাম্প্রদায়িক দল বলে। কারণ, এই দলের শক্তির উৎস হল R.S.S.-যাকে একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান বলে মনে করা হয়।
(vii) দলত্যাগের প্রবণতা : দলত্যাগ ভারতের দলীয় ব্যবস্থার একটি কলঙ্কিত বৈশিষ্ট্য। অর্থ। ও ক্ষমতার প্রতি লােভ দলত্যাগের প্রধান কারণ। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাজীব গান্ধির উদ্যোগে দলত্যাগ বিরােধী আইন তৈরি হয়েছে।
(vii) কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রবণতা : ভারতে বহুদল থাকায় কোয়ালিশন সরকার গড়ার প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের পর কেরালায়, পাঞ্জাবে, পশ্চিমবঙ্গে ও উত্তরপ্রদেশে কোয়ালিশন সরকার গড়ে ওঠে। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রে জনতা দলের সরকার কার্যত কোয়ালিশন সরকার ছিল। চতুর্দশ লােকসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেসের ড. মনমােহন সিং-এর নেতৃত্বে জোট সরকার গঠিত হয়েছে।
(ix) দলীয় সংহতির অভাব : ভারতের দলীয় ব্যবস্থায় দলীয় সংহতির অভাব দেখা যায়। কংগ্রেস(ই) দলের এই সমস্যা সবথেকে বেশি। অন্য দলের মধ্যে অন্তর্বিরােধ দলকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। শুধুমাত্র জাতীয় দলে নয়, আঞ্চলিক দলগুলিতেও দলীয় সংহতির অভাব দেখা যায়।
(x) ভাষাভিত্তিক দল : ভারতে ভাষার ভিত্তিতে কিছু দল গড়ে উঠেছে। অন্ত্রে তেলেগুদেশম, তামিলনাড়ুতে ডি. এম. কে, আসামে অ.গ.প. প্রভৃতি দল এইভাবে সৃষ্টি হয়েছে।
মূল্যায়ন
ভারতের দলীয় ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক জোহারি বলেছেন, আমাদের দলীয় ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতাে শিথিল নয়, আবার ইংল্যান্ডের মতাে সুসংবদ্ধ নয়। এখানে দলীয় শৃঙ্খলার অভাব আছে বলে ছােটো দল বড়াে দলে মিশে যায়। বড়াে দল ছােটো দলকে কুক্ষিগত করে নেয়। বিভিন্ন দলের মিলেমিশে যাওয়া আবার ভাঙন ধরানাে আমাদের বহুদলীয় ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + six =